আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে বাগেরহাটে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। ইসলাম প্রচার করতে এসে তিনি সেখানে সুপেয় পানির অভাবে মসজিদের পাশে খনন করেছিলেন প্রায় ২০০ একর আয়তনের বিশালাকৃতির একটি দিঘি। নিজের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি নদীর দুইটি কুমির এনে মিঠা পানির দিঘিতে বন্দী করেছিলেন। ভালোবেসে তাদের নামকরণ করেছিলেন কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নামে। তাঁর জীবদ্দশায় কুমির দুটি তাঁর হাতের ইশারায় চলতো। তিনি নাম ধরে ডাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে পাহাড়ের মতো তারা ভেসে উঠতো এবং মানুষের কাছে আসতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কালাপাহাড় পুরুষ এবং ধলাপাহাড় নারী কুমির হওয়ায় তারা দিঘিতে বেশকিছু বাচ্চা জন্ম দিয়েছিল। খানজাহান আলীর (রহ.) মৃত্যুর পরেও সেই কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধররা কয়েকশো বছর ধরে এই দিঘিতে বেঁচেছিল।
পরবর্তীকালে অযত্ন-অবহেলা, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা আর খাদ্যের অভাবে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বাচ্চা কুমিরগুলো একে একে মারা যেতে শুরু করে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর দিঘি। এতে মাজার ব্যবসায় ধ্বস নামে। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে নতুন ৩টি কুমির কিনে এনে খানজাহান আলীর দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। ঐতিহ্যের নামে মূলতঃ মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ। কিন্তু পরিচর্যার অভাব ও খাদ্য সংকটে ২টি কুমির মারা যায়। দিঘিতে অবশিষ্ট একটা কুমির টিকে থাকে। এই কুমিরের সাথে হযরত খানজাহান আলী (রহ.), তাঁর বংশধর কিংবা তাঁর আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাজার ব্যবসায়ী একদল ভন্ডের সাথে এই কুমিরের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আগত ভক্ত মাজার পূজারীরা আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আশায় কুমিরের জন্য টাকা দেয়, খাবার দেয়। খাবার হিসেবে মুরগি, ছাগল এবং মাংস কিনে দেয়। তবে সেগুলো কুমিরের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। কুমিরের মুখের সামনে থেকে ঘুরিয়ে এনে সেগুলো আবার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। মাজারের কাছে গড়ে উঠেছে আগরবাতি, মোমবাতি, তাগা, ফিতা, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁকসহ রকমারি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলে সেখানে চলছে নানান প্রতারণা আর পর্যটকদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। মাজার থেকে আয় হওয়া টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়। এই মাজার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত মাজারের খাদেম, স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কিছু মাদকসেবী, সরকার দলীয় কতিপয় নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি।
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল আর বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আমার উদাত্ত আহবান এবং বিনীত অনুরোধ থাকবে- দিঘির এই কুমিরকে অনতিবিলম্বে মিরপুরের চিড়িয়াখানা, চট্টগ্রামের কুমির প্রজনন কেন্দ্র কিংবা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে অবমুক্ত করা হোক। একটি মাংসাশী হিংস্র প্রাণিকে কোনো অবস্থাতেই একটি লোকালয়ের দর্শনীয় স্থানে রাখা যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে যেমন মানুষ শিরক করার মতো পাপাচারে লিপ্ত হবে, অন্যদিকে ফাতেমার মতো অনাথ পথশিশুরা কুমিরের খাদ্যবস্তুতে পরিনত হবে। আমার অনুসন্ধান করা এই ভেতরের গল্পটা দেশের ৯৯% মানুষ জানে না। অনেকেই ভক্তি সহকারে এই কুমিরের কাছে মানত করে। হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) প্রতিনিধি মনে করে। সরল বিশ্বাসী ধর্মভীরু এসব মানুষকে জেনেশুনে ধোঁকা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
