Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.

২৯ মে, ২০২৫ ১৬:১৩
কদিন পূর্বে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত। এবং গত ৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার আগেও অভিন্ন বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। নির্বাচনে জাহিদ ফারুককে সমর্থন দেওয়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাতও অনুরুপ অঙ্গীকার রেখেছেন নগরবাসীর কাছে। এবং উভয় জনপ্রতিনিধি এও জানিয়ে ছিলেন রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ করাসহ দখল সন্ত্রাস রোধ করে শান্তিময় ‘নতুন বরিশাল’ গড়ে তোলা হবে। স্বচ্ছ-সৎ-আদর্শিক এই দুই জনপ্রতিনিধি নির্বাচন পূর্বাপর দেওয়া তাদের অঙ্গীকার পালনের ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণার মধ্যেও বরিশালে তাদের অনুসারীরা ক্রমাগত অপরাধ পরিক্রমায় জড়িয়ে পড়ছেন। উভয় নেতার অনুসারীরা দলীয় ঘরনার বিরোধীদের হাট-বাজার দখল করাসহ সংঘাত-সংঘর্ষে বরিশাল উত্তপ্ত করে তুলেছেন। এসব ঘটনাবলীতে বরিশালের চার থানা কোতয়ালি, কাউনিয়া, বন্দর এবং বিমানবন্দরে অন্তত ডজনখানে মামলা হলেও নগরবাসী মোটেও স্বস্তিতে নেই। বরং দিনেদিনে আতঙ্ক ক্রমশই বৃদ্ধি করছে, যা প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং সিটি মেয়র আবুল খায়েরের ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা নয়, মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
অভিজ্ঞ মহল বলছেন, কীর্তনখোলা নদীঘেরা জনপদের দুই জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাত ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক। তাদের দুজনের ওপর বরিশাল সিটি ও সদর আসনের জনগণ আস্থা রেখেছেন বলেই তারা সম্প্রতি অনুষ্ঠেয় দুটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন। সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ দুটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হলে মহানগর আওয়ামী লীগ বেকে বসে। কিন্তু তারপরেও নৌকার প্রার্থী সিটিতে আবুল খায়ের এবং সংসদে জাহিদ ফারুক শামীমকেই সাধারণ মানুষ বেচে নিয়েছেন। নির্বাচন পূর্বাপর উভয় জনপ্রতিনিধি অনুরুপ প্রতিশ্রুতি করেছিলেন যে অবহেলিত বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত এবং উন্নত ‘নতুন বরিশাল’। অবশ্য এনিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল শহরবাসী। তবে সংসদ নির্বাচনের পর তাদের কর্মী-অনুসারীদের কয়েকজন বরিশালে দখল পাল্টা দখলের উৎসবে মেতে উঠেছেন। এনিয়ে সংঘাত-রক্তপাতে উত্তপ্ত এবং ক্রমাগতভাবে আতঙ্ক বৃদ্ধি হলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নির্লপ্ত থাকা সমীচীন নয়। বরং শহরবাসীর স্বার্থে এই দুই জনপ্রতিনিধির ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখতে সন্ত্রাস রুখে দিয়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া জরুরি। নতুবা এই সন্ত্রাস প্রতিমন্ত্রী মেয়রের ক্লিন ইমেজে দাগ লাগাবে!, ছাপিয়ে যাবে সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র সময়কার সকল বিতর্কিত কর্মকান্ডের রেকর্ড।
৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে বরিশাল নগরীতে সরকারি বেশ কিছু হাট-বাজার এবং ঘাট দখলের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে সিটি এবং সংসদে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত সাদিক আব্দুল্লাহ অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নেয় প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা। এই দখল প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে দুই পক্ষের হানাহানি খোদ সরকারের একাধিক দপ্তরকে বিপাকে ফেলে দেয়। মেয়র সমর্থিত খান হাবিব বিআইডব্লিউটিএ’র দুটি ঘাট তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন, যা এতদিন মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুলের দখলে ছিল। আলোচ্চ্য টুটুল সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়বাত সাদিক আব্দুল্লাহ সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে সমাধিক পরিচিত। ৫ বছর আগে ২০১৮ সালে তার নেতা সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র হলে অনুরুপভাবে তিনিও হাট-ঘাট-বাজারগুলো এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেন, তখনও সন্ত্রাস-সংঘাতে বরিশাল শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
রাজনৈতিক মহল বলছে, সদরের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক একজন সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতও অভিন্ন চরিত্রের। মহানগর আওয়ামী লীগ তাদের দুজনের নির্বাচনেই উল্টো পথে হেটেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। বরং নৌকার বিরুদ্ধচারণ করায় সাদিকসহ তার অনুসারীরা বিতর্কিত হয়েছেন। এছাড়া ক্ষমতার আমলে তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ওষ্ঠাগত হয়ে খোকন সেরনিয়াবাত এবং জাহিদ ফারুকের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিল। অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তারা নৌকা নিয়ে বৈতরণী পার হয়েছেন, নগরবাসী তাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দুই জনপ্রতিনিধি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে যখন আধাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন, তখনই গুটিকয়ে কর্মী তাদের এমন উদ্যোগ এবং প্রসংশনীয় কর্ম অপেক্ষা বিতর্ক বেশি তৈরি করেছে দখল সন্ত্রাসের জানান দিয়ে।
জানা যায়, কদিন পূর্বে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত দপদপিয়া ব্রিজের টোলপ্লাজায় আসা একটি যাত্রীবাহী পরিবহন থেকে পটুয়াখালীর ব্যবসায়ীদের মাছ লুটপাট করে সিটি মেয়র অনুসারী কথিত ছাত্র-যুবলীগ নেতাকর্মীরা। বিতর্কিত যুবক রেজভীর নেতৃত্বে মাছগুলো লুটপাট শেষে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িতে করে তা নিয়ে যাওয়া হয় শহরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পোর্টরোডে এবং কাশিপুরে। দুটি স্থানে মাছগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পটুয়াখালীর ওই ব্যবসায়ী বাদী হয়ে বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও নেতৃত্বদানকারী রেজভী আছেন বহাল তবিয়তে।
পুলিশ এই আলোচিত মামলাটি নিয়ে কাজ করছে এবং তদন্ত করতে গিয়ে যা পেয়েছে, পাচ্ছে তা শুনলে অনেকের চক্ষু চড়কগাছ। সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র আমলে অনুরুপ মাছের গাড়িতে লুটপাট চালিয়ে ছিলেন সদর উপজেলা ছাত্রলীগ সম্পাদক আশিকুর রহমান সুজন। তখন তিনিও পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট করে তা সিটি কর্পোরেশনের গাড়িযোগে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যেতেন। জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়েরের নতুন বরিশালে সাদিক অনুসারীদের আধিপত্য নেই, কিন্তু অভিন্ন স্টাইলেই লুটতরাজ চলছে, যা নিয়ে সরব আলোচনা-সমালোচনা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক সন্ত্রাস রোধে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের স্বদিচ্ছাও আছে, তারপরেও কেনো অনুগত কর্মীরা সংঘাত-সংঘর্ষ ও দখল পাল্টা দখলের পথে হাটছে, যা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর হতে বাধ্য করছে। তবে ভীতিগ্রস্ত করে তুলছে নগরবাসীকে।
