
২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০১:৩১
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)
০৬ মে, ২০২৬ ১৬:১৮
০৬ মে, ২০২৬ ১৫:০৪
০৬ মে, ২০২৬ ১৪:৩৯
০৬ মে, ২০২৬ ১৪:২০

০১ মে, ২০২৬ ১৫:৫৭
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:৩৫
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)

১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৪৭
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.