
২৯ মে, ২০২৫ ১৬:১৩
কদিন পূর্বে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত। এবং গত ৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার আগেও অভিন্ন বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। নির্বাচনে জাহিদ ফারুককে সমর্থন দেওয়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাতও অনুরুপ অঙ্গীকার রেখেছেন নগরবাসীর কাছে। এবং উভয় জনপ্রতিনিধি এও জানিয়ে ছিলেন রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ করাসহ দখল সন্ত্রাস রোধ করে শান্তিময় ‘নতুন বরিশাল’ গড়ে তোলা হবে। স্বচ্ছ-সৎ-আদর্শিক এই দুই জনপ্রতিনিধি নির্বাচন পূর্বাপর দেওয়া তাদের অঙ্গীকার পালনের ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণার মধ্যেও বরিশালে তাদের অনুসারীরা ক্রমাগত অপরাধ পরিক্রমায় জড়িয়ে পড়ছেন। উভয় নেতার অনুসারীরা দলীয় ঘরনার বিরোধীদের হাট-বাজার দখল করাসহ সংঘাত-সংঘর্ষে বরিশাল উত্তপ্ত করে তুলেছেন। এসব ঘটনাবলীতে বরিশালের চার থানা কোতয়ালি, কাউনিয়া, বন্দর এবং বিমানবন্দরে অন্তত ডজনখানে মামলা হলেও নগরবাসী মোটেও স্বস্তিতে নেই। বরং দিনেদিনে আতঙ্ক ক্রমশই বৃদ্ধি করছে, যা প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং সিটি মেয়র আবুল খায়েরের ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা নয়, মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
অভিজ্ঞ মহল বলছেন, কীর্তনখোলা নদীঘেরা জনপদের দুই জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাত ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক। তাদের দুজনের ওপর বরিশাল সিটি ও সদর আসনের জনগণ আস্থা রেখেছেন বলেই তারা সম্প্রতি অনুষ্ঠেয় দুটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন। সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ দুটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হলে মহানগর আওয়ামী লীগ বেকে বসে। কিন্তু তারপরেও নৌকার প্রার্থী সিটিতে আবুল খায়ের এবং সংসদে জাহিদ ফারুক শামীমকেই সাধারণ মানুষ বেচে নিয়েছেন। নির্বাচন পূর্বাপর উভয় জনপ্রতিনিধি অনুরুপ প্রতিশ্রুতি করেছিলেন যে অবহেলিত বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত এবং উন্নত ‘নতুন বরিশাল’। অবশ্য এনিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল শহরবাসী। তবে সংসদ নির্বাচনের পর তাদের কর্মী-অনুসারীদের কয়েকজন বরিশালে দখল পাল্টা দখলের উৎসবে মেতে উঠেছেন। এনিয়ে সংঘাত-রক্তপাতে উত্তপ্ত এবং ক্রমাগতভাবে আতঙ্ক বৃদ্ধি হলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নির্লপ্ত থাকা সমীচীন নয়। বরং শহরবাসীর স্বার্থে এই দুই জনপ্রতিনিধির ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখতে সন্ত্রাস রুখে দিয়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া জরুরি। নতুবা এই সন্ত্রাস প্রতিমন্ত্রী মেয়রের ক্লিন ইমেজে দাগ লাগাবে!, ছাপিয়ে যাবে সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র সময়কার সকল বিতর্কিত কর্মকান্ডের রেকর্ড।
৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে বরিশাল নগরীতে সরকারি বেশ কিছু হাট-বাজার এবং ঘাট দখলের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে সিটি এবং সংসদে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত সাদিক আব্দুল্লাহ অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নেয় প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা। এই দখল প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে দুই পক্ষের হানাহানি খোদ সরকারের একাধিক দপ্তরকে বিপাকে ফেলে দেয়। মেয়র সমর্থিত খান হাবিব বিআইডব্লিউটিএ’র দুটি ঘাট তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন, যা এতদিন মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুলের দখলে ছিল। আলোচ্চ্য টুটুল সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়বাত সাদিক আব্দুল্লাহ সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে সমাধিক পরিচিত। ৫ বছর আগে ২০১৮ সালে তার নেতা সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র হলে অনুরুপভাবে তিনিও হাট-ঘাট-বাজারগুলো এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেন, তখনও সন্ত্রাস-সংঘাতে বরিশাল শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
