
২৯ মে, ২০২৫ ১৬:১৩
কদিন পূর্বে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত। এবং গত ৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার আগেও অভিন্ন বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। নির্বাচনে জাহিদ ফারুককে সমর্থন দেওয়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাতও অনুরুপ অঙ্গীকার রেখেছেন নগরবাসীর কাছে। এবং উভয় জনপ্রতিনিধি এও জানিয়ে ছিলেন রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ করাসহ দখল সন্ত্রাস রোধ করে শান্তিময় ‘নতুন বরিশাল’ গড়ে তোলা হবে। স্বচ্ছ-সৎ-আদর্শিক এই দুই জনপ্রতিনিধি নির্বাচন পূর্বাপর দেওয়া তাদের অঙ্গীকার পালনের ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণার মধ্যেও বরিশালে তাদের অনুসারীরা ক্রমাগত অপরাধ পরিক্রমায় জড়িয়ে পড়ছেন। উভয় নেতার অনুসারীরা দলীয় ঘরনার বিরোধীদের হাট-বাজার দখল করাসহ সংঘাত-সংঘর্ষে বরিশাল উত্তপ্ত করে তুলেছেন। এসব ঘটনাবলীতে বরিশালের চার থানা কোতয়ালি, কাউনিয়া, বন্দর এবং বিমানবন্দরে অন্তত ডজনখানে মামলা হলেও নগরবাসী মোটেও স্বস্তিতে নেই। বরং দিনেদিনে আতঙ্ক ক্রমশই বৃদ্ধি করছে, যা প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং সিটি মেয়র আবুল খায়েরের ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা নয়, মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
অভিজ্ঞ মহল বলছেন, কীর্তনখোলা নদীঘেরা জনপদের দুই জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাত ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক। তাদের দুজনের ওপর বরিশাল সিটি ও সদর আসনের জনগণ আস্থা রেখেছেন বলেই তারা সম্প্রতি অনুষ্ঠেয় দুটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন। সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ দুটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হলে মহানগর আওয়ামী লীগ বেকে বসে। কিন্তু তারপরেও নৌকার প্রার্থী সিটিতে আবুল খায়ের এবং সংসদে জাহিদ ফারুক শামীমকেই সাধারণ মানুষ বেচে নিয়েছেন। নির্বাচন পূর্বাপর উভয় জনপ্রতিনিধি অনুরুপ প্রতিশ্রুতি করেছিলেন যে অবহেলিত বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত এবং উন্নত ‘নতুন বরিশাল’। অবশ্য এনিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল শহরবাসী। তবে সংসদ নির্বাচনের পর তাদের কর্মী-অনুসারীদের কয়েকজন বরিশালে দখল পাল্টা দখলের উৎসবে মেতে উঠেছেন। এনিয়ে সংঘাত-রক্তপাতে উত্তপ্ত এবং ক্রমাগতভাবে আতঙ্ক বৃদ্ধি হলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নির্লপ্ত থাকা সমীচীন নয়। বরং শহরবাসীর স্বার্থে এই দুই জনপ্রতিনিধির ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখতে সন্ত্রাস রুখে দিয়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া জরুরি। নতুবা এই সন্ত্রাস প্রতিমন্ত্রী মেয়রের ক্লিন ইমেজে দাগ লাগাবে!, ছাপিয়ে যাবে সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র সময়কার সকল বিতর্কিত কর্মকান্ডের রেকর্ড।
৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে বরিশাল নগরীতে সরকারি বেশ কিছু হাট-বাজার এবং ঘাট দখলের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে সিটি এবং সংসদে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত সাদিক আব্দুল্লাহ অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নেয় প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা। এই দখল প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে দুই পক্ষের হানাহানি খোদ সরকারের একাধিক দপ্তরকে বিপাকে ফেলে দেয়। মেয়র সমর্থিত খান হাবিব বিআইডব্লিউটিএ’র দুটি ঘাট তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন, যা এতদিন মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুলের দখলে ছিল। আলোচ্চ্য টুটুল সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়বাত সাদিক আব্দুল্লাহ সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে সমাধিক পরিচিত। ৫ বছর আগে ২০১৮ সালে তার নেতা সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র হলে অনুরুপভাবে তিনিও হাট-ঘাট-বাজারগুলো এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেন, তখনও সন্ত্রাস-সংঘাতে বরিশাল শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
রাজনৈতিক মহল বলছে, সদরের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক একজন সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতও অভিন্ন চরিত্রের। মহানগর আওয়ামী লীগ তাদের দুজনের নির্বাচনেই উল্টো পথে হেটেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। বরং নৌকার বিরুদ্ধচারণ করায় সাদিকসহ তার অনুসারীরা বিতর্কিত হয়েছেন। এছাড়া ক্ষমতার আমলে তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ওষ্ঠাগত হয়ে খোকন সেরনিয়াবাত এবং জাহিদ ফারুকের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিল। অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তারা নৌকা নিয়ে বৈতরণী পার হয়েছেন, নগরবাসী তাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দুই জনপ্রতিনিধি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে যখন আধাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন, তখনই গুটিকয়ে কর্মী তাদের এমন উদ্যোগ এবং প্রসংশনীয় কর্ম অপেক্ষা বিতর্ক বেশি তৈরি করেছে দখল সন্ত্রাসের জানান দিয়ে।
জানা যায়, কদিন পূর্বে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত দপদপিয়া ব্রিজের টোলপ্লাজায় আসা একটি যাত্রীবাহী পরিবহন থেকে পটুয়াখালীর ব্যবসায়ীদের মাছ লুটপাট করে সিটি মেয়র অনুসারী কথিত ছাত্র-যুবলীগ নেতাকর্মীরা। বিতর্কিত যুবক রেজভীর নেতৃত্বে মাছগুলো লুটপাট শেষে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িতে করে তা নিয়ে যাওয়া হয় শহরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পোর্টরোডে এবং কাশিপুরে। দুটি স্থানে মাছগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পটুয়াখালীর ওই ব্যবসায়ী বাদী হয়ে বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও নেতৃত্বদানকারী রেজভী আছেন বহাল তবিয়তে।