তাছাড়া হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) আমলে ছেড়ে দেওয়া কুমির কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধরেরা কখনো কাউকে আক্রমণ করার ইতিহাস নেই। তবে ভারত থেকে আনা এই কুমিরটি বারবার হিংস্র আচরণ করছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এই কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিঘির প্রধান ঘাটে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ কুমিরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমণ করেছিল হিংস্র স্বভাবের মাদ্রাজি এই কুমির। ২০০৯ সালে মাজারে মানত করতে আসা এক মায়ের হাত থেকে তার শিশু সন্তানকে প্রথম এই কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরে দিঘির মাঝখানে শিশুটির মৃতদেহ ভেসে ওঠে। গতকাল এর সর্বশেষ আক্রমণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে মাজারে আশ্রিত ৭ বছরের অনাথ পথশিশু ফাতেমা আক্তার। কুমিরের আক্রমণে একের পর এক এসব হতাহতের ঘটনা ঘটলেও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, তাদের কাছে মাজার আর কুমির ব্যবসাই ছিল মুখ্য। পরিশেষে বলতে চাই- ভন্ডদের মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেখানে ভিনদেশ থেকে কিনে আনা কুমির পালনের কোনো প্রয়োজন নেই। অনাথ ফাতেমার জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে অন্তত মাজারের কুমির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হোক। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও সুশাসনকর্মী।
২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:২৯
একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় কি এমনই হওয়ার কথা ছিল? দুই দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা করেছেন পুলক চ্যাটার্জি। দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বরিশাল ব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কর্মজীবনের শেষদিকে এসে চাকরি হারিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বেকার ছিলেন, আর্থিক সংকটে পড়েছেন- এমন তথ্যই এখন তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) তাঁর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে-একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন একের পর এক সংকটে পড়ছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন কে?
শুধু ব্যক্তিগত হতাশা, শারীরিক সমস্যা কিংবা আর্থিক সংকট দিয়ে কি এই মৃত্যুর পুরো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তা, কর্মহীনতা, পাওনা নিয়ে জটিলতা এবং সাংবাদিক সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর তিনি বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ব্যুরোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর সহকর্মী স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরীকে দিয়ে ব্যুরোর কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু চাকরি বা দায়িত্ব হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জির আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছিল- এখন সেটিই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে তাঁর ন্যায্য পাওনা আদৌ পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কতটুকু এবং না হয়ে থাকলে কেন- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। কারণ একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান শুধু একটি পদ হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর জীবিকা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের প্রশ্ন।
পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পরও সমকালের সঙ্গে পুলক চ্যাটার্জির সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর কাছে সাবেক অফিসের একটি বিকল্প চাবি ছিল বলে জানা গেছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যেতেন, বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কর্মস্থল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও একজন সাবেক ব্যুরোপ্রধান কেন সেখানে নিয়মিত যেতেন? এটি কি শুধুই পুরোনো কর্মস্থলের প্রতি আবেগ? নাকি দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না পারার এক ধরনের মানসিক টান? সহকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ঘটনাটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও তদন্তের দাবি রাখে।
মৃত্যুর পর পুলক চ্যাটার্জির পাশে একাধিক চিরকুট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব লেখায় আর্থিক সংকট, শারীরিক সমস্যা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতির কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি চিঠিতে সহকর্মী সুমন চৌধুরীর প্রসঙ্গ এসেছে। ছোট ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক, দুই সন্তান পিয়াঙ্কা ও প্রদ্ধতি এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ করেও পৃথক লেখা থাকার কথা জানা গেছে। এসব চিঠির বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু সেগুলো যদি তাঁর শেষ সময়ের মানসিক ও আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়ে থাকে, তাহলে সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়- তিনি যখন সংকটে ছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা কী জানতেন? আর জানলে কী করেছিলেন? নেতৃত্বের দায় কতটুকু?
