বৃহস্পতিবারের (০৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যাটা অন্যরকম ছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসজুড়ে তখন তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, বন্ধুদের আড্ডা আর অপেক্ষা, কখন মঞ্চে উঠবে প্রিয় ব্যান্ড সহজিয়া। গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল আয়োজিত ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’ অনুষ্ঠানের সেই সন্ধ্যা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় গান, নাচ, উচ্ছ্বাস আর মানবিকতার এক অনন্য মিলনমেলায়।
মঞ্চে সহজিয়া উঠতেই যেন বদলে যায় পুরো পরিবেশ। একে একে পরিবেশিত হতে থাকে তাদের জনপ্রিয় গান। আর প্রিয় গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে মেলাতে শ্রোতারা কখন যে দর্শক থেকে অনুষ্ঠানেরই অংশ হয়ে উঠেছেন, তা বোঝার উপায় ছিল না।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় লোক-রক ব্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠাতা, গীতিকার ও ভোকালিস্ট রাজিব আহমেদ রাজুর গান শুরু হতেই উচ্ছ্বাস যেন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। রাজু ভাইয়ের কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মেলায় শত শত শিক্ষার্থী। কেউ গাইছেন, কেউ নাচছেন, কেউবা মোবাইলের ক্যামেরায় ধরে রাখছেন স্মরণীয় মুহূর্তগুলো। মনে হচ্ছিল, গানটি শুধু মঞ্চে নয়, সেদিন গাওয়া হচ্ছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদয় থেকে।
এরপর আসে ‘বোকা পাখি’, ‘ছোট্ট পাখি’ ও ‘অপেক্ষা’সহ আরও কয়েকটি জনপ্রিয় গান। প্রতিটি গানের সঙ্গে শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস যেন আরও বাড়তে থাকে। পরিচিত সুর আর কথাগুলো ক্যাম্পাসের বাতাসে মিশে তৈরি করে এক আবেগঘন পরিবেশ।
তবে সন্ধ্যাটি শুধু আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সহজিয়ার পক্ষ থেকে একটি গান উৎসর্গ করা হয় ফিলিস্তিনের শিশুদের প্রতি। যুদ্ধের নির্মমতায় যেসব শিশু হারিয়েছে শৈশব, নিরাপত্তা আর স্বাভাবিক জীবনের অধিকার, তাদের স্মরণে গাওয়া সেই গান আনন্দের সন্ধ্যায় এনে দেয় এক গভীর মানবিক অনুভূতি।
একদিকে হাজারো তরুণের কণ্ঠে গান, অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের প্রতি সংহতির বার্তা, সন্ধ্যাটি তাই হয়ে ওঠে একই সঙ্গে আনন্দের এবং অনুভূতির।
সংগীতের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই, এটি মানুষকে একত্র করে। ভাষা, মত কিংবা পরিচয়ের সীমারেখা পেরিয়ে কয়েকটি সুর মানুষকে একই অনুভূতিতে যুক্ত করতে পারে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সন্ধ্যায় সহজিয়া ঠিক সেটিই যেন করে দেখাল।
রাত বাড়ল। মঞ্চের আলো নিভল। ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান শেষ হলো। কিন্তু সহজিয়ার সুর তখনও যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল ক্যাম্পাসের পথে-প্রান্তরে। শিক্ষার্থীদের মুখে হাসি, মনে গানের রেশ আর স্মৃতিতে জমে রইল একটি অসাধারণ সন্ধ্যা।
‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’, শুধু একটি আয়োজন নয়; বরং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্য, সংগীত, বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি ও মানবিকতার এক স্মরণীয় সন্ধ্যার নাম। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নানা পরিবেশনা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আবহে মুখর হয়ে ওঠে কীর্তনখোলা নদীর তীরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এর আগে বিকেল নাগাদ শুরু হয় গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আয়োজনে ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’। নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতা ও উদ্বোধনী গণসংগীত ‘মুক্তিরও মন্দিরও সোপানতলে’র মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। এরপর হাসিবুর রহমানের কণ্ঠে বিদ্রোহী কবিতা এবং ফারিয়া রহমানের আবৃত্তিতে ‘সৃষ্টির মানুষ’ পরিবেশিত হয়।
