বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে আর্নেস্তো চে গুয়েভারা একটি অত্যন্ত জটিল, বহুমাত্রিক এবং তুমুল বিতর্কিত নাম। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার সান্তা ফে শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না। কালক্রমে তিনি বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলমুক্তির এক অবিনাশী প্রতীকে পরিণত হন। তবে সমকালীন ইতিহাসচর্চা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্মেদ আলোয় চে গুয়েভারা কেবল একজন রোমান্টিক গেরিলা নেতা নন। তিনি একই সাথে একজন কট্টর মার্ক্সবাদী সামরিক তত্ত্ববিদ, কিউবা বিপ্লবের প্রধান স্থপতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাস্তবতায় এক তীব্র বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন, রাজনৈতিক দর্শন এবং সামরিক কৌশলকে বুঝতে হলে কেবল স্তুতিগাথা যথেষ্ট নয়। এর জন্য তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক চুক্তির মারপ্যাঁচ এবং ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের একটি নির্মোহ মূল্যায়ন অপরিহার্য।
সান্তা ফে শহরে জন্মের পর আর্নেস্তোর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল এক মননশীল ও উদার পারিবারিক আবহে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই তিনি তীব্র হাঁপানি রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যা তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পিছু ছাড়েনি। কিন্তু এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর অদম্য প্রাণশক্তিকে দমাতে পারেনি; বরং এটি তাঁকে আরও জেদি ও লড়াকু করে তোলে। তাঁর পরিবারে ছিল তিন হাজারেরও বেশি বইয়ের এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, যেখানে ডুব দিয়ে কিশোর আর্নেস্তো কার্ল মার্ক্স, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন থেকে শুরু করে পাবলো নেরুদা, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং জঁ-পল সার্ত্রের দর্শনের সাথে পরিচিত হন। একই সাথে দাবা খেলা ও খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র ঝোঁক। ১৯৪৭ সালে তিনি বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন। চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনকারী এই তরুণ মূলত মানুষের রোগমুক্তির স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু মানবসমাজের গভীরে প্রোথিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাধিটি তাঁকে আরও বেশি তাড়িত করেছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই ছাত্রটির বৈপ্লবিক চেতনার প্রধান রূপান্তর ঘটেছিল ১৯৫২ সালের প্রথমার্ধে নেওয়া লাতিন আমেরিকা পরিভ্রমণের মাধ্যমে। বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোকে সাথে নিয়ে এক জরাজীর্ণ মোটরসাইকেলে তিনি এই সফরে বের হন। এই সফর সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে ছিল না, এটি মূলত আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পথিমধ্যে চিলির লস অ্যাঞ্জেলেস নামক স্থানে মোটরসাইকেলটি চিরতরে অচল হয়ে যায় এবং বাকি পথ তাঁরা পায়ে হেঁটে, ট্রাকে বা ভেলায় পাড়ি দিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ ভ্রমণ কেবল কোনো ভৌগোলিক পর্যটন ছিল না, এটি ছিল লাতিন আমেরিকার খনি শ্রমিকদের অমানবিক শ্রম ও আদিবাসীদের চরম অবহেলিত জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। পেরুর আমাজন অববাহিকার সান পাবলো কুষ্ঠাশ্রমে কুষ্ঠরোগীদের সামাজিক ও শারীরিক বিচ্ছিন্নতা তরুণ আর্নেস্তোকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই ভ্রমণের পরপরই ১৯৫৩ সালে তিনি বলিভিয়ায় যান এবং সেখানে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা খনি শ্রমিকদের ক্ষমতা ও সংস্কারের প্রথম বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেন, যা তাঁর সমাজতান্ত্রিক ভাবনাকে আরও তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করে।
এই বৈপ্লবিক বোধ চে-র চিন্তাধারায় এক ধরনের আপসহীন মানসিকতা তৈরি করে। ১৯৫৩ সালের শেষভাগে গুয়াতেমালায় অবস্থানকালীন ওখানকার সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী নির্বাসিতরা তাঁর কথার মাঝে আর্জেন্টিনার আঞ্চলিক সম্বোধন ‘চে’ (যার অর্থ বন্ধু বা ভাই) ব্যবহারের অভ্যাসের কারণে তাঁকে ভালোবেসে প্রথম ‘চে’ নামে ডাকতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় পেরুর নির্বাসিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিবিদ হিল্ডা গাদিয়ার সাথে। হিল্ডা গাদিয়াই চে-কে প্রথম উচ্চতর মার্ক্সবাদী দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং মেক্সিকোতে নির্বাসিত থাকাকালীন ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর সাথে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেন। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এই অভিযানের মূল উস্কানিদাতা ছিল মার্কিন বহুজাতিক ফল বিপণন সংস্থা 'ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি', যাদের বিশাল ভূ-সম্পত্তি আরবেনজ সরকার ভূমি সংস্কার আইনের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। এই ঘটনা চে-র সেই সশস্ত্র দর্শনকে আরও দৃঢ় করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বা নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। শোষক শ্রেণী কখনো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। কাস্ত্রোর ‘২৬শে জুলাই আন্দোলন’-এ যোগ দিয়ে ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি 'গ্রানমা' নামক জাহাজে চড়ে কিউবায় অবতরণ করেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রার গেরিলা যুদ্ধে চে তাঁর বিখ্যাত ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটান। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি ছোট ও সুসংগঠিত গেরিলা অগ্রবর্তী দল গণ-আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ছাড়াই একটি দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতির সূচনা করতে পারে। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে চে-র নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘সান্তা ক্লারার যুদ্ধ’-এ বাতিস্তার সামরিক ট্রেনের ওপর আক্রমণ কিউবা বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় নির্ধারণ করে এবং ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি স্বৈরাচারী বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে কিউবার মাটিতে এই বিপ্লবী মডেল সফল হয়।
কিউবার বিপ্লবোত্তর পুনর্গঠন পর্বে চে গুয়েভারা যে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা আজো তীব্র সমালোচনার উৎস। বাতিস্তা সরকারের পতনের পর ১৯৫৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবী সরকার কর্তৃক কিউবার ১৯৪০ সালের সংবিধানে 'আইনি ধারা ১২' সংশোধন করে একটি বিশেষ ডিক্রি জারির মাধ্যমে চে গুয়েভারাকে 'জন্মসূত্রে কিউবান নাগরিক' হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা ছিল কিউবার ইতিহাসে এক বিরল আইনি ঘটনা। ১৯৫৯ সালের প্রথমভাগে হাভানার ‘লা কাবানিয়া’ দুর্গের সামরিক প্রধান হিসেবে বাতিস্তা সরকারের সহযোগী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল। বাতিস্তা সরকারের তৎকালীন ১৯৩৮ সালের 'প্রতিরক্ষা সামাজিক কোড' এবং বিপ্লবী সরকারের 'আইনি ডিক্রি নম্বর ২০৮' ও 'বিপ্লবী আইন নম্বর ১১'-এর আওতায় এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালিত হয়েছিল। এই সময় আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে চে-র একটি উক্তি আজো দালিলিক প্রমাণ হিসেবে বিতর্ক তৈরি করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, "বিচার বিভাগীয় প্রমাণের উপস্থাপনা বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালগুলোর জন্য অপ্রয়োজনীয়, এটি একটি বিপ্লবী যুদ্ধ।" পশ্চিমা ঐতিহাসিক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো আন্তর্জাতিক আইনি বিধিমালা বা আসামিপক্ষের যথাযথ আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অনুসৃত হয়নি। সেখানে বাতিস্তা সরকারের বেশ কিছু সহযোগীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যার সঠিক সংখ্যা নিয়ে আজো ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই একে রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও রাষ্ট্রীয় ভিন্নমত দমনের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। উল্লেখ্য, সমাজতন্ত্রের প্রতি অনুপযুক্ত নাগরিকদের কৃষি-শ্রমশিবিরে পাঠানোর বিতর্কিত প্রক্রিয়াটি কিউবায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৬৫ সালের শেষভাগে, যার নাম ছিল 'উৎপাদনে সহায়তার জন্য সামরিক ইউনিট'। তখন চে কিউবা ছেড়ে চলে গেছেন, ফলে তিনি সেই ক্যাম্পের সরাসরি পরিচালক ছিলেন না। তবে তাঁর তৈরি নতুন মানব তত্ত্বের কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক শুদ্ধিবাদ এই ক্যাম্প তৈরিতে গভীর আদেশিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
এর পাশাপাশি, সমাজতান্ত্রিক কিউবার শিল্পমন্ত্রী এবং জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তাঁর অর্থনৈতিক নীতিগুলো চরম প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। পুঁজিবাদের প্রতি তীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করতে তিনি জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কিউবান মুদ্রার নোটগুলোতে নিজের পুরো নামের বদলে শুধু অবহেলাভরে ‘চে’ লিখে স্বাক্ষর করতেন, যা ছিল বিশ্ব ব্যাংকিং ইতিহাসের এক অভিনব দালিলিক কূটাভাস। চে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ "কিউবায় সমাজতন্ত্র এবং মানুষ"-এ এক নতুন মানব ধারণার অবতারণা করেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ বা বস্তুগত লাভ ত্যাগ করে কেবল নৈতিক চেতনা ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করবে। মানুষের সহজাত মনস্তত্ত্ব ও বাজার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এই অতি-উগ্র অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং অবাস্তব দ্রুত শিল্পায়ন নীতির কারণে কিউবার উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে কিউবান অর্থনীতিতে বিখ্যাত 'শিল্প বনাম কৃষি উৎপাদন বিতর্ক' শুরু হয়, যেখানে সোভিয়েত ব্লকের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার বিরোধিতা করে চে কিউবাকে একতরফা ভারী শিল্পের দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করেন, যা চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। চিনি শিল্পের ওপর মারাত্মক ধস নামে। ফলে কিউবা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ সোভিয়েত-নির্ভর হয়ে পড়ে। এমনকি ১৯৬২ সালের বিখ্যাত 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' বা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন কিউবার মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগোচরে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, চে তা সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু পরে কিউবাকে অন্ধকারে রেখে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ফিরিয়ে নেন, তখন চে একে সোভিয়েত ইউনিয়নের চরম সাম্রাজ্যবাদী আপস ও বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করেন।