রাজনৈতিক মহল বলছে, সদরের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক একজন সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতও অভিন্ন চরিত্রের। মহানগর আওয়ামী লীগ তাদের দুজনের নির্বাচনেই উল্টো পথে হেটেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। বরং নৌকার বিরুদ্ধচারণ করায় সাদিকসহ তার অনুসারীরা বিতর্কিত হয়েছেন। এছাড়া ক্ষমতার আমলে তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ওষ্ঠাগত হয়ে খোকন সেরনিয়াবাত এবং জাহিদ ফারুকের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিল। অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তারা নৌকা নিয়ে বৈতরণী পার হয়েছেন, নগরবাসী তাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দুই জনপ্রতিনিধি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে যখন আধাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন, তখনই গুটিকয়ে কর্মী তাদের এমন উদ্যোগ এবং প্রসংশনীয় কর্ম অপেক্ষা বিতর্ক বেশি তৈরি করেছে দখল সন্ত্রাসের জানান দিয়ে।
জানা যায়, কদিন পূর্বে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত দপদপিয়া ব্রিজের টোলপ্লাজায় আসা একটি যাত্রীবাহী পরিবহন থেকে পটুয়াখালীর ব্যবসায়ীদের মাছ লুটপাট করে সিটি মেয়র অনুসারী কথিত ছাত্র-যুবলীগ নেতাকর্মীরা। বিতর্কিত যুবক রেজভীর নেতৃত্বে মাছগুলো লুটপাট শেষে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িতে করে তা নিয়ে যাওয়া হয় শহরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পোর্টরোডে এবং কাশিপুরে। দুটি স্থানে মাছগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পটুয়াখালীর ওই ব্যবসায়ী বাদী হয়ে বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও নেতৃত্বদানকারী রেজভী আছেন বহাল তবিয়তে।
পুলিশ এই আলোচিত মামলাটি নিয়ে কাজ করছে এবং তদন্ত করতে গিয়ে যা পেয়েছে, পাচ্ছে তা শুনলে অনেকের চক্ষু চড়কগাছ। সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র আমলে অনুরুপ মাছের গাড়িতে লুটপাট চালিয়ে ছিলেন সদর উপজেলা ছাত্রলীগ সম্পাদক আশিকুর রহমান সুজন। তখন তিনিও পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট করে তা সিটি কর্পোরেশনের গাড়িযোগে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যেতেন। জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়েরের নতুন বরিশালে সাদিক অনুসারীদের আধিপত্য নেই, কিন্তু অভিন্ন স্টাইলেই লুটতরাজ চলছে, যা নিয়ে সরব আলোচনা-সমালোচনা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক সন্ত্রাস রোধে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের স্বদিচ্ছাও আছে, তারপরেও কেনো অনুগত কর্মীরা সংঘাত-সংঘর্ষ ও দখল পাল্টা দখলের পথে হাটছে, যা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর হতে বাধ্য করছে। তবে ভীতিগ্রস্ত করে তুলছে নগরবাসীকে।
অবশ্য পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট যে দিন হয়েছিল, সেদিন প্রতিমন্ত্রী রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করছিলেন এবং সিটি মেয়র ওমরাহ পালনে সৌদিতে আছেন। কোতয়ালি পুলিশ বলছে, মাছ লুটপাটের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে, এতে কয়েকজন আছেন নামধারী, বাকিরা অজ্ঞাত। মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। এর বেশি পুলিশ কিছু না জানালেও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কিছু চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে, যার মধ্যে একটি সিটি কর্পোরেশনের পরিবহনে লুটপাটের মাছ বহন করা। এছাড়া এতে রেজভী নামক যুবকের নেতৃত্বে থাকার প্রমাণ ইতিমধ্যে হাতে এসেছে, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্রে এমনটি পরিলক্ষিত হয়।
সূত্র নিশ্চিত করেছে, পত্রিশোর্ধ্ব রেজভী সিটি মেয়র আবুল খায়েরের অনুসারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অসীম দেওয়ানের কর্মী। গুন্ডাবাহিনী নিয়ে পরিবহনের গতিরোধ করে মাছ লুটপাটের ঘটনা রেজভী অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে তাকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে এমন বর্ণনা দিয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজের সম্পৃক্ততা দ্বিতীয়বার অস্বীকার করলেও পরবর্তী বিভিন্ন মহল থেকে এ প্রতিবেদকের কাছে মুঠোফোনে সুপারিশ রাখেন সংবাদটি চেপে যেতে।
