
২৯ মে, ২০২৫ ১৬:১৬
রাজনীতির মাঠে উভয়েই ক্লিন ইমেজের এবং সৎ-স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হিসেবে সমাধিক পরিচিত। বিপরিতে উভয়ে বরিশালের স্থানীয় রাজনীতিতে স্বল্পসময়ে পেয়েছেন বেশ জনপ্রিয়তা, প্রসংশিত হয়েছেন, হচ্ছেন আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডে। ক্ষমতাসীন আ’লীগ ঘরনার রাজনৈতিক এবং জনপ্রতিনিধি হলেও উন্নয়ন কর্মকান্ডের বদৌলতে তাদের এই দলের বাইরেও রয়েছে সুনাম। এতক্ষণ যাদের কথা বলছিলাম, তাদের একজন বরিশাল সদর আসনের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) জাহিদ ফারুক শামীম, অপরজন বরিশাল সিটির নবনির্বাচিত মেয়র আবুল খায়ের ওরফে খোকন সেরনিয়বাত। নয়া এই মেয়র এখন পর্যন্ত বিসিসির দায়িত্বভার গ্রহণ না করলেও তার ওপর বরিশালবাসী যে আস্থা রেখেছে, তার প্রমাণ ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। ১২ জুন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পঞ্চম মেয়াদের নির্বাচনে তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে জনগণ।
খোকন সেরনিয়াবাতকে ভোটে নির্বাচিত করতে নেপথ্য কারিগর যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন বরিশাল সদর আসনের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনসহ সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৫ আসনে জনপ্রতিনিধি তিনি। খোকন সেরনিয়াবাতকে নিয়ে ভোটের মাঠে নামার আগে এবং জয়লাভের পর উভয় জনপ্রতিনিধির সম্পর্কের কোনো ঘাটতি নেই। বরং তারা অভিন্ন মেরুতেই অবস্থান করছেন। তারা দুজনেই নির্বাচন পূর্বাপর স্থানীয় বাসিন্দাদের বারংবার অঙ্গীকার করে আসছেন, বরিশাল হবে চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, মাদকসহ ‘রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত একটি শহর’। তাদের এই প্রতিশ্রুতির প্রতি বরিশাল শহরবাসীর যে আস্থা আছে, তার প্রমাণ ১২ জুনে ভোটে পেয়েছেন। এবং বিপরিতে কর্নেল-খোকন তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অভীষ্ট লক্ষে এগিয়ে চলছেন, কী ভাবে সন্ত্রাসমুক্ত বরিশাল নগরী গড়ে তোলা যায়।
যদিও ইতিমধ্যে উভয় জনপ্রতিনিধিই ঘোষণা দিয়েছেন এবং নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রতিশ্রুতি ছিল তিনি ‘নতুন বরিশাল’ গড়বেন। জনপ্রতিনিধির ওই আশ্বাস শহরবাসীর মনে আস্থা জুগিয়েছে, বেড়েছে নাগরিক প্রত্যাশাও।
কারণ এমপি জাহিদ ফারুক শামীম তাঁর আওতাধীন এলাকাসমূহ অর্থাৎ সদর উপজেলার ভাঙনরোধসহ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে যথেষ্ট ভুমিকা রাখলেও প্রভাবশালী একটি মহলের বাধায় বরিশাল নগর উন্নয়নে ইচ্ছা এবং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো কাজ করতে পারেননি। এনিয়ে প্রতিমন্ত্রীকে আলোচনার প্রাক্কালে ক্ষেত্র বিশেষ আফসোস করতেও শোনা যায়। বছর দুয়েক পূর্বে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শহর অভ্যন্তরের ফুসফুস খ্যাত ৬টি খাল সংরক্ষণ করাসহ পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নিলে সিটি কর্পোরেশনের বাধায় তা আটকে যায়।
অথচ শহরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অন্তত শহর অভ্যন্তরের খালগুলো সংরক্ষণ করে যেনো নগরকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা হয়। এনিয়ে সাবেক সফল সিটি মেয়র শওকত হোসেনের বেশ উদ্যোগও ছিল, কিন্তু তার মৃত্যুর পর বরিশাল সিটির তৃতীয় পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি নেতা আহসান হাবিব কামাল মেয়র নির্বাচিত হলে, তিনিও খাল উদ্ধারে তেমন কোনো ভুমিকা রাখেননি। এরপর চতুর্থ পরিষদ নির্বাচনে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র নির্বাচিত হলে তিনিও খালগুলো উদ্ধারে ভূমিকা রাখেননি, বা রাখতে পারেননি। যদিও সিটি কর্পোরেশনের তরফে মাসছয়েক আগেও বলা হচ্ছিল, শহর অভ্যন্তরের খালগুলো উদ্ধারে প্রকল্প চলমান আছে, কিন্তু এই বলাবলির মধ্যে মেয়র সাদিকে মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। আর মাত্র তিন মাস পরেই তাঁর আপন চাচা খায়ের আব্দুল্লাহ সিটির মসনদে বসবেন।