অবশ্য পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট যে দিন হয়েছিল, সেদিন প্রতিমন্ত্রী রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করছিলেন এবং সিটি মেয়র ওমরাহ পালনে সৌদিতে আছেন। কোতয়ালি পুলিশ বলছে, মাছ লুটপাটের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে, এতে কয়েকজন আছেন নামধারী, বাকিরা অজ্ঞাত। মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। এর বেশি পুলিশ কিছু না জানালেও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কিছু চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে, যার মধ্যে একটি সিটি কর্পোরেশনের পরিবহনে লুটপাটের মাছ বহন করা। এছাড়া এতে রেজভী নামক যুবকের নেতৃত্বে থাকার প্রমাণ ইতিমধ্যে হাতে এসেছে, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্রে এমনটি পরিলক্ষিত হয়।
সূত্র নিশ্চিত করেছে, পত্রিশোর্ধ্ব রেজভী সিটি মেয়র আবুল খায়েরের অনুসারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অসীম দেওয়ানের কর্মী। গুন্ডাবাহিনী নিয়ে পরিবহনের গতিরোধ করে মাছ লুটপাটের ঘটনা রেজভী অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে তাকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে এমন বর্ণনা দিয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজের সম্পৃক্ততা দ্বিতীয়বার অস্বীকার করলেও পরবর্তী বিভিন্ন মহল থেকে এ প্রতিবেদকের কাছে মুঠোফোনে সুপারিশ রাখেন সংবাদটি চেপে যেতে।
এছাড়া পোর্টরোডে সাদিকপন্থী টুটুলকে হঠিয়ে হাবিবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ইজারা দেওয়া ঘাটটি দখল নিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে টুটুল ক্ষুব্ধ, বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বিস্মিত।
মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাবিব ঘাট দখলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক সংবাদমাধ্যমকে বলছেন, ঘাটের বৈধ ইজারাদার নিরব হোসেন টুটুল। কিন্তু তাকে ইজারা তুলতে দেওয়া হচ্ছে না, এমন অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে আলোচনায় আসে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের অনুসারী চরবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত নেতা শহিদুল ইসলাম ওরফে ইতালি শহীদ ভূমি অফিসের জমিতে নিজস্ব অফিস করেছেন। পাশাপাশি তিনি পার্শ্ববর্তী তালতলী বাজারের ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে প্রতিদিন সকালে ৮/১০ হাজার টাকা চাঁদাও উত্তোলন করছেন। এই বাজার থেকে আগে নিরব হোসেন টুটুলের লোকেরা চাঁদা তুলতেন। এনিয়ে সংবাদ হলে ইতালির সেই অফিসটি ভূমি দপ্তর তালাবদ্ধ করে দিলেও বাজারে চাঁদাবাজি চলছেই।
জানতে চাইলে ইতালি শহীদ বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল হয়েছে, আগে টুটুলের লোকজন বাজারটি খেতেন, এখন আমি প্রতিমন্ত্রীর লোক হিসেবে খাই। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে একটি নির্ধারিত হারে টুটুল চাঁদা তুলতেন, সেটি এখন আমি করছি।’
জানা যায়, শহরের পোর্টরোড দখলের পর হাবিব এই ঘাটটিরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শহর রেখে সদর উপজেলার বাজারে আধিপত্য বিস্তার ঘটাতে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়তে পারেন এমন ভাবনায় পিছু হঠেছেন। এর আগে এই ঘাটটি দখল নেওয়া এবং চাঁদাবাজি করতে গিয়ে স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা অসীম দেওয়ান অনুসারী মিলন। তবে শেষ পর্যন্ত বাজারটিতে ইতালি শহীদই চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছেন, এতে ব্যবসায়ী সংক্ষুব্ধ হয়ে বিষয়টি লিখিত আকারে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রসহ স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
দখল পাল্টা দখল নিয়ে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা সংঘাত-সংঘর্ষে শহর উত্তপ্ত করে তুলেছে, স্থানীয় প্রশাসনও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে না। বরং এই অপরাধকে কোনো রুপ প্রশ্রয় না দিয়ে প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করছে পুলিশ। সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিমন্ত্রী-মেয়রও অপরাধে সম্পৃক্ত এমন কারও ব্যক্তি দায়ভার নিতে নারাজ। জনপ্রতিধিদ্বয় মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এও জানিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ কারও নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্ম করছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
নির্বাচন পরবর্তী প্রতিমন্ত্রী এবং মেয়র রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার অব্যাহত চেষ্টা করে গেলেও তাদের গুটিকয়েক কর্মীর বিতর্কিত কর্মকান্ড তাতে জল ঢালতে পারেন বলে অভিমত পাওয়া যায়। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণের একটি ধাপ হলো, রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করা, তা না করা গেলে এই বিপদগামী অংশটি প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের ক্লিন ইমেজকে ম্লান করে দিতে পারে, যেমনটি হয়েছে সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র ক্ষেত্রে। দীর্ঘ সময় দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকা, তদুপরি সিটি মেয়র হয়ে ইতিবাচক কর্মকান্ড অপেক্ষা নানামুখী বিতর্ক তৈরি করে সমালোচিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আ’লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে খেসারত গুণতে হচ্ছে।
সাদিকের সেই বরিশালকে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত শান্তির শহর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন। সেই সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন শহর উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। কিন্তু রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমাতে না পারলে তাদের নিয়েও বিতর্ক তৈরির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ সাদিক আব্দুল্লাহ এবং তার অনুসারীরা ওৎ পেতে আছেন, কখন এই দুই জনপ্রতিনিধির অনুসারীরা বড় ধরনের অঘটনের জন্ম দেয়, তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে জানান দিতে।
এমতাবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত নির্বাচন পূর্বাপর নগরবাসীকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাস রুখে দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনের পর গোটা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এক শ্রেণির বখাটে যুবক, তরুণ, যাদের দলে পদপদবি না থাকলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে মরিয়া হয়ে আছে। আবার কেউ কেউ ইতিমধ্যে বেআইনিভাবে বিভিন্ন হাট-ঘাট ও বাজার দখল দেওয়াসহ বিশেষ স্থানে চাঁদাবাজি করছেন। এতে প্রতিমন্ত্রী মেয়রের এক রকমের বদনাম হচ্ছে। এই অনৈতিক কর্মকান্ড রোহিত করা না গেলে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাবে নগরবাসীর কাছে। সুতরাং কালবিলম্ব না করে এখনই অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আইনি দুই প্রক্রিয়াতে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছে সচেতন মহল।
হাসিবুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।
