সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৪১
এসপি মাহমুদ হাসানকে নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন কোনো ঘটনা নয়। পতিত আওয়ামী লীগের আমলেও তাকে নিয়ে বহুবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে তাকে কখনো বিএনপিপন্থী পুলিশ, কখনো জামায়াতপন্থী, আবার কখনো রাজাকার ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমি নিজে যার বড় সাক্ষী। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আমি নিজেই একবার কলাম লিখেছিলাম। আরেকবার একটা কবিতাও লিখেছিলাম।
তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- এবার তাকে উল্টো আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর বানানোর মিশন নিয়ে নেমেছে একটি গ্রুপ। ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিংয়ের সেই ধারা একই আছে তবে এবার জাস্ট ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ইউটার্ণ নিয়ে পক্ষটা ঘুরে গেছে। কারণ, এসপি মাহমুদ হাসানের দোষ একটাই। সে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে পারে না। নিজের নীতি আর আদর্শ থেকে সহজে বিচ্যুত হতে পারে না। এজন্য বারবারই সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে।
মাহমুদ হাসান কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় চেয়েছে প্রজাতন্ত্রের পুলিশ হতে। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল জনগণের পুলিশ হয়ে ওঠা। আদর্শবান এক স্কুল শিক্ষকের সন্তান আর অসম্ভব রকমের মেধাবী মাহমুদ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে বিসিএস কৃষি ক্যাডারে এবং পরে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে বরিশাল মেট্রোপলিটনে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে ঝালকাঠিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। এরপরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (RAB) পোস্টিং হওয়ার পরে সেখানেও অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারসহ কর্মক্ষেত্রে নিষ্ঠা, দক্ষতা, দায়িত্ব এবং পেশাদারিত্বের বিভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে মাহমুদ হাসান।
পেশাগত কর্মজীবনে অসম্ভব রকমের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, পরিশ্রম আর সততা দিয়ে সবসময় কাজ করার চেষ্টা করেছে। দিনরাত এক করে মানুষকে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাঁর আচার, আচরণ, সেবা এবং নীতি দেখে অনেক মানুষ পুলিশকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছে। আমি মাহমুদকে প্রায় দেড় যুগ থেকে চিনি। আমার ধারণা বরিশাল এবং ঝালকাঠি জেলার হাতেগোনা কিছু চিহ্নিত অপরাধী আর দুষ্কৃতিকারী ছাড়া আমার এই কথার সাথে কেউ দ্বিমত করবে না। তাঁর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি থাকতে পারে তবে বিবেকবুদ্ধি থাকলে তারাও অন্তত বলবে মাহমুদ খারাপ মানুষ নয়।
মাহমুদ যখন বরিশাল থেকে বদলি হয়ে ঝালকাঠি গেছে তখন বরিশালের অনেক মানুষ কেঁদেছে। আবার যখন সে প্রমোশন নিয়ে ঝালকাঠি জেলা ত্যাগ করেছে তখন ঝালকাঠির মানুষ তাঁকে রাখার জন্য আন্দোলন করেছে, মিছিল করেছে। পুলিশের মতো নিত্য গালি খাওয়া একটা পেশায় একজন মানুষের জীবনে এরচেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে? প্রজাতন্ত্রের একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনে এরচেয়ে বড় অর্জন আর কী থাকতে পারে? এসপি মাহমুদ এখন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB) ঢাকায় কর্মরত। এর আগে সে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU)তেও নিষ্ঠা আর সুনামের সাথে কাজ করেছে।
মাহমুদকে নিয়ে নতুন করে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আমার সামনে জনৈক এক প্রবাসী ব্যক্তির একটা পোস্ট আসলো। সেখান থেকেই এই লেখার অবতারণা। পোস্টে মাহমুদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার প্রায় সবটাই বানোয়াট আর শত্রুতামূলক। খোঁজ নিয়ে যতদূর জানলাম, একটা পুরাতন অপরাধী গ্রুপ তাঁর চরিত্রহননের নতুন মিশন নিয়ে নেমেছে। অতীতেও অনেকে অনেকবার চেষ্টা করেছিল। তারা যেমন ব্যর্থ হয়েছিল আশাকরি তেমনি এবারের কুশীলবরাও ব্যর্থ হবে। কারণ, মিথ্যাকে সাময়িক সময়ের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিন্তু টিকিয়ে রাখা যায় না।
টানা ৩ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে আওয়ামী লীগ যখন পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেছিল তখন ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় ডিপার্টমেন্টের ৯০ জন অফিসারই প্রজাতন্ত্রের পুলিশের পরিবর্তে আওয়ামী পুলিশে পরিনত হয়েছিল। তবে সেদিনও বাকি ১০ জনের মধ্যে ছিল এই মাহমুদ হাসান। দলীয় সরকারের আদেশ কমবেশি পালন করলেও আমার জানামতে সে কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় জনগণের পুলিশ থাকার চেষ্টা করেছে। যাদের দেখলে মানুষ আবার নতুন করে পুলিশকে ভালোবাসতে শেখে তাদেরকে যখন মিথ্যা ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিং করা হয় তখন চুপ থাকা যায় না। বিবেক চিৎকার করে ওঠে। বিবেকের আর্তনাদ কিংবা দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, মানুষের বিবেকের চেয়ে বড় কোনো আদালত এই পৃথিবীতে নেই। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, মানবাধিকার ও সুশাসন ব্যক্তিত্ব।