নাগরিক সমাজের ভাষ্য হচ্ছে, যেহেতু এমপি জাহিদ ফারুক শামীম বরিশাল শহর উন্নয়ন প্রশ্নে আন্তরিক আছেন এবং নতুন মেয়র খোকন সেরনিয়বাতেরও অঙ্গীকার আছে, সেক্ষেত্রে আগামীতে উভয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় জলাবদ্ধতা দূরিকরণে সমাধান আসছে এটা বলার অপেক্ষা নেই। সৎ-স্বচ্ছ এবং ক্লিন ইমেজের এই দুই জনপ্রতিনিধি আগামীতে যে ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার অঙ্গীকার করছেন, তাও বাস্তবায়নের কিছু আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু এখন নগরবাসীর মধ্যে যে প্রশ্ন বেশি ভার সেটি হচ্ছে, জনপ্রতিনিধিদ্বয় টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, মাদক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত ‘নতুন বরিশাল’ গড়তে কতটা সফল হবেন? এবং বরিশালে বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয়ে দখল-পাল্টা দখলের যে উৎসব চলছে! তা নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করছেন, না কী করবেন।
বলা বাহুল্য যে, বিগত সময়ে বরিশাল শহর উন্নয়ন অপেক্ষা সন্ত্রাসীদের উৎপাত বেশি লক্ষ্যণীয় ছিল। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে একটি অংশ নিজের আখের গুছিয়েছে, দেখিয়েছে ত্রাস, ক্যাডাভিত্তিক সন্ত্রাসের ভয়ে বলতে গেলো তটস্থ ছিল বরিশালবাসী। ভয়ে মুখ না খুললেন, আশায় ছিল পরিবর্তনের। আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ বরিশাল সিটিতে আ’লীগ মনোনীত প্রার্থী হয়ে আসলে নগরবাসী সুবর্ন সুযোগটি লুফে নেয়, ভোট দিয়ে তাকে নগরপিতার আসনে বসিয়েছেন। কিন্তু শহরবাসীর অতীত রাজনৈতিক সন্ত্রাসের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে, যা কিছুটা হলেও ভুলতে চান প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের দৌত নগর উন্নয়নে।
অভিজ্ঞমহলের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হচ্ছে, অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে ‘ক্যাডারভিত্তিক’ রাজনীতি করে কোনো জনপ্রতিনিধি তাদের চেয়ার বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি, যার প্রমাণ ইতিমধ্যে বরিশালের মানুষ পেয়েছেন। কিন্তু এরপরেও সুযোগ-সন্ধানী একটি অংশ থাকে তারা সার্বক্ষণিক নিজেস্ব স্বার্থ সংরক্ষণের ধান্দায় ব্যস্ত, এরাই মূলত সমাজ এবং রাজনীতির বিষফোঁড়া। তাদের অবস্থান বিগত সময়েও বিদ্যমান ছিল, এখনও আছে। যার দরুণ অনেকে ক্লিন ইমেজের জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং খোকন সেরনিয়াবাতের দিতে আঙ্গুল তুলতে সাহস দেখাবেন। আবার দলীয় ঘরানার বিরোধীরা পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখছেন এবং হাসছেন, কেউ কেউ দিচ্ছেন উস্কানিও।
রাজনৈতিক বোদ্ধাদের অভিমত হচ্ছে, স্বচ্ছ-সৎ মানসিকতার জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং খোকনকে বিতর্কিত করতে দলীয় ঘরানার একটি অংশ মরিয়া হয়ে আছে। তারা সর্বদা চাইছেন কোনো কোনো ইস্যু তৈরি করে এই দুজনকে কী ভাবে ঝামেলায় মধ্যে ফেলা যায়। এসব বিষয় নিয়ে বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে চায়ের দোকানে চর্চা শোনা যাচ্ছে। ফলে উভয় রাজনৈতিকের লক্ষ্য-উদ্দেশ হবে নিজেদের সতর্কতার সাথে পথা চলা এবং কর্মী-সমর্থকদের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং কোনো প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখা। কারণ তারা প্রতিমন্ত্রী ও নয়া মেয়রের ইমেজ যে কোনো সময় ম্লান করে দিতে পারে বিতর্কিত কর্মকান্ডের মধ্যদিয়ে। এক্ষেত্রে তাদের ওপর বিশেষ খেয়াল দিতে হবে, যারা দল বদল করে বিএনপি-জামায়াত থেকে এসেছে।
মহলটি বলছেন, সিটি নির্বাচনের মাসখানেক আগে থেকে বর্তমান সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ অনেকটা অন্তর্ধানে চলে যাওয়ার পরে বরিশালে ক্ষমতাসী দলের নেতাকর্মীদের সৃষ্ট বেশ কয়েকটি ঘটনা বিশেষ করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান-ঘাট-বাজার দখল, চাঁদাবাজি এবং মারামারিতে রক্তপাত নেতিবাচক রাজনীতি জানান দিচ্ছে, যা এমপি বা নতুন মেয়র কেউ সমর্থন করেন না। কিন্তু তারপরেও একের পর এক এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে, অনুঘটকরা জনপ্রতিনিধিদের নাম সামনে রেখে এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করায় ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় নিতেও সাহস পাচ্ছেন না। আবার জনপ্রতিনিধিরাই মিডিয়ার সামনে আনুষ্ঠানিক বলছেন, দখলবাজ বা সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, বরিশালে গত দুই মাসে যে দখল পাল্টা দখলের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তা কী ভিত্তিহীন বা অবান্তর? আবার যারা এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড যারা করছেন তারা কী আইনে উর্ধ্বে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করছে না (!)