চে গুয়েভারার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের চীন-সোভিয়েত বিভাজন এবং সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের সাথে তাঁর সংঘাত। চে ক্রুশ্চেভ-এর পশ্চিমা পুঁজিবাদের সাথে "শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান" নীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি সংশোধনবাদী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল ১৯৬৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ঊনবিংশ অধিবেশনে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ। সেই ভাষণে তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি পরিষ্কার ঘোষণা দেন যে, লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষ এখন তাদের মুক্তির ইতিহাস নিজেদের রক্তে লিখতে শুরু করেছে। এই ওজস্বী ভাষণের ঠিক পরদিন কিউবান প্রবাসী সমাজতান্ত্রিক-বিরোধীরা জাতিসংঘের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে মর্টার হামলা চালায়, যা তাঁর উপস্থিতির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বড় প্রমাণ। এর পরপরই ১৯৬৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়াতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় অর্থনৈতিক সম্মেলনে তিনি তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ‘আলজিয়ার্স ভাষণ’ দেন। সেখানে চে খোলাখুলিভাবে সোভিয়েত ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুন্নত ও শোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মতোই অসমান ও শোষণমূলক বাণিজ্য করছে। এই ভাষণের ফলে কিউবা-সোভিয়েত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। ফিদেল কাস্ত্রো তখন অর্থনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে সোভিয়েত ব্লকের প্রবল চাপের মুখে চে গুয়েভারাকে কিউবার সমস্ত রাষ্ট্রীয় পদ, মন্ত্রিত্ব এবং নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়।
কিউবা ত্যাগের পর চে গুয়েভারা বিশ্ব-বিপ্লবের ধারণাকে ছড়িয়ে দিতে তাঁর বিখ্যাত ‘ত্রিমহাদেশীয় কৌশল’ প্রবর্তন করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডমিনো তত্ত্বের বিপরীতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ব্যস্ত ও দুর্বল রাখতে বিশ্বজুড়ে দুই, তিন বা ততোধিক ভিয়েতনামের জন্ম দেওয়ার সামরিক আহ্বান জানান। এই তত্ত্বের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে কঙ্গো কিনশাসায় তাঁর মার্ক্সবাদী গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর প্রধান কারণ ছিল স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বুঝতে না পারা, কঙ্গোলিজ নেতা লঁরা কাবিলার বাহিনীর চরম শৃঙ্খলহীনতা এবং চে-র নিজস্ব সামরিক সংস্কৃতির সাথে আফ্রিকান বাস্তবতার তীব্র অসঙ্গতি।
এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি বলিভিয়ায় তাঁর ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর পুনরাবৃত্তি করতে যান। সেখানে তাঁর সাথে একমাত্র নারী গেরিলা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হাইডি তামারা , যিনি 'টানিয়া' নামে পরিচিত। ছদ্মবেশে গোয়েন্দাগিরি ও লজিস্টিক সাপোর্টে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু বলিভিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল কিউবা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে রেনে বারিয়েনতোসের সামরিক সরকারের ভূমি সংস্কারের কারণে গ্রামীণ আদিবাসী কৃষকদের মধ্যে কোনো বড় অসন্তোষ ছিল না। তার ওপর ভাষাগত দূরত্ব ছিল এক বিশাল বাধা; স্থানীয় কৃষকেরা স্প্যানিশের বদলে কেচুয়া ও গুয়ারানি ভাষায় কথা বলত, যার ফলে চে-র বাহিনী তাদের সাথে সংযোগ গড়তে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, বলিভিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মারিও মোনহে চে-র সাথে দেখা করে দাবি করেছিলেন যে, বলিভিয়ার মাটির এই যুদ্ধের সুপ্রিম কমান্ডার হবেন তিনি নিজে। চে তা মেনে না নেওয়ায় দলের ভেতরের নেতৃত্বের অহং ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের কারণে সেই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টি চে-কে সমর্থন করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়।
ফলস্বরূপ, স্থানীয় জনবিচ্ছিন্নতা, চরম প্রতিকূল পরিবেশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ পরিচালিত বিশেষ দমন অভিযান 'অপারেশন সিনথিয়া'-র আওতায় সিআইএ-প্রশিক্ষিত বলিভিয়ান রেঞ্জার বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর 'কিব্রাদা দেল ইউরো' গিরিখাতে আহত অবস্থায় বন্দি হন চে। বন্দি হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক 'বলিভিয়ান ডায়েরি' সম্বলিত ব্যাগটি এক বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেন তাঁর শেষ লড়াইয়ের সত্যনিষ্ঠ দলিলটি সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে বিকৃত না হয়। পরদিন, ৯ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামের একটি জরাজীর্ণ স্কুলকক্ষে বলিভিয়ার সামরিক প্রধান রেনে বারিয়েনতোসের সরাসরি আদেশে এবং সিআইএ কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজের উপস্থিতিতে কোনো প্রকার আইনি বিচার ছাড়াই অত্যন্ত অনৈতিক ও নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ঘাতক সার্জেন্ট মারিও তেরান যখন মদ্যপ অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢোকে, চে তখন বুক চিতিয়ে তাঁর শেষ অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন: "আমি জানি তুমি আমাকে মারতে এসেছ। গুলি করো কাপুরুষ, তুমি কেবল একজন মানুষকে হত্যা করবে, তার আদর্শকে নয়।" মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর আইনি ও শারীরিক পরিচিতি নিশ্চিত করার অছিলায় বলিভিয়ার সামরিক জান্তা তাঁর দুই হাতের কবজি কেটে রাসায়নিক পাত্রে সংরক্ষণ করে হাভানায় পাঠিয়েছিল, যা বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসে এক পৈশাচিক দালিলিক প্রমাণ। পরবর্তীতে ডিক্লাসিফাইড হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নথিপত্র প্রমাণ করে যে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে এই অভিযানের প্রতিটি মুহূর্তের গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছিল। দীর্ঘ তিন দশক পর ১৯৯৭ সালে ভ্যালেগ্রান্দেতে তাঁর গোপন গণকবর আবিষ্কৃত হলে তাঁর দেহাবশেষ কিউবার সান্তা ক্লারায় এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বস্তুনিষ্ঠতার নিরিখে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, চে গুয়েভারা একই সাথে ইতিহাসের এক পরম পূজনীয় মুক্তিদূত এবং এক নির্মম শাসনতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব। ভিন্নমত দমন, সমকামীদের প্রতি নীতিগত কঠোরতা এবং আইনি প্রক্রিয়া বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য দক্ষিণপন্থী ও উদারপন্থী সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে তিনি একজন কঠোর ও নির্মম আদর্শবাদী। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল মুক্তিকামী শক্তির কাছে তিনি শৃঙ্খলমুক্তির এক আপসহীন আইকন। মৃত্যুর অর্ধশতক পরেও আলবার্তো কোর্দার তোলা তাঁর কালজয়ী আলোকচিত্র ‘গেরিলিরো হিরোইকো’-র যে বাণিজ্যিক রূপান্তর ঘটেছে, তা উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কূটাভাস। যে পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে চে গুয়েভারা আজীবন লড়াই করলেন, সেই বহুজাতিক পুঁজিবাদী কর্পোরেট বাজারই আজ তাঁর বৈপ্লবিক অবয়বকে টি-শার্ট, পোস্টার ও বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করে বিলিয়ন ডলারের মুনাফা কামাচ্ছে। এটি তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শকে এক প্রকার নিষ্ক্রিয় করে একটি নিরীহ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।
আর্নেস্তো চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার তাই কোনো সরলরৈখিক সমীকরণ নয়; এটি এক গভীর আত্মদ্বন্দ্বে জারিত আখ্যান। রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন ও নির্মম বাস্তবতায় তিনি হয়তো একজন ব্যর্থ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর অনেক সামরিক সিদ্ধান্তই হয়তো ডেকে এনেছিল বিপর্যয়। কিন্তু দিনশেষে চে গুয়েভারা কোনো সাধারণ ক্ষমতার লোভী রাজনীতিক ছিলেন না। নিজের তৈরি করা কঠোর আদর্শের জন্য সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুখ, মন্ত্রিত্বের গদি এবং নিশ্চিত বুর্জোয়া জীবনের সচ্ছলতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন—ইতিহাস তাঁকে সহজে ভুলে যায় না। পুঁজিবাদ তাঁর ছবি বিক্রি করে মুনাফা লুটতে পারে, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই আপসহীন শৃঙ্খল ভাঙার তাড়নাকে কিনতে পারে না। সমস্ত তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও শাসনতান্ত্রিক ত্রুটির ঊর্ধ্বে উঠে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর যে চিরকালীন মানবিক আদিম আকাঙ্ক্ষা—চে গুয়েভারা আজীবন তারই এক জীবন্ত, স্পন্দমান এবং অবিনাশী ইশতেহার।
আজ ১৪ জুন—এই কালজয়ী বিপ্লবীর শুভ জন্মদিন। ইতিহাসের খেরোখাতায় তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন এক অমলিন, দীপ্তিময় এবং তীব্র পঠনযোগ্য ধ্রুবতারা হয়ে। ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে ধূলিমগ্ন যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া এই চির-তরুণ রোমান্টিক রাজপুত্রের জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলিত মানুষের হৃদয়ে আজো বেজে ওঠে এক নীরব ও গভীর শ্রদ্ধাগাথা।
শুভ জন্মদিন, কমরেড চে গুয়েভারা!