এছাড়া পোর্টরোডে সাদিকপন্থী টুটুলকে হঠিয়ে হাবিবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ইজারা দেওয়া ঘাটটি দখল নিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে টুটুল ক্ষুব্ধ, বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বিস্মিত।
মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাবিব ঘাট দখলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক সংবাদমাধ্যমকে বলছেন, ঘাটের বৈধ ইজারাদার নিরব হোসেন টুটুল। কিন্তু তাকে ইজারা তুলতে দেওয়া হচ্ছে না, এমন অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে আলোচনায় আসে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের অনুসারী চরবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত নেতা শহিদুল ইসলাম ওরফে ইতালি শহীদ ভূমি অফিসের জমিতে নিজস্ব অফিস করেছেন। পাশাপাশি তিনি পার্শ্ববর্তী তালতলী বাজারের ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে প্রতিদিন সকালে ৮/১০ হাজার টাকা চাঁদাও উত্তোলন করছেন। এই বাজার থেকে আগে নিরব হোসেন টুটুলের লোকেরা চাঁদা তুলতেন। এনিয়ে সংবাদ হলে ইতালির সেই অফিসটি ভূমি দপ্তর তালাবদ্ধ করে দিলেও বাজারে চাঁদাবাজি চলছেই।
জানতে চাইলে ইতালি শহীদ বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল হয়েছে, আগে টুটুলের লোকজন বাজারটি খেতেন, এখন আমি প্রতিমন্ত্রীর লোক হিসেবে খাই। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে একটি নির্ধারিত হারে টুটুল চাঁদা তুলতেন, সেটি এখন আমি করছি।’
জানা যায়, শহরের পোর্টরোড দখলের পর হাবিব এই ঘাটটিরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শহর রেখে সদর উপজেলার বাজারে আধিপত্য বিস্তার ঘটাতে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়তে পারেন এমন ভাবনায় পিছু হঠেছেন। এর আগে এই ঘাটটি দখল নেওয়া এবং চাঁদাবাজি করতে গিয়ে স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা অসীম দেওয়ান অনুসারী মিলন। তবে শেষ পর্যন্ত বাজারটিতে ইতালি শহীদই চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছেন, এতে ব্যবসায়ী সংক্ষুব্ধ হয়ে বিষয়টি লিখিত আকারে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রসহ স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
দখল পাল্টা দখল নিয়ে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা সংঘাত-সংঘর্ষে শহর উত্তপ্ত করে তুলেছে, স্থানীয় প্রশাসনও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে না। বরং এই অপরাধকে কোনো রুপ প্রশ্রয় না দিয়ে প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করছে পুলিশ। সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিমন্ত্রী-মেয়রও অপরাধে সম্পৃক্ত এমন কারও ব্যক্তি দায়ভার নিতে নারাজ। জনপ্রতিধিদ্বয় মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এও জানিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ কারও নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্ম করছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
নির্বাচন পরবর্তী প্রতিমন্ত্রী এবং মেয়র রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার অব্যাহত চেষ্টা করে গেলেও তাদের গুটিকয়েক কর্মীর বিতর্কিত কর্মকান্ড তাতে জল ঢালতে পারেন বলে অভিমত পাওয়া যায়। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণের একটি ধাপ হলো, রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করা, তা না করা গেলে এই বিপদগামী অংশটি প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের ক্লিন ইমেজকে ম্লান করে দিতে পারে, যেমনটি হয়েছে সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র ক্ষেত্রে। দীর্ঘ সময় দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকা, তদুপরি সিটি মেয়র হয়ে ইতিবাচক কর্মকান্ড অপেক্ষা নানামুখী বিতর্ক তৈরি করে সমালোচিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আ’লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে খেসারত গুণতে হচ্ছে।
