
০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০২:৪৮
‘I Have a Plan, ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরে রাজধানী ঢাকার ৩০০ ফিটে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে এই একটি বাক্য ছুড়ে জনসাধারণের মাঝে তুমুল আলোচনায় এসেছিলেন তারেক রহমান। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট সন্তান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেকের উচ্চরিত এই ইংরেজি শব্দ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়। এবং দেশের মিডিয়ায় ইতিবাচক লেখালেখি করলেও কলকাতার একচোখা গণমাধ্যম ‘রিপাবলিক বাংলা’ প্রচার করে তারেক রহমান ভারতকে বিপদে ফেলার বড় কোনো প্ল্যান নিয়ে এসেছেন। ভূমিপুত্র তারেক রহমান নির্বাচনী সফরে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে জনসমাবেশ আগামীদিনে দেশ নিয়ে বহুমুখী উন্নয়ন করাসহ পরিকল্পনার গ্রহণের কথা জানালেও ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ কি কি আছে তা এখনও খোলাসা করেননি। বুধবার দীর্ঘ ২০ বছর পরে কীর্তনখোলার তীর জনপদ বরিশালের মাটিতে পা রাখবেন জিয়াপুত্র তারেক রহমান, এদিন বান্দরোডস্থ ঐতিহাসিক বেলসপার্ক মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তিনি ভাষণ দেবেন। এই সমাবেশে বিএনপির শীর্ষনেতৃত্ব তারেক রহমান তার প্ল্যান বরিশালবাসীর কাছে তুলে ধরবেন কী না তা নিয়েও আলোচনার শেষ নেই।
নির্বাচনপূর্ব বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে বরিশালের নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। দুদিন যাবত বরিশাল শহরসহ উপজেলাগুলোতে ট্রাকে ঘুরে ঘুরে তারেক রহমানের নামসংবলিত গান বাজিয়ে তার আগমনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ধানের শীষ প্রতীকে ভোটও প্রার্থনা করা হয়।
ধারনা করা হচ্ছে, বুধবার ‘বাংলার ভূমিপুত্র’ তারেক রহমান তার বক্তব্যে বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন এবং সমস্যা-সম্ভবনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। বরিশালবাসীর প্রত্যাশাও এমনটাই। তবে এর বাইরে তার কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যান নিয়ে আলোচনায় সরব হবেন কী না তা স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা নিশ্চিত বলতে পারছে না।
বিশ্বজুড়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যান্য প্রতীক যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, ‘I Have a Dream.’। ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মাটিতে নেমে ঢাকার ৩০০ ফিটে আনুমানিক অর্ধকোটি মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে নেতা তারেক রহমান কর্মীদের উদ্দেশ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবিসংবাদিত নেতা লুথার কিংয়ের নাম উচ্চরণ করার পাশাপাশি বলেছিলেন, ‘I Have a Plan’
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, এই দুটি বাক্যের মধ্যকার পার্থক্য শুধু অর্থগত নয়, বরং বাক্য দুটিও ভিন্ন দুটি সময়ের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘ড্রিম’ জন্ম নেয় শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে আর ‘প্ল্যান’ জন্ম নেয় রাষ্ট্রভাঙনের ঝুঁকির মুহূর্তে।
নেতা তারেক রহমান লন্ডন থেকে ফিরে গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিএনপির ৩১ দফার স্বপক্ষে সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখলেও ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এই বাক্যটির অন্তরালে কি লুকায়িত আছে তা নিয়ে রাজনৈতিব মহলে কৌতুহলের শেষ নেই। এবং তিনি দীর্ঘ এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে সমাবেশে ইতিবাচক ও জনস্বার্থমূলক বক্তব্য রেখে প্রতিনিয়ত মিডিয়ার শিরোনাম হচ্ছেন, মানুষও তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন নারী নেত্রী খালেদা জিয়াপুত্র বুধবার বরিশাল বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি প্ল্যান প্রকাশ অপেক্ষা বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশার হিসেব জানতে চাইতেও পারেন বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