এক্ষেত্রে সুশীলমহলে অভিমত হচ্ছে, কর্নেল এবং খোকন সেরনিয়াবাতকেই এই রাজনৈতিক সন্ত্রাস রুখে দিতে হবে এবং তাদের দুজনের সদিচ্ছাও আছে, তারা পারবেনও। তবে এটা সময়ের ব্যাপার, কারণ বরিশাল সিটির মেয়র এখনও মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ। বরিশাল সিটির মসনদে বসতে খোকন সেরনিয়াবাতের অপেক্ষা করতে হচ্ছে তিন মাসের অধিক সময়। হয়তো তিনি দায়িত্বভার গ্রহণের পরপরই রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমনে যে অঙ্গীকার করেছেন, তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন।
সিটির নাগরিকেরা বলছেন, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়ে জাহিদ ফারুক শামীম একই সাথে সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে প্রতিশ্রুতির কিছুটা হলেও বরিশালবাসীকে দিয়েছেন। বিশেষ করে তিনি (বরিশাল ৫ আসন) সদর আসনের আওতাধীন বরিশাল উপজেলার রাস্তা-ঘাট উন্নয়নের পাশাপাশি নদী ভাঙন রক্ষায় যে অগ্রণী ভুমিকা রেখেছেন, তা সর্বমহলে আলোচিত এবং আলোড়িত। ফলে তার কাছে জনগণের আশা-আকাঙ্খা আরও বেড়েছে। পাশাপাশি বিপুল ভোটে জয়ী খোকন সেরনিয়াবাতের কাছেও তার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চাইছেন জনতা।
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের এই সদিচ্ছায় রাজনৈতিক সন্ত্রাস বড় বাধা হতে পারে কী না, যেমনটি হয়েছে সাবেক সফল মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পরে। সর্বশেষ কাশিপুরে গত দুদিন পূর্বে দুই জনপ্রতিনিধির অনুগত ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে যে সংঘাত-রক্তপাত হলো তা রাজনীতির ইতিবাচক ধারা বলে মনে হচ্ছে না, মন্তব্য পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন মাধ্যম জানা গেছে, কাশিপুরে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় প্রতিমন্ত্রী-মেয়র উভয়েই হার্ডলাইনে আছেন। এ ধরনের ঘটনা আগামীতে কোনো প্রকার প্রশ্রয় দেওয়া হবে না, সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী-মেয়র। এমনকি কাশিপুরের ওই ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করতে তারা দুজনেই পুলিশকে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
ফলে ধারনা বদ্ধমূল হয়ে ওঠে যে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার ক্ষেত্রে যারা বড় বাধা হয়ে উঠবে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার! আর যারা দখল পাল্টা দখল এবং চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিতে ধাবিত হয়ে রাজনৈতিক ব্যানারে সন্ত্রাস করার কথা ভাবছেন, তাদের অবস্থা আরও করুন হতে পারে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ‘মানবতার মা’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাও অনুরুপ। সেক্ষেত্রে কর্নেল-খোকনের আগামীর ‘নতুন বরিশাল’ যে শান্তিময় হবে তা আর অস্বীকার করার সুযোগ থাকছে না।
হাসিবুল ইসলাম, কলামিস্ট ও সিনিয়র সাংবাদিক এবং সভাপতি, ‘নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল’।
রাজনীতির মাঠে উভয়েই ক্লিন ইমেজের এবং সৎ-স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হিসেবে সমাধিক পরিচিত। বিপরিতে উভয়ে বরিশালের স্থানীয় রাজনীতিতে স্বল্পসময়ে পেয়েছেন বেশ জনপ্রিয়তা, প্রসংশিত হয়েছেন, হচ্ছেন আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডে। ক্ষমতাসীন আ’লীগ ঘরনার রাজনৈতিক এবং জনপ্রতিনিধি হলেও উন্নয়ন কর্মকান্ডের বদৌলতে তাদের এই দলের বাইরেও রয়েছে সুনাম। এতক্ষণ যাদের কথা বলছিলাম, তাদের একজন বরিশাল সদর আসনের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) জাহিদ ফারুক শামীম, অপরজন বরিশাল সিটির নবনির্বাচিত মেয়র আবুল খায়ের ওরফে খোকন সেরনিয়বাত। নয়া এই মেয়র এখন পর্যন্ত বিসিসির দায়িত্বভার গ্রহণ না করলেও তার ওপর বরিশালবাসী যে আস্থা রেখেছে, তার প্রমাণ ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে। ১২ জুন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পঞ্চম মেয়াদের নির্বাচনে তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে জনগণ।
খোকন সেরনিয়াবাতকে ভোটে নির্বাচিত করতে নেপথ্য কারিগর যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম একজন বরিশাল সদর আসনের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনসহ সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত বরিশাল-৫ আসনে জনপ্রতিনিধি তিনি। খোকন সেরনিয়াবাতকে নিয়ে ভোটের মাঠে নামার আগে এবং জয়লাভের পর উভয় জনপ্রতিনিধির সম্পর্কের কোনো ঘাটতি নেই। বরং তারা অভিন্ন মেরুতেই অবস্থান করছেন। তারা দুজনেই নির্বাচন পূর্বাপর স্থানীয় বাসিন্দাদের বারংবার অঙ্গীকার করে আসছেন, বরিশাল হবে চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, মাদকসহ ‘রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত একটি শহর’। তাদের এই প্রতিশ্রুতির প্রতি বরিশাল শহরবাসীর যে আস্থা আছে, তার প্রমাণ ১২ জুনে ভোটে পেয়েছেন। এবং বিপরিতে কর্নেল-খোকন তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অভীষ্ট লক্ষে এগিয়ে চলছেন, কী ভাবে সন্ত্রাসমুক্ত বরিশাল নগরী গড়ে তোলা যায়।
যদিও ইতিমধ্যে উভয় জনপ্রতিনিধিই ঘোষণা দিয়েছেন এবং নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের নির্বাচনী ইশতেহারেও প্রতিশ্রুতি ছিল তিনি ‘নতুন বরিশাল’ গড়বেন। জনপ্রতিনিধির ওই আশ্বাস শহরবাসীর মনে আস্থা জুগিয়েছে, বেড়েছে নাগরিক প্রত্যাশাও।