বাবুগঞ্জঃ ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
এসপি মাহমুদ হাসানকে নিয়ে ষড়যন্ত্র নতুন কোনো ঘটনা নয়। পতিত আওয়ামী লীগের আমলেও তাকে নিয়ে বহুবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে তাকে কখনো বিএনপিপন্থী পুলিশ, কখনো জামায়াতপন্থী, আবার কখনো রাজাকার ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আমি নিজে যার বড় সাক্ষী। এর প্রতিবাদ জানিয়ে আমি নিজেই একবার কলাম লিখেছিলাম। আরেকবার একটা কবিতাও লিখেছিলাম।
তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো- এবার তাকে উল্টো আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর বানানোর মিশন নিয়ে নেমেছে একটি গ্রুপ। ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিংয়ের সেই ধারা একই আছে তবে এবার জাস্ট ১৮০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ইউটার্ণ নিয়ে পক্ষটা ঘুরে গেছে। কারণ, এসপি মাহমুদ হাসানের দোষ একটাই। সে অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে পারে না। নিজের নীতি আর আদর্শ থেকে সহজে বিচ্যুত হতে পারে না। এজন্য বারবারই সমস্যায় পড়তে হয় তাঁকে।
মাহমুদ হাসান কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় চেয়েছে প্রজাতন্ত্রের পুলিশ হতে। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল জনগণের পুলিশ হয়ে ওঠা। আদর্শবান এক স্কুল শিক্ষকের সন্তান আর অসম্ভব রকমের মেধাবী মাহমুদ পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে প্রথমে বিসিএস কৃষি ক্যাডারে এবং পরে বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগদান করেছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার হিসেবে বরিশাল মেট্রোপলিটনে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে ঝালকাঠিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। এরপরে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (RAB) পোস্টিং হওয়ার পরে সেখানেও অস্ত্র উদ্ধার, মাদক উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারসহ কর্মক্ষেত্রে নিষ্ঠা, দক্ষতা, দায়িত্ব এবং পেশাদারিত্বের বিভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে মাহমুদ হাসান।
পেশাগত কর্মজীবনে অসম্ভব রকমের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, পরিশ্রম আর সততা দিয়ে সবসময় কাজ করার চেষ্টা করেছে। দিনরাত এক করে মানুষকে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে সার্ভিস দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাঁর আচার, আচরণ, সেবা এবং নীতি দেখে অনেক মানুষ পুলিশকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছে। আমি মাহমুদকে প্রায় দেড় যুগ থেকে চিনি। আমার ধারণা বরিশাল এবং ঝালকাঠি জেলার হাতেগোনা কিছু চিহ্নিত অপরাধী আর দুষ্কৃতিকারী ছাড়া আমার এই কথার সাথে কেউ দ্বিমত করবে না। তাঁর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি থাকতে পারে তবে বিবেকবুদ্ধি থাকলে তারাও অন্তত বলবে মাহমুদ খারাপ মানুষ নয়।
মাহমুদ যখন বরিশাল থেকে বদলি হয়ে ঝালকাঠি গেছে তখন বরিশালের অনেক মানুষ কেঁদেছে। আবার যখন সে প্রমোশন নিয়ে ঝালকাঠি জেলা ত্যাগ করেছে তখন ঝালকাঠির মানুষ তাঁকে রাখার জন্য আন্দোলন করেছে, মিছিল করেছে। পুলিশের মতো নিত্য গালি খাওয়া একটা পেশায় একজন মানুষের জীবনে এরচেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে? প্রজাতন্ত্রের একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মজীবনে এরচেয়ে বড় অর্জন আর কী থাকতে পারে? এসপি মাহমুদ এখন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (SB) ঢাকায় কর্মরত। এর আগে সে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) এবং অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (ATU)তেও নিষ্ঠা আর সুনামের সাথে কাজ করেছে।
মাহমুদকে নিয়ে নতুন করে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে আমার সামনে জনৈক এক প্রবাসী ব্যক্তির একটা পোস্ট আসলো। সেখান থেকেই এই লেখার অবতারণা। পোস্টে মাহমুদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তার প্রায় সবটাই বানোয়াট আর শত্রুতামূলক। খোঁজ নিয়ে যতদূর জানলাম, একটা পুরাতন অপরাধী গ্রুপ তাঁর চরিত্রহননের নতুন মিশন নিয়ে নেমেছে। অতীতেও অনেকে অনেকবার চেষ্টা করেছিল। তারা যেমন ব্যর্থ হয়েছিল আশাকরি তেমনি এবারের কুশীলবরাও ব্যর্থ হবে। কারণ, মিথ্যাকে সাময়িক সময়ের জন্য ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিন্তু টিকিয়ে রাখা যায় না।