এই আলোচনায় অগ্রাধিকার পেতে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করা এবং বাইপাসসহ ভাঙা-বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের বিষয়টি। বর্তমান সময়ে বরিশাল-ঢাকা সরু মহাসড়কটিতে যে প্রতিনিয়ত প্রাণহানি ঘটছে তা সম্পর্কে নেতা তারেক রহমানও অবগত আছেন। এবং বরিশাল বিএনপির নেতারা এই বিষয়টি তাকে অনেক আগেই অবগত করেছেন বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার বিকেলের আগেই বেলসপার্ক মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ শেষ হয়। এর আগে দুপুরে নেতাকর্মীদের আনাগোনায় মাঠটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সেই সময় স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতারা সমাবেশস্থল পরিদর্শন করেন।
কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন সমাবেশস্থল পরিদর্শনে গিয়ে জানান, তাদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন নেতা তারেক রহমানকে বরণ করার অপেক্ষা। তবে এই নারী নেত্রীও তার নেতা তারেক রহমান দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে কি প্ল্যান করে রেখেছেন তা সম্পর্কে আগাম কিছু বলতে চাইছেন না বা বলতে পারছেন না। তারেক রহমানের এই সমাবেশে কয়েক লাখ সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ঘটবে এবং বরিশাল শহরটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে মন্তব্য করেন শিরিন।
অনুরূপ মন্তব্য করেন বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার এবং একই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা। মঙ্গলবার গভীর রাতে মহানগর বিএনপির এই দুই নেতা জানান, সন্ধ্যার পর থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলা থেকে কর্মী-সমর্থকেরা মাঠে অবস্থান নেন। অবশ্য এর দুদিন আগে অর্থাৎ সোমবার থেকে বরিশালের অধিকাংশ হোটেলগুলোতে অবস্থান নেন জেলা-উপজেলার শীর্ষ নেতারা।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, দুই দশক পরে বরিশালে তারেক রহমানের আগমনে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের উৎসবের আবহ বিরাজ করছে। এবং বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে তাদের নেতা কি প্ল্যান রেখেছেন তা শোনার অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু বাংলার ভূমিপুত্র তারেক রহমান পূর্বে ঘোষিত ৩১ দফার বাইরে দেশ নিয়ে নতুন কি প্ল্যান এই বিষয়টি আদৌ বরিশালের সমাবেশে পরিস্কার করবেন কী না তা নিশ্চিত বলা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের সমস্যা এবং সম্ভবনাগুলো সম্পর্কে তারেক রহমান যেহেতু অবগত আছেন, বিশেষ করে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করার বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজেও ভাবছেন। সেক্ষেত্রে জিয়াপুত্র তারেক মহাসড়ক বহু লেনে উন্নীত করাসহ ভাঙা টু কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন নিয়ে বরিশালবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরতে পারেন। পাশাপাশি স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিভাজন বা বিভক্তি ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী করার ক্ষেত্রে কর্মী-সমর্থকদের অঙ্গীকার বা শপথ করানোর সিদ্ধন্তে যাওয়ার সম্ভবনাও থাকছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের এমপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, নেতা তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নিয়ে তার মহাপরিকল্পনার কথা আছে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সেখানে কি কি পরিকল্পনা রয়েছে, তা খোলসা না করে তিনি কৌশল হিসেবে বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। এই একটি শব্দ বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরকে ঘোর টেনশনে ফেলে দিয়েছে এবং দেশের সাধারণ মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে ‘ ‘I Have a Plan’ এই ইংরেজি ছোট্ট শব্দের ব্যাপকতা হয়তো দেশবাসী দেখতে পাবেন মন্তব্য করেন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক সরোয়ার।’
লেখক
হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।
ইমেল: bslhasib@gmail.com, মোবাইল: +৮৮০১৭১১-৫৮৬৯৪০।