কদিন পূর্বে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত। এবং গত ৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার আগেও অভিন্ন বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। নির্বাচনে জাহিদ ফারুককে সমর্থন দেওয়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাতও অনুরুপ অঙ্গীকার রেখেছেন নগরবাসীর কাছে। এবং উভয় জনপ্রতিনিধি এও জানিয়ে ছিলেন রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ করাসহ দখল সন্ত্রাস রোধ করে শান্তিময় ‘নতুন বরিশাল’ গড়ে তোলা হবে। স্বচ্ছ-সৎ-আদর্শিক এই দুই জনপ্রতিনিধি নির্বাচন পূর্বাপর দেওয়া তাদের অঙ্গীকার পালনের ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণার মধ্যেও বরিশালে তাদের অনুসারীরা ক্রমাগত অপরাধ পরিক্রমায় জড়িয়ে পড়ছেন। উভয় নেতার অনুসারীরা দলীয় ঘরনার বিরোধীদের হাট-বাজার দখল করাসহ সংঘাত-সংঘর্ষে বরিশাল উত্তপ্ত করে তুলেছেন। এসব ঘটনাবলীতে বরিশালের চার থানা কোতয়ালি, কাউনিয়া, বন্দর এবং বিমানবন্দরে অন্তত ডজনখানে মামলা হলেও নগরবাসী মোটেও স্বস্তিতে নেই। বরং দিনেদিনে আতঙ্ক ক্রমশই বৃদ্ধি করছে, যা প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং সিটি মেয়র আবুল খায়েরের ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা নয়, মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
অভিজ্ঞ মহল বলছেন, কীর্তনখোলা নদীঘেরা জনপদের দুই জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাত ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক। তাদের দুজনের ওপর বরিশাল সিটি ও সদর আসনের জনগণ আস্থা রেখেছেন বলেই তারা সম্প্রতি অনুষ্ঠেয় দুটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন। সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ দুটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হলে মহানগর আওয়ামী লীগ বেকে বসে। কিন্তু তারপরেও নৌকার প্রার্থী সিটিতে আবুল খায়ের এবং সংসদে জাহিদ ফারুক শামীমকেই সাধারণ মানুষ বেচে নিয়েছেন। নির্বাচন পূর্বাপর উভয় জনপ্রতিনিধি অনুরুপ প্রতিশ্রুতি করেছিলেন যে অবহেলিত বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত এবং উন্নত ‘নতুন বরিশাল’। অবশ্য এনিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল শহরবাসী। তবে সংসদ নির্বাচনের পর তাদের কর্মী-অনুসারীদের কয়েকজন বরিশালে দখল পাল্টা দখলের উৎসবে মেতে উঠেছেন। এনিয়ে সংঘাত-রক্তপাতে উত্তপ্ত এবং ক্রমাগতভাবে আতঙ্ক বৃদ্ধি হলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নির্লপ্ত থাকা সমীচীন নয়। বরং শহরবাসীর স্বার্থে এই দুই জনপ্রতিনিধির ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখতে সন্ত্রাস রুখে দিয়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া জরুরি। নতুবা এই সন্ত্রাস প্রতিমন্ত্রী মেয়রের ক্লিন ইমেজে দাগ লাগাবে!, ছাপিয়ে যাবে সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র সময়কার সকল বিতর্কিত কর্মকান্ডের রেকর্ড।
৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে বরিশাল নগরীতে সরকারি বেশ কিছু হাট-বাজার এবং ঘাট দখলের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে সিটি এবং সংসদে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত সাদিক আব্দুল্লাহ অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নেয় প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা। এই দখল প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে দুই পক্ষের হানাহানি খোদ সরকারের একাধিক দপ্তরকে বিপাকে ফেলে দেয়। মেয়র সমর্থিত খান হাবিব বিআইডব্লিউটিএ’র দুটি ঘাট তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন, যা এতদিন মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুলের দখলে ছিল। আলোচ্চ্য টুটুল সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়বাত সাদিক আব্দুল্লাহ সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে সমাধিক পরিচিত। ৫ বছর আগে ২০১৮ সালে তার নেতা সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র হলে অনুরুপভাবে তিনিও হাট-ঘাট-বাজারগুলো এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেন, তখনও সন্ত্রাস-সংঘাতে বরিশাল শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
রাজনৈতিক মহল বলছে, সদরের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক একজন সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতও অভিন্ন চরিত্রের। মহানগর আওয়ামী লীগ তাদের দুজনের নির্বাচনেই উল্টো পথে হেটেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। বরং নৌকার বিরুদ্ধচারণ করায় সাদিকসহ তার অনুসারীরা বিতর্কিত হয়েছেন। এছাড়া ক্ষমতার আমলে তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ওষ্ঠাগত হয়ে খোকন সেরনিয়াবাত এবং জাহিদ ফারুকের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিল। অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তারা নৌকা নিয়ে বৈতরণী পার হয়েছেন, নগরবাসী তাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দুই জনপ্রতিনিধি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে যখন আধাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন, তখনই গুটিকয়ে কর্মী তাদের এমন উদ্যোগ এবং প্রসংশনীয় কর্ম অপেক্ষা বিতর্ক বেশি তৈরি করেছে দখল সন্ত্রাসের জানান দিয়ে।
জানা যায়, কদিন পূর্বে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত দপদপিয়া ব্রিজের টোলপ্লাজায় আসা একটি যাত্রীবাহী পরিবহন থেকে পটুয়াখালীর ব্যবসায়ীদের মাছ লুটপাট করে সিটি মেয়র অনুসারী কথিত ছাত্র-যুবলীগ নেতাকর্মীরা। বিতর্কিত যুবক রেজভীর নেতৃত্বে মাছগুলো লুটপাট শেষে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িতে করে তা নিয়ে যাওয়া হয় শহরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পোর্টরোডে এবং কাশিপুরে। দুটি স্থানে মাছগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পটুয়াখালীর ওই ব্যবসায়ী বাদী হয়ে বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও নেতৃত্বদানকারী রেজভী আছেন বহাল তবিয়তে।
পুলিশ এই আলোচিত মামলাটি নিয়ে কাজ করছে এবং তদন্ত করতে গিয়ে যা পেয়েছে, পাচ্ছে তা শুনলে অনেকের চক্ষু চড়কগাছ। সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র আমলে অনুরুপ মাছের গাড়িতে লুটপাট চালিয়ে ছিলেন সদর উপজেলা ছাত্রলীগ সম্পাদক আশিকুর রহমান সুজন। তখন তিনিও পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট করে তা সিটি কর্পোরেশনের গাড়িযোগে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যেতেন। জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়েরের নতুন বরিশালে সাদিক অনুসারীদের আধিপত্য নেই, কিন্তু অভিন্ন স্টাইলেই লুটতরাজ চলছে, যা নিয়ে সরব আলোচনা-সমালোচনা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক সন্ত্রাস রোধে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের স্বদিচ্ছাও আছে, তারপরেও কেনো অনুগত কর্মীরা সংঘাত-সংঘর্ষ ও দখল পাল্টা দখলের পথে হাটছে, যা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর হতে বাধ্য করছে। তবে ভীতিগ্রস্ত করে তুলছে নগরবাসীকে।
অবশ্য পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট যে দিন হয়েছিল, সেদিন প্রতিমন্ত্রী রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করছিলেন এবং সিটি মেয়র ওমরাহ পালনে সৌদিতে আছেন। কোতয়ালি পুলিশ বলছে, মাছ লুটপাটের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে, এতে কয়েকজন আছেন নামধারী, বাকিরা অজ্ঞাত। মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। এর বেশি পুলিশ কিছু না জানালেও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কিছু চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে, যার মধ্যে একটি সিটি কর্পোরেশনের পরিবহনে লুটপাটের মাছ বহন করা। এছাড়া এতে রেজভী নামক যুবকের নেতৃত্বে থাকার প্রমাণ ইতিমধ্যে হাতে এসেছে, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্রে এমনটি পরিলক্ষিত হয়।