কারণ এমপি জাহিদ ফারুক শামীম তাঁর আওতাধীন এলাকাসমূহ অর্থাৎ সদর উপজেলার ভাঙনরোধসহ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে যথেষ্ট ভুমিকা রাখলেও প্রভাবশালী একটি মহলের বাধায় বরিশাল নগর উন্নয়নে ইচ্ছা এবং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো কাজ করতে পারেননি। এনিয়ে প্রতিমন্ত্রীকে আলোচনার প্রাক্কালে ক্ষেত্র বিশেষ আফসোস করতেও শোনা যায়। বছর দুয়েক পূর্বে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শহর অভ্যন্তরের ফুসফুস খ্যাত ৬টি খাল সংরক্ষণ করাসহ পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে উদ্যোগ নিলে সিটি কর্পোরেশনের বাধায় তা আটকে যায়।
অথচ শহরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা অন্তত শহর অভ্যন্তরের খালগুলো সংরক্ষণ করে যেনো নগরকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা হয়। এনিয়ে সাবেক সফল সিটি মেয়র শওকত হোসেনের বেশ উদ্যোগও ছিল, কিন্তু তার মৃত্যুর পর বরিশাল সিটির তৃতীয় পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি নেতা আহসান হাবিব কামাল মেয়র নির্বাচিত হলে, তিনিও খাল উদ্ধারে তেমন কোনো ভুমিকা রাখেননি। এরপর চতুর্থ পরিষদ নির্বাচনে সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র নির্বাচিত হলে তিনিও খালগুলো উদ্ধারে ভূমিকা রাখেননি, বা রাখতে পারেননি। যদিও সিটি কর্পোরেশনের তরফে মাসছয়েক আগেও বলা হচ্ছিল, শহর অভ্যন্তরের খালগুলো উদ্ধারে প্রকল্প চলমান আছে, কিন্তু এই বলাবলির মধ্যে মেয়র সাদিকে মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে। আর মাত্র তিন মাস পরেই তাঁর আপন চাচা খায়ের আব্দুল্লাহ সিটির মসনদে বসবেন।
নাগরিক সমাজের ভাষ্য হচ্ছে, যেহেতু এমপি জাহিদ ফারুক শামীম বরিশাল শহর উন্নয়ন প্রশ্নে আন্তরিক আছেন এবং নতুন মেয়র খোকন সেরনিয়বাতেরও অঙ্গীকার আছে, সেক্ষেত্রে আগামীতে উভয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় জলাবদ্ধতা দূরিকরণে সমাধান আসছে এটা বলার অপেক্ষা নেই। সৎ-স্বচ্ছ এবং ক্লিন ইমেজের এই দুই জনপ্রতিনিধি আগামীতে যে ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার অঙ্গীকার করছেন, তাও বাস্তবায়নের কিছু আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু এখন নগরবাসীর মধ্যে যে প্রশ্ন বেশি ভার সেটি হচ্ছে, জনপ্রতিনিধিদ্বয় টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, মাদক ও রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত ‘নতুন বরিশাল’ গড়তে কতটা সফল হবেন? এবং বরিশালে বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয়ে দখল-পাল্টা দখলের যে উৎসব চলছে! তা নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করছেন, না কী করবেন।
বলা বাহুল্য যে, বিগত সময়ে বরিশাল শহর উন্নয়ন অপেক্ষা সন্ত্রাসীদের উৎপাত বেশি লক্ষ্যণীয় ছিল। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে একটি অংশ নিজের আখের গুছিয়েছে, দেখিয়েছে ত্রাস, ক্যাডাভিত্তিক সন্ত্রাসের ভয়ে বলতে গেলো তটস্থ ছিল বরিশালবাসী। ভয়ে মুখ না খুললেন, আশায় ছিল পরিবর্তনের। আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ বরিশাল সিটিতে আ’লীগ মনোনীত প্রার্থী হয়ে আসলে নগরবাসী সুবর্ন সুযোগটি লুফে নেয়, ভোট দিয়ে তাকে নগরপিতার আসনে বসিয়েছেন। কিন্তু শহরবাসীর অতীত রাজনৈতিক সন্ত্রাসের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে, যা কিছুটা হলেও ভুলতে চান প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের দৌত নগর উন্নয়নে।
অভিজ্ঞমহলের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হচ্ছে, অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে ‘ক্যাডারভিত্তিক’ রাজনীতি করে কোনো জনপ্রতিনিধি তাদের চেয়ার বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি, যার প্রমাণ ইতিমধ্যে বরিশালের মানুষ পেয়েছেন। কিন্তু এরপরেও সুযোগ-সন্ধানী একটি অংশ থাকে তারা সার্বক্ষণিক নিজেস্ব স্বার্থ সংরক্ষণের ধান্দায় ব্যস্ত, এরাই মূলত সমাজ এবং রাজনীতির বিষফোঁড়া। তাদের অবস্থান বিগত সময়েও বিদ্যমান ছিল, এখনও আছে। যার দরুণ অনেকে ক্লিন ইমেজের জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং খোকন সেরনিয়াবাতের দিতে আঙ্গুল তুলতে সাহস দেখাবেন। আবার দলীয় ঘরানার বিরোধীরা পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখছেন এবং হাসছেন, কেউ কেউ দিচ্ছেন উস্কানিও।
রাজনৈতিক বোদ্ধাদের অভিমত হচ্ছে, স্বচ্ছ-সৎ মানসিকতার জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং খোকনকে বিতর্কিত করতে দলীয় ঘরানার একটি অংশ মরিয়া হয়ে আছে। তারা সর্বদা চাইছেন কোনো কোনো ইস্যু তৈরি করে এই দুজনকে কী ভাবে ঝামেলায় মধ্যে ফেলা যায়। এসব বিষয় নিয়ে বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে চায়ের দোকানে চর্চা শোনা যাচ্ছে। ফলে উভয় রাজনৈতিকের লক্ষ্য-উদ্দেশ হবে নিজেদের সতর্কতার সাথে পথা চলা এবং কর্মী-সমর্থকদের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং কোনো প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখা। কারণ তারা প্রতিমন্ত্রী ও নয়া মেয়রের ইমেজ যে কোনো সময় ম্লান করে দিতে পারে বিতর্কিত কর্মকান্ডের মধ্যদিয়ে। এক্ষেত্রে তাদের ওপর বিশেষ খেয়াল দিতে হবে, যারা দল বদল করে বিএনপি-জামায়াত থেকে এসেছে।