সাদিকের সেই বরিশালকে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত শান্তির শহর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন। সেই সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন শহর উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। কিন্তু রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমাতে না পারলে তাদের নিয়েও বিতর্ক তৈরির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ সাদিক আব্দুল্লাহ এবং তার অনুসারীরা ওৎ পেতে আছেন, কখন এই দুই জনপ্রতিনিধির অনুসারীরা বড় ধরনের অঘটনের জন্ম দেয়, তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে জানান দিতে।
এমতাবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত নির্বাচন পূর্বাপর নগরবাসীকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাস রুখে দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনের পর গোটা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এক শ্রেণির বখাটে যুবক, তরুণ, যাদের দলে পদপদবি না থাকলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে মরিয়া হয়ে আছে। আবার কেউ কেউ ইতিমধ্যে বেআইনিভাবে বিভিন্ন হাট-ঘাট ও বাজার দখল দেওয়াসহ বিশেষ স্থানে চাঁদাবাজি করছেন। এতে প্রতিমন্ত্রী মেয়রের এক রকমের বদনাম হচ্ছে। এই অনৈতিক কর্মকান্ড রোহিত করা না গেলে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাবে নগরবাসীর কাছে। সুতরাং কালবিলম্ব না করে এখনই অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আইনি দুই প্রক্রিয়াতে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছে সচেতন মহল।
হাসিবুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।
কদিন পূর্বে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত। এবং গত ৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নেওয়ার আগেও অভিন্ন বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। নির্বাচনে জাহিদ ফারুককে সমর্থন দেওয়া বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাতও অনুরুপ অঙ্গীকার রেখেছেন নগরবাসীর কাছে। এবং উভয় জনপ্রতিনিধি এও জানিয়ে ছিলেন রাজনৈতিক হানাহানি বন্ধ করাসহ দখল সন্ত্রাস রোধ করে শান্তিময় ‘নতুন বরিশাল’ গড়ে তোলা হবে। স্বচ্ছ-সৎ-আদর্শিক এই দুই জনপ্রতিনিধি নির্বাচন পূর্বাপর দেওয়া তাদের অঙ্গীকার পালনের ধারা অব্যাহত রাখার ঘোষণার মধ্যেও বরিশালে তাদের অনুসারীরা ক্রমাগত অপরাধ পরিক্রমায় জড়িয়ে পড়ছেন। উভয় নেতার অনুসারীরা দলীয় ঘরনার বিরোধীদের হাট-বাজার দখল করাসহ সংঘাত-সংঘর্ষে বরিশাল উত্তপ্ত করে তুলেছেন। এসব ঘটনাবলীতে বরিশালের চার থানা কোতয়ালি, কাউনিয়া, বন্দর এবং বিমানবন্দরে অন্তত ডজনখানে মামলা হলেও নগরবাসী মোটেও স্বস্তিতে নেই। বরং দিনেদিনে আতঙ্ক ক্রমশই বৃদ্ধি করছে, যা প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং সিটি মেয়র আবুল খায়েরের ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা নয়, মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
অভিজ্ঞ মহল বলছেন, কীর্তনখোলা নদীঘেরা জনপদের দুই জনপ্রতিনিধি জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়ের খোকন সেরনিয়াবাত ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক। তাদের দুজনের ওপর বরিশাল সিটি ও সদর আসনের জনগণ আস্থা রেখেছেন বলেই তারা সম্প্রতি অনুষ্ঠেয় দুটি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় পেয়েছেন। সাবেক সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ দুটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হলে মহানগর আওয়ামী লীগ বেকে বসে। কিন্তু তারপরেও নৌকার প্রার্থী সিটিতে আবুল খায়ের এবং সংসদে জাহিদ ফারুক শামীমকেই সাধারণ মানুষ বেচে নিয়েছেন। নির্বাচন পূর্বাপর উভয় জনপ্রতিনিধি অনুরুপ প্রতিশ্রুতি করেছিলেন যে অবহেলিত বরিশাল হবে রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত এবং উন্নত ‘নতুন বরিশাল’। অবশ্য এনিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল শহরবাসী। তবে সংসদ নির্বাচনের পর তাদের কর্মী-অনুসারীদের কয়েকজন বরিশালে দখল পাল্টা দখলের উৎসবে মেতে উঠেছেন। এনিয়ে সংঘাত-রক্তপাতে উত্তপ্ত এবং ক্রমাগতভাবে আতঙ্ক বৃদ্ধি হলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নির্লপ্ত থাকা সমীচীন নয়। বরং শহরবাসীর স্বার্থে এই দুই জনপ্রতিনিধির ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখতে সন্ত্রাস রুখে দিয়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া জরুরি। নতুবা এই সন্ত্রাস প্রতিমন্ত্রী মেয়রের ক্লিন ইমেজে দাগ লাগাবে!, ছাপিয়ে যাবে সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র সময়কার সকল বিতর্কিত কর্মকান্ডের রেকর্ড।