সূত্র নিশ্চিত করেছে, পত্রিশোর্ধ্ব রেজভী সিটি মেয়র আবুল খায়েরের অনুসারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অসীম দেওয়ানের কর্মী। গুন্ডাবাহিনী নিয়ে পরিবহনের গতিরোধ করে মাছ লুটপাটের ঘটনা রেজভী অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে তাকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে এমন বর্ণনা দিয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজের সম্পৃক্ততা দ্বিতীয়বার অস্বীকার করলেও পরবর্তী বিভিন্ন মহল থেকে এ প্রতিবেদকের কাছে মুঠোফোনে সুপারিশ রাখেন সংবাদটি চেপে যেতে।
এছাড়া পোর্টরোডে সাদিকপন্থী টুটুলকে হঠিয়ে হাবিবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ইজারা দেওয়া ঘাটটি দখল নিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে টুটুল ক্ষুব্ধ, বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বিস্মিত।
মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাবিব ঘাট দখলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক সংবাদমাধ্যমকে বলছেন, ঘাটের বৈধ ইজারাদার নিরব হোসেন টুটুল। কিন্তু তাকে ইজারা তুলতে দেওয়া হচ্ছে না, এমন অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে আলোচনায় আসে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের অনুসারী চরবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত নেতা শহিদুল ইসলাম ওরফে ইতালি শহীদ ভূমি অফিসের জমিতে নিজস্ব অফিস করেছেন। পাশাপাশি তিনি পার্শ্ববর্তী তালতলী বাজারের ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে প্রতিদিন সকালে ৮/১০ হাজার টাকা চাঁদাও উত্তোলন করছেন। এই বাজার থেকে আগে নিরব হোসেন টুটুলের লোকেরা চাঁদা তুলতেন। এনিয়ে সংবাদ হলে ইতালির সেই অফিসটি ভূমি দপ্তর তালাবদ্ধ করে দিলেও বাজারে চাঁদাবাজি চলছেই।
জানতে চাইলে ইতালি শহীদ বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল হয়েছে, আগে টুটুলের লোকজন বাজারটি খেতেন, এখন আমি প্রতিমন্ত্রীর লোক হিসেবে খাই। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে একটি নির্ধারিত হারে টুটুল চাঁদা তুলতেন, সেটি এখন আমি করছি।’
জানা যায়, শহরের পোর্টরোড দখলের পর হাবিব এই ঘাটটিরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শহর রেখে সদর উপজেলার বাজারে আধিপত্য বিস্তার ঘটাতে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়তে পারেন এমন ভাবনায় পিছু হঠেছেন। এর আগে এই ঘাটটি দখল নেওয়া এবং চাঁদাবাজি করতে গিয়ে স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা অসীম দেওয়ান অনুসারী মিলন। তবে শেষ পর্যন্ত বাজারটিতে ইতালি শহীদই চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছেন, এতে ব্যবসায়ী সংক্ষুব্ধ হয়ে বিষয়টি লিখিত আকারে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রসহ স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
দখল পাল্টা দখল নিয়ে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা সংঘাত-সংঘর্ষে শহর উত্তপ্ত করে তুলেছে, স্থানীয় প্রশাসনও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে না। বরং এই অপরাধকে কোনো রুপ প্রশ্রয় না দিয়ে প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করছে পুলিশ। সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিমন্ত্রী-মেয়রও অপরাধে সম্পৃক্ত এমন কারও ব্যক্তি দায়ভার নিতে নারাজ। জনপ্রতিধিদ্বয় মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এও জানিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ কারও নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্ম করছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
নির্বাচন পরবর্তী প্রতিমন্ত্রী এবং মেয়র রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার অব্যাহত চেষ্টা করে গেলেও তাদের গুটিকয়েক কর্মীর বিতর্কিত কর্মকান্ড তাতে জল ঢালতে পারেন বলে অভিমত পাওয়া যায়। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণের একটি ধাপ হলো, রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করা, তা না করা গেলে এই বিপদগামী অংশটি প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের ক্লিন ইমেজকে ম্লান করে দিতে পারে, যেমনটি হয়েছে সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র ক্ষেত্রে। দীর্ঘ সময় দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকা, তদুপরি সিটি মেয়র হয়ে ইতিবাচক কর্মকান্ড অপেক্ষা নানামুখী বিতর্ক তৈরি করে সমালোচিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আ’লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে খেসারত গুণতে হচ্ছে।
সাদিকের সেই বরিশালকে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত শান্তির শহর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন। সেই সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন শহর উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। কিন্তু রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমাতে না পারলে তাদের নিয়েও বিতর্ক তৈরির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ সাদিক আব্দুল্লাহ এবং তার অনুসারীরা ওৎ পেতে আছেন, কখন এই দুই জনপ্রতিনিধির অনুসারীরা বড় ধরনের অঘটনের জন্ম দেয়, তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে জানান দিতে।
এমতাবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত নির্বাচন পূর্বাপর নগরবাসীকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাস রুখে দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনের পর গোটা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এক শ্রেণির বখাটে যুবক, তরুণ, যাদের দলে পদপদবি না থাকলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে মরিয়া হয়ে আছে। আবার কেউ কেউ ইতিমধ্যে বেআইনিভাবে বিভিন্ন হাট-ঘাট ও বাজার দখল দেওয়াসহ বিশেষ স্থানে চাঁদাবাজি করছেন। এতে প্রতিমন্ত্রী মেয়রের এক রকমের বদনাম হচ্ছে। এই অনৈতিক কর্মকান্ড রোহিত করা না গেলে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাবে নগরবাসীর কাছে। সুতরাং কালবিলম্ব না করে এখনই অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আইনি দুই প্রক্রিয়াতে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছে সচেতন মহল।
হাসিবুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।

০৩ জুন, ২০২৬ ১২:১০
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে বাগেরহাটে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। ইসলাম প্রচার করতে এসে তিনি সেখানে সুপেয় পানির অভাবে মসজিদের পাশে খনন করেছিলেন প্রায় ২০০ একর আয়তনের বিশালাকৃতির একটি দিঘি। নিজের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি নদীর দুইটি কুমির এনে মিঠা পানির দিঘিতে বন্দী করেছিলেন। ভালোবেসে তাদের নামকরণ করেছিলেন কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নামে। তাঁর জীবদ্দশায় কুমির দুটি তাঁর হাতের ইশারায় চলতো। তিনি নাম ধরে ডাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে পাহাড়ের মতো তারা ভেসে উঠতো এবং মানুষের কাছে আসতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কালাপাহাড় পুরুষ এবং ধলাপাহাড় নারী কুমির হওয়ায় তারা দিঘিতে বেশকিছু বাচ্চা জন্ম দিয়েছিল। খানজাহান আলীর (রহ.) মৃত্যুর পরেও সেই কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধররা কয়েকশো বছর ধরে এই দিঘিতে বেঁচেছিল।