পরে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজনের উদ্বোধন করেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক আহ্বায়ক সুজয় শুভ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মুখভাগে যখন বিকেলের আয়োজন জমে উঠেছে, তখনই হঠাৎ বৃষ্টি এসে ছন্দপতন ঘটায়। তবে বৃষ্টি দমাতে পারেনি তরুণদের। উপায়ান্ত না দেখে আয়োজক ও শিক্ষার্থীরা দ্রুত মঞ্চ সরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারের মেঝেতে নতুন করে মঞ্চ তৈরির উদ্যোগ নেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বদলে যায় আয়োজনের স্থান।
মঞ্চ সরানোর সেই কাজে শুধু আয়োজক বা শিক্ষার্থীরাই নন, সাংবাদিক মানজুর আল মতিনকেও হাত লাগাতে দেখা যায়। তারুণ্যের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে ভিন্ন এক মাত্রা দেয়।
নতুন মঞ্চে আয়োজন শুরুর পর সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন লেখক ও গবেষক মাহাতাব উদ্দিন, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার সরকার এবং আইনজীবী ও সাংবাদিক মানজুর আল মতিন। তাদের আলোচনায় উঠে আসে তরুণ প্রজন্ম, সমাজ, সংস্কৃতি ও সমকালীন নানা প্রসঙ্গ।
আলোচনা শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। কল্পনা চাকমার কণ্ঠে কোরাস গান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোরাস আবৃত্তি আসর দর্শকদের মধ্যে তৈরি করে অন্যরকম আবহ। শাকিরা বিনতে সাঈদের পরিবেশনা ‘ও যে মানে না মানা’ও ছিল প্রশংসনীয়।
তবে সন্ধ্যার অন্যতম প্রশান্তিময় মুহূর্ত হয়ে ওঠে হনুফা আহমেদের কণ্ঠে ‘জাত গেল বলে’ গানটি। তার পরিবেশনায় উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় গভীর মনোযোগ ও মুগ্ধতা।
এরপর একে একে মঞ্চে আসেন অরূপ শিকদার, পূর্ণা বচনিকা, অর্জিত ও প্রিয়রত্না। তাদের গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। জারিনের কণ্ঠে ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’ এবং শ্রেয়ার রবীন্দ্রসংগীতেও মুগ্ধ হন দর্শকরা।
গালিবের ‘হার কালা করলা রে...’ গানটিও ছিল বেশ উপভোগ্য। শাওনও নিজের পরিবেশনায় দর্শকদের জন্য উপহার দেন একটি চমৎকার গান।
আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ ছিল আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নৃত্য পরিবেশনা। তাদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের ছন্দে কীর্তনখোলা নদীতীরের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ যেন আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এই উপস্থাপন পুরো আয়োজনের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দেয়।
সবশেষে মঞ্চ মাতাতে আসে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যান্ড ‘রিটেক’। তাদের পরিবেশনার পর অপেক্ষা ছিল ‘সহজিয়া’র জন্য। জনপ্রিয় এই ব্যান্ড মঞ্চে আসার আগেই রিটেকের পরিবেশনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। পরে সহজিয়ার সুরে রাত আরও গভীর হয়, আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে পুরো প্রাঙ্গণে।
পুরো আয়োজনের সঞ্চালনায় ছিলেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের উদীয়মান নেতৃত্ব ভূমিকা সরকার। তার সাবলীল উপস্থাপনায় বিকেল থেকে রাতের পুরো অনুষ্ঠান এগিয়ে যায় প্রাণবন্ত গতিতে।
বৃষ্টির বাধা, মঞ্চ বদলের তাড়াহুড়ো, স্বেচ্ছাশ্রম, আলোচনা, আবৃত্তি, গান, নৃত্য আর ব্যান্ডের সুর, সবকিছু মিলিয়ে ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’ শেষ পর্যন্ত কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের নিজেদের মতো করে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সৃজনশীলতাকে উদ্যাপনের এক অনন্য আয়োজন।
কীর্তনখোলার বাতাসে যখন শেষ রাতের সুর মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখনও যেন থেকে যাচ্ছিল একটি বার্তা—তারুণ্য শুধু উচ্ছ্বাসের নাম নয়; প্রয়োজনের মুহূর্তে একসঙ্গে দাঁড়ানোর, সংস্কৃতিকে ধারণ করার এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখারও নাম তারুণ্য।