মহলটি বলছেন, সিটি নির্বাচনের মাসখানেক আগে থেকে বর্তমান সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ অনেকটা অন্তর্ধানে চলে যাওয়ার পরে বরিশালে ক্ষমতাসী দলের নেতাকর্মীদের সৃষ্ট বেশ কয়েকটি ঘটনা বিশেষ করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান-ঘাট-বাজার দখল, চাঁদাবাজি এবং মারামারিতে রক্তপাত নেতিবাচক রাজনীতি জানান দিচ্ছে, যা এমপি বা নতুন মেয়র কেউ সমর্থন করেন না। কিন্তু তারপরেও একের পর এক এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে, অনুঘটকরা জনপ্রতিনিধিদের নাম সামনে রেখে এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করায় ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় নিতেও সাহস পাচ্ছেন না। আবার জনপ্রতিনিধিরাই মিডিয়ার সামনে আনুষ্ঠানিক বলছেন, দখলবাজ বা সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, বরিশালে গত দুই মাসে যে দখল পাল্টা দখলের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তা কী ভিত্তিহীন বা অবান্তর? আবার যারা এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড যারা করছেন তারা কী আইনে উর্ধ্বে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ করছে না (!)
এক্ষেত্রে সুশীলমহলে অভিমত হচ্ছে, কর্নেল এবং খোকন সেরনিয়াবাতকেই এই রাজনৈতিক সন্ত্রাস রুখে দিতে হবে এবং তাদের দুজনের সদিচ্ছাও আছে, তারা পারবেনও। তবে এটা সময়ের ব্যাপার, কারণ বরিশাল সিটির মেয়র এখনও মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ। বরিশাল সিটির মসনদে বসতে খোকন সেরনিয়াবাতের অপেক্ষা করতে হচ্ছে তিন মাসের অধিক সময়। হয়তো তিনি দায়িত্বভার গ্রহণের পরপরই রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমনে যে অঙ্গীকার করেছেন, তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন।
সিটির নাগরিকেরা বলছেন, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়ে জাহিদ ফারুক শামীম একই সাথে সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে প্রতিশ্রুতির কিছুটা হলেও বরিশালবাসীকে দিয়েছেন। বিশেষ করে তিনি (বরিশাল ৫ আসন) সদর আসনের আওতাধীন বরিশাল উপজেলার রাস্তা-ঘাট উন্নয়নের পাশাপাশি নদী ভাঙন রক্ষায় যে অগ্রণী ভুমিকা রেখেছেন, তা সর্বমহলে আলোচিত এবং আলোড়িত। ফলে তার কাছে জনগণের আশা-আকাঙ্খা আরও বেড়েছে। পাশাপাশি বিপুল ভোটে জয়ী খোকন সেরনিয়াবাতের কাছেও তার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন চাইছেন জনতা।
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের এই সদিচ্ছায় রাজনৈতিক সন্ত্রাস বড় বাধা হতে পারে কী না, যেমনটি হয়েছে সাবেক সফল মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুর পরে। সর্বশেষ কাশিপুরে গত দুদিন পূর্বে দুই জনপ্রতিনিধির অনুগত ছাত্রলীগ কর্মীদের মধ্যে যে সংঘাত-রক্তপাত হলো তা রাজনীতির ইতিবাচক ধারা বলে মনে হচ্ছে না, মন্তব্য পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন মাধ্যম জানা গেছে, কাশিপুরে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় প্রতিমন্ত্রী-মেয়র উভয়েই হার্ডলাইনে আছেন। এ ধরনের ঘটনা আগামীতে কোনো প্রকার প্রশ্রয় দেওয়া হবে না, সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী-মেয়র। এমনকি কাশিপুরের ওই ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করতে তারা দুজনেই পুলিশকে কঠোর হওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
ফলে ধারনা বদ্ধমূল হয়ে ওঠে যে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার ক্ষেত্রে যারা বড় বাধা হয়ে উঠবে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার! আর যারা দখল পাল্টা দখল এবং চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজিতে ধাবিত হয়ে রাজনৈতিক ব্যানারে সন্ত্রাস করার কথা ভাবছেন, তাদের অবস্থা আরও করুন হতে পারে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ‘মানবতার মা’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাও অনুরুপ। সেক্ষেত্রে কর্নেল-খোকনের আগামীর ‘নতুন বরিশাল’ যে শান্তিময় হবে তা আর অস্বীকার করার সুযোগ থাকছে না।
হাসিবুল ইসলাম, কলামিস্ট ও সিনিয়র সাংবাদিক এবং সভাপতি, ‘নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল’।

০৭ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৩৮
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০১:৩১
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)

০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৯:০০
বিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নে, যখন বিশ্বসাহিত্য আধুনিকতার রুক্ষ ও যান্ত্রিক অভিঘাতে এক পরিচয়হীন শূন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছিল এক নাক্ষত্রিক স্থপতির মতো। ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার পলিধৌত বাহেরচর গ্রামে যে প্রাণস্পন্দনের শুরু, তা কেবল একটি জীবনের অঙ্কুরোদ্গম ছিল না—বরং তা ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সন্ধানের দার্শনিক ইশতেহার। আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই বাহেরচরের আদিম পলি আর মরমী আবহ তাঁর সত্তাকে এক দ্বান্দ্বিক অথচ সুষম বিন্যাসে গড়ে তুলেছিল; যেখানে একাধারে মিশে ছিল বাংলার লোকজ সহজপন্থা এবং ইংরেজি সাহিত্যের রাজকীয় আভিজাত্যের ধ্রুপদী দীপ্তি। হার্ভার্ডের বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যাকরণ আর বাহেরচরের মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাঁর ভেতর এমন এক ‘পোয়েটিক জেনিয়াস’ তৈরি করেছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল নাগরিক ড্রয়িংরুমের অলঙ্কার হিসেবে দেখেনি, বরং তাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ষিত জমিন ও ঐতিহ্যের শাশ্বত বেদিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার বর্তমানের সমষ্টি নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংকলন—যেখানে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি শস্যের দানার মতো পবিত্র।