পরবর্তীকালে অযত্ন-অবহেলা, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা আর খাদ্যের অভাবে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বাচ্চা কুমিরগুলো একে একে মারা যেতে শুরু করে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর দিঘি। এতে মাজার ব্যবসায় ধ্বস নামে। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে নতুন ৩টি কুমির কিনে এনে খানজাহান আলীর দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। ঐতিহ্যের নামে মূলতঃ মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ। কিন্তু পরিচর্যার অভাব ও খাদ্য সংকটে ২টি কুমির মারা যায়। দিঘিতে অবশিষ্ট একটা কুমির টিকে থাকে। এই কুমিরের সাথে হযরত খানজাহান আলী (রহ.), তাঁর বংশধর কিংবা তাঁর আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাজার ব্যবসায়ী একদল ভন্ডের সাথে এই কুমিরের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আগত ভক্ত মাজার পূজারীরা আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আশায় কুমিরের জন্য টাকা দেয়, খাবার দেয়। খাবার হিসেবে মুরগি, ছাগল এবং মাংস কিনে দেয়। তবে সেগুলো কুমিরের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। কুমিরের মুখের সামনে থেকে ঘুরিয়ে এনে সেগুলো আবার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। মাজারের কাছে গড়ে উঠেছে আগরবাতি, মোমবাতি, তাগা, ফিতা, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁকসহ রকমারি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলে সেখানে চলছে নানান প্রতারণা আর পর্যটকদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। মাজার থেকে আয় হওয়া টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়। এই মাজার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত মাজারের খাদেম, স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কিছু মাদকসেবী, সরকার দলীয় কতিপয় নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি।
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল আর বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আমার উদাত্ত আহবান এবং বিনীত অনুরোধ থাকবে- দিঘির এই কুমিরকে অনতিবিলম্বে মিরপুরের চিড়িয়াখানা, চট্টগ্রামের কুমির প্রজনন কেন্দ্র কিংবা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে অবমুক্ত করা হোক। একটি মাংসাশী হিংস্র প্রাণিকে কোনো অবস্থাতেই একটি লোকালয়ের দর্শনীয় স্থানে রাখা যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে যেমন মানুষ শিরক করার মতো পাপাচারে লিপ্ত হবে, অন্যদিকে ফাতেমার মতো অনাথ পথশিশুরা কুমিরের খাদ্যবস্তুতে পরিনত হবে। আমার অনুসন্ধান করা এই ভেতরের গল্পটা দেশের ৯৯% মানুষ জানে না। অনেকেই ভক্তি সহকারে এই কুমিরের কাছে মানত করে। হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) প্রতিনিধি মনে করে। সরল বিশ্বাসী ধর্মভীরু এসব মানুষকে জেনেশুনে ধোঁকা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
তাছাড়া হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) আমলে ছেড়ে দেওয়া কুমির কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধরেরা কখনো কাউকে আক্রমণ করার ইতিহাস নেই। তবে ভারত থেকে আনা এই কুমিরটি বারবার হিংস্র আচরণ করছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এই কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিঘির প্রধান ঘাটে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ কুমিরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমণ করেছিল হিংস্র স্বভাবের মাদ্রাজি এই কুমির। ২০০৯ সালে মাজারে মানত করতে আসা এক মায়ের হাত থেকে তার শিশু সন্তানকে প্রথম এই কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরে দিঘির মাঝখানে শিশুটির মৃতদেহ ভেসে ওঠে। গতকাল এর সর্বশেষ আক্রমণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে মাজারে আশ্রিত ৭ বছরের অনাথ পথশিশু ফাতেমা আক্তার। কুমিরের আক্রমণে একের পর এক এসব হতাহতের ঘটনা ঘটলেও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, তাদের কাছে মাজার আর কুমির ব্যবসাই ছিল মুখ্য। পরিশেষে বলতে চাই- ভন্ডদের মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেখানে ভিনদেশ থেকে কিনে আনা কুমির পালনের কোনো প্রয়োজন নেই। অনাথ ফাতেমার জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে অন্তত মাজারের কুমির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হোক। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও সুশাসনকর্মী।
২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে বাগেরহাটে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। ইসলাম প্রচার করতে এসে তিনি সেখানে সুপেয় পানির অভাবে মসজিদের পাশে খনন করেছিলেন প্রায় ২০০ একর আয়তনের বিশালাকৃতির একটি দিঘি। নিজের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি নদীর দুইটি কুমির এনে মিঠা পানির দিঘিতে বন্দী করেছিলেন। ভালোবেসে তাদের নামকরণ করেছিলেন কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নামে। তাঁর জীবদ্দশায় কুমির দুটি তাঁর হাতের ইশারায় চলতো। তিনি নাম ধরে ডাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে পাহাড়ের মতো তারা ভেসে উঠতো এবং মানুষের কাছে আসতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কালাপাহাড় পুরুষ এবং ধলাপাহাড় নারী কুমির হওয়ায় তারা দিঘিতে বেশকিছু বাচ্চা জন্ম দিয়েছিল। খানজাহান আলীর (রহ.) মৃত্যুর পরেও সেই কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধররা কয়েকশো বছর ধরে এই দিঘিতে বেঁচেছিল।
পরবর্তীকালে অযত্ন-অবহেলা, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা আর খাদ্যের অভাবে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বাচ্চা কুমিরগুলো একে একে মারা যেতে শুরু করে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর দিঘি। এতে মাজার ব্যবসায় ধ্বস নামে। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে নতুন ৩টি কুমির কিনে এনে খানজাহান আলীর দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। ঐতিহ্যের নামে মূলতঃ মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ। কিন্তু পরিচর্যার অভাব ও খাদ্য সংকটে ২টি কুমির মারা যায়। দিঘিতে অবশিষ্ট একটা কুমির টিকে থাকে। এই কুমিরের সাথে হযরত খানজাহান আলী (রহ.), তাঁর বংশধর কিংবা তাঁর আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাজার ব্যবসায়ী একদল ভন্ডের সাথে এই কুমিরের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আগত ভক্ত মাজার পূজারীরা আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আশায় কুমিরের জন্য টাকা দেয়, খাবার দেয়। খাবার হিসেবে মুরগি, ছাগল এবং মাংস কিনে দেয়। তবে সেগুলো কুমিরের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। কুমিরের মুখের সামনে থেকে ঘুরিয়ে এনে সেগুলো আবার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। মাজারের কাছে গড়ে উঠেছে আগরবাতি, মোমবাতি, তাগা, ফিতা, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁকসহ রকমারি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলে সেখানে চলছে নানান প্রতারণা আর পর্যটকদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। মাজার থেকে আয় হওয়া টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়। এই মাজার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত মাজারের খাদেম, স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কিছু মাদকসেবী, সরকার দলীয় কতিপয় নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি।