পুলিশ এই আলোচিত মামলাটি নিয়ে কাজ করছে এবং তদন্ত করতে গিয়ে যা পেয়েছে, পাচ্ছে তা শুনলে অনেকের চক্ষু চড়কগাছ। সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র আমলে অনুরুপ মাছের গাড়িতে লুটপাট চালিয়ে ছিলেন সদর উপজেলা ছাত্রলীগ সম্পাদক আশিকুর রহমান সুজন। তখন তিনিও পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট করে তা সিটি কর্পোরেশনের গাড়িযোগে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যেতেন। জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়েরের নতুন বরিশালে সাদিক অনুসারীদের আধিপত্য নেই, কিন্তু অভিন্ন স্টাইলেই লুটতরাজ চলছে, যা নিয়ে সরব আলোচনা-সমালোচনা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক সন্ত্রাস রোধে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের স্বদিচ্ছাও আছে, তারপরেও কেনো অনুগত কর্মীরা সংঘাত-সংঘর্ষ ও দখল পাল্টা দখলের পথে হাটছে, যা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর হতে বাধ্য করছে। তবে ভীতিগ্রস্ত করে তুলছে নগরবাসীকে।
অবশ্য পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট যে দিন হয়েছিল, সেদিন প্রতিমন্ত্রী রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করছিলেন এবং সিটি মেয়র ওমরাহ পালনে সৌদিতে আছেন। কোতয়ালি পুলিশ বলছে, মাছ লুটপাটের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে, এতে কয়েকজন আছেন নামধারী, বাকিরা অজ্ঞাত। মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। এর বেশি পুলিশ কিছু না জানালেও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কিছু চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে, যার মধ্যে একটি সিটি কর্পোরেশনের পরিবহনে লুটপাটের মাছ বহন করা। এছাড়া এতে রেজভী নামক যুবকের নেতৃত্বে থাকার প্রমাণ ইতিমধ্যে হাতে এসেছে, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্রে এমনটি পরিলক্ষিত হয়।
সূত্র নিশ্চিত করেছে, পত্রিশোর্ধ্ব রেজভী সিটি মেয়র আবুল খায়েরের অনুসারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অসীম দেওয়ানের কর্মী। গুন্ডাবাহিনী নিয়ে পরিবহনের গতিরোধ করে মাছ লুটপাটের ঘটনা রেজভী অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে তাকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে এমন বর্ণনা দিয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজের সম্পৃক্ততা দ্বিতীয়বার অস্বীকার করলেও পরবর্তী বিভিন্ন মহল থেকে এ প্রতিবেদকের কাছে মুঠোফোনে সুপারিশ রাখেন সংবাদটি চেপে যেতে।
এছাড়া পোর্টরোডে সাদিকপন্থী টুটুলকে হঠিয়ে হাবিবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ইজারা দেওয়া ঘাটটি দখল নিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে টুটুল ক্ষুব্ধ, বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বিস্মিত।
মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাবিব ঘাট দখলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক সংবাদমাধ্যমকে বলছেন, ঘাটের বৈধ ইজারাদার নিরব হোসেন টুটুল। কিন্তু তাকে ইজারা তুলতে দেওয়া হচ্ছে না, এমন অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে আলোচনায় আসে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের অনুসারী চরবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত নেতা শহিদুল ইসলাম ওরফে ইতালি শহীদ ভূমি অফিসের জমিতে নিজস্ব অফিস করেছেন। পাশাপাশি তিনি পার্শ্ববর্তী তালতলী বাজারের ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে প্রতিদিন সকালে ৮/১০ হাজার টাকা চাঁদাও উত্তোলন করছেন। এই বাজার থেকে আগে নিরব হোসেন টুটুলের লোকেরা চাঁদা তুলতেন। এনিয়ে সংবাদ হলে ইতালির সেই অফিসটি ভূমি দপ্তর তালাবদ্ধ করে দিলেও বাজারে চাঁদাবাজি চলছেই।
জানতে চাইলে ইতালি শহীদ বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল হয়েছে, আগে টুটুলের লোকজন বাজারটি খেতেন, এখন আমি প্রতিমন্ত্রীর লোক হিসেবে খাই। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে একটি নির্ধারিত হারে টুটুল চাঁদা তুলতেন, সেটি এখন আমি করছি।’
জানা যায়, শহরের পোর্টরোড দখলের পর হাবিব এই ঘাটটিরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শহর রেখে সদর উপজেলার বাজারে আধিপত্য বিস্তার ঘটাতে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়তে পারেন এমন ভাবনায় পিছু হঠেছেন। এর আগে এই ঘাটটি দখল নেওয়া এবং চাঁদাবাজি করতে গিয়ে স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা অসীম দেওয়ান অনুসারী মিলন। তবে শেষ পর্যন্ত বাজারটিতে ইতালি শহীদই চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছেন, এতে ব্যবসায়ী সংক্ষুব্ধ হয়ে বিষয়টি লিখিত আকারে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রসহ স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
দখল পাল্টা দখল নিয়ে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা সংঘাত-সংঘর্ষে শহর উত্তপ্ত করে তুলেছে, স্থানীয় প্রশাসনও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে না। বরং এই অপরাধকে কোনো রুপ প্রশ্রয় না দিয়ে প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করছে পুলিশ। সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিমন্ত্রী-মেয়রও অপরাধে সম্পৃক্ত এমন কারও ব্যক্তি দায়ভার নিতে নারাজ। জনপ্রতিধিদ্বয় মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এও জানিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ কারও নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্ম করছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