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যভুবনের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি অনন্য নান্দনিক অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) ছিল রোমান্টিক সংবেদনশীলতা ও লোকজ ছন্দের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন, যেখানে তিনি ঐতিহ্যের অলঙ্কার দিয়ে আধুনিকতার অবয়ব গড়েছিলেন। বিশেষ করে ‘কমলিনী-র হাসি’ গ্রন্থে নারীর শাশ্বত রূপ ও তাঁর অন্তর্লীন হাসিকে তিনি যেভাবে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে জাদুকরী বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাব্যে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ সুফি দর্শনের সেই চিরন্তন হাহাকারকে আধুনিক নাগরিক চেতনার সাথে যুক্ত করে, যেখানে তিনি মরমী ঢংয়ে প্রশ্ন তোলেন— “তুমি কে / এই অন্ধকারে একা ব’সে আছো? / তোমার চোখের তারা কি নক্ষত্রের প্রতিচ্ছায়া?” (খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ১৯৯৬)। ওবায়দুল্লাহর কাব্যিক শ্রেষ্ঠত্বের শিখর স্পর্শ করে তাঁর কালজয়ী ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৮২)। কার্ল ইয়ুং-এর ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতনার তত্ত্বের আলোকে এই কাব্যটি বাঙালির হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক স্মৃতির এক মহাকাব্যিক ইশতেহার। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন, ওবায়দুল্লাহ সেই মাটির ইতিহাসকেই দিয়েছেন এক বীরত্বগাথার রূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি / তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল / তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন / অরণ্য এবং পদের কথা বলতেন”—তখন তিনি আসলে একজন কবির ব্যক্তি-পরিচয় ছাপিয়ে এক জাতির শেকড়ের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠেন। তাঁর শব্দশৈলী ছিল মিতব্যয়ী কিন্তু আবেদন ছিল মহাজাগতিক। তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে— “যে কবিতা শুনতে জানে না / সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।” (আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, ১৯৮২)।
ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণে ওবায়দুল্লাহর তুলনা অনিবার্যভাবে টি. এস. এলিয়টের ‘ঐতিহাসিক বোধ’-এর সাথে চলে আসে। এলিয়ট যেমন পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের আধুনিকায়নের পথ দেখিয়েছিলেন, ওবায়দুল্লাহ তেমনি বাংলার লুপ্তপ্রায় মিথ ও লোকগাথাকে আধুনিক কবিতার শরীরে সঞ্চারিত করে আধুনিকতার একটি ‘দেশজ মডেল’ তৈরি করেছেন। তবে তাঁর মহত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতন্ত্রের যান্ত্রিক শীতলতা বনাম কবিতার মানবিক উষ্ণতার সার্থক মেলবন্ধন। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে কিংবা জাতিসংঘের এফএও (FAO)-এর এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নীতি-নির্ধারণ করেছেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা কেবল ফাইলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল বৈপ্লবিক ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প, যা ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক ছিল মূলত মাটির প্রতি তাঁর এক শৈল্পিক অঙ্গীকার। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাত ও কবিতা সমার্থক—এই মরমী দর্শনই তাঁর প্রশাসনিক মেধা ও সাহিত্যিক জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছে। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলগুলো আজও প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের কবির চোখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক মুক্তি।
শিল্পের এই দায়বদ্ধতা পাবলো নেরুদার মতো তাঁর কাব্যেও প্রকৃতি ও রাজনীতিকে এক পরাবাস্তব রসায়নে গেঁথেছে। ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তাঁর সেই হাহাকার এক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের নাম। সেখানে তিনি কাতরকণ্ঠে অমোঘ প্রার্থনায় নিমগ্ন হন— “হে ঈশ্বর / আমাদের বৃষ্টির জল দাও / যেন আমাদের পাপ ধুয়ে যায় / যেন শস্যের গহন থেকে আবার জীবন জেগে ওঠে।” (বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, ১৯৭১)। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে সিভিল সার্ভিসের (CSP) নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর যে সূক্ষ্ম নৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তা তিনি জয় করেছিলেন শিল্পের সাহসিকতায়। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম ‘একুশের সংকলন’-এর নেপথ্যে তাঁর অর্থায়ন ও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তাঁর সহকর্মীরা বলতেন, ওবায়দুল্লাহ ফাইলে বন্দি কোনো আমলা ছিলেন না, বরং এক ঋজু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ক্ষমতার অলিন্দেও তাঁর কবিত্ব ও নৈতিকতাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাঁর বাসভবনে ‘আলাপন’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ছিল মূলত সমকালীন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের এক মিলনমেলা, যা ক্ষমতার যান্ত্রিকতাকে সৃজনশীলতার স্পর্শে মানবিক করার এক বিরল নজির।