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল আর বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আমার উদাত্ত আহবান এবং বিনীত অনুরোধ থাকবে- দিঘির এই কুমিরকে অনতিবিলম্বে মিরপুরের চিড়িয়াখানা, চট্টগ্রামের কুমির প্রজনন কেন্দ্র কিংবা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে অবমুক্ত করা হোক। একটি মাংসাশী হিংস্র প্রাণিকে কোনো অবস্থাতেই একটি লোকালয়ের দর্শনীয় স্থানে রাখা যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে যেমন মানুষ শিরক করার মতো পাপাচারে লিপ্ত হবে, অন্যদিকে ফাতেমার মতো অনাথ পথশিশুরা কুমিরের খাদ্যবস্তুতে পরিনত হবে। আমার অনুসন্ধান করা এই ভেতরের গল্পটা দেশের ৯৯% মানুষ জানে না। অনেকেই ভক্তি সহকারে এই কুমিরের কাছে মানত করে। হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) প্রতিনিধি মনে করে। সরল বিশ্বাসী ধর্মভীরু এসব মানুষকে জেনেশুনে ধোঁকা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
তাছাড়া হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) আমলে ছেড়ে দেওয়া কুমির কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধরেরা কখনো কাউকে আক্রমণ করার ইতিহাস নেই। তবে ভারত থেকে আনা এই কুমিরটি বারবার হিংস্র আচরণ করছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এই কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিঘির প্রধান ঘাটে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ কুমিরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমণ করেছিল হিংস্র স্বভাবের মাদ্রাজি এই কুমির। ২০০৯ সালে মাজারে মানত করতে আসা এক মায়ের হাত থেকে তার শিশু সন্তানকে প্রথম এই কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরে দিঘির মাঝখানে শিশুটির মৃতদেহ ভেসে ওঠে। গতকাল এর সর্বশেষ আক্রমণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে মাজারে আশ্রিত ৭ বছরের অনাথ পথশিশু ফাতেমা আক্তার। কুমিরের আক্রমণে একের পর এক এসব হতাহতের ঘটনা ঘটলেও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, তাদের কাছে মাজার আর কুমির ব্যবসাই ছিল মুখ্য। পরিশেষে বলতে চাই- ভন্ডদের মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেখানে ভিনদেশ থেকে কিনে আনা কুমির পালনের কোনো প্রয়োজন নেই। অনাথ ফাতেমার জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে অন্তত মাজারের কুমির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হোক। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও সুশাসনকর্মী।
২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।

০১ জুন, ২০২৬ ২০:৪৩
📌 নশ্বর পৃথিবীর এটাই নিয়ম—সব আলোকেই একদিন মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে হয়। কিন্তু কিছু জীবন নিভে যাওয়ার পরও তার আভা রেখে যায় শতাব্দীর দিগন্তে। ১ জুন, ২০২৬, সোমবার; ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল সাড়ে ৩টা। চারদিকের প্রখর রোদ যখন ম্লান হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম চালিকাশক্তি ও অবিসংবাদিত নেতা তোফায়েল আহমেদ। আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম রূপকার, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মহানায়ক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এই সহচরের প্রস্থান কেবল একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের বিদায় নয়; বরং এটি রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের একটি জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ অধ্যায়ের মহাপ্রস্থান। চিরচেনা সেই শুভ্র পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোটে আবৃত, হাত নেড়ে উত্তাল জনসমুদ্রকে জাগ্রত করা রাজপথের সেই সিংহপুরুষ আর কোনোদিন আমাদের মাঝে ফিরবেন না।
এই দূরদর্শী নেতার জীবন ও রাজনীতির পরিক্রমা শুরু হয়েছিল নদী-বিধৌত ভোলার পললভূমিতে। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা আজাহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল ও খায়েরহাট জুনিয়র হাইস্কুলে প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি বোরহানউদ্দিন হাইস্কুলে লজিং থেকে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ভোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ১৯৬০ সালে বিজ্ঞান শাখায় ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি ভর্তি হন বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৬ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে অধ্যায়নকালেই তোফায়েল আহমেদের সাংগঠনিক প্রতিভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। ১৯৬২ সালে তিনি বিপুল ভোটে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অর্জনের পর তাঁর নেতৃত্বের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রাখার পর, ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর, ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মহাসময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন এবং তৎকালীন ছাত্রসমাজকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তরিত করেন।
তোফায়েল আহমেদ ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস যেন একই সুতোয় গাঁথা। তাঁর রাজনীতির প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে, যখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ভোলা সরকারি কলেজ মাঠে এক উপনির্বাচনের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তৎকালীন তরুণ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা তাঁর কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। সেদিনই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, রাজনীতি করলে এই নেতার রাজনীতিই করবেন। সেই থেকে শুরু করে বাঙালির মুক্তিসনদ ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে অনন্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের পর জুনের ঐতিহাসিক ছয় দফার হরতালে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯৬৮ সালের স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের দমনপীড়নের মুখে তিনি কারাবরণ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রদীপ্ত অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন ফাঁসি দেয়ার চক্রান্ত চলছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) ও ডাকসুর সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁরই অনলবর্ষী নেতৃত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও অবিচল গণলড়াইয়ের মুখে আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদই প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে বাঙালি জাতির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে সুনির্দিষ্ট রূপ দেন।