বাহাউদ্দিন গোলাপ,
১৪ জুন,২০২৬

২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:২৪
নিকোলাস বিশ্বাস
২৪ অক্টোবর “জাতিসংঘ দিবস”। ২০২৬ সালে গোটা বিশ্ব এ দিবসটি পালন করবে এমন এক সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গভীর সংকটের মুখে। যুদ্ধ বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত পদক্ষেপ অচল করে দিচ্ছে, মানবাধিকার সুরক্ষায় দেখা যাচ্ছে দ্বৈতনীতি এবং জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আর্থিক চাপও বাধাগ্রস্ত করছে টেকসই উন্নয়ন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করা এবং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার ৮১ বছর পরও এই লক্ষ্য অপরিহার্য। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যবধান প্রশ্ন তুলছে: জাতিসংঘ কি তার প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম?
প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকারিতার সংকট
বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ১৯৩টি। ভ্যাটিকান ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সদস্য না হলেও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদায় রয়েছে। ১৯৪৫ সালে ৫১টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটিতে বাংলাদেশ যোগ দেয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। সর্বশেষ সদস্যরাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান, যার সদস্যপদ লাভের তারিখ ২০১১ সালের ১৪ জুলাই।
সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট থাকলেও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবার প্রভাব সমান নয়। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় ক্ষমতার অসম বণ্টন স্পষ্ট। তাই প্রশ্নটি জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং সংস্থাটি কতটা কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বে যুদ্ধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে। অথচ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা প্রায়ই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। যখন সম্মিলিত দায়িত্বের চেয়ে জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেপরিবার হারায় ঘরবাড়ি, শিশুরা হারায় শিক্ষার সুযোগ এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ বন্ধ হওয়া নয়; এর অর্থ নিরাপদে ঘরে ফেরা, ভয়মুক্ত জীবনযাপন এবং মর্যাদার সঙ্গে নতুন করে জীবন গড়ে তোলা। সংঘাত প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে অনু-প্রতিনিধিত্বশীল অঞ্চলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ব্যাপক নৃশংসতার ক্ষেত্রে ভেটো ব্যবহারে সংযম প্রতিষ্ঠা জরুরি। এজন্য প্রয়োজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বহুপাক্ষিকতায় আস্থা ফেরানো
জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অবক্ষয় বৈশ্বিক সহযোগিতাকে দুর্বল করছে। কিছু সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখে; অন্যরা মনে করে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সব ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে না। আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও দৃশ্যমান ফলাফল। অন্যদের কাছে জবাবদিহি দাবি করা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এই বিতর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর সংস্থা’ এবং এর কর্মকর্তাদের ‘অহংকারী পরজীবী’ বলে আখ্যায়িত করেন বলে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সংস্থাটি সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিরাপত্তা পরিষদে সব অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্কারের আহ্বান জানান এবং ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন বলে আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন ও সাইবার হুমকি প্রমাণ করে, স্বার্থের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা অপরিহার্য। দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিকতা জাতীয় স্বার্থকে অস্বীকার করে না; বরং তা সুরক্ষায় সহায়তা করে। এজন্য আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিৎ।
মানবাধিকার হতে হবে সর্বজনীন
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমতার অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনো অসম। কোনো কোনো সরকার সমালোচনা এড়াতে সার্বভৌমত্বের যুক্তি তুলে ধরে। অন্যদিকে নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ ও ডিজিটাল দমন-পীড়ন ব্যক্তি-স্বাধীনতার জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।
রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী নয়, সর্বক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারলেই জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার হাতিয়ার হতে পারে না। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
টেকসই উন্নয়নে বৈশ্বিক সংহতি
জাতিসংঘের ২০৩০ সালের এজেন্ডা ও ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় অভিন্ন কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অভিঘাত, ঋণসংকট, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন অগ্রগতিকে মন্থর করছে। পরিবেশগত সংকটে যাদের অবদান সবচেয়ে কম, অনেক ক্ষেত্রে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, স্বল্পসুদে উন্নয়ন অর্থায়ন এবং অসহনীয় ঋণের বোঝা কমানো জরুরি। উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব আর্থিক সহায়তার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
তবে শুধু বৈদেশিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। জাতীয় নেতৃত্ব, সুশাসন ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের দায়িত্ব হলো অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং উন্নয়নের সুফল যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা।
ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য - ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’ - বর্তমান চ্যালেঞ্জের সারকথা তুলে ধরে। মানুষের জীবনে দৃশ্যমান অগ্রগতিই আস্থা ফেরানোর প্রধান শর্ত। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, ফলাফলের জবাবদিহি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জনসেবা উন্নত করতে পারে, তবে এর ব্যবহার মানবাধিকার ও স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।
সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও সাংবাদিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ন্যায্য বৈশ্বিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরে তা আদায় করতে হবে।
মানবতার প্রতি নতুন অঙ্গীকার
জাতিসংঘ দিবস কেবল বার্ষিকী উদ্যাপনের দিন নয়; বরং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান পর্যালোচনার উপলক্ষ্য। জাতিসংঘ নিখুঁত প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার জন্য একটি অভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা পরিত্যাগ করলে বৈশ্বিক সংকট দূর হবে না; বরং সেগুলো মোকাবিলা আরও কঠিন হবে।
৮১ বছরে পদার্পণ করা জাতিসংঘের প্রয়োজন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের প্রতি নতুন অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। এর সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে নয়; বরং যুদ্ধের দুর্ভোগ কমছে কি না, মানবাধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, উন্নয়নশীল দেশগুলো ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তার ভিত্তিতে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ যথার্থই বলেছেন, ‘শান্তির পরিমাপ শুধু স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের জীবনে আসা পরিবর্তনের মাধ্যমেও করতে হবে।’ বিশ্বের প্রয়োজন এমন এক জাতিসংঘ, যে শুধু কিছু মুষ্টিমেয়দের পক্ষে কাজ করবে না, বরং সবার জন্য কাজ করবে এবং বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করবে।
লেখক পরিচিতি
নিকোলাস বিশ্বাস একজন ফ্রীল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগের ই-মেইল: gonomaddzam@gmail.com
নিকোলাস বিশ্বাস
২৪ অক্টোবর “জাতিসংঘ দিবস”। ২০২৬ সালে গোটা বিশ্ব এ দিবসটি পালন করবে এমন এক সময়ে, যখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গভীর সংকটের মুখে। যুদ্ধ বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্ন করছে, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্মিলিত পদক্ষেপ অচল করে দিচ্ছে, মানবাধিকার সুরক্ষায় দেখা যাচ্ছে দ্বৈতনীতি এবং জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আর্থিক চাপও বাধাগ্রস্ত করছে টেকসই উন্নয়ন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করা এবং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা। ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হওয়ার ৮১ বছর পরও এই লক্ষ্য অপরিহার্য। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যবধান প্রশ্ন তুলছে: জাতিসংঘ কি তার প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম?