আজ ২০ ২৬ সালের এই নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক সভ্যতায়, যখন মানবসত্তা কৃত্রিম মেধার গোলকধাঁধায় তার আদিম স্পন্দন হারিয়ে ফেলছে, তখন ওবায়দুল্লাহর ‘পলিমাটির সৌরভ’ আমাদের ক্লান্ত অস্তিত্বে এক পৈত্তিক আশ্লেষ হয়ে ধরা দেয়। তথ্যের পাহাড় আর অ্যালগরিদমের শীতল অরণ্যে যখন মানবিক আবেগগুলো প্রাণহীন সংজ্ঞায় পর্যবসিত, তখন তাঁর কবিতা আমাদের সেই চিরন্তন শেকড়ের স্পন্দন শুনিয়ে যায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—আমরা নিছক কোনো যান্ত্রিক কোড নই, বরং এই বাংলার কর্ষিত মৃত্তিকার এক একটি জীবন্ত নক্ষত্র। চিরকালীনতার আলোয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সৃষ্টিকর্ম কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং তা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অতলস্পর্শী দর্পণ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’ কেবল একটি শোকগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে জাদুকরী বাস্তবতার এক শাশ্বত মহাকাব্য। মাতৃভাষার প্রতি সেই ব্যাকুলতা তিনি গেঁথেছিলেন এইভাবে— “মাগো, ওরা বলে / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো মা, তাই কি হয়?” (কবিতা- ‘মাগো, ওরা বলে’, কাব্যগ্রন্থ- সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, ১৯৮২)।
কুমড়ো ফুল কিংবা লতা-পাতার বুননে তিনি মায়ের আকুতিকে যেভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ঐতিহ্যেরই নামান্তর। বর্তমানের যান্ত্রিক মরুভূমিতে যখন মানুষ তার শিকড় হারিয়ে দিশেহারা, তখন ওবায়দুল্লাহর কবিতা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো নন্দনকাননে, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বাঁচে। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ এই ঋষিপ্রতিম কবি নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও, তিনি রেখে গেছেন এমন এক দার্শনিক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শেখায়—প্রকৃত মুক্তি ঐতিহ্যের বিনাশে নয়, বরং তার পুনর্জাগরণে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আজ কেবল একজন ব্যক্তি বা কবির নাম নয়, তিনি আমাদের পলিমাটির সেই অমর প্রজ্ঞা, যা যুগ-যুগান্তরের ধূলি সরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের শ্বেতপদ্মটিকে জাগিয়ে রাখে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় b_golap@yahoo.com)
বিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নে, যখন বিশ্বসাহিত্য আধুনিকতার রুক্ষ ও যান্ত্রিক অভিঘাতে এক পরিচয়হীন শূন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছিল এক নাক্ষত্রিক স্থপতির মতো। ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার পলিধৌত বাহেরচর গ্রামে যে প্রাণস্পন্দনের শুরু, তা কেবল একটি জীবনের অঙ্কুরোদ্গম ছিল না—বরং তা ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সন্ধানের দার্শনিক ইশতেহার। আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই বাহেরচরের আদিম পলি আর মরমী আবহ তাঁর সত্তাকে এক দ্বান্দ্বিক অথচ সুষম বিন্যাসে গড়ে তুলেছিল; যেখানে একাধারে মিশে ছিল বাংলার লোকজ সহজপন্থা এবং ইংরেজি সাহিত্যের রাজকীয় আভিজাত্যের ধ্রুপদী দীপ্তি। হার্ভার্ডের বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যাকরণ আর বাহেরচরের মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাঁর ভেতর এমন এক ‘পোয়েটিক জেনিয়াস’ তৈরি করেছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল নাগরিক ড্রয়িংরুমের অলঙ্কার হিসেবে দেখেনি, বরং তাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ষিত জমিন ও ঐতিহ্যের শাশ্বত বেদিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার বর্তমানের সমষ্টি নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংকলন—যেখানে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি শস্যের দানার মতো পবিত্র।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যভুবনের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি অনন্য নান্দনিক অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) ছিল রোমান্টিক সংবেদনশীলতা ও লোকজ ছন্দের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন, যেখানে তিনি ঐতিহ্যের অলঙ্কার দিয়ে আধুনিকতার অবয়ব গড়েছিলেন। বিশেষ করে ‘কমলিনী-র হাসি’ গ্রন্থে নারীর শাশ্বত রূপ ও তাঁর অন্তর্লীন হাসিকে তিনি যেভাবে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে জাদুকরী বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাব্যে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ সুফি দর্শনের সেই চিরন্তন হাহাকারকে আধুনিক নাগরিক চেতনার সাথে যুক্ত করে, যেখানে তিনি মরমী ঢংয়ে প্রশ্ন তোলেন— “তুমি কে / এই অন্ধকারে একা ব’সে আছো? / তোমার চোখের তারা কি নক্ষত্রের প্রতিচ্ছায়া?” (খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ১৯৯৬)। ওবায়দুল্লাহর কাব্যিক শ্রেষ্ঠত্বের শিখর স্পর্শ করে তাঁর কালজয়ী ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৮২)। কার্ল ইয়ুং-এর ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতনার তত্ত্বের আলোকে এই কাব্যটি বাঙালির হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক স্মৃতির এক মহাকাব্যিক ইশতেহার। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন, ওবায়দুল্লাহ সেই মাটির ইতিহাসকেই দিয়েছেন এক বীরত্বগাথার রূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি / তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল / তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন / অরণ্য এবং পদের কথা বলতেন”—তখন তিনি আসলে একজন কবির ব্যক্তি-পরিচয় ছাপিয়ে এক জাতির শেকড়ের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠেন। তাঁর শব্দশৈলী ছিল মিতব্যয়ী কিন্তু আবেদন ছিল মহাজাগতিক। তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে— “যে কবিতা শুনতে জানে না / সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।” (আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, ১৯৮২)।
ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণে ওবায়দুল্লাহর তুলনা অনিবার্যভাবে টি. এস. এলিয়টের ‘ঐতিহাসিক বোধ’-এর সাথে চলে আসে। এলিয়ট যেমন পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের আধুনিকায়নের পথ দেখিয়েছিলেন, ওবায়দুল্লাহ তেমনি বাংলার লুপ্তপ্রায় মিথ ও লোকগাথাকে আধুনিক কবিতার শরীরে সঞ্চারিত করে আধুনিকতার একটি ‘দেশজ মডেল’ তৈরি করেছেন। তবে তাঁর মহত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতন্ত্রের যান্ত্রিক শীতলতা বনাম কবিতার মানবিক উষ্ণতার সার্থক মেলবন্ধন। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে কিংবা জাতিসংঘের এফএও (FAO)-এর এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নীতি-নির্ধারণ করেছেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা কেবল ফাইলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল বৈপ্লবিক ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প, যা ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক ছিল মূলত মাটির প্রতি তাঁর এক শৈল্পিক অঙ্গীকার। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাত ও কবিতা সমার্থক—এই মরমী দর্শনই তাঁর প্রশাসনিক মেধা ও সাহিত্যিক জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছে। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলগুলো আজও প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের কবির চোখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক মুক্তি।
শিল্পের এই দায়বদ্ধতা পাবলো নেরুদার মতো তাঁর কাব্যেও প্রকৃতি ও রাজনীতিকে এক পরাবাস্তব রসায়নে গেঁথেছে। ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তাঁর সেই হাহাকার এক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের নাম। সেখানে তিনি কাতরকণ্ঠে অমোঘ প্রার্থনায় নিমগ্ন হন— “হে ঈশ্বর / আমাদের বৃষ্টির জল দাও / যেন আমাদের পাপ ধুয়ে যায় / যেন শস্যের গহন থেকে আবার জীবন জেগে ওঠে।” (বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, ১৯৭১)। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে সিভিল সার্ভিসের (CSP) নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর যে সূক্ষ্ম নৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তা তিনি জয় করেছিলেন শিল্পের সাহসিকতায়। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম ‘একুশের সংকলন’-এর নেপথ্যে তাঁর অর্থায়ন ও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তাঁর সহকর্মীরা বলতেন, ওবায়দুল্লাহ ফাইলে বন্দি কোনো আমলা ছিলেন না, বরং এক ঋজু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ক্ষমতার অলিন্দেও তাঁর কবিত্ব ও নৈতিকতাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাঁর বাসভবনে ‘আলাপন’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ছিল মূলত সমকালীন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের এক মিলনমেলা, যা ক্ষমতার যান্ত্রিকতাকে সৃজনশীলতার স্পর্শে মানবিক করার এক বিরল নজির।
আজ ২০ ২৬ সালের এই নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক সভ্যতায়, যখন মানবসত্তা কৃত্রিম মেধার গোলকধাঁধায় তার আদিম স্পন্দন হারিয়ে ফেলছে, তখন ওবায়দুল্লাহর ‘পলিমাটির সৌরভ’ আমাদের ক্লান্ত অস্তিত্বে এক পৈত্তিক আশ্লেষ হয়ে ধরা দেয়। তথ্যের পাহাড় আর অ্যালগরিদমের শীতল অরণ্যে যখন মানবিক আবেগগুলো প্রাণহীন সংজ্ঞায় পর্যবসিত, তখন তাঁর কবিতা আমাদের সেই চিরন্তন শেকড়ের স্পন্দন শুনিয়ে যায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—আমরা নিছক কোনো যান্ত্রিক কোড নই, বরং এই বাংলার কর্ষিত মৃত্তিকার এক একটি জীবন্ত নক্ষত্র। চিরকালীনতার আলোয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সৃষ্টিকর্ম কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং তা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অতলস্পর্শী দর্পণ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’ কেবল একটি শোকগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে জাদুকরী বাস্তবতার এক শাশ্বত মহাকাব্য। মাতৃভাষার প্রতি সেই ব্যাকুলতা তিনি গেঁথেছিলেন এইভাবে— “মাগো, ওরা বলে / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো মা, তাই কি হয়?” (কবিতা- ‘মাগো, ওরা বলে’, কাব্যগ্রন্থ- সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, ১৯৮২)।
কুমড়ো ফুল কিংবা লতা-পাতার বুননে তিনি মায়ের আকুতিকে যেভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ঐতিহ্যেরই নামান্তর। বর্তমানের যান্ত্রিক মরুভূমিতে যখন মানুষ তার শিকড় হারিয়ে দিশেহারা, তখন ওবায়দুল্লাহর কবিতা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো নন্দনকাননে, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বাঁচে। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ এই ঋষিপ্রতিম কবি নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও, তিনি রেখে গেছেন এমন এক দার্শনিক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শেখায়—প্রকৃত মুক্তি ঐতিহ্যের বিনাশে নয়, বরং তার পুনর্জাগরণে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আজ কেবল একজন ব্যক্তি বা কবির নাম নয়, তিনি আমাদের পলিমাটির সেই অমর প্রজ্ঞা, যা যুগ-যুগান্তরের ধূলি সরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের শ্বেতপদ্মটিকে জাগিয়ে রাখে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় b_golap@yahoo.com)
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
১১ মার্চ, ২০২৬ ১৩:৩৮
১১ মার্চ, ২০২৬ ১৩:১০
১১ মার্চ, ২০২৬ ১২:৫৪
১১ মার্চ, ২০২৬ ১২:৪৫