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে তিনি নিজেই ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ, কিছু সংগঠনে পেশাদার সাংবাদিকদের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তি-স্বার্থের প্রভাব কখনো কখনো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যক্তি-বিশেষের প্রভাব সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ওপর চেপে বসলে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই কারণে পুলক চ্যাটার্জির মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাংবাদিকরা যথার্থ সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মৃত্যুর দায় সরাসরি কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একজন প্রবীণ সাংবাদিক দীর্ঘদিন কর্মহীন ও আর্থিক সংকটে থাকলে তাঁর সহকর্মী সংগঠনগুলোর সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল, জরুরি সহায়তা, কর্মসংস্থান বা পেশাগত পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না- পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অনৈক্য ও নেতৃত্বের বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে- এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। পুলক চ্যাটার্জির মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিক কর্মজীবন হারানোর পর যদি দীর্ঘ সময় নিজেকে একা মনে করে থাকেন, তবে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংকট নয়; সাংবাদিক সমাজের সাংগঠনিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলো কতটা সফল- এখন সেটিই আলোচনার বিষয়।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত ২০২৩ সালে তাঁর চাকরি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল? দ্বিতীয়ত, সমকাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর কোনো ন্যায্য পাওনা বকেয়া ছিল কি না? তৃতীয়ত, চাকরি হারানোর পর তাঁর আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী ছিল? চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠন ও সহকর্মীরা তাঁর সংকট সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন এবং তাঁকে কোনো সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না? পঞ্চমত, মৃত্যুর আগে পাওয়া চিঠিগুলোর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে কী উঠে আসে? ষষ্ঠত, স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা রয়েছে এবং তার কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই মৃত্যু কি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের পরিণতি, নাকি এর সঙ্গে পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, স্মৃতিচারণ থাকবে। কিন্তু শুধু শোক প্রকাশ করে যদি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর আর পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য। প্রয়োজন তাঁর চাকরি হারানোর প্রেক্ষাপট ও পাওনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ। প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিজেদের ভূমিকা পর্যালোচনা।
একজন সাংবাদিক তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ সংবাদপেশা ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। শেষ জীবনে যদি তিনি আর্থিক সংকট, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যাবে। পুলক চ্যাটার্জি নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বরিশালের সাংবাদিক সমাজের সামনে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলো এখনো জীবিত।
একজন সাংবাদিকের দুর্দিনে সাংবাদিক সমাজ কোথায় থাকে- আর সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব যখন পেশাদারিত্বের বদলে অন্য কোনো প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যোগ্য সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবে কে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু এখন সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে।’
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।
একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ অধ্যায় কি এমনই হওয়ার কথা ছিল? দুই দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতা করেছেন পুলক চ্যাটার্জি। দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির বরিশাল ব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ কর্মজীবনের শেষদিকে এসে চাকরি হারিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বেকার ছিলেন, আর্থিক সংকটে পড়েছেন- এমন তথ্যই এখন তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) তাঁর আকস্মিক ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো হয়ে উঠেছে-একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সাংবাদিক যখন একের পর এক সংকটে পড়ছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন কে?