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।

২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:২৭
আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের ৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিকের পরিবারে সন্তান ৫৮ জন। চার স্ত্রী ও এতগুলো সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। অভাবের কারণে পরিবারের কিছু শিশুকে কখনো কখনো ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়। বিশাল এই পরিবারের খাবার, পোশাক ও শিক্ষার খরচ জোগাতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাকে।
খামা প্রেস এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, নিজের পরিবারের ভরণপোষণের কঠিন বাস্তবতা নিয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন সাদিক। তিনি জানান, সন্তানদের সবার নাম মনে রাখাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কখনো পরিবারের সবাইকে নিয়ে খাওয়ার সময় সন্তানদের গুনে দেখতে হয়। তখন দেখা যায়, কেউ একজন অনুপস্থিত—হয়তো সে অন্য কোথাও রয়েছে। দীর্ঘ সময়ে তার ও স্ত্রীদের ১৪ সন্তান মারা গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাদিক স্থানীয় একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তার ভাষ্য, একটি গাড়ি বিক্রি হলে তিনি প্রায় এক হাজার আফগানি আয় করেন। এই সামান্য আয়ে পরিবারের এত সদস্যের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। সংসারের খরচ মেটাতে তার কয়েকজন সন্তানকেও কাজ করতে হয়। তাদের কেউ কেউ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাগজ ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করে।
পরিবারে সাধারণত দিনে দুই বেলা খাবার তৈরি হয়—সকালের নাশতা ও রাতের খাবার। দুই স্ত্রী রান্নার দায়িত্ব সামলান। শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন, আর গ্রীষ্মে বসেন উঠানে। ঘুমানোর ব্যবস্থাও অত্যন্ত সীমিত। কখনো ছয়-সাতজনকে একটি পাতলা কম্বল ভাগাভাগি করে রাত কাটাতে হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে পরিবারটির বসবাসের অপ্রতুল পরিবেশের চিত্র উঠে এসেছে। বাড়ির ঘরগুলোতে প্রচলিত দরজা-জানালার পরিবর্তে পাতলা পর্দা ব্যবহার করা হয়। গোসলের স্থানেই কাপড় ও থালাবাসন ধোয়ার কাজ চলে; কখনো সেটি শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সাদিক। তবে অর্থের অভাবে তাদের পড়াশোনার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাদিক জানান, বড় পরিবার গড়ার পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। কিন্তু এত সন্তানকে নিয়ে দৈনন্দিন জীবনে নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখেও পড়তে হয় তাকে।
একবার বিয়ের অনুষ্ঠানে এক ধর্মীয় নেতার কাছে এক মেয়ের পরিবর্তে অন্য মেয়ের নাম বলে ফেলেন তিনি। অনেক সময় সন্তানের নাম মনে করতে না পেরে তাদের ‘আমার ছেলে’ কিংবা ‘আমার সন্তান’ বলে ডাকেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাদিকের চার স্ত্রী যখন তাকে বিয়ে করেন, তখন তাদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। প্রথম বিয়ের সময় সাদিকের বয়স ছিল ২০ বছর। প্রতিটি বিয়ের আগে কনের বিয়ের মূল্য বা দেনমোহরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে তাকে দীর্ঘ সময় সঞ্চয় করতে হয়েছে।
সাদিকের পরিবারের ঘটনা অল্প বয়সে বিয়ে এবং কৈশোরে গর্ভধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে। অল্প বয়সে গর্ভধারণ মেয়েদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে, ঘন ঘন গর্ভধারণ মায়েদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এসব ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সাদিক নিজেও পড়তে বা লিখতে পারেন না। পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে তিনি সরকার, ত্রাণ সংস্থা এবং ব্যবসায়ীদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন।