‘I Have a Plan, ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষ করে গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশে ফিরে রাজধানী ঢাকার ৩০০ ফিটে জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে এই একটি বাক্য ছুড়ে জনসাধারণের মাঝে তুমুল আলোচনায় এসেছিলেন তারেক রহমান। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট সন্তান বিএনপির চেয়ারম্যান তারেকের উচ্চরিত এই ইংরেজি শব্দ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়। এবং দেশের মিডিয়ায় ইতিবাচক লেখালেখি করলেও কলকাতার একচোখা গণমাধ্যম ‘রিপাবলিক বাংলা’ প্রচার করে তারেক রহমান ভারতকে বিপদে ফেলার বড় কোনো প্ল্যান নিয়ে এসেছেন। ভূমিপুত্র তারেক রহমান নির্বাচনী সফরে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে জনসমাবেশ আগামীদিনে দেশ নিয়ে বহুমুখী উন্নয়ন করাসহ পরিকল্পনার গ্রহণের কথা জানালেও ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ কি কি আছে তা এখনও খোলাসা করেননি। বুধবার দীর্ঘ ২০ বছর পরে কীর্তনখোলার তীর জনপদ বরিশালের মাটিতে পা রাখবেন জিয়াপুত্র তারেক রহমান, এদিন বান্দরোডস্থ ঐতিহাসিক বেলসপার্ক মাঠে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তিনি ভাষণ দেবেন। এই সমাবেশে বিএনপির শীর্ষনেতৃত্ব তারেক রহমান তার প্ল্যান বরিশালবাসীর কাছে তুলে ধরবেন কী না তা নিয়েও আলোচনার শেষ নেই।
নির্বাচনপূর্ব বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে বরিশালের নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। দুদিন যাবত বরিশাল শহরসহ উপজেলাগুলোতে ট্রাকে ঘুরে ঘুরে তারেক রহমানের নামসংবলিত গান বাজিয়ে তার আগমনের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ধানের শীষ প্রতীকে ভোটও প্রার্থনা করা হয়।
ধারনা করা হচ্ছে, বুধবার ‘বাংলার ভূমিপুত্র’ তারেক রহমান তার বক্তব্যে বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন এবং সমস্যা-সম্ভবনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। বরিশালবাসীর প্রত্যাশাও এমনটাই। তবে এর বাইরে তার কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যান নিয়ে আলোচনায় সরব হবেন কী না তা স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা নিশ্চিত বলতে পারছে না।
বিশ্বজুড়ে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অন্যান্য প্রতীক যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন, ‘I Have a Dream.’। ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশের মাটিতে নেমে ঢাকার ৩০০ ফিটে আনুমানিক অর্ধকোটি মানুষের মধ্যে দাঁড়িয়ে নেতা তারেক রহমান কর্মীদের উদ্দেশ করে যুক্তরাষ্ট্রে অবিসংবাদিত নেতা লুথার কিংয়ের নাম উচ্চরণ করার পাশাপাশি বলেছিলেন, ‘I Have a Plan’
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, এই দুটি বাক্যের মধ্যকার পার্থক্য শুধু অর্থগত নয়, বরং বাক্য দুটিও ভিন্ন দুটি সময়ের বাস্তবতাকে তুলে ধরে। মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘ড্রিম’ জন্ম নেয় শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্নে আর ‘প্ল্যান’ জন্ম নেয় রাষ্ট্রভাঙনের ঝুঁকির মুহূর্তে।
নেতা তারেক রহমান লন্ডন থেকে ফিরে গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিএনপির ৩১ দফার স্বপক্ষে সভা-সমাবেশে বক্তব্য রাখলেও ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এই বাক্যটির অন্তরালে কি লুকায়িত আছে তা নিয়ে রাজনৈতিব মহলে কৌতুহলের শেষ নেই। এবং তিনি দীর্ঘ এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরে সমাবেশে ইতিবাচক ও জনস্বার্থমূলক বক্তব্য রেখে প্রতিনিয়ত মিডিয়ার শিরোনাম হচ্ছেন, মানুষও তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন নারী নেত্রী খালেদা জিয়াপুত্র বুধবার বরিশাল বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনি প্ল্যান প্রকাশ অপেক্ষা বেশি মাত্রায় গুরুত্ব দিয়ে এই অঞ্চলের মানুষের প্রাপ্তি এবং প্রত্যাশার হিসেব জানতে চাইতেও পারেন বলে কেউ কেউ মনে করছেন।