প্রতিনিধিত্ব ও কার্যকারিতার সংকট
বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র ১৯৩টি। ভ্যাটিকান ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র সদস্য না হলেও পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদায় রয়েছে। ১৯৪৫ সালে ৫১টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটিতে বাংলাদেশ যোগ দেয় ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। সর্বশেষ সদস্যরাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান, যার সদস্যপদ লাভের তারিখ ২০১১ সালের ১৪ জুলাই।
সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট থাকলেও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবার প্রভাব সমান নয়। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোয় ক্ষমতার অসম বণ্টন স্পষ্ট। তাই প্রশ্নটি জাতিসংঘের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং সংস্থাটি কতটা কার্যকর, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে পারে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বে যুদ্ধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে। অথচ ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা প্রায়ই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। যখন সম্মিলিত দায়িত্বের চেয়ে জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়, তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেপরিবার হারায় ঘরবাড়ি, শিশুরা হারায় শিক্ষার সুযোগ এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
শান্তি মানে শুধু যুদ্ধ বন্ধ হওয়া নয়; এর অর্থ নিরাপদে ঘরে ফেরা, ভয়মুক্ত জীবনযাপন এবং মর্যাদার সঙ্গে নতুন করে জীবন গড়ে তোলা। সংঘাত প্রতিরোধে আগাম সতর্কতা, কূটনৈতিক উদ্যোগ ও মধ্যস্থতা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে অনু-প্রতিনিধিত্বশীল অঞ্চলগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ব্যাপক নৃশংসতার ক্ষেত্রে ভেটো ব্যবহারে সংযম প্রতিষ্ঠা জরুরি। এজন্য প্রয়োজন প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
বহুপাক্ষিকতায় আস্থা ফেরানো
জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার অবক্ষয় বৈশ্বিক সহযোগিতাকে দুর্বল করছে। কিছু সরকার আন্তর্জাতিক চুক্তিকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখে; অন্যরা মনে করে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সব ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করে না। আস্থা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও দৃশ্যমান ফলাফল। অন্যদের কাছে জবাবদিহি দাবি করা ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এই বিতর্ক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর সংস্থা’ এবং এর কর্মকর্তাদের ‘অহংকারী পরজীবী’ বলে আখ্যায়িত করেন বলে দ্য টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সংস্থাটি সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিরাপত্তা পরিষদে সব অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংস্কারের আহ্বান জানান এবং ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার পক্ষে মত দেন বলে আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন ও সাইবার হুমকি প্রমাণ করে, স্বার্থের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতা অপরিহার্য। দায়িত্বশীল বহুপাক্ষিকতা জাতীয় স্বার্থকে অস্বীকার করে না; বরং তা সুরক্ষায় সহায়তা করে। এজন্য আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জাতিসংঘের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিৎ।
মানবাধিকার হতে হবে সর্বজনীন
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমতার অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনো অসম। কোনো কোনো সরকার সমালোচনা এড়াতে সার্বভৌমত্বের যুক্তি তুলে ধরে। অন্যদিকে নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ ও ডিজিটাল দমন-পীড়ন ব্যক্তি-স্বাধীনতার জন্য নতুন হুমকি তৈরি করছে।
রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী নয়, সর্বক্ষেত্রে মানবাধিকার রক্ষা করতে পারলেই জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের দৃষ্টিতে সমতা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার হাতিয়ার হতে পারে না। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত, জবাবদিহি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
টেকসই উন্নয়নে বৈশ্বিক সংহতি
জাতিসংঘের ২০৩০ সালের এজেন্ডা ও ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা দারিদ্র্য, বৈষম্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ সুরক্ষায় অভিন্ন কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অভিঘাত, ঋণসংকট, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন অগ্রগতিকে মন্থর করছে। পরিবেশগত সংকটে যাদের অবদান সবচেয়ে কম, অনেক ক্ষেত্রে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, স্বল্পসুদে উন্নয়ন অর্থায়ন এবং অসহনীয় ঋণের বোঝা কমানো জরুরি। উন্নত দেশগুলোকে জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব আর্থিক সহায়তার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
তবে শুধু বৈদেশিক সহায়তা যথেষ্ট নয়। জাতীয় নেতৃত্ব, সুশাসন ও জবাবদিহিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের দায়িত্ব হলো অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং উন্নয়নের সুফল যেন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা।
ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য - ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন মোকাবিলা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’ - বর্তমান চ্যালেঞ্জের সারকথা তুলে ধরে। মানুষের জীবনে দৃশ্যমান অগ্রগতিই আস্থা ফেরানোর প্রধান শর্ত। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়, ফলাফলের জবাবদিহি এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জনসেবা উন্নত করতে পারে, তবে এর ব্যবহার মানবাধিকার ও স্বচ্ছতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।
সদস্যরাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম, গবেষক ও সাংবাদিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু আন্তর্জাতিক বৈঠকে অংশ নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ন্যায্য বৈশ্বিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরে তা আদায় করতে হবে।
মানবতার প্রতি নতুন অঙ্গীকার
জাতিসংঘ দিবস কেবল বার্ষিকী উদ্যাপনের দিন নয়; বরং প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান পর্যালোচনার উপলক্ষ্য। জাতিসংঘ নিখুঁত প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার জন্য একটি অভিন্ন বৈশ্বিক মঞ্চের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। বহুপাক্ষিক সহযোগিতা পরিত্যাগ করলে বৈশ্বিক সংকট দূর হবে না; বরং সেগুলো মোকাবিলা আরও কঠিন হবে।
৮১ বছরে পদার্পণ করা জাতিসংঘের প্রয়োজন প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের প্রতি নতুন অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দেওয়ার মানসিকতা। এর সাফল্য নির্ধারিত হবে শুধু গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে নয়; বরং যুদ্ধের দুর্ভোগ কমছে কি না, মানবাধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, উন্নয়নশীল দেশগুলো ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তার ভিত্তিতে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ যথার্থই বলেছেন, ‘শান্তির পরিমাপ শুধু স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের জীবনে আসা পরিবর্তনের মাধ্যমেও করতে হবে।’ বিশ্বের প্রয়োজন এমন এক জাতিসংঘ, যে শুধু কিছু মুষ্টিমেয়দের পক্ষে কাজ করবে না, বরং সবার জন্য কাজ করবে এবং বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করবে।
লেখক পরিচিতি
নিকোলাস বিশ্বাস একজন ফ্রীল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। যোগাযোগের ই-মেইল: gonomaddzam@gmail.com

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৪১
এসপি মাহমুদ হাসানকে নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন কোনো ঘটনা নয়। পতিত আওয়ামী লীগের আমলেও তাকে নিয়ে বহুবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে তাকে কখনো বিএনপিপন্থী পুলিশ, কখনো জামায়াতপন্থী, আবার কখনো রাজাকার ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমি নিজে যার বড় সাক্ষী। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আমি নিজেই একবার কলাম লিখেছিলাম। আরেকবার একটা কবিতাও লিখেছিলাম।
তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- এবার তাকে উল্টো আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর বানানোর মিশন নিয়ে নেমেছে একটি গ্রুপ। ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিংয়ের সেই ধারা একই আছে তবে এবার জাস্ট ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ইউটার্ণ নিয়ে পক্ষটা ঘুরে গেছে। কারণ, এসপি মাহমুদ হাসানের দোষ একটাই। সে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে পারে না। নিজের নীতি আর আদর্শ থেকে সহজে বিচ্যুত হতে পারে না। এজন্য বারবারই সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে।
মাহমুদ হাসান কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় চেয়েছে প্রজাতন্ত্রের পুলিশ হতে। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল জনগণের পুলিশ হয়ে ওঠা। আদর্শবান এক স্কুল শিক্ষকের সন্তান আর অসম্ভব রকমের মেধাবী মাহমুদ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে বিসিএস কৃষি ক্যাডারে এবং পরে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে বরিশাল মেট্রোপলিটনে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে ঝালকাঠিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। এরপরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (RAB) পোস্টিং হওয়ার পরে সেখানেও অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারসহ কর্মক্ষেত্রে নিষ্ঠা, দক্ষতা, দায়িত্ব এবং পেশাদারিত্বের বিভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে মাহমুদ হাসান।
পেশাগত কর্মজীবনে অসম্ভব রকমের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, পরিশ্রম আর সততা দিয়ে সবসময় কাজ করার চেষ্টা করেছে। দিনরাত এক করে মানুষকে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাঁর আচার, আচরণ, সেবা এবং নীতি দেখে অনেক মানুষ পুলিশকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছে। আমি মাহমুদকে প্রায় দেড় যুগ থেকে চিনি। আমার ধারণা বরিশাল এবং ঝালকাঠি জেলার হাতেগোনা কিছু চিহ্নিত অপরাধী আর দুষ্কৃতিকারী ছাড়া আমার এই কথার সাথে কেউ দ্বিমত করবে না। তাঁর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি থাকতে পারে তবে বিবেকবুদ্ধি থাকলে তারাও অন্তত বলবে মাহমুদ খারাপ মানুষ নয়।