তার প্রত্যাশা, সন্তানরা যেন শিক্ষার সুযোগ পায় এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য অন্তত পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। বিশাল পরিবার নিয়ে তার এই সংগ্রাম আফগানিস্তানের দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও শিক্ষাবঞ্চনার কঠিন বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
সূত্র: খামা প্রেস এজেন্সি ও বিবিসির প্রতিবেদন।
আফগানিস্তানের উরুজগান প্রদেশের ৫৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ সাদিকের পরিবারে সন্তান ৫৮ জন। চার স্ত্রী ও এতগুলো সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। অভাবের কারণে পরিবারের কিছু শিশুকে কখনো কখনো ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হয়। বিশাল এই পরিবারের খাবার, পোশাক ও শিক্ষার খরচ জোগাতে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তাকে।
খামা প্রেস এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, নিজের পরিবারের ভরণপোষণের কঠিন বাস্তবতা নিয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেছেন সাদিক। তিনি জানান, সন্তানদের সবার নাম মনে রাখাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কখনো পরিবারের সবাইকে নিয়ে খাওয়ার সময় সন্তানদের গুনে দেখতে হয়। তখন দেখা যায়, কেউ একজন অনুপস্থিত—হয়তো সে অন্য কোথাও রয়েছে। দীর্ঘ সময়ে তার ও স্ত্রীদের ১৪ সন্তান মারা গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাদিক স্থানীয় একটি গাড়ির শোরুমে কাজ করেন। তার ভাষ্য, একটি গাড়ি বিক্রি হলে তিনি প্রায় এক হাজার আফগানি আয় করেন। এই সামান্য আয়ে পরিবারের এত সদস্যের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। সংসারের খরচ মেটাতে তার কয়েকজন সন্তানকেও কাজ করতে হয়। তাদের কেউ কেউ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাগজ ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করে।
পরিবারে সাধারণত দিনে দুই বেলা খাবার তৈরি হয়—সকালের নাশতা ও রাতের খাবার। দুই স্ত্রী রান্নার দায়িত্ব সামলান। শীতকালে পরিবারের সদস্যরা ঘরের ভেতরে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন, আর গ্রীষ্মে বসেন উঠানে। ঘুমানোর ব্যবস্থাও অত্যন্ত সীমিত। কখনো ছয়-সাতজনকে একটি পাতলা কম্বল ভাগাভাগি করে রাত কাটাতে হয়।
বিবিসির প্রতিবেদনে পরিবারটির বসবাসের অপ্রতুল পরিবেশের চিত্র উঠে এসেছে। বাড়ির ঘরগুলোতে প্রচলিত দরজা-জানালার পরিবর্তে পাতলা পর্দা ব্যবহার করা হয়। গোসলের স্থানেই কাপড় ও থালাবাসন ধোয়ার কাজ চলে; কখনো সেটি শৌচাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন সাদিক। তবে অর্থের অভাবে তাদের পড়াশোনার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সাদিক জানান, বড় পরিবার গড়ার পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুসারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা। কিন্তু এত সন্তানকে নিয়ে দৈনন্দিন জীবনে নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখেও পড়তে হয় তাকে।
একবার বিয়ের অনুষ্ঠানে এক ধর্মীয় নেতার কাছে এক মেয়ের পরিবর্তে অন্য মেয়ের নাম বলে ফেলেন তিনি। অনেক সময় সন্তানের নাম মনে করতে না পেরে তাদের ‘আমার ছেলে’ কিংবা ‘আমার সন্তান’ বলে ডাকেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাদিকের চার স্ত্রী যখন তাকে বিয়ে করেন, তখন তাদের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। প্রথম বিয়ের সময় সাদিকের বয়স ছিল ২০ বছর। প্রতিটি বিয়ের আগে কনের বিয়ের মূল্য বা দেনমোহরের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে তাকে দীর্ঘ সময় সঞ্চয় করতে হয়েছে।
সাদিকের পরিবারের ঘটনা অল্প বয়সে বিয়ে এবং কৈশোরে গর্ভধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে। অল্প বয়সে গর্ভধারণ মেয়েদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অন্যদিকে, ঘন ঘন গর্ভধারণ মায়েদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এসব ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