টানা ৩ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে আওয়ামী লীগ যখন পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেছিল তখন ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় ডিপার্টমেন্টের ৯০ জন অফিসারই প্রজাতন্ত্রের পুলিশের পরিবর্তে আওয়ামী পুলিশে পরিনত হয়েছিল। তবে সেদিনও বাকি ১০ জনের মধ্যে ছিল এই মাহমুদ হাসান। দলীয় সরকারের আদেশ কমবেশি পালন করলেও আমার জানামতে সে কখনো দলীয় পুলিশ হয়নি। সে সবসময় জনগণের পুলিশ থাকার চেষ্টা করেছে। যাদের দেখলে মানুষ আবার নতুন করে পুলিশকে ভালোবাসতে শেখে তাদেরকে যখন মিথ্যা ট্যাগিং, ফ্রেমিং, ব্লেমিং করা হয় তখন চুপ থাকা যায় না। বিবেক চিৎকার করে ওঠে। বিবেকের আর্তনাদ কিংবা দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, মানুষের বিবেকের চেয়ে বড় কোনো আদালত এই পৃথিবীতে নেই। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি, মানবাধিকার ও সুশাসন ব্যক্তিত্ব।
বাবুগঞ্জঃ ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ।

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:২৯
একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় কি এমনই হওয়ার কথা ছিল? দুই দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা করেছেন পুলক চ্যাটার্জি। দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বরিশাল ব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কর্মজীবনের শেষদিকে এসে চাকরি হারিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বেকার ছিলেন, আর্থিক সংকটে পড়েছেন- এমন তথ্যই এখন তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) তাঁর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে-একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন একের পর এক সংকটে পড়ছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন কে?
শুধু ব্যক্তিগত হতাশা, শারীরিক সমস্যা কিংবা আর্থিক সংকট দিয়ে কি এই মৃত্যুর পুরো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তা, কর্মহীনতা, পাওনা নিয়ে জটিলতা এবং সাংবাদিক সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর তিনি বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ব্যুরোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর সহকর্মী স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরীকে দিয়ে ব্যুরোর কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু চাকরি বা দায়িত্ব হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জির আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছিল- এখন সেটিই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে তাঁর ন্যায্য পাওনা আদৌ পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কতটুকু এবং না হয়ে থাকলে কেন- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। কারণ একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান শুধু একটি পদ হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর জীবিকা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের প্রশ্ন।
পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পরও সমকালের সঙ্গে পুলক চ্যাটার্জির সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর কাছে সাবেক অফিসের একটি বিকল্প চাবি ছিল বলে জানা গেছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যেতেন, বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কর্মস্থল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও একজন সাবেক ব্যুরোপ্রধান কেন সেখানে নিয়মিত যেতেন? এটি কি শুধুই পুরোনো কর্মস্থলের প্রতি আবেগ? নাকি দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না পারার এক ধরনের মানসিক টান? সহকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ঘটনাটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও তদন্তের দাবি রাখে।
মৃত্যুর পর পুলক চ্যাটার্জির পাশে একাধিক চিরকুট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব লেখায় আর্থিক সংকট, শারীরিক সমস্যা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতির কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি চিঠিতে সহকর্মী সুমন চৌধুরীর প্রসঙ্গ এসেছে। ছোট ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক, দুই সন্তান পিয়াঙ্কা ও প্রদ্ধতি এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ করেও পৃথক লেখা থাকার কথা জানা গেছে। এসব চিঠির বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু সেগুলো যদি তাঁর শেষ সময়ের মানসিক ও আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়ে থাকে, তাহলে সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়- তিনি যখন সংকটে ছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা কী জানতেন? আর জানলে কী করেছিলেন? নেতৃত্বের দায় কতটুকু?