নির্বাচন পরবর্তী প্রতিমন্ত্রী এবং মেয়র রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার অব্যাহত চেষ্টা করে গেলেও তাদের গুটিকয়েক কর্মীর বিতর্কিত কর্মকান্ড তাতে জল ঢালতে পারেন বলে অভিমত পাওয়া যায়। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণের একটি ধাপ হলো, রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করা, তা না করা গেলে এই বিপদগামী অংশটি প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের ক্লিন ইমেজকে ম্লান করে দিতে পারে, যেমনটি হয়েছে সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র ক্ষেত্রে। দীর্ঘ সময় দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকা, তদুপরি সিটি মেয়র হয়ে ইতিবাচক কর্মকান্ড অপেক্ষা নানামুখী বিতর্ক তৈরি করে সমালোচিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আ’লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে খেসারত গুণতে হচ্ছে।
সাদিকের সেই বরিশালকে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত শান্তির শহর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন। সেই সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন শহর উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। কিন্তু রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমাতে না পারলে তাদের নিয়েও বিতর্ক তৈরির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ সাদিক আব্দুল্লাহ এবং তার অনুসারীরা ওৎ পেতে আছেন, কখন এই দুই জনপ্রতিনিধির অনুসারীরা বড় ধরনের অঘটনের জন্ম দেয়, তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে জানান দিতে।
এমতাবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত নির্বাচন পূর্বাপর নগরবাসীকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাস রুখে দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনের পর গোটা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এক শ্রেণির বখাটে যুবক, তরুণ, যাদের দলে পদপদবি না থাকলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে মরিয়া হয়ে আছে। আবার কেউ কেউ ইতিমধ্যে বেআইনিভাবে বিভিন্ন হাট-ঘাট ও বাজার দখল দেওয়াসহ বিশেষ স্থানে চাঁদাবাজি করছেন। এতে প্রতিমন্ত্রী মেয়রের এক রকমের বদনাম হচ্ছে। এই অনৈতিক কর্মকান্ড রোহিত করা না গেলে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাবে নগরবাসীর কাছে। সুতরাং কালবিলম্ব না করে এখনই অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আইনি দুই প্রক্রিয়াতে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছে সচেতন মহল।
হাসিবুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।
কদিন পূর্বে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত। এবং গত ৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার আগেও অভিন্ন বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। নির্বাচনে জাহিদ ফারুককে সমর্থন দেওয়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাতও অনুরুপ অঙ্গীকার রেখেছেন নগরবাসীর কাছে। এবং উভয় জনপ্রতিনিধি এও জানিয়ে ছিলেন রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ করাসহ দখল সন্ত্রাস রোধ করে শান্তিময় ‘নতুন বরিশাল’ গড়ে তোলা হবে। স্বচ্ছ-সৎ-আদর্শিক এই দুই জনপ্রতিনিধি নির্বাচন পূর্বাপর দেওয়া তাদের অঙ্গীকার পালনের ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণার মধ্যেও বরিশালে তাদের অনুসারীরা ক্রমাগত অপরাধ পরিক্রমায় জড়িয়ে পড়ছেন। উভয় নেতার অনুসারীরা দলীয় ঘরনার বিরোধীদের হাট-বাজার দখল করাসহ সংঘাত-সংঘর্ষে বরিশাল উত্তপ্ত করে তুলেছেন। এসব ঘটনাবলীতে বরিশালের চার থানা কোতয়ালি, কাউনিয়া, বন্দর এবং বিমানবন্দরে অন্তত ডজনখানে মামলা হলেও নগরবাসী মোটেও স্বস্তিতে নেই। বরং দিনেদিনে আতঙ্ক ক্রমশই বৃদ্ধি করছে, যা প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং সিটি মেয়র আবুল খায়েরের ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা নয়, মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
অভিজ্ঞ মহল বলছেন, কীর্তনখোলা নদীঘেরা জনপদের দুই জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাত ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক। তাদের দুজনের ওপর বরিশাল সিটি ও সদর আসনের জনগণ আস্থা রেখেছেন বলেই তারা সম্প্রতি অনুষ্ঠেয় দুটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন। সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ দুটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হলে মহানগর আওয়ামী লীগ বেকে বসে। কিন্তু তারপরেও নৌকার প্রার্থী সিটিতে আবুল খায়ের এবং সংসদে জাহিদ ফারুক শামীমকেই সাধারণ মানুষ বেচে নিয়েছেন। নির্বাচন পূর্বাপর উভয় জনপ্রতিনিধি অনুরুপ প্রতিশ্রুতি করেছিলেন যে অবহেলিত বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত এবং উন্নত ‘নতুন বরিশাল’। অবশ্য এনিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল শহরবাসী। তবে সংসদ নির্বাচনের পর তাদের কর্মী-অনুসারীদের কয়েকজন বরিশালে দখল পাল্টা দখলের উৎসবে মেতে উঠেছেন। এনিয়ে সংঘাত-রক্তপাতে উত্তপ্ত এবং ক্রমাগতভাবে আতঙ্ক বৃদ্ধি হলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নির্লপ্ত থাকা সমীচীন নয়। বরং শহরবাসীর স্বার্থে এই দুই জনপ্রতিনিধির ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখতে সন্ত্রাস রুখে দিয়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া জরুরি। নতুবা এই সন্ত্রাস প্রতিমন্ত্রী মেয়রের ক্লিন ইমেজে দাগ লাগাবে!, ছাপিয়ে যাবে সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র সময়কার সকল বিতর্কিত কর্মকান্ডের রেকর্ড।
৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে বরিশাল নগরীতে সরকারি বেশ কিছু হাট-বাজার এবং ঘাট দখলের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে সিটি এবং সংসদে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত সাদিক আব্দুল্লাহ অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নেয় প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা। এই দখল প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে দুই পক্ষের হানাহানি খোদ সরকারের একাধিক দপ্তরকে বিপাকে ফেলে দেয়। মেয়র সমর্থিত খান হাবিব বিআইডব্লিউটিএ’র দুটি ঘাট তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন, যা এতদিন মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুলের দখলে ছিল। আলোচ্চ্য টুটুল সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়বাত সাদিক আব্দুল্লাহ সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে সমাধিক পরিচিত। ৫ বছর আগে ২০১৮ সালে তার নেতা সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র হলে অনুরুপভাবে তিনিও হাট-ঘাট-বাজারগুলো এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেন, তখনও সন্ত্রাস-সংঘাতে বরিশাল শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
রাজনৈতিক মহল বলছে, সদরের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক একজন সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতও অভিন্ন চরিত্রের। মহানগর আওয়ামী লীগ তাদের দুজনের নির্বাচনেই উল্টো পথে হেটেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। বরং নৌকার বিরুদ্ধচারণ করায় সাদিকসহ তার অনুসারীরা বিতর্কিত হয়েছেন। এছাড়া ক্ষমতার আমলে তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ওষ্ঠাগত হয়ে খোকন সেরনিয়াবাত এবং জাহিদ ফারুকের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিল। অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তারা নৌকা নিয়ে বৈতরণী পার হয়েছেন, নগরবাসী তাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দুই জনপ্রতিনিধি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে যখন আধাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন, তখনই গুটিকয়ে কর্মী তাদের এমন উদ্যোগ এবং প্রসংশনীয় কর্ম অপেক্ষা বিতর্ক বেশি তৈরি করেছে দখল সন্ত্রাসের জানান দিয়ে।
জানা যায়, কদিন পূর্বে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত দপদপিয়া ব্রিজের টোলপ্লাজায় আসা একটি যাত্রীবাহী পরিবহন থেকে পটুয়াখালীর ব্যবসায়ীদের মাছ লুটপাট করে সিটি মেয়র অনুসারী কথিত ছাত্র-যুবলীগ নেতাকর্মীরা। বিতর্কিত যুবক রেজভীর নেতৃত্বে মাছগুলো লুটপাট শেষে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িতে করে তা নিয়ে যাওয়া হয় শহরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পোর্টরোডে এবং কাশিপুরে। দুটি স্থানে মাছগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পটুয়াখালীর ওই ব্যবসায়ী বাদী হয়ে বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও নেতৃত্বদানকারী রেজভী আছেন বহাল তবিয়তে।
পুলিশ এই আলোচিত মামলাটি নিয়ে কাজ করছে এবং তদন্ত করতে গিয়ে যা পেয়েছে, পাচ্ছে তা শুনলে অনেকের চক্ষু চড়কগাছ। সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র আমলে অনুরুপ মাছের গাড়িতে লুটপাট চালিয়ে ছিলেন সদর উপজেলা ছাত্রলীগ সম্পাদক আশিকুর রহমান সুজন। তখন তিনিও পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট করে তা সিটি কর্পোরেশনের গাড়িযোগে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যেতেন। জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়েরের নতুন বরিশালে সাদিক অনুসারীদের আধিপত্য নেই, কিন্তু অভিন্ন স্টাইলেই লুটতরাজ চলছে, যা নিয়ে সরব আলোচনা-সমালোচনা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক সন্ত্রাস রোধে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের স্বদিচ্ছাও আছে, তারপরেও কেনো অনুগত কর্মীরা সংঘাত-সংঘর্ষ ও দখল পাল্টা দখলের পথে হাটছে, যা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর হতে বাধ্য করছে। তবে ভীতিগ্রস্ত করে তুলছে নগরবাসীকে।
অবশ্য পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট যে দিন হয়েছিল, সেদিন প্রতিমন্ত্রী রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করছিলেন এবং সিটি মেয়র ওমরাহ পালনে সৌদিতে আছেন। কোতয়ালি পুলিশ বলছে, মাছ লুটপাটের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে, এতে কয়েকজন আছেন নামধারী, বাকিরা অজ্ঞাত। মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। এর বেশি পুলিশ কিছু না জানালেও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কিছু চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে, যার মধ্যে একটি সিটি কর্পোরেশনের পরিবহনে লুটপাটের মাছ বহন করা। এছাড়া এতে রেজভী নামক যুবকের নেতৃত্বে থাকার প্রমাণ ইতিমধ্যে হাতে এসেছে, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্রে এমনটি পরিলক্ষিত হয়।
সূত্র নিশ্চিত করেছে, পত্রিশোর্ধ্ব রেজভী সিটি মেয়র আবুল খায়েরের অনুসারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অসীম দেওয়ানের কর্মী। গুন্ডাবাহিনী নিয়ে পরিবহনের গতিরোধ করে মাছ লুটপাটের ঘটনা রেজভী অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে তাকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে এমন বর্ণনা দিয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজের সম্পৃক্ততা দ্বিতীয়বার অস্বীকার করলেও পরবর্তী বিভিন্ন মহল থেকে এ প্রতিবেদকের কাছে মুঠোফোনে সুপারিশ রাখেন সংবাদটি চেপে যেতে।
এছাড়া পোর্টরোডে সাদিকপন্থী টুটুলকে হঠিয়ে হাবিবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ইজারা দেওয়া ঘাটটি দখল নিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে টুটুল ক্ষুব্ধ, বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বিস্মিত।
মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাবিব ঘাট দখলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক সংবাদমাধ্যমকে বলছেন, ঘাটের বৈধ ইজারাদার নিরব হোসেন টুটুল। কিন্তু তাকে ইজারা তুলতে দেওয়া হচ্ছে না, এমন অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে আলোচনায় আসে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের অনুসারী চরবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত নেতা শহিদুল ইসলাম ওরফে ইতালি শহীদ ভূমি অফিসের জমিতে নিজস্ব অফিস করেছেন। পাশাপাশি তিনি পার্শ্ববর্তী তালতলী বাজারের ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে প্রতিদিন সকালে ৮/১০ হাজার টাকা চাঁদাও উত্তোলন করছেন। এই বাজার থেকে আগে নিরব হোসেন টুটুলের লোকেরা চাঁদা তুলতেন। এনিয়ে সংবাদ হলে ইতালির সেই অফিসটি ভূমি দপ্তর তালাবদ্ধ করে দিলেও বাজারে চাঁদাবাজি চলছেই।
জানতে চাইলে ইতালি শহীদ বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল হয়েছে, আগে টুটুলের লোকজন বাজারটি খেতেন, এখন আমি প্রতিমন্ত্রীর লোক হিসেবে খাই। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে একটি নির্ধারিত হারে টুটুল চাঁদা তুলতেন, সেটি এখন আমি করছি।’
জানা যায়, শহরের পোর্টরোড দখলের পর হাবিব এই ঘাটটিরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শহর রেখে সদর উপজেলার বাজারে আধিপত্য বিস্তার ঘটাতে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়তে পারেন এমন ভাবনায় পিছু হঠেছেন। এর আগে এই ঘাটটি দখল নেওয়া এবং চাঁদাবাজি করতে গিয়ে স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা অসীম দেওয়ান অনুসারী মিলন। তবে শেষ পর্যন্ত বাজারটিতে ইতালি শহীদই চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছেন, এতে ব্যবসায়ী সংক্ষুব্ধ হয়ে বিষয়টি লিখিত আকারে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রসহ স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
দখল পাল্টা দখল নিয়ে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা সংঘাত-সংঘর্ষে শহর উত্তপ্ত করে তুলেছে, স্থানীয় প্রশাসনও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে না। বরং এই অপরাধকে কোনো রুপ প্রশ্রয় না দিয়ে প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করছে পুলিশ। সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিমন্ত্রী-মেয়রও অপরাধে সম্পৃক্ত এমন কারও ব্যক্তি দায়ভার নিতে নারাজ। জনপ্রতিধিদ্বয় মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এও জানিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ কারও নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্ম করছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
নির্বাচন পরবর্তী প্রতিমন্ত্রী এবং মেয়র রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার অব্যাহত চেষ্টা করে গেলেও তাদের গুটিকয়েক কর্মীর বিতর্কিত কর্মকান্ড তাতে জল ঢালতে পারেন বলে অভিমত পাওয়া যায়। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণের একটি ধাপ হলো, রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করা, তা না করা গেলে এই বিপদগামী অংশটি প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের ক্লিন ইমেজকে ম্লান করে দিতে পারে, যেমনটি হয়েছে সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র ক্ষেত্রে। দীর্ঘ সময় দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকা, তদুপরি সিটি মেয়র হয়ে ইতিবাচক কর্মকান্ড অপেক্ষা নানামুখী বিতর্ক তৈরি করে সমালোচিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আ’লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে খেসারত গুণতে হচ্ছে।
সাদিকের সেই বরিশালকে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত শান্তির শহর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন। সেই সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন শহর উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। কিন্তু রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমাতে না পারলে তাদের নিয়েও বিতর্ক তৈরির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ সাদিক আব্দুল্লাহ এবং তার অনুসারীরা ওৎ পেতে আছেন, কখন এই দুই জনপ্রতিনিধির অনুসারীরা বড় ধরনের অঘটনের জন্ম দেয়, তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে জানান দিতে।
এমতাবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত নির্বাচন পূর্বাপর নগরবাসীকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাস রুখে দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনের পর গোটা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এক শ্রেণির বখাটে যুবক, তরুণ, যাদের দলে পদপদবি না থাকলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে মরিয়া হয়ে আছে। আবার কেউ কেউ ইতিমধ্যে বেআইনিভাবে বিভিন্ন হাট-ঘাট ও বাজার দখল দেওয়াসহ বিশেষ স্থানে চাঁদাবাজি করছেন। এতে প্রতিমন্ত্রী মেয়রের এক রকমের বদনাম হচ্ছে। এই অনৈতিক কর্মকান্ড রোহিত করা না গেলে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাবে নগরবাসীর কাছে। সুতরাং কালবিলম্ব না করে এখনই অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আইনি দুই প্রক্রিয়াতে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছে সচেতন মহল।
হাসিবুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।
১১ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৪১
১১ মার্চ, ২০২৬ ১৪:০৫
১১ মার্চ, ২০২৬ ১৩:৫৪
১১ মার্চ, ২০২৬ ১৩:৩৮

০৭ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৩৮
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০১:৩১
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)

০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৯:০০
বিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নে, যখন বিশ্বসাহিত্য আধুনিকতার রুক্ষ ও যান্ত্রিক অভিঘাতে এক পরিচয়হীন শূন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছিল এক নাক্ষত্রিক স্থপতির মতো। ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার পলিধৌত বাহেরচর গ্রামে যে প্রাণস্পন্দনের শুরু, তা কেবল একটি জীবনের অঙ্কুরোদ্গম ছিল না—বরং তা ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সন্ধানের দার্শনিক ইশতেহার। আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই বাহেরচরের আদিম পলি আর মরমী আবহ তাঁর সত্তাকে এক দ্বান্দ্বিক অথচ সুষম বিন্যাসে গড়ে তুলেছিল; যেখানে একাধারে মিশে ছিল বাংলার লোকজ সহজপন্থা এবং ইংরেজি সাহিত্যের রাজকীয় আভিজাত্যের ধ্রুপদী দীপ্তি। হার্ভার্ডের বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যাকরণ আর বাহেরচরের মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাঁর ভেতর এমন এক ‘পোয়েটিক জেনিয়াস’ তৈরি করেছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল নাগরিক ড্রয়িংরুমের অলঙ্কার হিসেবে দেখেনি, বরং তাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ষিত জমিন ও ঐতিহ্যের শাশ্বত বেদিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার বর্তমানের সমষ্টি নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংকলন—যেখানে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি শস্যের দানার মতো পবিত্র।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যভুবনের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি অনন্য নান্দনিক অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) ছিল রোমান্টিক সংবেদনশীলতা ও লোকজ ছন্দের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন, যেখানে তিনি ঐতিহ্যের অলঙ্কার দিয়ে আধুনিকতার অবয়ব গড়েছিলেন। বিশেষ করে ‘কমলিনী-র হাসি’ গ্রন্থে নারীর শাশ্বত রূপ ও তাঁর অন্তর্লীন হাসিকে তিনি যেভাবে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে জাদুকরী বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাব্যে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ সুফি দর্শনের সেই চিরন্তন হাহাকারকে আধুনিক নাগরিক চেতনার সাথে যুক্ত করে, যেখানে তিনি মরমী ঢংয়ে প্রশ্ন তোলেন— “তুমি কে / এই অন্ধকারে একা ব’সে আছো? / তোমার চোখের তারা কি নক্ষত্রের প্রতিচ্ছায়া?” (খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ১৯৯৬)। ওবায়দুল্লাহর কাব্যিক শ্রেষ্ঠত্বের শিখর স্পর্শ করে তাঁর কালজয়ী ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৮২)। কার্ল ইয়ুং-এর ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতনার তত্ত্বের আলোকে এই কাব্যটি বাঙালির হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক স্মৃতির এক মহাকাব্যিক ইশতেহার। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন, ওবায়দুল্লাহ সেই মাটির ইতিহাসকেই দিয়েছেন এক বীরত্বগাথার রূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি / তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল / তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন / অরণ্য এবং পদের কথা বলতেন”—তখন তিনি আসলে একজন কবির ব্যক্তি-পরিচয় ছাপিয়ে এক জাতির শেকড়ের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠেন। তাঁর শব্দশৈলী ছিল মিতব্যয়ী কিন্তু আবেদন ছিল মহাজাগতিক। তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে— “যে কবিতা শুনতে জানে না / সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।” (আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, ১৯৮২)।
ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণে ওবায়দুল্লাহর তুলনা অনিবার্যভাবে টি. এস. এলিয়টের ‘ঐতিহাসিক বোধ’-এর সাথে চলে আসে। এলিয়ট যেমন পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের আধুনিকায়নের পথ দেখিয়েছিলেন, ওবায়দুল্লাহ তেমনি বাংলার লুপ্তপ্রায় মিথ ও লোকগাথাকে আধুনিক কবিতার শরীরে সঞ্চারিত করে আধুনিকতার একটি ‘দেশজ মডেল’ তৈরি করেছেন। তবে তাঁর মহত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতন্ত্রের যান্ত্রিক শীতলতা বনাম কবিতার মানবিক উষ্ণতার সার্থক মেলবন্ধন। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে কিংবা জাতিসংঘের এফএও (FAO)-এর এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নীতি-নির্ধারণ করেছেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা কেবল ফাইলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল বৈপ্লবিক ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প, যা ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক ছিল মূলত মাটির প্রতি তাঁর এক শৈল্পিক অঙ্গীকার। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাত ও কবিতা সমার্থক—এই মরমী দর্শনই তাঁর প্রশাসনিক মেধা ও সাহিত্যিক জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছে। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলগুলো আজও প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের কবির চোখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক মুক্তি।
শিল্পের এই দায়বদ্ধতা পাবলো নেরুদার মতো তাঁর কাব্যেও প্রকৃতি ও রাজনীতিকে এক পরাবাস্তব রসায়নে গেঁথেছে। ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তাঁর সেই হাহাকার এক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের নাম। সেখানে তিনি কাতরকণ্ঠে অমোঘ প্রার্থনায় নিমগ্ন হন— “হে ঈশ্বর / আমাদের বৃষ্টির জল দাও / যেন আমাদের পাপ ধুয়ে যায় / যেন শস্যের গহন থেকে আবার জীবন জেগে ওঠে।” (বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, ১৯৭১)। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে সিভিল সার্ভিসের (CSP) নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর যে সূক্ষ্ম নৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তা তিনি জয় করেছিলেন শিল্পের সাহসিকতায়। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম ‘একুশের সংকলন’-এর নেপথ্যে তাঁর অর্থায়ন ও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তাঁর সহকর্মীরা বলতেন, ওবায়দুল্লাহ ফাইলে বন্দি কোনো আমলা ছিলেন না, বরং এক ঋজু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ক্ষমতার অলিন্দেও তাঁর কবিত্ব ও নৈতিকতাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাঁর বাসভবনে ‘আলাপন’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ছিল মূলত সমকালীন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের এক মিলনমেলা, যা ক্ষমতার যান্ত্রিকতাকে সৃজনশীলতার স্পর্শে মানবিক করার এক বিরল নজির।