শুধু ব্যক্তিগত হতাশা, শারীরিক সমস্যা কিংবা আর্থিক সংকট দিয়ে কি এই মৃত্যুর পুরো প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা সম্ভব? নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পেশাগত অনিশ্চয়তা, কর্মহীনতা, পাওনা নিয়ে জটিলতা এবং সাংবাদিক সমাজের কাঠামোগত দুর্বলতা? এসব প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জি ২০০৫ সালে দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর তিনি বরিশাল ব্যুরোর দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ সালে সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে ব্যুরোর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর সহকর্মী স্টাফ রিপোর্টার সুমন চৌধুরীকে দিয়ে ব্যুরোর কার্যক্রম চালানো হয়। কিন্তু চাকরি বা দায়িত্ব হারানোর পর পুলক চ্যাটার্জির আর্থিক ও পেশাগত পরিস্থিতি কী দাঁড়িয়েছিল- এখন সেটিই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে তাঁর ন্যায্য পাওনা আদৌ পরিশোধ করা হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে কতটুকু এবং না হয়ে থাকলে কেন- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন। কারণ একজন সাংবাদিকের দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান শুধু একটি পদ হারানোর ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তাঁর জীবিকা, পরিবারের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের প্রশ্ন।
পরিবার ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরি হারানোর পরও সমকালের সঙ্গে পুলক চ্যাটার্জির সম্পর্ক পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর কাছে সাবেক অফিসের একটি বিকল্প চাবি ছিল বলে জানা গেছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে যেতেন, বসতেন এবং পত্রিকা পড়তেন। এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- কর্মস্থল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও একজন সাবেক ব্যুরোপ্রধান কেন সেখানে নিয়মিত যেতেন? এটি কি শুধুই পুরোনো কর্মস্থলের প্রতি আবেগ? নাকি দীর্ঘ কর্মজীবনের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না পারার এক ধরনের মানসিক টান? সহকর্মীদের কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু তাঁর জীবনের শেষ সময়ের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ঘটনাটির সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকও তদন্তের দাবি রাখে।
মৃত্যুর পর পুলক চ্যাটার্জির পাশে একাধিক চিরকুট পাওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব লেখায় আর্থিক সংকট, শারীরিক সমস্যা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার অনুভূতির কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি চিঠিতে সহকর্মী সুমন চৌধুরীর প্রসঙ্গ এসেছে। ছোট ভাই ভূমি কর্মকর্তা দীপক, দুই সন্তান পিয়াঙ্কা ও প্রদ্ধতি এবং বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসেনকে উদ্দেশ করেও পৃথক লেখা থাকার কথা জানা গেছে। এসব চিঠির বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই তদন্তের বিষয়। কিন্তু সেগুলো যদি তাঁর শেষ সময়ের মানসিক ও আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হয়ে থাকে, তাহলে সাংবাদিক সমাজের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়ায়- তিনি যখন সংকটে ছিলেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা কী জানতেন? আর জানলে কী করেছিলেন? নেতৃত্বের দায় কতটুকু?
বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন পুলক চ্যাটার্জি। অর্থাৎ সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃত্বে তিনি নিজেই ছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ, কিছু সংগঠনে পেশাদার সাংবাদিকদের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তি-স্বার্থের প্রভাব কখনো কখনো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ব্যক্তি-বিশেষের প্রভাব সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ওপর চেপে বসলে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথার্থ মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই কারণে পুলক চ্যাটার্জির মতো দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও যোগ্য সাংবাদিকরা যথার্থ সম্মান ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অবশ্য কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মৃত্যুর দায় সরাসরি কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনের পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু একজন প্রবীণ সাংবাদিক দীর্ঘদিন কর্মহীন ও আর্থিক সংকটে থাকলে তাঁর সহকর্মী সংগঠনগুলোর সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য কল্যাণ তহবিল, জরুরি সহায়তা, কর্মসংস্থান বা পেশাগত পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না- পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে অনৈক্য ও নেতৃত্বের বিভাজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্বে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সাংবাদিকদের স্বার্থ কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে- এ নিয়েও প্রশ্ন আছে। পুলক চ্যাটার্জির মতো অভিজ্ঞ সাংবাদিক কর্মজীবন হারানোর পর যদি দীর্ঘ সময় নিজেকে একা মনে করে থাকেন, তবে সেটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংকট নয়; সাংবাদিক সমাজের সাংগঠনিক সক্ষমতারও একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় বরিশালের সাংবাদিক সংগঠনগুলো কতটা সফল- এখন সেটিই আলোচনার বিষয়।