সাদিক নিজেও পড়তে বা লিখতে পারেন না। পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত খাবার ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে তিনি সরকার, ত্রাণ সংস্থা এবং ব্যবসায়ীদের কাছে সহায়তা চেয়েছেন।
তার প্রত্যাশা, সন্তানরা যেন শিক্ষার সুযোগ পায় এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য অন্তত পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। বিশাল পরিবার নিয়ে তার এই সংগ্রাম আফগানিস্তানের দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও শিক্ষাবঞ্চনার কঠিন বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
সূত্র: খামা প্রেস এজেন্সি ও বিবিসির প্রতিবেদন।

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:৫৫
সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ এবং মসজিদের পবিত্রতা ও মর্যাদা লঙ্ঘনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) মক্কা অঞ্চলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার। সৌদিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আজেল নিউজের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজে’ জড়িত থাকার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাদের আটক করে। পরে তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়।
বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সংশ্লিষ্ট আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। অপরাধের গুরুত্ব এবং সময় ও স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সাজা দেওয়া হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখে এবং সাজা কার্যকরের জন্য রাজকীয় আদেশ জারি করা হয়।
তবে ঠিক কী ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি আইন বাস্তবায়নে সৌদি সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও আজেল নিউজ।
সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজ’ এবং মসজিদের পবিত্রতা ও মর্যাদা লঙ্ঘনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) মক্কা অঞ্চলে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জানিয়েছে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নাজেরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতার। সৌদিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আজেল নিউজের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক কাজে’ জড়িত থাকার অভিযোগে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী তাদের আটক করে। পরে তদন্ত শেষে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়।
বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সংশ্লিষ্ট আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। অপরাধের গুরুত্ব এবং সময় ও স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সাজা দেওয়া হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখে এবং সাজা কার্যকরের জন্য রাজকীয় আদেশ জারি করা হয়।
তবে ঠিক কী ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামি আইন বাস্তবায়নে সৌদি সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও আজেল নিউজ।

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ ২০:৩৭
স্ত্রী অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে চলে গেছেন—এমন দাবি করে ভারতের হরিদ্বারে একটি মোবাইল টাওয়ারে উঠে বসেন এক যুবক। স্ত্রীকে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত নিচে নামবেন না বলে জানান তিনি। তাঁকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতে নিজেই টাওয়ার থেকে নেমে আসেন ওই যুবক।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার জেলার শিবালিক নগরে এ ঘটনা ঘটে। স্ত্রী অন্য একজনের সঙ্গে পালিয়ে হরিদ্বারে চলে গেছেন বলে জানতে পেরে সেখানে ছুটে যান ওই যুবক। একপর্যায়ে তিনি উঠে পড়েন এলাকার একটি মোবাইল টাওয়ারে।
বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তাঁরা যুবককে নিচে নামানোর চেষ্টা করেন। তবে নানা অনুরোধেও তিনি রাজি হননি। টাওয়ারের ওপর থেকে যুবক দাবি করেন, তাঁর স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্ত্রীকে ফিরিয়ে না দিলে তিনি নিচে নামবেন না বলেও জানান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে খবর দেওয়া হয় পুলিশে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে নিরাপদে নিচে নামানোর উদ্যোগ নেয়। তবে পুলিশের প্রাথমিক চেষ্টাও সফল হয়নি। নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে স্ত্রী না আসা পর্যন্ত টাওয়ার থেকে নামতে অস্বীকৃতি জানান ওই যুবক।
এ অবস্থায় পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাঁকে শান্ত করার পাশাপাশি নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও টাওয়ারের ওপর অবস্থান করছিলেন তিনি। পরে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামার সময় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘ সময় পর ওই যুবক নিজেই টাওয়ার থেকে নেমে আসেন।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ভূপি পাওয়ার’ নামের একটি এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডল থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছে। এরই মধ্যে ভিডিওটি বহু মানুষের নজরে এসেছে।
স্ত্রী অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে চলে গেছেন—এমন দাবি করে ভারতের হরিদ্বারে একটি মোবাইল টাওয়ারে উঠে বসেন এক যুবক। স্ত্রীকে ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত নিচে নামবেন না বলে জানান তিনি। তাঁকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। পরে পুলিশ ও প্রশাসনের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতে নিজেই টাওয়ার থেকে নেমে আসেন ওই যুবক।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার জেলার শিবালিক নগরে এ ঘটনা ঘটে। স্ত্রী অন্য একজনের সঙ্গে পালিয়ে হরিদ্বারে চলে গেছেন বলে জানতে পেরে সেখানে ছুটে যান ওই যুবক। একপর্যায়ে তিনি উঠে পড়েন এলাকার একটি মোবাইল টাওয়ারে।
বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তাঁরা যুবককে নিচে নামানোর চেষ্টা করেন। তবে নানা অনুরোধেও তিনি রাজি হননি। টাওয়ারের ওপর থেকে যুবক দাবি করেন, তাঁর স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনতে হবে। স্ত্রীকে ফিরিয়ে না দিলে তিনি নিচে নামবেন না বলেও জানান।
পরিস্থিতি সামাল দিতে খবর দেওয়া হয় পুলিশে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে নিরাপদে নিচে নামানোর উদ্যোগ নেয়। তবে পুলিশের প্রাথমিক চেষ্টাও সফল হয়নি। নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে স্ত্রী না আসা পর্যন্ত টাওয়ার থেকে নামতে অস্বীকৃতি জানান ওই যুবক।
এ অবস্থায় পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাঁকে শান্ত করার পাশাপাশি নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও টাওয়ারের ওপর অবস্থান করছিলেন তিনি। পরে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামার সময় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘ সময় পর ওই যুবক নিজেই টাওয়ার থেকে নেমে আসেন।
এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ভূপি পাওয়ার’ নামের একটি এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডল থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছে। এরই মধ্যে ভিডিওটি বহু মানুষের নজরে এসেছে।

০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:২৯