মাহমুদ যখন বরিশাল থেকে বদলি হয়ে ঝালকাঠি গেছে তখন বরিশালের অনেক মানুষ কেঁদেছে। আবার যখন সে প্রমোশন নিয়ে ঝালকাঠি জেলা ত্যাগ করেছে তখন ঝালকাঠির মানুষ তাঁকে রাখার জন্য আন্দোলন করেছে, মিছিল করেছে। পুলিশের মতো নিত্য গালি খাওয়া একটা পেশায় একজন মানুষের জীবনে এরচেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে? প্রজাতন্ত্রের একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনে এরচেয়ে বড় অর্জন আর কী থাকতে পারে? এসপি মাহমুদ এখন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB) ঢাকায় কর্মরত। এর আগে সে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU)তেও নিষ্ঠা আর সুনামের সাথে কাজ করেছে।
মাহমুদকে নিয়ে নতুন করে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আমার সামনে জনৈক এক প্রবাসী ব্যক্তির একটা পোস্ট আসলো। সেখান থেকেই এই লেখার অবতারণা। পোস্টে মাহমুদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার প্রায় সবটাই বানোয়াট আর শত্রুতামূলক। খোঁজ নিয়ে যতদূর জানলাম, একটা পুরাতন অপরাধী গ্রুপ তাঁর চরিত্রহননের নতুন মিশন নিয়ে নেমেছে। অতীতেও অনেকে অনেকবার চেষ্টা করেছিল। তারা যেমন ব্যর্থ হয়েছিল আশাকরি তেমনি এবারের কুশীলবরাও ব্যর্থ হবে। কারণ, মিথ্যাকে সাময়িক সময়ের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিন্তু টিকিয়ে রাখা যায় না।
টানা ৩ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে আওয়ামী লীগ যখন পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেছিল তখন ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় ডিপার্টমেন্টের ৯০ জন অফিসারই প্রজাতন্ত্রের পুলিশের পরিবর্তে আওয়ামী পুলিশে পরিনত হয়েছিল। তবে সেদিনও বাকি ১০ জনের মধ্যে ছিল এই মাহমুদ হাসান। দলীয় সরকারের আদেশ কমবেশি পালন করলেও আমার জানামতে সে কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় জনগণের পুলিশ থাকার চেষ্টা করেছে। যাদের দেখলে মানুষ আবার নতুন করে পুলিশকে ভালোবাসতে শেখে তাদেরকে যখন মিথ্যা ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিং করা হয় তখন চুপ থাকা যায় না। বিবেক চিৎকার করে ওঠে। বিবেকের আর্তনাদ কিংবা দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, মানুষের বিবেকের চেয়ে বড় কোনো আদালত এই পৃথিবীতে নেই। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, মানবাধিকার ও সুশাসন ব্যক্তিত্ব।
বাবুগঞ্জঃ ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
এসপি মাহমুদ হাসানকে নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন কোনো ঘটনা নয়। পতিত আওয়ামী লীগের আমলেও তাকে নিয়ে বহুবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে তাকে কখনো বিএনপিপন্থী পুলিশ, কখনো জামায়াতপন্থী, আবার কখনো রাজাকার ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমি নিজে যার বড় সাক্ষী। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আমি নিজেই একবার কলাম লিখেছিলাম। আরেকবার একটা কবিতাও লিখেছিলাম।
তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- এবার তাকে উল্টো আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর বানানোর মিশন নিয়ে নেমেছে একটি গ্রুপ। ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিংয়ের সেই ধারা একই আছে তবে এবার জাস্ট ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ইউটার্ণ নিয়ে পক্ষটা ঘুরে গেছে। কারণ, এসপি মাহমুদ হাসানের দোষ একটাই। সে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে পারে না। নিজের নীতি আর আদর্শ থেকে সহজে বিচ্যুত হতে পারে না। এজন্য বারবারই সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে।
মাহমুদ হাসান কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় চেয়েছে প্রজাতন্ত্রের পুলিশ হতে। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল জনগণের পুলিশ হয়ে ওঠা। আদর্শবান এক স্কুল শিক্ষকের সন্তান আর অসম্ভব রকমের মেধাবী মাহমুদ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে বিসিএস কৃষি ক্যাডারে এবং পরে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে বরিশাল মেট্রোপলিটনে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে ঝালকাঠিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। এরপরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (RAB) পোস্টিং হওয়ার পরে সেখানেও অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারসহ কর্মক্ষেত্রে নিষ্ঠা, দক্ষতা, দায়িত্ব এবং পেশাদারিত্বের বিভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে মাহমুদ হাসান।
পেশাগত কর্মজীবনে অসম্ভব রকমের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, পরিশ্রম আর সততা দিয়ে সবসময় কাজ করার চেষ্টা করেছে। দিনরাত এক করে মানুষকে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাঁর আচার, আচরণ, সেবা এবং নীতি দেখে অনেক মানুষ পুলিশকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছে। আমি মাহমুদকে প্রায় দেড় যুগ থেকে চিনি। আমার ধারণা বরিশাল এবং ঝালকাঠি জেলার হাতেগোনা কিছু চিহ্নিত অপরাধী আর দুষ্কৃতিকারী ছাড়া আমার এই কথার সাথে কেউ দ্বিমত করবে না। তাঁর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি থাকতে পারে তবে বিবেকবুদ্ধি থাকলে তারাও অন্তত বলবে মাহমুদ খারাপ মানুষ নয়।
মাহমুদ যখন বরিশাল থেকে বদলি হয়ে ঝালকাঠি গেছে তখন বরিশালের অনেক মানুষ কেঁদেছে। আবার যখন সে প্রমোশন নিয়ে ঝালকাঠি জেলা ত্যাগ করেছে তখন ঝালকাঠির মানুষ তাঁকে রাখার জন্য আন্দোলন করেছে, মিছিল করেছে। পুলিশের মতো নিত্য গালি খাওয়া একটা পেশায় একজন মানুষের জীবনে এরচেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে? প্রজাতন্ত্রের একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনে এরচেয়ে বড় অর্জন আর কী থাকতে পারে? এসপি মাহমুদ এখন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB) ঢাকায় কর্মরত। এর আগে সে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU)তেও নিষ্ঠা আর সুনামের সাথে কাজ করেছে।
মাহমুদকে নিয়ে নতুন করে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আমার সামনে জনৈক এক প্রবাসী ব্যক্তির একটা পোস্ট আসলো। সেখান থেকেই এই লেখার অবতারণা। পোস্টে মাহমুদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার প্রায় সবটাই বানোয়াট আর শত্রুতামূলক। খোঁজ নিয়ে যতদূর জানলাম, একটা পুরাতন অপরাধী গ্রুপ তাঁর চরিত্রহননের নতুন মিশন নিয়ে নেমেছে। অতীতেও অনেকে অনেকবার চেষ্টা করেছিল। তারা যেমন ব্যর্থ হয়েছিল আশাকরি তেমনি এবারের কুশীলবরাও ব্যর্থ হবে। কারণ, মিথ্যাকে সাময়িক সময়ের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিন্তু টিকিয়ে রাখা যায় না।
টানা ৩ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে আওয়ামী লীগ যখন পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেছিল তখন ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় ডিপার্টমেন্টের ৯০ জন অফিসারই প্রজাতন্ত্রের পুলিশের পরিবর্তে আওয়ামী পুলিশে পরিনত হয়েছিল। তবে সেদিনও বাকি ১০ জনের মধ্যে ছিল এই মাহমুদ হাসান। দলীয় সরকারের আদেশ কমবেশি পালন করলেও আমার জানামতে সে কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় জনগণের পুলিশ থাকার চেষ্টা করেছে। যাদের দেখলে মানুষ আবার নতুন করে পুলিশকে ভালোবাসতে শেখে তাদেরকে যখন মিথ্যা ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিং করা হয় তখন চুপ থাকা যায় না। বিবেক চিৎকার করে ওঠে। বিবেকের আর্তনাদ কিংবা দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, মানুষের বিবেকের চেয়ে বড় কোনো আদালত এই পৃথিবীতে নেই। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, মানবাধিকার ও সুশাসন ব্যক্তিত্ব।
বাবুগঞ্জঃ ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ।

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:২৯
একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় কি এমনই হওয়ার কথা ছিল? দুই দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা করেছেন পুলক চ্যাটার্জি। দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বরিশাল ব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কর্মজীবনের শেষদিকে এসে চাকরি হারিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বেকার ছিলেন, আর্থিক সংকটে পড়েছেন- এমন তথ্যই এখন তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) তাঁর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে-একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন একের পর এক সংকটে পড়ছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন কে?
শুধু ব্যক্তিগত হতাশা, শারীরিক সমস্যা কিংবা আর্থিক সংকট দিয়ে কি এই মৃত্যুর পুরো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তা, কর্মহীনতা, পাওনা নিয়ে জটিলতা এবং সাংবাদিক সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর তিনি বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ব্যুরোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর সহকর্মী স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরীকে দিয়ে ব্যুরোর কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু চাকরি বা দায়িত্ব হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জির আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছিল- এখন সেটিই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে তাঁর ন্যায্য পাওনা আদৌ পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কতটুকু এবং না হয়ে থাকলে কেন- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। কারণ একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান শুধু একটি পদ হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর জীবিকা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের প্রশ্ন।
পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পরও সমকালের সঙ্গে পুলক চ্যাটার্জির সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর কাছে সাবেক অফিসের একটি বিকল্প চাবি ছিল বলে জানা গেছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যেতেন, বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কর্মস্থল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও একজন সাবেক ব্যুরোপ্রধান কেন সেখানে নিয়মিত যেতেন? এটি কি শুধুই পুরোনো কর্মস্থলের প্রতি আবেগ? নাকি দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না পারার এক ধরনের মানসিক টান? সহকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ঘটনাটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও তদন্তের দাবি রাখে।
মৃত্যুর পর পুলক চ্যাটার্জির পাশে একাধিক চিরকুট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব লেখায় আর্থিক সংকট, শারীরিক সমস্যা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতির কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি চিঠিতে সহকর্মী সুমন চৌধুরীর প্রসঙ্গ এসেছে। ছোট ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক, দুই সন্তান পিয়াঙ্কা ও প্রদ্ধতি এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ করেও পৃথক লেখা থাকার কথা জানা গেছে। এসব চিঠির বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু সেগুলো যদি তাঁর শেষ সময়ের মানসিক ও আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়ে থাকে, তাহলে সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়- তিনি যখন সংকটে ছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা কী জানতেন? আর জানলে কী করেছিলেন? নেতৃত্বের দায় কতটুকু?