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে তিনি নিজেই ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ, কিছু সংগঠনে পেশাদার সাংবাদিকদের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তি-স্বার্থের প্রভাব কখনো কখনো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যক্তি-বিশেষের প্রভাব সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ওপর চেপে বসলে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই কারণে পুলক চ্যাটার্জির মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাংবাদিকরা যথার্থ সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মৃত্যুর দায় সরাসরি কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একজন প্রবীণ সাংবাদিক দীর্ঘদিন কর্মহীন ও আর্থিক সংকটে থাকলে তাঁর সহকর্মী সংগঠনগুলোর সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল, জরুরি সহায়তা, কর্মসংস্থান বা পেশাগত পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না- পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অনৈক্য ও নেতৃত্বের বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে- এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। পুলক চ্যাটার্জির মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিক কর্মজীবন হারানোর পর যদি দীর্ঘ সময় নিজেকে একা মনে করে থাকেন, তবে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংকট নয়; সাংবাদিক সমাজের সাংগঠনিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলো কতটা সফল- এখন সেটিই আলোচনার বিষয়।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত ২০২৩ সালে তাঁর চাকরি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল? দ্বিতীয়ত, সমকাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর কোনো ন্যায্য পাওনা বকেয়া ছিল কি না? তৃতীয়ত, চাকরি হারানোর পর তাঁর আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী ছিল? চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠন ও সহকর্মীরা তাঁর সংকট সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন এবং তাঁকে কোনো সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না? পঞ্চমত, মৃত্যুর আগে পাওয়া চিঠিগুলোর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে কী উঠে আসে? ষষ্ঠত, স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা রয়েছে এবং তার কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই মৃত্যু কি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের পরিণতি, নাকি এর সঙ্গে পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, স্মৃতিচারণ থাকবে। কিন্তু শুধু শোক প্রকাশ করে যদি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর আর পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য। প্রয়োজন তাঁর চাকরি হারানোর প্রেক্ষাপট ও পাওনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ। প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিজেদের ভূমিকা পর্যালোচনা।
একজন সাংবাদিক তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ সংবাদপেশা ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। শেষ জীবনে যদি তিনি আর্থিক সংকট, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যাবে। পুলক চ্যাটার্জি নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বরিশালের সাংবাদিক সমাজের সামনে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলো এখনো জীবিত।
একজন সাংবাদিকের দুর্দিনে সাংবাদিক সমাজ কোথায় থাকে- আর সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব যখন পেশাদারিত্বের বদলে অন্য কোনো প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যোগ্য সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবে কে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু এখন সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে।’
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।
একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় কি এমনই হওয়ার কথা ছিল? দুই দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা করেছেন পুলক চ্যাটার্জি। দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বরিশাল ব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কর্মজীবনের শেষদিকে এসে চাকরি হারিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বেকার ছিলেন, আর্থিক সংকটে পড়েছেন- এমন তথ্যই এখন তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) তাঁর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে-একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন একের পর এক সংকটে পড়ছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন কে?
শুধু ব্যক্তিগত হতাশা, শারীরিক সমস্যা কিংবা আর্থিক সংকট দিয়ে কি এই মৃত্যুর পুরো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তা, কর্মহীনতা, পাওনা নিয়ে জটিলতা এবং সাংবাদিক সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর তিনি বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ব্যুরোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর সহকর্মী স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরীকে দিয়ে ব্যুরোর কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু চাকরি বা দায়িত্ব হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জির আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছিল- এখন সেটিই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে তাঁর ন্যায্য পাওনা আদৌ পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কতটুকু এবং না হয়ে থাকলে কেন- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। কারণ একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান শুধু একটি পদ হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর জীবিকা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের প্রশ্ন।
পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পরও সমকালের সঙ্গে পুলক চ্যাটার্জির সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর কাছে সাবেক অফিসের একটি বিকল্প চাবি ছিল বলে জানা গেছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যেতেন, বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কর্মস্থল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও একজন সাবেক ব্যুরোপ্রধান কেন সেখানে নিয়মিত যেতেন? এটি কি শুধুই পুরোনো কর্মস্থলের প্রতি আবেগ? নাকি দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না পারার এক ধরনের মানসিক টান? সহকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ঘটনাটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও তদন্তের দাবি রাখে।
মৃত্যুর পর পুলক চ্যাটার্জির পাশে একাধিক চিরকুট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব লেখায় আর্থিক সংকট, শারীরিক সমস্যা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতির কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি চিঠিতে সহকর্মী সুমন চৌধুরীর প্রসঙ্গ এসেছে। ছোট ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক, দুই সন্তান পিয়াঙ্কা ও প্রদ্ধতি এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ করেও পৃথক লেখা থাকার কথা জানা গেছে। এসব চিঠির বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু সেগুলো যদি তাঁর শেষ সময়ের মানসিক ও আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়ে থাকে, তাহলে সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়- তিনি যখন সংকটে ছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা কী জানতেন? আর জানলে কী করেছিলেন? নেতৃত্বের দায় কতটুকু?