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অন্তত কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত ২০২৩ সালে তাঁর চাকরি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ কী ছিল? দ্বিতীয়ত, সমকাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর কোনো ন্যায্য পাওনা বকেয়া ছিল কি না? তৃতীয়ত, চাকরি হারানোর পর তাঁর আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কী ছিল? চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠন ও সহকর্মীরা তাঁর সংকট সম্পর্কে কতটা অবগত ছিলেন এবং তাঁকে কোনো সহায়তা দেওয়া হয়েছিল কি না? পঞ্চমত, মৃত্যুর আগে পাওয়া চিঠিগুলোর বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তে কী উঠে আসে? ষষ্ঠত, স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা রয়েছে এবং তার কারণে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা, অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই মৃত্যু কি কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংকটের পরিণতি, নাকি এর সঙ্গে পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারও কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, স্মৃতিচারণ থাকবে। কিন্তু শুধু শোক প্রকাশ করে যদি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাঁর মৃত্যুর পর সামনে আসা প্রশ্নগুলোর উত্তর আর পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য। প্রয়োজন তাঁর চাকরি হারানোর প্রেক্ষাপট ও পাওনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ। প্রয়োজন সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিজেদের ভূমিকা পর্যালোচনা।
একজন সাংবাদিক তাঁর জীবনের বড় একটি অংশ সংবাদপেশা ও সমাজের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। শেষ জীবনে যদি তিনি আর্থিক সংকট, পেশাগত অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভারে ন্যুব্জ হয়ে থাকেন, তবে তাঁর মৃত্যুকে শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হিসেবে দেখলে মূল প্রশ্নটি আড়ালেই থেকে যাবে। পুলক চ্যাটার্জি নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু বরিশালের সাংবাদিক সমাজের সামনে যে প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলো এখনো জীবিত।
একজন সাংবাদিকের দুর্দিনে সাংবাদিক সমাজ কোথায় থাকে- আর সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃত্ব যখন পেশাদারিত্বের বদলে অন্য কোনো প্রভাবের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যোগ্য সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াবে কে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু এখন সেই প্রশ্নের উত্তর দাবি করছে।’
হাসিবুল ইসলাম, সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক।

১৩ আগস্ট, ২০২৬ ০২:৫৬
বিগত ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার আমলে পরীক্ষায় নকল বন্ধ, মেয়েদের উপবৃত্তি, অবৈতনিক শিক্ষা, জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ বেশকিছু সফলতা ছিল বিএনপির। তবে এর বিপরীতে সবচেয়ে বেশি যে কয়েকটা ব্যর্থতার জন্য আজো বিএনপিকে লজ্জিত হতে হয় এরমধ্যে অন্যতম একটা হলো বিদ্যুৎ। সেই আমলে বিদ্যুতের জন্য কানসাট বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের মতো যে লজ্জাজনক ইতিহাস রচিত হয়েছিল এবং সেই ঘটনার জন্য যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী ছিলেন, সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই আবার প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি দিয়ে এবার পূর্ণমন্ত্রী করা হলো! অযোগ্য মানুষকে প্রমোশন দিয়ে দ্বিতীয়বার আগের চেয়েও বড় চেয়ারে বসাতে কতখানি চাটুকারিতা তোষামোদির যোগ্যতা থাকা লাগে জানিনা, তবে এটা জানি সেই একই ব্যক্তির জন্য বিএনপি এবারও বড় বিতর্কের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে যিনি তীব্র জনরোষের মুখে মন্ত্রীত্ব থেকে অপসারিত হয়েছিলেন তাকেই এবার পূর্ণমন্ত্রী বানিয়ে বিএনপি কী কী সাফল্য অর্জন করবে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি যে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ ম্যানেজমেন্টে পুরোপুরি অযোগ্য তার প্রমাণ ইতোমধ্যে তিনি দিয়েছেন। গ্রামে বর্তমানে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতি ২ ঘন্টা পরপর এক থেকে দেড় ঘন্টা বা কোথাও কোথাও এরচেয়ে বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এমনকি রাতের অফ-পিক আওয়ারেও গড়ে ২ থেকে ৩ বার লোডশেডিং হচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ মন্ত্রী বললেন- গ্রামে নাকি লোডশেডিং নাই! বিদ্যুতের লম্বা লম্বা লাইনের জন্য নাকি বিদ্যুৎ ট্রিপ বা ফল্ট করে! এটা কোনো যুক্তি? গ্রামের মানুষ বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে এখন অতিষ্ঠ। সেখানে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া বা গ্যাস-কয়লা সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে কৈফিয়ত দেওয়ার পরিবর্তে তিনি দায় চাপালেন পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের উপরে!