বৃহস্পতিবারের (০৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যাটা অন্যরকম ছিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসজুড়ে তখন তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, বন্ধুদের আড্ডা আর অপেক্ষা, কখন মঞ্চে উঠবে প্রিয় ব্যান্ড সহজিয়া। গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল আয়োজিত ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’ অনুষ্ঠানের সেই সন্ধ্যা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় গান, নাচ, উচ্ছ্বাস আর মানবিকতার এক অনন্য মিলনমেলায়।
মঞ্চে সহজিয়া উঠতেই যেন বদলে যায় পুরো পরিবেশ। একে একে পরিবেশিত হতে থাকে তাদের জনপ্রিয় গান। আর প্রিয় গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাতে মেলাতে শ্রোতারা কখন যে দর্শক থেকে অনুষ্ঠানেরই অংশ হয়ে উঠেছেন, তা বোঝার উপায় ছিল না।
বাংলাদেশের জনপ্রিয় লোক-রক ব্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠাতা, গীতিকার ও ভোকালিস্ট রাজিব আহমেদ রাজুর গান শুরু হতেই উচ্ছ্বাস যেন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। রাজু ভাইয়ের কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মেলায় শত শত শিক্ষার্থী। কেউ গাইছেন, কেউ নাচছেন, কেউবা মোবাইলের ক্যামেরায় ধরে রাখছেন স্মরণীয় মুহূর্তগুলো। মনে হচ্ছিল, গানটি শুধু মঞ্চে নয়, সেদিন গাওয়া হচ্ছিল পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদয় থেকে।
এরপর আসে ‘বোকা পাখি’, ‘ছোট্ট পাখি’ ও ‘অপেক্ষা’সহ আরও কয়েকটি জনপ্রিয় গান। প্রতিটি গানের সঙ্গে শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস যেন আরও বাড়তে থাকে। পরিচিত সুর আর কথাগুলো ক্যাম্পাসের বাতাসে মিশে তৈরি করে এক আবেগঘন পরিবেশ।
তবে সন্ধ্যাটি শুধু আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সহজিয়ার পক্ষ থেকে একটি গান উৎসর্গ করা হয় ফিলিস্তিনের শিশুদের প্রতি। যুদ্ধের নির্মমতায় যেসব শিশু হারিয়েছে শৈশব, নিরাপত্তা আর স্বাভাবিক জীবনের অধিকার, তাদের স্মরণে গাওয়া সেই গান আনন্দের সন্ধ্যায় এনে দেয় এক গভীর মানবিক অনুভূতি।
একদিকে হাজারো তরুণের কণ্ঠে গান, অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের প্রতি সংহতির বার্তা, সন্ধ্যাটি তাই হয়ে ওঠে একই সঙ্গে আনন্দের এবং অনুভূতির।
সংগীতের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই, এটি মানুষকে একত্র করে। ভাষা, মত কিংবা পরিচয়ের সীমারেখা পেরিয়ে কয়েকটি সুর মানুষকে একই অনুভূতিতে যুক্ত করতে পারে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই সন্ধ্যায় সহজিয়া ঠিক সেটিই যেন করে দেখাল।
রাত বাড়ল। মঞ্চের আলো নিভল। ধীরে ধীরে অনুষ্ঠান শেষ হলো। কিন্তু সহজিয়ার সুর তখনও যেন ভেসে বেড়াচ্ছিল ক্যাম্পাসের পথে-প্রান্তরে। শিক্ষার্থীদের মুখে হাসি, মনে গানের রেশ আর স্মৃতিতে জমে রইল একটি অসাধারণ সন্ধ্যা।
‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’, শুধু একটি আয়োজন নয়; বরং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্য, সংগীত, বন্ধুত্ব, সংস্কৃতি ও মানবিকতার এক স্মরণীয় সন্ধ্যার নাম। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত নানা পরিবেশনা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আবহে মুখর হয়ে ওঠে কীর্তনখোলা নদীর তীরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
এর আগে বিকেল নাগাদ শুরু হয় গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আয়োজনে ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’। নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতা ও উদ্বোধনী গণসংগীত ‘মুক্তিরও মন্দিরও সোপানতলে’র মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। এরপর হাসিবুর রহমানের কণ্ঠে বিদ্রোহী কবিতা এবং ফারিয়া রহমানের আবৃত্তিতে ‘সৃষ্টির মানুষ’ পরিবেশিত হয়।