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে তিনি নিজেই ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ, কিছু সংগঠনে পেশাদার সাংবাদিকদের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তি-স্বার্থের প্রভাব কখনো কখনো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যক্তি-বিশেষের প্রভাব সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ওপর চেপে বসলে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই কারণে পুলক চ্যাটার্জির মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাংবাদিকরা যথার্থ সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মৃত্যুর দায় সরাসরি কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একজন প্রবীণ সাংবাদিক দীর্ঘদিন কর্মহীন ও আর্থিক সংকটে থাকলে তাঁর সহকর্মী সংগঠনগুলোর সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল, জরুরি সহায়তা, কর্মসংস্থান বা পেশাগত পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না- পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অনৈক্য ও নেতৃত্বের বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে- এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। পুলক চ্যাটার্জির মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিক কর্মজীবন হারানোর পর যদি দীর্ঘ সময় নিজেকে একা মনে করে থাকেন, তবে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংকট নয়; সাংবাদিক সমাজের সাংগঠনিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলো কতটা সফল- এখন সেটিই আলোচনার বিষয়।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত ২০২৩ সালে তাঁর চাকরি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল? দ্বিতীয়ত, সমকাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর কোনো ন্যায্য পাওনা বকেয়া ছিল কি না? তৃতীয়ত, চাকরি হারানোর পর তাঁর আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী ছিল? চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠন ও সহকর্মীরা তাঁর সংকট সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন এবং তাঁকে কোনো সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না? পঞ্চমত, মৃত্যুর আগে পাওয়া চিঠিগুলোর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে কী উঠে আসে? ষষ্ঠত, স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা রয়েছে এবং তার কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই মৃত্যু কি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের পরিণতি, নাকি এর সঙ্গে পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, স্মৃতিচারণ থাকবে। কিন্তু শুধু শোক প্রকাশ করে যদি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর আর পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য। প্রয়োজন তাঁর চাকরি হারানোর প্রেক্ষাপট ও পাওনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ। প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিজেদের ভূমিকা পর্যালোচনা।
একজন সাংবাদিক তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ সংবাদপেশা ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। শেষ জীবনে যদি তিনি আর্থিক সংকট, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যাবে। পুলক চ্যাটার্জি নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বরিশালের সাংবাদিক সমাজের সামনে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলো এখনো জীবিত।
একজন সাংবাদিকের দুর্দিনে সাংবাদিক সমাজ কোথায় থাকে- আর সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব যখন পেশাদারিত্বের বদলে অন্য কোনো প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যোগ্য সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবে কে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু এখন সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে।’
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০২:৫৬
বিগত ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার আমলে পরীক্ষায় নকল বন্ধ, মেয়েদের উপবৃত্তি, অবৈতনিক শিক্ষা, জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ বেশকিছু সফলতা ছিল বিএনপির। তবে এর বিপরীতে সবচেয়ে বেশি যে কয়েকটা ব্যর্থতার জন্য আজো বিএনপিকে লজ্জিত হতে হয় এরমধ্যে অন্যতম একটা হলো বিদ্যুৎ। সেই আমলে বিদ্যুতের জন্য কানসাট বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের মতো যে লজ্জাজনক ইতিহাস রচিত হয়েছিল এবং সেই ঘটনার জন্য যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী ছিলেন, সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই আবার প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি দিয়ে এবার পূর্ণমন্ত্রী করা হলো! অযোগ্য মানুষকে প্রমোশন দিয়ে দ্বিতীয়বার আগের চেয়েও বড় চেয়ারে বসাতে কতখানি চাটুকারিতা তোষামোদির যোগ্যতা থাকা লাগে জানিনা, তবে এটা জানি সেই একই ব্যক্তির জন্য বিএনপি এবারও বড় বিতর্কের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে যিনি তীব্র জনরোষের মুখে মন্ত্রীত্ব থেকে অপসারিত হয়েছিলেন তাকেই এবার পূর্ণমন্ত্রী বানিয়ে বিএনপি কী কী সাফল্য অর্জন করবে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি যে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ ম্যানেজমেন্টে পুরোপুরি অযোগ্য তার প্রমাণ ইতোমধ্যে তিনি দিয়েছেন। গ্রামে বর্তমানে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতি ২ ঘন্টা পরপর এক থেকে দেড় ঘন্টা বা কোথাও কোথাও এরচেয়ে বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এমনকি রাতের অফ-পিক আওয়ারেও গড়ে ২ থেকে ৩ বার লোডশেডিং হচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ মন্ত্রী বললেন- গ্রামে নাকি লোডশেডিং নাই! বিদ্যুতের লম্বা লম্বা লাইনের জন্য নাকি বিদ্যুৎ ট্রিপ বা ফল্ট করে! এটা কোনো যুক্তি? গ্রামের মানুষ বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে এখন অতিষ্ঠ। সেখানে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া বা গ্যাস-কয়লা সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে কৈফিয়ত দেওয়ার পরিবর্তে তিনি দায় চাপালেন পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের উপরে!