মন্ত্রী হওয়ার পরেই কি মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে যায় নাকি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে ভারসাম্যহীন হলেই তখন তাকে মন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয় সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় এসব অযোগ্য মন্ত্রীদের জন্য বিএনপি এবারও বিতর্কিত হবে, জনবিচ্ছিন্ন হবে এবং বিপদে পড়বে। দেশে এখন তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। ঢাকার অনেক জায়গায় চুলা জ্বলছে না। সিএনজি স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গাড়িতে গ্যাস পাচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় গ্যাসের সামান্য সরবরাহ থাকলেও গ্যাসের চাপ একদম নেই। এদিকে কয়লা মজুদও প্রায় শেষ। বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রায় খালি। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেলের সরবরাহ নেই। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লাচালিত। গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লার সরবরাহ না থাকলে এগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। ভারতীয় কোম্পানি আদানি এবং দেশীয় সামিট গ্রুপকে বিশেষ সু্বিধা দেওয়ার জন্য চড়াদামে কেনা বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন দেশের অর্থনীতির গলার কাঁটা। সরকারের জন্য বিরাট বড় বোঝা। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিগত দিনে পাচার হয়েছে দেশের কোটি কোটি ডলার।
বিগত পতিত সরকারের আমলে এদেশে আমদানি নির্ভর কয়লা, ডিজেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল মূলত একটি দেশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য। আশাকরি সেই দেশটার নাম বলার আর দরকার নেই। সবাই বুঝতে পারছে। অথচ নদীমাতৃক এবং মৌসুমী বায়ুর এই বাংলাদেশে দরকার ছিল বেশি বেশি জলবিদ্যুৎ এবং বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা, যা এদেশে সারাবছর বিনামূল্যে পাওয়া যায়। উন্নত বিশ্বের মতো সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট নির্মাণ করার দরকার ছিল। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে বারবার কাঁচামাল আমদানি করা লাগতো না। তবে সেটা না করার পেছনে মূল রহস্য হলো এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশের বিরাট লাভ হলেও ক্ষতি হতো লুটেরাদের। তারা বারবার এলএনজি, গ্যাস, কয়লা, ডিজেল, ইউরেনিয়াম আমদানির নামে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পাচার করতে পারতো না। এদেশের সকল উন্নয়ন হয় মূলত বড় বড় চোর-ডাকাত, লুটেরাদের লুটপাটে সহায়তা করার জন্য আর কিছু উন্নয়ন প্রদর্শনী করার জন্য। সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের স্বার্থে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কোনো উন্নয়ন হয় না।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম আসে বিদেশ থেকে। সেটা যদি না পাওয়া যায় তবে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কানাকড়ি মূল্যও নাই। অথচ এই একটা স্বপ্নবিলাসী বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ দিয়ে কাপ্তাইয়ের মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে ১০টা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যেতো। এখানে জ্বালানি লাগতো নদীর স্রোত, যা সারাবছরই কমবেশি থাকতো এই নদীমাতৃক বাংলাদেশে। পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আমি অপ্রয়োজনীয় বলছি না। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা 'ঋণ নিয়ে ঘি কিনে খাওয়া'র মতো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। তবে সেটা তাদের জন্যই প্রযোজ্য যেখানে এর কাঁচামাল ইউরেনিয়ামের খনি বা পর্যাপ্ত জোগান আছে। আমাদের গরীব দেশের বাস্তবতায় স্বপ্নবিলাসী চড়াদামের বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক স্বল্পব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র দরকার। আমাদের সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দরকার, যার কাঁচামাল তথা জ্বালানি আমাদের দেশে পাওয়া যায় বা দেশেই উৎপাদন হয়। অথচ গণহারে নির্মাণ করা হয়েছে সব কয়লা, গ্যাস আর ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। চিন্তা করা হয়নি এর জ্বালানি কোথা থেকে আসবে। অন্য দেশ যদি না দেয় বা সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় তখন কী হবে। কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লার আমদানি না থাকলে, ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেল না পাওয়া গেলে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ না থাকলে বিদ্যুৎ কি হাওয়া-বাতাস থেকে আসবে?