আজ ২০ ২৬ সালের এই নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক সভ্যতায়, যখন মানবসত্তা কৃত্রিম মেধার গোলকধাঁধায় তার আদিম স্পন্দন হারিয়ে ফেলছে, তখন ওবায়দুল্লাহর ‘পলিমাটির সৌরভ’ আমাদের ক্লান্ত অস্তিত্বে এক পৈত্তিক আশ্লেষ হয়ে ধরা দেয়। তথ্যের পাহাড় আর অ্যালগরিদমের শীতল অরণ্যে যখন মানবিক আবেগগুলো প্রাণহীন সংজ্ঞায় পর্যবসিত, তখন তাঁর কবিতা আমাদের সেই চিরন্তন শেকড়ের স্পন্দন শুনিয়ে যায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—আমরা নিছক কোনো যান্ত্রিক কোড নই, বরং এই বাংলার কর্ষিত মৃত্তিকার এক একটি জীবন্ত নক্ষত্র। চিরকালীনতার আলোয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সৃষ্টিকর্ম কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং তা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অতলস্পর্শী দর্পণ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’ কেবল একটি শোকগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে জাদুকরী বাস্তবতার এক শাশ্বত মহাকাব্য। মাতৃভাষার প্রতি সেই ব্যাকুলতা তিনি গেঁথেছিলেন এইভাবে— “মাগো, ওরা বলে / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো মা, তাই কি হয়?” (কবিতা- ‘মাগো, ওরা বলে’, কাব্যগ্রন্থ- সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, ১৯৮২)।
কুমড়ো ফুল কিংবা লতা-পাতার বুননে তিনি মায়ের আকুতিকে যেভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ঐতিহ্যেরই নামান্তর। বর্তমানের যান্ত্রিক মরুভূমিতে যখন মানুষ তার শিকড় হারিয়ে দিশেহারা, তখন ওবায়দুল্লাহর কবিতা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো নন্দনকাননে, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বাঁচে। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ এই ঋষিপ্রতিম কবি নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও, তিনি রেখে গেছেন এমন এক দার্শনিক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শেখায়—প্রকৃত মুক্তি ঐতিহ্যের বিনাশে নয়, বরং তার পুনর্জাগরণে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আজ কেবল একজন ব্যক্তি বা কবির নাম নয়, তিনি আমাদের পলিমাটির সেই অমর প্রজ্ঞা, যা যুগ-যুগান্তরের ধূলি সরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের শ্বেতপদ্মটিকে জাগিয়ে রাখে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় b_golap@yahoo.com)
বিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নে, যখন বিশ্বসাহিত্য আধুনিকতার রুক্ষ ও যান্ত্রিক অভিঘাতে এক পরিচয়হীন শূন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছিল এক নাক্ষত্রিক স্থপতির মতো। ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার পলিধৌত বাহেরচর গ্রামে যে প্রাণস্পন্দনের শুরু, তা কেবল একটি জীবনের অঙ্কুরোদ্গম ছিল না—বরং তা ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সন্ধানের দার্শনিক ইশতেহার। আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই বাহেরচরের আদিম পলি আর মরমী আবহ তাঁর সত্তাকে এক দ্বান্দ্বিক অথচ সুষম বিন্যাসে গড়ে তুলেছিল; যেখানে একাধারে মিশে ছিল বাংলার লোকজ সহজপন্থা এবং ইংরেজি সাহিত্যের রাজকীয় আভিজাত্যের ধ্রুপদী দীপ্তি। হার্ভার্ডের বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যাকরণ আর বাহেরচরের মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাঁর ভেতর এমন এক ‘পোয়েটিক জেনিয়াস’ তৈরি করেছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল নাগরিক ড্রয়িংরুমের অলঙ্কার হিসেবে দেখেনি, বরং তাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ষিত জমিন ও ঐতিহ্যের শাশ্বত বেদিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার বর্তমানের সমষ্টি নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংকলন—যেখানে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি শস্যের দানার মতো পবিত্র।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যভুবনের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি অনন্য নান্দনিক অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) ছিল রোমান্টিক সংবেদনশীলতা ও লোকজ ছন্দের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন, যেখানে তিনি ঐতিহ্যের অলঙ্কার দিয়ে আধুনিকতার অবয়ব গড়েছিলেন। বিশেষ করে ‘কমলিনী-র হাসি’ গ্রন্থে নারীর শাশ্বত রূপ ও তাঁর অন্তর্লীন হাসিকে তিনি যেভাবে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে জাদুকরী বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাব্যে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ সুফি দর্শনের সেই চিরন্তন হাহাকারকে আধুনিক নাগরিক চেতনার সাথে যুক্ত করে, যেখানে তিনি মরমী ঢংয়ে প্রশ্ন তোলেন— “তুমি কে / এই অন্ধকারে একা ব’সে আছো? / তোমার চোখের তারা কি নক্ষত্রের প্রতিচ্ছায়া?” (খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ১৯৯৬)। ওবায়দুল্লাহর কাব্যিক শ্রেষ্ঠত্বের শিখর স্পর্শ করে তাঁর কালজয়ী ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৮২)। কার্ল ইয়ুং-এর ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতনার তত্ত্বের আলোকে এই কাব্যটি বাঙালির হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক স্মৃতির এক মহাকাব্যিক ইশতেহার। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন, ওবায়দুল্লাহ সেই মাটির ইতিহাসকেই দিয়েছেন এক বীরত্বগাথার রূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি / তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল / তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন / অরণ্য এবং পদের কথা বলতেন”—তখন তিনি আসলে একজন কবির ব্যক্তি-পরিচয় ছাপিয়ে এক জাতির শেকড়ের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠেন। তাঁর শব্দশৈলী ছিল মিতব্যয়ী কিন্তু আবেদন ছিল মহাজাগতিক। তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে— “যে কবিতা শুনতে জানে না / সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।” (আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, ১৯৮২)।
ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণে ওবায়দুল্লাহর তুলনা অনিবার্যভাবে টি. এস. এলিয়টের ‘ঐতিহাসিক বোধ’-এর সাথে চলে আসে। এলিয়ট যেমন পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের আধুনিকায়নের পথ দেখিয়েছিলেন, ওবায়দুল্লাহ তেমনি বাংলার লুপ্তপ্রায় মিথ ও লোকগাথাকে আধুনিক কবিতার শরীরে সঞ্চারিত করে আধুনিকতার একটি ‘দেশজ মডেল’ তৈরি করেছেন। তবে তাঁর মহত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতন্ত্রের যান্ত্রিক শীতলতা বনাম কবিতার মানবিক উষ্ণতার সার্থক মেলবন্ধন। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে কিংবা জাতিসংঘের এফএও (FAO)-এর এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নীতি-নির্ধারণ করেছেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা কেবল ফাইলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল বৈপ্লবিক ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প, যা ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক ছিল মূলত মাটির প্রতি তাঁর এক শৈল্পিক অঙ্গীকার। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাত ও কবিতা সমার্থক—এই মরমী দর্শনই তাঁর প্রশাসনিক মেধা ও সাহিত্যিক জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছে। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলগুলো আজও প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের কবির চোখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক মুক্তি।
শিল্পের এই দায়বদ্ধতা পাবলো নেরুদার মতো তাঁর কাব্যেও প্রকৃতি ও রাজনীতিকে এক পরাবাস্তব রসায়নে গেঁথেছে। ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তাঁর সেই হাহাকার এক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের নাম। সেখানে তিনি কাতরকণ্ঠে অমোঘ প্রার্থনায় নিমগ্ন হন— “হে ঈশ্বর / আমাদের বৃষ্টির জল দাও / যেন আমাদের পাপ ধুয়ে যায় / যেন শস্যের গহন থেকে আবার জীবন জেগে ওঠে।” (বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, ১৯৭১)। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে সিভিল সার্ভিসের (CSP) নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর যে সূক্ষ্ম নৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তা তিনি জয় করেছিলেন শিল্পের সাহসিকতায়। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম ‘একুশের সংকলন’-এর নেপথ্যে তাঁর অর্থায়ন ও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তাঁর সহকর্মীরা বলতেন, ওবায়দুল্লাহ ফাইলে বন্দি কোনো আমলা ছিলেন না, বরং এক ঋজু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ক্ষমতার অলিন্দেও তাঁর কবিত্ব ও নৈতিকতাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাঁর বাসভবনে ‘আলাপন’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ছিল মূলত সমকালীন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের এক মিলনমেলা, যা ক্ষমতার যান্ত্রিকতাকে সৃজনশীলতার স্পর্শে মানবিক করার এক বিরল নজির।
আজ ২০ ২৬ সালের এই নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক সভ্যতায়, যখন মানবসত্তা কৃত্রিম মেধার গোলকধাঁধায় তার আদিম স্পন্দন হারিয়ে ফেলছে, তখন ওবায়দুল্লাহর ‘পলিমাটির সৌরভ’ আমাদের ক্লান্ত অস্তিত্বে এক পৈত্তিক আশ্লেষ হয়ে ধরা দেয়। তথ্যের পাহাড় আর অ্যালগরিদমের শীতল অরণ্যে যখন মানবিক আবেগগুলো প্রাণহীন সংজ্ঞায় পর্যবসিত, তখন তাঁর কবিতা আমাদের সেই চিরন্তন শেকড়ের স্পন্দন শুনিয়ে যায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—আমরা নিছক কোনো যান্ত্রিক কোড নই, বরং এই বাংলার কর্ষিত মৃত্তিকার এক একটি জীবন্ত নক্ষত্র। চিরকালীনতার আলোয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সৃষ্টিকর্ম কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং তা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অতলস্পর্শী দর্পণ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’ কেবল একটি শোকগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে জাদুকরী বাস্তবতার এক শাশ্বত মহাকাব্য। মাতৃভাষার প্রতি সেই ব্যাকুলতা তিনি গেঁথেছিলেন এইভাবে— “মাগো, ওরা বলে / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো মা, তাই কি হয়?” (কবিতা- ‘মাগো, ওরা বলে’, কাব্যগ্রন্থ- সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, ১৯৮২)।
কুমড়ো ফুল কিংবা লতা-পাতার বুননে তিনি মায়ের আকুতিকে যেভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ঐতিহ্যেরই নামান্তর। বর্তমানের যান্ত্রিক মরুভূমিতে যখন মানুষ তার শিকড় হারিয়ে দিশেহারা, তখন ওবায়দুল্লাহর কবিতা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো নন্দনকাননে, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বাঁচে। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ এই ঋষিপ্রতিম কবি নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও, তিনি রেখে গেছেন এমন এক দার্শনিক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শেখায়—প্রকৃত মুক্তি ঐতিহ্যের বিনাশে নয়, বরং তার পুনর্জাগরণে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আজ কেবল একজন ব্যক্তি বা কবির নাম নয়, তিনি আমাদের পলিমাটির সেই অমর প্রজ্ঞা, যা যুগ-যুগান্তরের ধূলি সরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের শ্বেতপদ্মটিকে জাগিয়ে রাখে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় b_golap@yahoo.com)
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.