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে তিনি নিজেই ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ, কিছু সংগঠনে পেশাদার সাংবাদিকদের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তি-স্বার্থের প্রভাব কখনো কখনো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যক্তি-বিশেষের প্রভাব সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ওপর চেপে বসলে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই কারণে পুলক চ্যাটার্জির মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাংবাদিকরা যথার্থ সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মৃত্যুর দায় সরাসরি কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একজন প্রবীণ সাংবাদিক দীর্ঘদিন কর্মহীন ও আর্থিক সংকটে থাকলে তাঁর সহকর্মী সংগঠনগুলোর সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল, জরুরি সহায়তা, কর্মসংস্থান বা পেশাগত পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না- পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অনৈক্য ও নেতৃত্বের বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে- এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। পুলক চ্যাটার্জির মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিক কর্মজীবন হারানোর পর যদি দীর্ঘ সময় নিজেকে একা মনে করে থাকেন, তবে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংকট নয়; সাংবাদিক সমাজের সাংগঠনিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলো কতটা সফল- এখন সেটিই আলোচনার বিষয়।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত ২০২৩ সালে তাঁর চাকরি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল? দ্বিতীয়ত, সমকাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর কোনো ন্যায্য পাওনা বকেয়া ছিল কি না? তৃতীয়ত, চাকরি হারানোর পর তাঁর আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী ছিল? চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠন ও সহকর্মীরা তাঁর সংকট সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন এবং তাঁকে কোনো সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না? পঞ্চমত, মৃত্যুর আগে পাওয়া চিঠিগুলোর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে কী উঠে আসে? ষষ্ঠত, স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা রয়েছে এবং তার কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই মৃত্যু কি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের পরিণতি, নাকি এর সঙ্গে পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, স্মৃতিচারণ থাকবে। কিন্তু শুধু শোক প্রকাশ করে যদি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর আর পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য। প্রয়োজন তাঁর চাকরি হারানোর প্রেক্ষাপট ও পাওনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ। প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিজেদের ভূমিকা পর্যালোচনা।
একজন সাংবাদিক তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ সংবাদপেশা ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। শেষ জীবনে যদি তিনি আর্থিক সংকট, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যাবে। পুলক চ্যাটার্জি নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বরিশালের সাংবাদিক সমাজের সামনে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলো এখনো জীবিত।
একজন সাংবাদিকের দুর্দিনে সাংবাদিক সমাজ কোথায় থাকে- আর সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব যখন পেশাদারিত্বের বদলে অন্য কোনো প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যোগ্য সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবে কে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু এখন সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে।’
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।
একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় কি এমনই হওয়ার কথা ছিল? দুই দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা করেছেন পুলক চ্যাটার্জি। দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বরিশাল ব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কর্মজীবনের শেষদিকে এসে চাকরি হারিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বেকার ছিলেন, আর্থিক সংকটে পড়েছেন- এমন তথ্যই এখন তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) তাঁর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে-একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন একের পর এক সংকটে পড়ছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন কে?
শুধু ব্যক্তিগত হতাশা, শারীরিক সমস্যা কিংবা আর্থিক সংকট দিয়ে কি এই মৃত্যুর পুরো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তা, কর্মহীনতা, পাওনা নিয়ে জটিলতা এবং সাংবাদিক সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর তিনি বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ব্যুরোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর সহকর্মী স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরীকে দিয়ে ব্যুরোর কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু চাকরি বা দায়িত্ব হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জির আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছিল- এখন সেটিই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে তাঁর ন্যায্য পাওনা আদৌ পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কতটুকু এবং না হয়ে থাকলে কেন- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। কারণ একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান শুধু একটি পদ হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর জীবিকা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের প্রশ্ন।
পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পরও সমকালের সঙ্গে পুলক চ্যাটার্জির সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর কাছে সাবেক অফিসের একটি বিকল্প চাবি ছিল বলে জানা গেছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যেতেন, বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কর্মস্থল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও একজন সাবেক ব্যুরোপ্রধান কেন সেখানে নিয়মিত যেতেন? এটি কি শুধুই পুরোনো কর্মস্থলের প্রতি আবেগ? নাকি দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না পারার এক ধরনের মানসিক টান? সহকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ঘটনাটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও তদন্তের দাবি রাখে।
মৃত্যুর পর পুলক চ্যাটার্জির পাশে একাধিক চিরকুট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব লেখায় আর্থিক সংকট, শারীরিক সমস্যা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতির কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি চিঠিতে সহকর্মী সুমন চৌধুরীর প্রসঙ্গ এসেছে। ছোট ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক, দুই সন্তান পিয়াঙ্কা ও প্রদ্ধতি এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ করেও পৃথক লেখা থাকার কথা জানা গেছে। এসব চিঠির বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু সেগুলো যদি তাঁর শেষ সময়ের মানসিক ও আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়ে থাকে, তাহলে সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়- তিনি যখন সংকটে ছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা কী জানতেন? আর জানলে কী করেছিলেন? নেতৃত্বের দায় কতটুকু?
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে তিনি নিজেই ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ, কিছু সংগঠনে পেশাদার সাংবাদিকদের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তি-স্বার্থের প্রভাব কখনো কখনো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যক্তি-বিশেষের প্রভাব সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ওপর চেপে বসলে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই কারণে পুলক চ্যাটার্জির মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাংবাদিকরা যথার্থ সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মৃত্যুর দায় সরাসরি কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একজন প্রবীণ সাংবাদিক দীর্ঘদিন কর্মহীন ও আর্থিক সংকটে থাকলে তাঁর সহকর্মী সংগঠনগুলোর সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল, জরুরি সহায়তা, কর্মসংস্থান বা পেশাগত পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না- পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অনৈক্য ও নেতৃত্বের বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে- এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। পুলক চ্যাটার্জির মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিক কর্মজীবন হারানোর পর যদি দীর্ঘ সময় নিজেকে একা মনে করে থাকেন, তবে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংকট নয়; সাংবাদিক সমাজের সাংগঠনিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলো কতটা সফল- এখন সেটিই আলোচনার বিষয়।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত ২০২৩ সালে তাঁর চাকরি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল? দ্বিতীয়ত, সমকাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর কোনো ন্যায্য পাওনা বকেয়া ছিল কি না? তৃতীয়ত, চাকরি হারানোর পর তাঁর আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী ছিল? চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠন ও সহকর্মীরা তাঁর সংকট সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন এবং তাঁকে কোনো সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না? পঞ্চমত, মৃত্যুর আগে পাওয়া চিঠিগুলোর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে কী উঠে আসে? ষষ্ঠত, স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা রয়েছে এবং তার কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই মৃত্যু কি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের পরিণতি, নাকি এর সঙ্গে পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, স্মৃতিচারণ থাকবে। কিন্তু শুধু শোক প্রকাশ করে যদি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর আর পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য। প্রয়োজন তাঁর চাকরি হারানোর প্রেক্ষাপট ও পাওনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ। প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিজেদের ভূমিকা পর্যালোচনা।