হ্যাঁ, হাওয়া-বাতাস থেকেও তো বিনামূল্যে বিদ্যুৎ আসে। তবে অতীতের মারাত্মক লেভেলের দেশপ্রেমিক দাবিদার রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের লাভের স্বার্থে তারা কোনো উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। বিনামূল্যে পানি থেকেও বিদ্যুৎ আসে, সূর্যের আলো থেকেও বিদ্যুৎ আসে। কিন্তু তারা ওয়াটার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। কারণ, এতে কোনো জ্বালানি লাগে না। যা লাগে তা প্রকৃতি থেকে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কিন্তু তাহলে তো বারবার জ্বালানি আমদানির নামে কেনাকাটায় চরম লাভের ব্যবসাটা আর থাকে না। রাষ্ট্রের টাকা বারবার লুট আর পাচার করার সুযোগটাও তো তবে হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা এসব দুর্বৃত্তদের অর্থনৈতিক লুটপাটের এই জটিল অংকটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তারা বুঝতে চায়ও না। তারা শুধু চায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা।
আপনি জনগণের জন্য বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ টাকা ইউনিট দামে বিদ্যুৎ কিনলেন, নাকি ভারত থেকে বিদ্যুৎ চুরি করে আনলেন, নাকি নিজের কেন্দ্রের টারবাইন চালু রাখতে ৫ টাকা দামের কয়লা-ইউরেনিয়াম আপনি ৫০ টাকায় কিনে বাকি ৪৫ টাকাই আত্মসাৎ করলেন, সেটা দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে চায় না। তারা শুধু নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা চায়। সারা পৃথিবী যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সন্ধানে ব্যস্ত তখন আমরা ব্যস্ত চেতনার সন্ধানে আর বিরোধী মত দমনে। একদল তো চেতনার লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে পালিয়েছে। কিন্তু কথা হলো- ফ্যাসিস্ট, লুটেরা, গণহত্যাকারী যাকে বলা হয় সেই শেখ হাসিনার সরকার যদি নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারে তাহলে আপনারা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার হয়ে সেটা পারছেন না কেন? জনগণ এই প্রশ্নটা খুব ভালোভাবেই বোঝে। এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি ভূগোল অর্থনীতি বুঝিয়ে, জিডিপি বুঝিয়ে, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি বা হরমুজ প্রণালী বুঝিয়ে কিংবা পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। সরকারে থাকলে সব ব্যর্থতার দায় আপনাদের নিতেই হবে। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, লেখক, কবি, কলামিস্ট ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ।
বাবুগঞ্জঃ ১২ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।
বিগত ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার আমলে পরীক্ষায় নকল বন্ধ, মেয়েদের উপবৃত্তি, অবৈতনিক শিক্ষা, জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ বেশকিছু সফলতা ছিল বিএনপির। তবে এর বিপরীতে সবচেয়ে বেশি যে কয়েকটা ব্যর্থতার জন্য আজো বিএনপিকে লজ্জিত হতে হয় এরমধ্যে অন্যতম একটা হলো বিদ্যুৎ। সেই আমলে বিদ্যুতের জন্য কানসাট বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের মতো যে লজ্জাজনক ইতিহাস রচিত হয়েছিল এবং সেই ঘটনার জন্য যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী ছিলেন, সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই আবার প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি দিয়ে এবার পূর্ণমন্ত্রী করা হলো! অযোগ্য মানুষকে প্রমোশন দিয়ে দ্বিতীয়বার আগের চেয়েও বড় চেয়ারে বসাতে কতখানি চাটুকারিতা তোষামোদির যোগ্যতা থাকা লাগে জানিনা, তবে এটা জানি সেই একই ব্যক্তির জন্য বিএনপি এবারও বড় বিতর্কের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে যিনি তীব্র জনরোষের মুখে মন্ত্রীত্ব থেকে অপসারিত হয়েছিলেন তাকেই এবার পূর্ণমন্ত্রী বানিয়ে বিএনপি কী কী সাফল্য অর্জন করবে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি যে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ ম্যানেজমেন্টে পুরোপুরি অযোগ্য তার প্রমাণ ইতোমধ্যে তিনি দিয়েছেন। গ্রামে বর্তমানে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতি ২ ঘন্টা পরপর এক থেকে দেড় ঘন্টা বা কোথাও কোথাও এরচেয়ে বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এমনকি রাতের অফ-পিক আওয়ারেও গড়ে ২ থেকে ৩ বার লোডশেডিং হচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ মন্ত্রী বললেন- গ্রামে নাকি লোডশেডিং নাই! বিদ্যুতের লম্বা লম্বা লাইনের জন্য নাকি বিদ্যুৎ ট্রিপ বা ফল্ট করে! এটা কোনো যুক্তি? গ্রামের মানুষ বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে এখন অতিষ্ঠ। সেখানে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া বা গ্যাস-কয়লা সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে কৈফিয়ত দেওয়ার পরিবর্তে তিনি দায় চাপালেন পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের উপরে!