পরে আনুষ্ঠানিকভাবে আয়োজনের উদ্বোধন করেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক আহ্বায়ক সুজয় শুভ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মুখভাগে যখন বিকেলের আয়োজন জমে উঠেছে, তখনই হঠাৎ বৃষ্টি এসে ছন্দপতন ঘটায়। তবে বৃষ্টি দমাতে পারেনি তরুণদের। উপায়ান্ত না দেখে আয়োজক ও শিক্ষার্থীরা দ্রুত মঞ্চ সরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারের মেঝেতে নতুন করে মঞ্চ তৈরির উদ্যোগ নেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বদলে যায় আয়োজনের স্থান।
মঞ্চ সরানোর সেই কাজে শুধু আয়োজক বা শিক্ষার্থীরাই নন, সাংবাদিক মানজুর আল মতিনকেও হাত লাগাতে দেখা যায়। তারুণ্যের এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে ভিন্ন এক মাত্রা দেয়।
নতুন মঞ্চে আয়োজন শুরুর পর সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন লেখক ও গবেষক মাহাতাব উদ্দিন, বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার সরকার এবং আইনজীবী ও সাংবাদিক মানজুর আল মতিন। তাদের আলোচনায় উঠে আসে তরুণ প্রজন্ম, সমাজ, সংস্কৃতি ও সমকালীন নানা প্রসঙ্গ।
আলোচনা শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব। কল্পনা চাকমার কণ্ঠে কোরাস গান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোরাস আবৃত্তি আসর দর্শকদের মধ্যে তৈরি করে অন্যরকম আবহ। শাকিরা বিনতে সাঈদের পরিবেশনা ‘ও যে মানে না মানা’ও ছিল প্রশংসনীয়।
তবে সন্ধ্যার অন্যতম প্রশান্তিময় মুহূর্ত হয়ে ওঠে হনুফা আহমেদের কণ্ঠে ‘জাত গেল বলে’ গানটি। তার পরিবেশনায় উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় গভীর মনোযোগ ও মুগ্ধতা।
এরপর একে একে মঞ্চে আসেন অরূপ শিকদার, পূর্ণা বচনিকা, অর্জিত ও প্রিয়রত্না। তাদের গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। জারিনের কণ্ঠে ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’ এবং শ্রেয়ার রবীন্দ্রসংগীতেও মুগ্ধ হন দর্শকরা।
গালিবের ‘হার কালা করলা রে...’ গানটিও ছিল বেশ উপভোগ্য। শাওনও নিজের পরিবেশনায় দর্শকদের জন্য উপহার দেন একটি চমৎকার গান।
আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ ছিল আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নৃত্য পরিবেশনা। তাদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের ছন্দে কীর্তনখোলা নদীতীরের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ যেন আরও বর্ণিল হয়ে ওঠে। বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এই উপস্থাপন পুরো আয়োজনের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দেয়।
সবশেষে মঞ্চ মাতাতে আসে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যান্ড ‘রিটেক’। তাদের পরিবেশনার পর অপেক্ষা ছিল ‘সহজিয়া’র জন্য। জনপ্রিয় এই ব্যান্ড মঞ্চে আসার আগেই রিটেকের পরিবেশনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। পরে সহজিয়ার সুরে রাত আরও গভীর হয়, আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে পুরো প্রাঙ্গণে।
পুরো আয়োজনের সঞ্চালনায় ছিলেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিলের উদীয়মান নেতৃত্ব ভূমিকা সরকার। তার সাবলীল উপস্থাপনায় বিকেল থেকে রাতের পুরো অনুষ্ঠান এগিয়ে যায় প্রাণবন্ত গতিতে।
বৃষ্টির বাধা, মঞ্চ বদলের তাড়াহুড়ো, স্বেচ্ছাশ্রম, আলোচনা, আবৃত্তি, গান, নৃত্য আর ব্যান্ডের সুর, সবকিছু মিলিয়ে ‘পলাশ কুঁড়ি অভিষেক ৩.০’ শেষ পর্যন্ত কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের নিজেদের মতো করে সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সৃজনশীলতাকে উদ্যাপনের এক অনন্য আয়োজন।
কীর্তনখোলার বাতাসে যখন শেষ রাতের সুর মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখনও যেন থেকে যাচ্ছিল একটি বার্তা—তারুণ্য শুধু উচ্ছ্বাসের নাম নয়; প্রয়োজনের মুহূর্তে একসঙ্গে দাঁড়ানোর, সংস্কৃতিকে ধারণ করার এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখারও নাম তারুণ্য।
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৩:৪৩
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৩৮
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:১৫
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৩৩