এই আলোচনায় অগ্রাধিকার পেতে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করা এবং বাইপাসসহ ভাঙা-বরিশাল হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের বিষয়টি। বর্তমান সময়ে বরিশাল-ঢাকা সরু মহাসড়কটিতে যে প্রতিনিয়ত প্রাণহানি ঘটছে তা সম্পর্কে নেতা তারেক রহমানও অবগত আছেন। এবং বরিশাল বিএনপির নেতারা এই বিষয়টি তাকে অনেক আগেই অবগত করেছেন বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার বিকেলের আগেই বেলসপার্ক মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ শেষ হয়। এর আগে দুপুরে নেতাকর্মীদের আনাগোনায় মাঠটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সেই সময় স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতারা সমাবেশস্থল পরিদর্শন করেন।
কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন সমাবেশস্থল পরিদর্শনে গিয়ে জানান, তাদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন নেতা তারেক রহমানকে বরণ করার অপেক্ষা। তবে এই নারী নেত্রীও তার নেতা তারেক রহমান দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে কি প্ল্যান করে রেখেছেন তা সম্পর্কে আগাম কিছু বলতে চাইছেন না বা বলতে পারছেন না। তারেক রহমানের এই সমাবেশে কয়েক লাখ সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ঘটবে এবং বরিশাল শহরটি লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে মন্তব্য করেন শিরিন।
অনুরূপ মন্তব্য করেন বরিশাল মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার এবং একই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিনসহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা। মঙ্গলবার গভীর রাতে মহানগর বিএনপির এই দুই নেতা জানান, সন্ধ্যার পর থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং উপজেলা থেকে কর্মী-সমর্থকেরা মাঠে অবস্থান নেন। অবশ্য এর দুদিন আগে অর্থাৎ সোমবার থেকে বরিশালের অধিকাংশ হোটেলগুলোতে অবস্থান নেন জেলা-উপজেলার শীর্ষ নেতারা।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, দুই দশক পরে বরিশালে তারেক রহমানের আগমনে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের উৎসবের আবহ বিরাজ করছে। এবং বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে তাদের নেতা কি প্ল্যান রেখেছেন তা শোনার অধির আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু বাংলার ভূমিপুত্র তারেক রহমান পূর্বে ঘোষিত ৩১ দফার বাইরে দেশ নিয়ে নতুন কি প্ল্যান এই বিষয়টি আদৌ বরিশালের সমাবেশে পরিস্কার করবেন কী না তা নিশ্চিত বলা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, বরিশাল তথা গোটা দক্ষিণাঞ্চলের সমস্যা এবং সম্ভবনাগুলো সম্পর্কে তারেক রহমান যেহেতু অবগত আছেন, বিশেষ করে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়ক ৪ বা ৬ লেনে উন্নীত করার বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজেও ভাবছেন। সেক্ষেত্রে জিয়াপুত্র তারেক মহাসড়ক বহু লেনে উন্নীত করাসহ ভাঙা টু কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন নিয়ে বরিশালবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরতে পারেন। পাশাপাশি স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিভাজন বা বিভক্তি ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী করার ক্ষেত্রে কর্মী-সমর্থকদের অঙ্গীকার বা শপথ করানোর সিদ্ধন্তে যাওয়ার সম্ভবনাও থাকছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বরিশাল সদর আসনের এমপি প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, নেতা তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নিয়ে তার মহাপরিকল্পনার কথা আছে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু সেখানে কি কি পরিকল্পনা রয়েছে, তা খোলসা না করে তিনি কৌশল হিসেবে বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। এই একটি শব্দ বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরকে ঘোর টেনশনে ফেলে দিয়েছে এবং দেশের সাধারণ মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে ‘ ‘I Have a Plan’ এই ইংরেজি ছোট্ট শব্দের ব্যাপকতা হয়তো দেশবাসী দেখতে পাবেন মন্তব্য করেন বর্ষীয়ান রাজনৈতিক সরোয়ার।’
লেখক
হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।
ইমেল: bslhasib@gmail.com, মোবাইল: +৮৮০১৭১১-৫৮৬৯৪০।

০১ মে, ২০২৬ ১৫:৫৭

১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:৩৫

১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৪৭
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।