৭ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে বরিশাল নগরীতে সরকারি বেশ কিছু হাট-বাজার এবং ঘাট দখলের একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশেষ করে সিটি এবং সংসদে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত সাদিক আব্দুল্লাহ অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নেয় প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা। এই দখল প্রক্রিয়া চালাতে গিয়ে দুই পক্ষের হানাহানি খোদ সরকারের একাধিক দপ্তরকে বিপাকে ফেলে দেয়। মেয়র সমর্থিত খান হাবিব বিআইডব্লিউটিএ’র দুটি ঘাট তার নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন, যা এতদিন মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুলের দখলে ছিল। আলোচ্চ্য টুটুল সাবেক সিটি মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়বাত সাদিক আব্দুল্লাহ সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে সমাধিক পরিচিত। ৫ বছর আগে ২০১৮ সালে তার নেতা সাদিক আব্দুল্লাহ মেয়র হলে অনুরুপভাবে তিনিও হাট-ঘাট-বাজারগুলো এককভাবে নিয়ন্ত্রণে নেন, তখনও সন্ত্রাস-সংঘাতে বরিশাল শহর উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
রাজনৈতিক মহল বলছে, সদরের এমপি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক একজন সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া সিটি মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতও অভিন্ন চরিত্রের। মহানগর আওয়ামী লীগ তাদের দুজনের নির্বাচনেই উল্টো পথে হেটেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। বরং নৌকার বিরুদ্ধচারণ করায় সাদিকসহ তার অনুসারীরা বিতর্কিত হয়েছেন। এছাড়া ক্ষমতার আমলে তাদের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে ওষ্ঠাগত হয়ে খোকন সেরনিয়াবাত এবং জাহিদ ফারুকের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিল। অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তারা নৌকা নিয়ে বৈতরণী পার হয়েছেন, নগরবাসী তাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দুই জনপ্রতিনিধি তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণে যখন আধাজল খেয়ে মাঠে নেমেছেন, তখনই গুটিকয়ে কর্মী তাদের এমন উদ্যোগ এবং প্রসংশনীয় কর্ম অপেক্ষা বিতর্ক বেশি তৈরি করেছে দখল সন্ত্রাসের জানান দিয়ে।
জানা যায়, কদিন পূর্বে শহরের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত দপদপিয়া ব্রিজের টোলপ্লাজায় আসা একটি যাত্রীবাহী পরিবহন থেকে পটুয়াখালীর ব্যবসায়ীদের মাছ লুটপাট করে সিটি মেয়র অনুসারী কথিত ছাত্র-যুবলীগ নেতাকর্মীরা। বিতর্কিত যুবক রেজভীর নেতৃত্বে মাছগুলো লুটপাট শেষে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িতে করে তা নিয়ে যাওয়া হয় শহরের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পোর্টরোডে এবং কাশিপুরে। দুটি স্থানে মাছগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পটুয়াখালীর ওই ব্যবসায়ী বাদী হয়ে বরিশাল কোতয়ালি মডেল থানায় একটি মামলা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিক কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও নেতৃত্বদানকারী রেজভী আছেন বহাল তবিয়তে।