মন্ত্রী হওয়ার পরেই কি মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে যায় নাকি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে ভারসাম্যহীন হলেই তখন তাকে মন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয় সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় এসব অযোগ্য মন্ত্রীদের জন্য বিএনপি এবারও বিতর্কিত হবে, জনবিচ্ছিন্ন হবে এবং বিপদে পড়বে। দেশে এখন তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। ঢাকার অনেক জায়গায় চুলা জ্বলছে না। সিএনজি স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গাড়িতে গ্যাস পাচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় গ্যাসের সামান্য সরবরাহ থাকলেও গ্যাসের চাপ একদম নেই। এদিকে কয়লা মজুদও প্রায় শেষ। বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রায় খালি। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেলের সরবরাহ নেই। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লাচালিত। গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লার সরবরাহ না থাকলে এগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। ভারতীয় কোম্পানি আদানি এবং দেশীয় সামিট গ্রুপকে বিশেষ সু্বিধা দেওয়ার জন্য চড়াদামে কেনা বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন দেশের অর্থনীতির গলার কাঁটা। সরকারের জন্য বিরাট বড় বোঝা। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিগত দিনে পাচার হয়েছে দেশের কোটি কোটি ডলার।
বিগত পতিত সরকারের আমলে এদেশে আমদানি নির্ভর কয়লা, ডিজেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল মূলত একটি দেশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য। আশাকরি সেই দেশটার নাম বলার আর দরকার নেই। সবাই বুঝতে পারছে। অথচ নদীমাতৃক এবং মৌসুমী বায়ুর এই বাংলাদেশে দরকার ছিল বেশি বেশি জলবিদ্যুৎ এবং বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা, যা এদেশে সারাবছর বিনামূল্যে পাওয়া যায়। উন্নত বিশ্বের মতো সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট নির্মাণ করার দরকার ছিল। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে বারবার কাঁচামাল আমদানি করা লাগতো না। তবে সেটা না করার পেছনে মূল রহস্য হলো এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশের বিরাট লাভ হলেও ক্ষতি হতো লুটেরাদের। তারা বারবার এলএনজি, গ্যাস, কয়লা, ডিজেল, ইউরেনিয়াম আমদানির নামে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পাচার করতে পারতো না। এদেশের সকল উন্নয়ন হয় মূলত বড় বড় চোর-ডাকাত, লুটেরাদের লুটপাটে সহায়তা করার জন্য আর কিছু উন্নয়ন প্রদর্শনী করার জন্য। সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের স্বার্থে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কোনো উন্নয়ন হয় না।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম আসে বিদেশ থেকে। সেটা যদি না পাওয়া যায় তবে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কানাকড়ি মূল্যও নাই। অথচ এই একটা স্বপ্নবিলাসী বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ দিয়ে কাপ্তাইয়ের মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে ১০টা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যেতো। এখানে জ্বালানি লাগতো নদীর স্রোত, যা সারাবছরই কমবেশি থাকতো এই নদীমাতৃক বাংলাদেশে। পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আমি অপ্রয়োজনীয় বলছি না। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা 'ঋণ নিয়ে ঘি কিনে খাওয়া'র মতো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। তবে সেটা তাদের জন্যই প্রযোজ্য যেখানে এর কাঁচামাল ইউরেনিয়ামের খনি বা পর্যাপ্ত জোগান আছে। আমাদের গরীব দেশের বাস্তবতায় স্বপ্নবিলাসী চড়াদামের বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক স্বল্পব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র দরকার। আমাদের সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দরকার, যার কাঁচামাল তথা জ্বালানি আমাদের দেশে পাওয়া যায় বা দেশেই উৎপাদন হয়। অথচ গণহারে নির্মাণ করা হয়েছে সব কয়লা, গ্যাস আর ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। চিন্তা করা হয়নি এর জ্বালানি কোথা থেকে আসবে। অন্য দেশ যদি না দেয় বা সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় তখন কী হবে। কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লার আমদানি না থাকলে, ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেল না পাওয়া গেলে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ না থাকলে বিদ্যুৎ কি হাওয়া-বাতাস থেকে আসবে?
হ্যাঁ, হাওয়া-বাতাস থেকেও তো বিনামূল্যে বিদ্যুৎ আসে। তবে অতীতের মারাত্মক লেভেলের দেশপ্রেমিক দাবিদার রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের লাভের স্বার্থে তারা কোনো উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। বিনামূল্যে পানি থেকেও বিদ্যুৎ আসে, সূর্যের আলো থেকেও বিদ্যুৎ আসে। কিন্তু তারা ওয়াটার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। কারণ, এতে কোনো জ্বালানি লাগে না। যা লাগে তা প্রকৃতি থেকে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কিন্তু তাহলে তো বারবার জ্বালানি আমদানির নামে কেনাকাটায় চরম লাভের ব্যবসাটা আর থাকে না। রাষ্ট্রের টাকা বারবার লুট আর পাচার করার সুযোগটাও তো তবে হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা এসব দুর্বৃত্তদের অর্থনৈতিক লুটপাটের এই জটিল অংকটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তারা বুঝতে চায়ও না। তারা শুধু চায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা।