একজন সাংবাদিক তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ সংবাদপেশা ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। শেষ জীবনে যদি তিনি আর্থিক সংকট, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যাবে। পুলক চ্যাটার্জি নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বরিশালের সাংবাদিক সমাজের সামনে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলো এখনো জীবিত।
একজন সাংবাদিকের দুর্দিনে সাংবাদিক সমাজ কোথায় থাকে- আর সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব যখন পেশাদারিত্বের বদলে অন্য কোনো প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যোগ্য সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবে কে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু এখন সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে।’
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।

১৪ জুন, ২০২৬ ১৯:১৩
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে আর্নেস্তো চে গুয়েভারা একটি অত্যন্ত জটিল, বহুমাত্রিক এবং তুমুল বিতর্কিত নাম। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার সান্তা ফে শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না। কালক্রমে তিনি বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলমুক্তির এক অবিনাশী প্রতীকে পরিণত হন। তবে সমকালীন ইতিহাসচর্চা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্মেদ আলোয় চে গুয়েভারা কেবল একজন রোমান্টিক গেরিলা নেতা নন। তিনি একই সাথে একজন কট্টর মার্ক্সবাদী সামরিক তত্ত্ববিদ, কিউবা বিপ্লবের প্রধান স্থপতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাস্তবতায় এক তীব্র বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন, রাজনৈতিক দর্শন এবং সামরিক কৌশলকে বুঝতে হলে কেবল স্তুতিগাথা যথেষ্ট নয়। এর জন্য তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক চুক্তির মারপ্যাঁচ এবং ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের একটি নির্মোহ মূল্যায়ন অপরিহার্য।
সান্তা ফে শহরে জন্মের পর আর্নেস্তোর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল এক মননশীল ও উদার পারিবারিক আবহে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই তিনি তীব্র হাঁপানি রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যা তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পিছু ছাড়েনি। কিন্তু এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর অদম্য প্রাণশক্তিকে দমাতে পারেনি; বরং এটি তাঁকে আরও জেদি ও লড়াকু করে তোলে। তাঁর পরিবারে ছিল তিন হাজারেরও বেশি বইয়ের এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, যেখানে ডুব দিয়ে কিশোর আর্নেস্তো কার্ল মার্ক্স, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন থেকে শুরু করে পাবলো নেরুদা, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং জঁ-পল সার্ত্রের দর্শনের সাথে পরিচিত হন। একই সাথে দাবা খেলা ও খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র ঝোঁক। ১৯৪৭ সালে তিনি বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন। চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনকারী এই তরুণ মূলত মানুষের রোগমুক্তির স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু মানবসমাজের গভীরে প্রোথিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাধিটি তাঁকে আরও বেশি তাড়িত করেছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই ছাত্রটির বৈপ্লবিক চেতনার প্রধান রূপান্তর ঘটেছিল ১৯৫২ সালের প্রথমার্ধে নেওয়া লাতিন আমেরিকা পরিভ্রমণের মাধ্যমে। বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোকে সাথে নিয়ে এক জরাজীর্ণ মোটরসাইকেলে তিনি এই সফরে বের হন। এই সফর সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে ছিল না, এটি মূলত আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পথিমধ্যে চিলির লস অ্যাঞ্জেলেস নামক স্থানে মোটরসাইকেলটি চিরতরে অচল হয়ে যায় এবং বাকি পথ তাঁরা পায়ে হেঁটে, ট্রাকে বা ভেলায় পাড়ি দিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ ভ্রমণ কেবল কোনো ভৌগোলিক পর্যটন ছিল না, এটি ছিল লাতিন আমেরিকার খনি শ্রমিকদের অমানবিক শ্রম ও আদিবাসীদের চরম অবহেলিত জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। পেরুর আমাজন অববাহিকার সান পাবলো কুষ্ঠাশ্রমে কুষ্ঠরোগীদের সামাজিক ও শারীরিক বিচ্ছিন্নতা তরুণ আর্নেস্তোকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই ভ্রমণের পরপরই ১৯৫৩ সালে তিনি বলিভিয়ায় যান এবং সেখানে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা খনি শ্রমিকদের ক্ষমতা ও সংস্কারের প্রথম বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেন, যা তাঁর সমাজতান্ত্রিক ভাবনাকে আরও তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করে।
এই বৈপ্লবিক বোধ চে-র চিন্তাধারায় এক ধরনের আপসহীন মানসিকতা তৈরি করে। ১৯৫৩ সালের শেষভাগে গুয়াতেমালায় অবস্থানকালীন ওখানকার সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী নির্বাসিতরা তাঁর কথার মাঝে আর্জেন্টিনার আঞ্চলিক সম্বোধন ‘চে’ (যার অর্থ বন্ধু বা ভাই) ব্যবহারের অভ্যাসের কারণে তাঁকে ভালোবেসে প্রথম ‘চে’ নামে ডাকতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় পেরুর নির্বাসিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিবিদ হিল্ডা গাদিয়ার সাথে। হিল্ডা গাদিয়াই চে-কে প্রথম উচ্চতর মার্ক্সবাদী দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং মেক্সিকোতে নির্বাসিত থাকাকালীন ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর সাথে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেন। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এই অভিযানের মূল উস্কানিদাতা ছিল মার্কিন বহুজাতিক ফল বিপণন সংস্থা 'ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি', যাদের বিশাল ভূ-সম্পত্তি আরবেনজ সরকার ভূমি সংস্কার আইনের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। এই ঘটনা চে-র সেই সশস্ত্র দর্শনকে আরও দৃঢ় করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বা নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। শোষক শ্রেণী কখনো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। কাস্ত্রোর ‘২৬শে জুলাই আন্দোলন’-এ যোগ দিয়ে ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি 'গ্রানমা' নামক জাহাজে চড়ে কিউবায় অবতরণ করেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রার গেরিলা যুদ্ধে চে তাঁর বিখ্যাত ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটান। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি ছোট ও সুসংগঠিত গেরিলা অগ্রবর্তী দল গণ-আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ছাড়াই একটি দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতির সূচনা করতে পারে। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে চে-র নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘সান্তা ক্লারার যুদ্ধ’-এ বাতিস্তার সামরিক ট্রেনের ওপর আক্রমণ কিউবা বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় নির্ধারণ করে এবং ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি স্বৈরাচারী বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে কিউবার মাটিতে এই বিপ্লবী মডেল সফল হয়।
কিউবার বিপ্লবোত্তর পুনর্গঠন পর্বে চে গুয়েভারা যে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা আজো তীব্র সমালোচনার উৎস। বাতিস্তা সরকারের পতনের পর ১৯৫৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবী সরকার কর্তৃক কিউবার ১৯৪০ সালের সংবিধানে 'আইনি ধারা ১২' সংশোধন করে একটি বিশেষ ডিক্রি জারির মাধ্যমে চে গুয়েভারাকে 'জন্মসূত্রে কিউবান নাগরিক' হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা ছিল কিউবার ইতিহাসে এক বিরল আইনি ঘটনা। ১৯৫৯ সালের প্রথমভাগে হাভানার ‘লা কাবানিয়া’ দুর্গের সামরিক প্রধান হিসেবে বাতিস্তা সরকারের সহযোগী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল। বাতিস্তা সরকারের তৎকালীন ১৯৩৮ সালের 'প্রতিরক্ষা সামাজিক কোড' এবং বিপ্লবী সরকারের 'আইনি ডিক্রি নম্বর ২০৮' ও 'বিপ্লবী আইন নম্বর ১১'-এর আওতায় এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালিত হয়েছিল। এই সময় আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে চে-র একটি উক্তি আজো দালিলিক প্রমাণ হিসেবে বিতর্ক তৈরি করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, "বিচার বিভাগীয় প্রমাণের উপস্থাপনা বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালগুলোর জন্য অপ্রয়োজনীয়, এটি একটি বিপ্লবী যুদ্ধ।" পশ্চিমা ঐতিহাসিক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো আন্তর্জাতিক আইনি বিধিমালা বা আসামিপক্ষের যথাযথ আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অনুসৃত হয়নি। সেখানে বাতিস্তা সরকারের বেশ কিছু সহযোগীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যার সঠিক সংখ্যা নিয়ে আজো ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই একে রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও রাষ্ট্রীয় ভিন্নমত দমনের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। উল্লেখ্য, সমাজতন্ত্রের প্রতি অনুপযুক্ত নাগরিকদের কৃষি-শ্রমশিবিরে পাঠানোর বিতর্কিত প্রক্রিয়াটি কিউবায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৬৫ সালের শেষভাগে, যার নাম ছিল 'উৎপাদনে সহায়তার জন্য সামরিক ইউনিট'। তখন চে কিউবা ছেড়ে চলে গেছেন, ফলে তিনি সেই ক্যাম্পের সরাসরি পরিচালক ছিলেন না। তবে তাঁর তৈরি নতুন মানব তত্ত্বের কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক শুদ্ধিবাদ এই ক্যাম্প তৈরিতে গভীর আদেশিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