পুলিশ এই আলোচিত মামলাটি নিয়ে কাজ করছে এবং তদন্ত করতে গিয়ে যা পেয়েছে, পাচ্ছে তা শুনলে অনেকের চক্ষু চড়কগাছ। সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র আমলে অনুরুপ মাছের গাড়িতে লুটপাট চালিয়ে ছিলেন সদর উপজেলা ছাত্রলীগ সম্পাদক আশিকুর রহমান সুজন। তখন তিনিও পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট করে তা সিটি কর্পোরেশনের গাড়িযোগে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যেতেন। জাহিদ ফারুক এবং আবুল খায়েরের নতুন বরিশালে সাদিক অনুসারীদের আধিপত্য নেই, কিন্তু অভিন্ন স্টাইলেই লুটতরাজ চলছে, যা নিয়ে সরব আলোচনা-সমালোচনা হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক সন্ত্রাস রোধে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাদের স্বদিচ্ছাও আছে, তারপরেও কেনো অনুগত কর্মীরা সংঘাত-সংঘর্ষ ও দখল পাল্টা দখলের পথে হাটছে, যা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর হতে বাধ্য করছে। তবে ভীতিগ্রস্ত করে তুলছে নগরবাসীকে।
অবশ্য পরিবহন থেকে মাছ লুটপাট যে দিন হয়েছিল, সেদিন প্রতিমন্ত্রী রাজধানী ঢাকাতে অবস্থান করছিলেন এবং সিটি মেয়র ওমরাহ পালনে সৌদিতে আছেন। কোতয়ালি পুলিশ বলছে, মাছ লুটপাটের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে, এতে কয়েকজন আছেন নামধারী, বাকিরা অজ্ঞাত। মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। এর বেশি পুলিশ কিছু না জানালেও নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কিছু চ্যাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে, যার মধ্যে একটি সিটি কর্পোরেশনের পরিবহনে লুটপাটের মাছ বহন করা। এছাড়া এতে রেজভী নামক যুবকের নেতৃত্বে থাকার প্রমাণ ইতিমধ্যে হাতে এসেছে, সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্রে এমনটি পরিলক্ষিত হয়।
সূত্র নিশ্চিত করেছে, পত্রিশোর্ধ্ব রেজভী সিটি মেয়র আবুল খায়েরের অনুসারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অসীম দেওয়ানের কর্মী। গুন্ডাবাহিনী নিয়ে পরিবহনের গতিরোধ করে মাছ লুটপাটের ঘটনা রেজভী অস্বীকার করেছেন। কিন্তু সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে তাকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে এমন বর্ণনা দিয়ে জানতে চাইলে তিনি নিজের সম্পৃক্ততা দ্বিতীয়বার অস্বীকার করলেও পরবর্তী বিভিন্ন মহল থেকে এ প্রতিবেদকের কাছে মুঠোফোনে সুপারিশ রাখেন সংবাদটি চেপে যেতে।
এছাড়া পোর্টরোডে সাদিকপন্থী টুটুলকে হঠিয়ে হাবিবের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ইজারা দেওয়া ঘাটটি দখল নিয়ে সেখান থেকে টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে। এতে টুটুল ক্ষুব্ধ, বিআইডব্লিউটিএ কর্মকর্তারা বিস্মিত।
মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে হাবিব ঘাট দখলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক সংবাদমাধ্যমকে বলছেন, ঘাটের বৈধ ইজারাদার নিরব হোসেন টুটুল। কিন্তু তাকে ইজারা তুলতে দেওয়া হচ্ছে না, এমন অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে আলোচনায় আসে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের অনুসারী চরবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিস্কৃত নেতা শহিদুল ইসলাম ওরফে ইতালি শহীদ ভূমি অফিসের জমিতে নিজস্ব অফিস করেছেন। পাশাপাশি তিনি পার্শ্ববর্তী তালতলী বাজারের ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে প্রতিদিন সকালে ৮/১০ হাজার টাকা চাঁদাও উত্তোলন করছেন। এই বাজার থেকে আগে নিরব হোসেন টুটুলের লোকেরা চাঁদা তুলতেন। এনিয়ে সংবাদ হলে ইতালির সেই অফিসটি ভূমি দপ্তর তালাবদ্ধ করে দিলেও বাজারে চাঁদাবাজি চলছেই।
জানতে চাইলে ইতালি শহীদ বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল হয়েছে, আগে টুটুলের লোকজন বাজারটি খেতেন, এখন আমি প্রতিমন্ত্রীর লোক হিসেবে খাই। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে একটি নির্ধারিত হারে টুটুল চাঁদা তুলতেন, সেটি এখন আমি করছি।’
জানা যায়, শহরের পোর্টরোড দখলের পর হাবিব এই ঘাটটিরও নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শহর রেখে সদর উপজেলার বাজারে আধিপত্য বিস্তার ঘটাতে গিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিপাকে পড়তে পারেন এমন ভাবনায় পিছু হঠেছেন। এর আগে এই ঘাটটি দখল নেওয়া এবং চাঁদাবাজি করতে গিয়ে স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা অসীম দেওয়ান অনুসারী মিলন। তবে শেষ পর্যন্ত বাজারটিতে ইতালি শহীদই চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছেন, এতে ব্যবসায়ী সংক্ষুব্ধ হয়ে বিষয়টি লিখিত আকারে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রসহ স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করার প্রস্তুতি নিয়েছেন।