আপনি জনগণের জন্য বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ টাকা ইউনিট দামে বিদ্যুৎ কিনলেন, নাকি ভারত থেকে বিদ্যুৎ চুরি করে আনলেন, নাকি নিজের কেন্দ্রের টারবাইন চালু রাখতে ৫ টাকা দামের কয়লা-ইউরেনিয়াম আপনি ৫০ টাকায় কিনে বাকি ৪৫ টাকাই আত্মসাৎ করলেন, সেটা দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে চায় না। তারা শুধু নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা চায়। সারা পৃথিবী যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সন্ধানে ব্যস্ত তখন আমরা ব্যস্ত চেতনার সন্ধানে আর বিরোধী মত দমনে। একদল তো চেতনার লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে পালিয়েছে। কিন্তু কথা হলো- ফ্যাসিস্ট, লুটেরা, গণহত্যাকারী যাকে বলা হয় সেই শেখ হাসিনার সরকার যদি নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারে তাহলে আপনারা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার হয়ে সেটা পারছেন না কেন? জনগণ এই প্রশ্নটা খুব ভালোভাবেই বোঝে। এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি ভূগোল অর্থনীতি বুঝিয়ে, জিডিপি বুঝিয়ে, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি বা হরমুজ প্রণালী বুঝিয়ে কিংবা পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। সরকারে থাকলে সব ব্যর্থতার দায় আপনাদের নিতেই হবে। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, লেখক, কবি, কলামিস্ট ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ।
বাবুগঞ্জঃ ১২ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।
বিগত ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার আমলে পরীক্ষায় নকল বন্ধ, মেয়েদের উপবৃত্তি, অবৈতনিক শিক্ষা, জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ বেশকিছু সফলতা ছিল বিএনপির। তবে এর বিপরীতে সবচেয়ে বেশি যে কয়েকটা ব্যর্থতার জন্য আজো বিএনপিকে লজ্জিত হতে হয় এরমধ্যে অন্যতম একটা হলো বিদ্যুৎ। সেই আমলে বিদ্যুতের জন্য কানসাট বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের মতো যে লজ্জাজনক ইতিহাস রচিত হয়েছিল এবং সেই ঘটনার জন্য যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী ছিলেন, সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই আবার প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি দিয়ে এবার পূর্ণমন্ত্রী করা হলো! অযোগ্য মানুষকে প্রমোশন দিয়ে দ্বিতীয়বার আগের চেয়েও বড় চেয়ারে বসাতে কতখানি চাটুকারিতা তোষামোদির যোগ্যতা থাকা লাগে জানিনা, তবে এটা জানি সেই একই ব্যক্তির জন্য বিএনপি এবারও বড় বিতর্কের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে যিনি তীব্র জনরোষের মুখে মন্ত্রীত্ব থেকে অপসারিত হয়েছিলেন তাকেই এবার পূর্ণমন্ত্রী বানিয়ে বিএনপি কী কী সাফল্য অর্জন করবে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি যে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ ম্যানেজমেন্টে পুরোপুরি অযোগ্য তার প্রমাণ ইতোমধ্যে তিনি দিয়েছেন। গ্রামে বর্তমানে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতি ২ ঘন্টা পরপর এক থেকে দেড় ঘন্টা বা কোথাও কোথাও এরচেয়ে বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এমনকি রাতের অফ-পিক আওয়ারেও গড়ে ২ থেকে ৩ বার লোডশেডিং হচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ মন্ত্রী বললেন- গ্রামে নাকি লোডশেডিং নাই! বিদ্যুতের লম্বা লম্বা লাইনের জন্য নাকি বিদ্যুৎ ট্রিপ বা ফল্ট করে! এটা কোনো যুক্তি? গ্রামের মানুষ বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে এখন অতিষ্ঠ। সেখানে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া বা গ্যাস-কয়লা সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে কৈফিয়ত দেওয়ার পরিবর্তে তিনি দায় চাপালেন পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের উপরে!
মন্ত্রী হওয়ার পরেই কি মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে যায় নাকি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে ভারসাম্যহীন হলেই তখন তাকে মন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয় সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় এসব অযোগ্য মন্ত্রীদের জন্য বিএনপি এবারও বিতর্কিত হবে, জনবিচ্ছিন্ন হবে এবং বিপদে পড়বে। দেশে এখন তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। ঢাকার অনেক জায়গায় চুলা জ্বলছে না। সিএনজি স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গাড়িতে গ্যাস পাচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় গ্যাসের সামান্য সরবরাহ থাকলেও গ্যাসের চাপ একদম নেই। এদিকে কয়লা মজুদও প্রায় শেষ। বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রায় খালি। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেলের সরবরাহ নেই। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লাচালিত। গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লার সরবরাহ না থাকলে এগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। ভারতীয় কোম্পানি আদানি এবং দেশীয় সামিট গ্রুপকে বিশেষ সু্বিধা দেওয়ার জন্য চড়াদামে কেনা বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন দেশের অর্থনীতির গলার কাঁটা। সরকারের জন্য বিরাট বড় বোঝা। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিগত দিনে পাচার হয়েছে দেশের কোটি কোটি ডলার।