এর পাশাপাশি, সমাজতান্ত্রিক কিউবার শিল্পমন্ত্রী এবং জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তাঁর অর্থনৈতিক নীতিগুলো চরম প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। পুঁজিবাদের প্রতি তীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করতে তিনি জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কিউবান মুদ্রার নোটগুলোতে নিজের পুরো নামের বদলে শুধু অবহেলাভরে ‘চে’ লিখে স্বাক্ষর করতেন, যা ছিল বিশ্ব ব্যাংকিং ইতিহাসের এক অভিনব দালিলিক কূটাভাস। চে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ "কিউবায় সমাজতন্ত্র এবং মানুষ"-এ এক নতুন মানব ধারণার অবতারণা করেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ বা বস্তুগত লাভ ত্যাগ করে কেবল নৈতিক চেতনা ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করবে। মানুষের সহজাত মনস্তত্ত্ব ও বাজার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এই অতি-উগ্র অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং অবাস্তব দ্রুত শিল্পায়ন নীতির কারণে কিউবার উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে কিউবান অর্থনীতিতে বিখ্যাত 'শিল্প বনাম কৃষি উৎপাদন বিতর্ক' শুরু হয়, যেখানে সোভিয়েত ব্লকের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার বিরোধিতা করে চে কিউবাকে একতরফা ভারী শিল্পের দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করেন, যা চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। চিনি শিল্পের ওপর মারাত্মক ধস নামে। ফলে কিউবা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ সোভিয়েত-নির্ভর হয়ে পড়ে। এমনকি ১৯৬২ সালের বিখ্যাত 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' বা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন কিউবার মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগোচরে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, চে তা সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু পরে কিউবাকে অন্ধকারে রেখে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ফিরিয়ে নেন, তখন চে একে সোভিয়েত ইউনিয়নের চরম সাম্রাজ্যবাদী আপস ও বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করেন।
চে গুয়েভারার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের চীন-সোভিয়েত বিভাজন এবং সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের সাথে তাঁর সংঘাত। চে ক্রুশ্চেভ-এর পশ্চিমা পুঁজিবাদের সাথে "শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান" নীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি সংশোধনবাদী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল ১৯৬৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ঊনবিংশ অধিবেশনে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ। সেই ভাষণে তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি পরিষ্কার ঘোষণা দেন যে, লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষ এখন তাদের মুক্তির ইতিহাস নিজেদের রক্তে লিখতে শুরু করেছে। এই ওজস্বী ভাষণের ঠিক পরদিন কিউবান প্রবাসী সমাজতান্ত্রিক-বিরোধীরা জাতিসংঘের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে মর্টার হামলা চালায়, যা তাঁর উপস্থিতির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বড় প্রমাণ। এর পরপরই ১৯৬৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়াতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় অর্থনৈতিক সম্মেলনে তিনি তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ‘আলজিয়ার্স ভাষণ’ দেন। সেখানে চে খোলাখুলিভাবে সোভিয়েত ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুন্নত ও শোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মতোই অসমান ও শোষণমূলক বাণিজ্য করছে। এই ভাষণের ফলে কিউবা-সোভিয়েত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। ফিদেল কাস্ত্রো তখন অর্থনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে সোভিয়েত ব্লকের প্রবল চাপের মুখে চে গুয়েভারাকে কিউবার সমস্ত রাষ্ট্রীয় পদ, মন্ত্রিত্ব এবং নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়।
কিউবা ত্যাগের পর চে গুয়েভারা বিশ্ব-বিপ্লবের ধারণাকে ছড়িয়ে দিতে তাঁর বিখ্যাত ‘ত্রিমহাদেশীয় কৌশল’ প্রবর্তন করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডমিনো তত্ত্বের বিপরীতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ব্যস্ত ও দুর্বল রাখতে বিশ্বজুড়ে দুই, তিন বা ততোধিক ভিয়েতনামের জন্ম দেওয়ার সামরিক আহ্বান জানান। এই তত্ত্বের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে কঙ্গো কিনশাসায় তাঁর মার্ক্সবাদী গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর প্রধান কারণ ছিল স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বুঝতে না পারা, কঙ্গোলিজ নেতা লঁরা কাবিলার বাহিনীর চরম শৃঙ্খলহীনতা এবং চে-র নিজস্ব সামরিক সংস্কৃতির সাথে আফ্রিকান বাস্তবতার তীব্র অসঙ্গতি।
এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি বলিভিয়ায় তাঁর ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর পুনরাবৃত্তি করতে যান। সেখানে তাঁর সাথে একমাত্র নারী গেরিলা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হাইডি তামারা , যিনি 'টানিয়া' নামে পরিচিত। ছদ্মবেশে গোয়েন্দাগিরি ও লজিস্টিক সাপোর্টে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু বলিভিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল কিউবা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে রেনে বারিয়েনতোসের সামরিক সরকারের ভূমি সংস্কারের কারণে গ্রামীণ আদিবাসী কৃষকদের মধ্যে কোনো বড় অসন্তোষ ছিল না। তার ওপর ভাষাগত দূরত্ব ছিল এক বিশাল বাধা; স্থানীয় কৃষকেরা স্প্যানিশের বদলে কেচুয়া ও গুয়ারানি ভাষায় কথা বলত, যার ফলে চে-র বাহিনী তাদের সাথে সংযোগ গড়তে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, বলিভিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মারিও মোনহে চে-র সাথে দেখা করে দাবি করেছিলেন যে, বলিভিয়ার মাটির এই যুদ্ধের সুপ্রিম কমান্ডার হবেন তিনি নিজে। চে তা মেনে না নেওয়ায় দলের ভেতরের নেতৃত্বের অহং ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের কারণে সেই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টি চে-কে সমর্থন করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়।
ফলস্বরূপ, স্থানীয় জনবিচ্ছিন্নতা, চরম প্রতিকূল পরিবেশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ পরিচালিত বিশেষ দমন অভিযান 'অপারেশন সিনথিয়া'-র আওতায় সিআইএ-প্রশিক্ষিত বলিভিয়ান রেঞ্জার বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর 'কিব্রাদা দেল ইউরো' গিরিখাতে আহত অবস্থায় বন্দি হন চে। বন্দি হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক 'বলিভিয়ান ডায়েরি' সম্বলিত ব্যাগটি এক বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেন তাঁর শেষ লড়াইয়ের সত্যনিষ্ঠ দলিলটি সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে বিকৃত না হয়। পরদিন, ৯ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামের একটি জরাজীর্ণ স্কুলকক্ষে বলিভিয়ার সামরিক প্রধান রেনে বারিয়েনতোসের সরাসরি আদেশে এবং সিআইএ কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজের উপস্থিতিতে কোনো প্রকার আইনি বিচার ছাড়াই অত্যন্ত অনৈতিক ও নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ঘাতক সার্জেন্ট মারিও তেরান যখন মদ্যপ অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢোকে, চে তখন বুক চিতিয়ে তাঁর শেষ অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন: "আমি জানি তুমি আমাকে মারতে এসেছ। গুলি করো কাপুরুষ, তুমি কেবল একজন মানুষকে হত্যা করবে, তার আদর্শকে নয়।" মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর আইনি ও শারীরিক পরিচিতি নিশ্চিত করার অছিলায় বলিভিয়ার সামরিক জান্তা তাঁর দুই হাতের কবজি কেটে রাসায়নিক পাত্রে সংরক্ষণ করে হাভানায় পাঠিয়েছিল, যা বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসে এক পৈশাচিক দালিলিক প্রমাণ। পরবর্তীতে ডিক্লাসিফাইড হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নথিপত্র প্রমাণ করে যে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে এই অভিযানের প্রতিটি মুহূর্তের গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছিল। দীর্ঘ তিন দশক পর ১৯৯৭ সালে ভ্যালেগ্রান্দেতে তাঁর গোপন গণকবর আবিষ্কৃত হলে তাঁর দেহাবশেষ কিউবার সান্তা ক্লারায় এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বস্তুনিষ্ঠতার নিরিখে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, চে গুয়েভারা একই সাথে ইতিহাসের এক পরম পূজনীয় মুক্তিদূত এবং এক নির্মম শাসনতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব। ভিন্নমত দমন, সমকামীদের প্রতি নীতিগত কঠোরতা এবং আইনি প্রক্রিয়া বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য দক্ষিণপন্থী ও উদারপন্থী সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে তিনি একজন কঠোর ও নির্মম আদর্শবাদী। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল মুক্তিকামী শক্তির কাছে তিনি শৃঙ্খলমুক্তির এক আপসহীন আইকন। মৃত্যুর অর্ধশতক পরেও আলবার্তো কোর্দার তোলা তাঁর কালজয়ী আলোকচিত্র ‘গেরিলিরো হিরোইকো’-র যে বাণিজ্যিক রূপান্তর ঘটেছে, তা উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কূটাভাস। যে পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে চে গুয়েভারা আজীবন লড়াই করলেন, সেই বহুজাতিক পুঁজিবাদী কর্পোরেট বাজারই আজ তাঁর বৈপ্লবিক অবয়বকে টি-শার্ট, পোস্টার ও বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করে বিলিয়ন ডলারের মুনাফা কামাচ্ছে। এটি তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শকে এক প্রকার নিষ্ক্রিয় করে একটি নিরীহ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।
আর্নেস্তো চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার তাই কোনো সরলরৈখিক সমীকরণ নয়; এটি এক গভীর আত্মদ্বন্দ্বে জারিত আখ্যান। রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন ও নির্মম বাস্তবতায় তিনি হয়তো একজন ব্যর্থ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর অনেক সামরিক সিদ্ধান্তই হয়তো ডেকে এনেছিল বিপর্যয়। কিন্তু দিনশেষে চে গুয়েভারা কোনো সাধারণ ক্ষমতার লোভী রাজনীতিক ছিলেন না। নিজের তৈরি করা কঠোর আদর্শের জন্য সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুখ, মন্ত্রিত্বের গদি এবং নিশ্চিত বুর্জোয়া জীবনের সচ্ছলতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন—ইতিহাস তাঁকে সহজে ভুলে যায় না। পুঁজিবাদ তাঁর ছবি বিক্রি করে মুনাফা লুটতে পারে, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই আপসহীন শৃঙ্খল ভাঙার তাড়নাকে কিনতে পারে না। সমস্ত তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও শাসনতান্ত্রিক ত্রুটির ঊর্ধ্বে উঠে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর যে চিরকালীন মানবিক আদিম আকাঙ্ক্ষা—চে গুয়েভারা আজীবন তারই এক জীবন্ত, স্পন্দমান এবং অবিনাশী ইশতেহার।
আজ ১৪ জুন—এই কালজয়ী বিপ্লবীর শুভ জন্মদিন। ইতিহাসের খেরোখাতায় তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন এক অমলিন, দীপ্তিময় এবং তীব্র পঠনযোগ্য ধ্রুবতারা হয়ে। ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে ধূলিমগ্ন যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া এই চির-তরুণ রোমান্টিক রাজপুত্রের জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলিত মানুষের হৃদয়ে আজো বেজে ওঠে এক নীরব ও গভীর শ্রদ্ধাগাথা।
শুভ জন্মদিন, কমরেড চে গুয়েভারা!

বাহাউদ্দিন গোলাপ,
১৪ জুন,২০২৬
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:৪৩
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৩৮
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:১৫
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৩৩