ছাত্ররাজনীতির এই বিপুল জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন, যা তাঁকে তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের তালিকায় স্থান করে দেয়। এর ঠিক আগে, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপদ্বুত শাহবাজপুর (ভোলা) ও উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্গত মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাঁর অকুতোভয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন তৎপরতা মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী করে দেয়। স্বাধীনতার পর, ১৯৭৫ সালে একক জাতীয় দল 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) গঠিত হলে তোফায়েল আহমেদ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন। একই সাথে বাকশালের অন্যতম প্রধান অঙ্গসংগঠন 'জাতীয় যুব লীগ'-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেশের যুব সমাজকে দেশ পুনর্গঠনের কাজে সংগঠিত করার গুরুদায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রামে তাঁর রণকৌশল, বীরত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল এক চিরন্তন বিস্ময়। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বীরত্বপূর্ণ মুজিব বাহিনীর (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস - বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের অন্যতম। এর পাশাপাশি, যুদ্ধের অন্যতম কৌশলগত ও ঝুঁকিপূর্ণ '১০ নম্বর সেক্টর' (নৌ-কমান্ডো) গঠনে এবং শত্রুপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া ঐতিহাসিক 'অপারেশন জ্যাকপট'-এর মতো জলযুদ্ধের নেপথ্য রূপকার হিসেবে তাঁর প্রাজ্ঞ রণকৌশল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। একই সাথে প্রবাসী সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের কাছে বাঙালির ন্যায্য অধিকারের দাবি ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তিনি অনন্য ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন।
স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পর, ১৯৭২ সালে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) গুরুদায়িত্ব লাভ করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রির নির্মমতম ট্র্যাজেডির পর যখন দেশের রাজনৈতিক আকাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়, তখন নেমে আসে তাঁর ওপর অমানুষিক রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। সামরিক জান্তার শাসনামলে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হলেও তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ, সততা ও বঙ্গবন্ধুর চেতনার প্রশ্নে একচুলও আপস করেননি। পরবর্তীতে যখন আওয়ামী লীগ চরম নেতৃত্বসংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তৃণমূল পর্যায়ে দলকে টিকিয়ে রাখতে এবং ১৯৮১ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, নীতি নির্ধারণ ও শৃঙ্খলা সুদৃঢ় করতে তিনি অন্যতম জ্যেষ্ঠ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে তিনি দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সুদীর্ঘকাল অবদান করেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক কিংবদন্তি পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নিজ জন্মভূমি ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন আসন থেকে তিনি মোট ৯ বার বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। দেশের প্রতিটি জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে সংসদে তাঁর উত্থাপিত জোরালো, যুক্তিপূর্ণ ও দালিলিক উপাত্ত সমৃদ্ধ বক্তব্য সমগ্র জাতিকে দিকনির্দেশনা দিত। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফল, দূরদর্শী ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের মেয়াদে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁরই দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশের 'জিএসপি সুবিধা' নিশ্চিতকরণ এবং মার্কিন বাজারে কোটা সুবিধা সম্প্রসারণে তাঁর যুগান্তকারী অর্থনৈতিক কূটনীতি দেশের অর্থনীতির ভিতকে বিশ্বমঞ্চে মজবুত করেছিল। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা আদায়ে তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
ভোলার মেঠোপথ থেকে উঠে এসে ঢাকার রাজপথ, উত্তাল গণআন্দোলন আর সংসদের মাইক কাঁপানো সেই চিরপরিচিত প্রাজ্ঞ কণ্ঠটি আজ চিরতরে নীরব হয়ে গেল! দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার 'তোফায়েল ভাই'। তাঁর এই চিরবিদায় দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান হলো সত্য, কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে তোফায়েল আহমেদের নাম কখনো মুছে যাবার নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস যতকাল থাকবে, ততকাল তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর দেয়া অমর উপাধিতে এবং লাল-সবুজের পতাকায়।
এই মহান বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, ভোলার আপামর জনতা ও দেশ-বিদেশে থাকা লাখো অনুসারীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। ভালো থাকবেন ওপারে, হে ইতিহাসের মহান সারথি। স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র আপনাকে চিরকাল পরম শ্রদ্ধায় বুকে ধারণ করে রাখবে।
📌 বাহাউদ্দিন গোলাপ,
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
📌 নশ্বর পৃথিবীর এটাই নিয়ম—সব আলোকেই একদিন মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে হয়। কিন্তু কিছু জীবন নিভে যাওয়ার পরও তার আভা রেখে যায় শতাব্দীর দিগন্তে। ১ জুন, ২০২৬, সোমবার; ঘড়ির কাঁটায় তখন বিকেল সাড়ে ৩টা। চারদিকের প্রখর রোদ যখন ম্লান হতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম চালিকাশক্তি ও অবিসংবাদিত নেতা তোফায়েল আহমেদ। আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম রূপকার, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মহানায়ক এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এই সহচরের প্রস্থান কেবল একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের বিদায় নয়; বরং এটি রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের একটি জীবন্ত ও প্রত্যক্ষ অধ্যায়ের মহাপ্রস্থান। চিরচেনা সেই শুভ্র পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোটে আবৃত, হাত নেড়ে উত্তাল জনসমুদ্রকে জাগ্রত করা রাজপথের সেই সিংহপুরুষ আর কোনোদিন আমাদের মাঝে ফিরবেন না।
এই দূরদর্শী নেতার জীবন ও রাজনীতির পরিক্রমা শুরু হয়েছিল নদী-বিধৌত ভোলার পললভূমিতে। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা আজাহার আলী ও মাতা ফাতেমা খানম। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল ও খায়েরহাট জুনিয়র হাইস্কুলে প্রাথমিক পাঠ শেষে তিনি বোরহানউদ্দিন হাইস্কুলে লজিং থেকে পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ভোলা সরকারি হাইস্কুল থেকে ১৯৬০ সালে বিজ্ঞান শাখায় ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে তিনি ভর্তি হন বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ব্রজমোহন (বিএম) কলেজে। এই কলেজ থেকেই তিনি ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৬৬ সালে তিনি কৃতিত্বের সাথে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।
বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে অধ্যায়নকালেই তোফায়েল আহমেদের সাংগঠনিক প্রতিভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিকাশ ঘটে। ১৯৬২ সালে তিনি বিপুল ভোটে বিএম কলেজ ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অর্জনের পর তাঁর নেতৃত্বের চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা রাখার পর, ১৯৬৬-৬৭ মেয়াদে তিনি তৎকালীন ইকবাল হলের ভিপি নির্বাচিত হন। এরপর, ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মহাসময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নির্বাচিত হন এবং তৎকালীন ছাত্রসমাজকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তরিত করেন।