বিগত পতিত সরকারের আমলে এদেশে আমদানি নির্ভর কয়লা, ডিজেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল মূলত একটি দেশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য। আশাকরি সেই দেশটার নাম বলার আর দরকার নেই। সবাই বুঝতে পারছে। অথচ নদীমাতৃক এবং মৌসুমী বায়ুর এই বাংলাদেশে দরকার ছিল বেশি বেশি জলবিদ্যুৎ এবং বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা, যা এদেশে সারাবছর বিনামূল্যে পাওয়া যায়। উন্নত বিশ্বের মতো সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট নির্মাণ করার দরকার ছিল। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে বারবার কাঁচামাল আমদানি করা লাগতো না। তবে সেটা না করার পেছনে মূল রহস্য হলো এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশের বিরাট লাভ হলেও ক্ষতি হতো লুটেরাদের। তারা বারবার এলএনজি, গ্যাস, কয়লা, ডিজেল, ইউরেনিয়াম আমদানির নামে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পাচার করতে পারতো না। এদেশের সকল উন্নয়ন হয় মূলত বড় বড় চোর-ডাকাত, লুটেরাদের লুটপাটে সহায়তা করার জন্য আর কিছু উন্নয়ন প্রদর্শনী করার জন্য। সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের স্বার্থে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কোনো উন্নয়ন হয় না।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম আসে বিদেশ থেকে। সেটা যদি না পাওয়া যায় তবে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কানাকড়ি মূল্যও নাই। অথচ এই একটা স্বপ্নবিলাসী বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ দিয়ে কাপ্তাইয়ের মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে ১০টা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যেতো। এখানে জ্বালানি লাগতো নদীর স্রোত, যা সারাবছরই কমবেশি থাকতো এই নদীমাতৃক বাংলাদেশে। পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আমি অপ্রয়োজনীয় বলছি না। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা 'ঋণ নিয়ে ঘি কিনে খাওয়া'র মতো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। তবে সেটা তাদের জন্যই প্রযোজ্য যেখানে এর কাঁচামাল ইউরেনিয়ামের খনি বা পর্যাপ্ত জোগান আছে। আমাদের গরীব দেশের বাস্তবতায় স্বপ্নবিলাসী চড়াদামের বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক স্বল্পব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র দরকার। আমাদের সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দরকার, যার কাঁচামাল তথা জ্বালানি আমাদের দেশে পাওয়া যায় বা দেশেই উৎপাদন হয়। অথচ গণহারে নির্মাণ করা হয়েছে সব কয়লা, গ্যাস আর ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। চিন্তা করা হয়নি এর জ্বালানি কোথা থেকে আসবে। অন্য দেশ যদি না দেয় বা সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় তখন কী হবে। কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লার আমদানি না থাকলে, ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেল না পাওয়া গেলে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ না থাকলে বিদ্যুৎ কি হাওয়া-বাতাস থেকে আসবে?
হ্যাঁ, হাওয়া-বাতাস থেকেও তো বিনামূল্যে বিদ্যুৎ আসে। তবে অতীতের মারাত্মক লেভেলের দেশপ্রেমিক দাবিদার রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের লাভের স্বার্থে তারা কোনো উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। বিনামূল্যে পানি থেকেও বিদ্যুৎ আসে, সূর্যের আলো থেকেও বিদ্যুৎ আসে। কিন্তু তারা ওয়াটার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। কারণ, এতে কোনো জ্বালানি লাগে না। যা লাগে তা প্রকৃতি থেকে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কিন্তু তাহলে তো বারবার জ্বালানি আমদানির নামে কেনাকাটায় চরম লাভের ব্যবসাটা আর থাকে না। রাষ্ট্রের টাকা বারবার লুট আর পাচার করার সুযোগটাও তো তবে হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা এসব দুর্বৃত্তদের অর্থনৈতিক লুটপাটের এই জটিল অংকটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তারা বুঝতে চায়ও না। তারা শুধু চায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা।
আপনি জনগণের জন্য বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ টাকা ইউনিট দামে বিদ্যুৎ কিনলেন, নাকি ভারত থেকে বিদ্যুৎ চুরি করে আনলেন, নাকি নিজের কেন্দ্রের টারবাইন চালু রাখতে ৫ টাকা দামের কয়লা-ইউরেনিয়াম আপনি ৫০ টাকায় কিনে বাকি ৪৫ টাকাই আত্মসাৎ করলেন, সেটা দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে চায় না। তারা শুধু নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা চায়। সারা পৃথিবী যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সন্ধানে ব্যস্ত তখন আমরা ব্যস্ত চেতনার সন্ধানে আর বিরোধী মত দমনে। একদল তো চেতনার লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে পালিয়েছে। কিন্তু কথা হলো- ফ্যাসিস্ট, লুটেরা, গণহত্যাকারী যাকে বলা হয় সেই শেখ হাসিনার সরকার যদি নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারে তাহলে আপনারা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার হয়ে সেটা পারছেন না কেন? জনগণ এই প্রশ্নটা খুব ভালোভাবেই বোঝে। এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি ভূগোল অর্থনীতি বুঝিয়ে, জিডিপি বুঝিয়ে, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি বা হরমুজ প্রণালী বুঝিয়ে কিংবা পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। সরকারে থাকলে সব ব্যর্থতার দায় আপনাদের নিতেই হবে। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, লেখক, কবি, কলামিস্ট ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ।
বাবুগঞ্জঃ ১২ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০১:৩১
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪৫
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:১১
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:৪৯
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:০৩