দখল পাল্টা দখল নিয়ে প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের অনুসারীরা সংঘাত-সংঘর্ষে শহর উত্তপ্ত করে তুলেছে, স্থানীয় প্রশাসনও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে না। বরং এই অপরাধকে কোনো রুপ প্রশ্রয় না দিয়ে প্রতিটি ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থাগ্রহণ করছে পুলিশ। সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রতিমন্ত্রী-মেয়রও অপরাধে সম্পৃক্ত এমন কারও ব্যক্তি দায়ভার নিতে নারাজ। জনপ্রতিধিদ্বয় মিডিয়ায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে এও জানিয়ে দিয়েছেন, বিশেষ কারও নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্ম করছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
নির্বাচন পরবর্তী প্রতিমন্ত্রী এবং মেয়র রাজনৈতিক সন্ত্রাসমুক্ত ‘নতুন বরিশাল’ গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার অব্যাহত চেষ্টা করে গেলেও তাদের গুটিকয়েক কর্মীর বিতর্কিত কর্মকান্ড তাতে জল ঢালতে পারেন বলে অভিমত পাওয়া যায়। নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণের একটি ধাপ হলো, রাজনৈতিক সন্ত্রাস বন্ধ করা, তা না করা গেলে এই বিপদগামী অংশটি প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের ক্লিন ইমেজকে ম্লান করে দিতে পারে, যেমনটি হয়েছে সাবেক মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র ক্ষেত্রে। দীর্ঘ সময় দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকা, তদুপরি সিটি মেয়র হয়ে ইতিবাচক কর্মকান্ড অপেক্ষা নানামুখী বিতর্ক তৈরি করে সমালোচিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আ’লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে খেসারত গুণতে হচ্ছে।
সাদিকের সেই বরিশালকে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত শান্তির শহর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন। সেই সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন শহর উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। কিন্তু রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমাতে না পারলে তাদের নিয়েও বিতর্ক তৈরির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষ সাদিক আব্দুল্লাহ এবং তার অনুসারীরা ওৎ পেতে আছেন, কখন এই দুই জনপ্রতিনিধির অনুসারীরা বড় ধরনের অঘটনের জন্ম দেয়, তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে জানান দিতে।
এমতাবস্থায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক এবং মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত নির্বাচন পূর্বাপর নগরবাসীকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি রাজনৈতিক সন্ত্রাস রুখে দেওয়া। কিন্তু নির্বাচনের পর গোটা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এক শ্রেণির বখাটে যুবক, তরুণ, যাদের দলে পদপদবি না থাকলেও প্রতিমন্ত্রী-মেয়রের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে মরিয়া হয়ে আছে। আবার কেউ কেউ ইতিমধ্যে বেআইনিভাবে বিভিন্ন হাট-ঘাট ও বাজার দখল দেওয়াসহ বিশেষ স্থানে চাঁদাবাজি করছেন। এতে প্রতিমন্ত্রী মেয়রের এক রকমের বদনাম হচ্ছে। এই অনৈতিক কর্মকান্ড রোহিত করা না গেলে প্রতিমন্ত্রী-মেয়র সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যাবে নগরবাসীর কাছে। সুতরাং কালবিলম্ব না করে এখনই অপকর্মে জড়িতদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আইনি দুই প্রক্রিয়াতে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছে সচেতন মহল।
হাসিবুল ইসলাম, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল।

১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:৩৫
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)

১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৪৭
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।

০৭ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৩৮
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.