তোফায়েল আহমেদ ও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস যেন একই সুতোয় গাঁথা। তাঁর রাজনীতির প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে, যখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ভোলা সরকারি কলেজ মাঠে এক উপনির্বাচনের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও তৎকালীন তরুণ আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা তাঁর কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। সেদিনই তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, রাজনীতি করলে এই নেতার রাজনীতিই করবেন। সেই থেকে শুরু করে বাঙালির মুক্তিসনদ ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলনে তিনি ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করতে অনন্য ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তারের পর জুনের ঐতিহাসিক ছয় দফার হরতালে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯৬৮ সালের স্বৈরাচারী আইয়ুব সরকারের দমনপীড়নের মুখে তিনি কারাবরণ করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে প্রদীপ্ত অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন ফাঁসি দেয়ার চক্রান্ত চলছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) ও ডাকসুর সমন্বয়ে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ডাক দেন। তাঁরই অনলবর্ষী নেতৃত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তীব্র ছাত্র আন্দোলন ও অবিচল গণলড়াইয়ের মুখে আইয়ুব সরকার বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লাখো জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদই প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করে বাঙালি জাতির আবেগ ও আকাঙ্ক্ষাকে সুনির্দিষ্ট রূপ দেন।
ছাত্ররাজনীতির এই বিপুল জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে তোফায়েল আহমেদ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেন, যা তাঁকে তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের তালিকায় স্থান করে দেয়। এর ঠিক আগে, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর উপদ্বুত শাহবাজপুর (ভোলা) ও উপকূলীয় অঞ্চলের দুর্গত মানুষের মাঝে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাঁর অকুতোভয় ত্রাণ ও পুনর্বাসন তৎপরতা মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী করে দেয়। স্বাধীনতার পর, ১৯৭৫ সালে একক জাতীয় দল 'বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ' (বাকশাল) গঠিত হলে তোফায়েল আহমেদ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মনোনীত হন। একই সাথে বাকশালের অন্যতম প্রধান অঙ্গসংগঠন 'জাতীয় যুব লীগ'-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেশের যুব সমাজকে দেশ পুনর্গঠনের কাজে সংগঠিত করার গুরুদায়িত্ব লাভ করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিসংগ্রামে তাঁর রণকৌশল, বীরত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল এক চিরন্তন বিস্ময়। স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বীরত্বপূর্ণ মুজিব বাহিনীর (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস - বিএলএফ) অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার প্রধানের অন্যতম। এর পাশাপাশি, যুদ্ধের অন্যতম কৌশলগত ও ঝুঁকিপূর্ণ '১০ নম্বর সেক্টর' (নৌ-কমান্ডো) গঠনে এবং শত্রুপক্ষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া ঐতিহাসিক 'অপারেশন জ্যাকপট'-এর মতো জলযুদ্ধের নেপথ্য রূপকার হিসেবে তাঁর প্রাজ্ঞ রণকৌশল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। একই সাথে প্রবাসী সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং বিশ্ব গণমাধ্যমের কাছে বাঙালির ন্যায্য অধিকারের দাবি ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তিনি অনন্য ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন।
স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের পর, ১৯৭২ সালে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) গুরুদায়িত্ব লাভ করেন এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর ছায়াসঙ্গী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাত্রির নির্মমতম ট্র্যাজেডির পর যখন দেশের রাজনৈতিক আকাশ ঘন অন্ধকারে ছেয়ে যায়, তখন নেমে আসে তাঁর ওপর অমানুষিক রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। সামরিক জান্তার শাসনামলে দীর্ঘ সময় কারাবরণ করতে হলেও তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ, সততা ও বঙ্গবন্ধুর চেতনার প্রশ্নে একচুলও আপস করেননি। পরবর্তীতে যখন আওয়ামী লীগ চরম নেতৃত্বসংকট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তৃণমূল পর্যায়ে দলকে টিকিয়ে রাখতে এবং ১৯৮১ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, নীতি নির্ধারণ ও শৃঙ্খলা সুদৃঢ় করতে তিনি অন্যতম জ্যেষ্ঠ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম তথা প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে তিনি দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সুদীর্ঘকাল অবদান করেছিলেন।
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক কিংবদন্তি পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নিজ জন্মভূমি ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন আসন থেকে তিনি মোট ৯ বার বিপুল ভোটে জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। দেশের প্রতিটি জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে সংসদে তাঁর উত্থাপিত জোরালো, যুক্তিপূর্ণ ও দালিলিক উপাত্ত সমৃদ্ধ বক্তব্য সমগ্র জাতিকে দিকনির্দেশনা দিত। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফল, দূরদর্শী ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের মেয়াদে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁরই দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বাংলাদেশের 'জিএসপি সুবিধা' নিশ্চিতকরণ এবং মার্কিন বাজারে কোটা সুবিধা সম্প্রসারণে তাঁর যুগান্তকারী অর্থনৈতিক কূটনীতি দেশের অর্থনীতির ভিতকে বিশ্বমঞ্চে মজবুত করেছিল। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা আদায়ে তাঁর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।
ভোলার মেঠোপথ থেকে উঠে এসে ঢাকার রাজপথ, উত্তাল গণআন্দোলন আর সংসদের মাইক কাঁপানো সেই চিরপরিচিত প্রাজ্ঞ কণ্ঠটি আজ চিরতরে নীরব হয়ে গেল! দলমত নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার 'তোফায়েল ভাই'। তাঁর এই চিরবিদায় দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একটি গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান হলো সত্য, কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে তোফায়েল আহমেদের নাম কখনো মুছে যাবার নয়। বাংলাদেশের ইতিহাস যতকাল থাকবে, ততকাল তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, তাঁর দেয়া অমর উপাধিতে এবং লাল-সবুজের পতাকায়।
এই মহান বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির প্রতি গভীরতম শ্রদ্ধা নিবেদন করি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, ভোলার আপামর জনতা ও দেশ-বিদেশে থাকা লাখো অনুসারীর প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। ভালো থাকবেন ওপারে, হে ইতিহাসের মহান সারথি। স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র আপনাকে চিরকাল পরম শ্রদ্ধায় বুকে ধারণ করে রাখবে।
📌 বাহাউদ্দিন গোলাপ,
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

০১ মে, ২০২৬ ১৫:৫৭
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)