মন্ত্রী হওয়ার পরেই কি মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে যায় নাকি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে ভারসাম্যহীন হলেই তখন তাকে মন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয় সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় এসব অযোগ্য মন্ত্রীদের জন্য বিএনপি এবারও বিতর্কিত হবে, জনবিচ্ছিন্ন হবে এবং বিপদে পড়বে। দেশে এখন তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। ঢাকার অনেক জায়গায় চুলা জ্বলছে না। সিএনজি স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গাড়িতে গ্যাস পাচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় গ্যাসের সামান্য সরবরাহ থাকলেও গ্যাসের চাপ একদম নেই। এদিকে কয়লা মজুদও প্রায় শেষ। বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রায় খালি। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেলের সরবরাহ নেই। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লাচালিত। গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লার সরবরাহ না থাকলে এগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। ভারতীয় কোম্পানি আদানি এবং দেশীয় সামিট গ্রুপকে বিশেষ সু্বিধা দেওয়ার জন্য চড়াদামে কেনা বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন দেশের অর্থনীতির গলার কাঁটা। সরকারের জন্য বিরাট বড় বোঝা। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিগত দিনে পাচার হয়েছে দেশের কোটি কোটি ডলার।
বিগত পতিত সরকারের আমলে এদেশে আমদানি নির্ভর কয়লা, ডিজেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল মূলত একটি দেশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য। আশাকরি সেই দেশটার নাম বলার আর দরকার নেই। সবাই বুঝতে পারছে। অথচ নদীমাতৃক এবং মৌসুমী বায়ুর এই বাংলাদেশে দরকার ছিল বেশি বেশি জলবিদ্যুৎ এবং বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা, যা এদেশে সারাবছর বিনামূল্যে পাওয়া যায়। উন্নত বিশ্বের মতো সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট নির্মাণ করার দরকার ছিল। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে বারবার কাঁচামাল আমদানি করা লাগতো না। তবে সেটা না করার পেছনে মূল রহস্য হলো এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশের বিরাট লাভ হলেও ক্ষতি হতো লুটেরাদের। তারা বারবার এলএনজি, গ্যাস, কয়লা, ডিজেল, ইউরেনিয়াম আমদানির নামে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পাচার করতে পারতো না। এদেশের সকল উন্নয়ন হয় মূলত বড় বড় চোর-ডাকাত, লুটেরাদের লুটপাটে সহায়তা করার জন্য আর কিছু উন্নয়ন প্রদর্শনী করার জন্য। সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের স্বার্থে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কোনো উন্নয়ন হয় না।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম আসে বিদেশ থেকে। সেটা যদি না পাওয়া যায় তবে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কানাকড়ি মূল্যও নাই। অথচ এই একটা স্বপ্নবিলাসী বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ দিয়ে কাপ্তাইয়ের মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে ১০টা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যেতো। এখানে জ্বালানি লাগতো নদীর স্রোত, যা সারাবছরই কমবেশি থাকতো এই নদীমাতৃক বাংলাদেশে। পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আমি অপ্রয়োজনীয় বলছি না। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা 'ঋণ নিয়ে ঘি কিনে খাওয়া'র মতো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। তবে সেটা তাদের জন্যই প্রযোজ্য যেখানে এর কাঁচামাল ইউরেনিয়ামের খনি বা পর্যাপ্ত জোগান আছে। আমাদের গরীব দেশের বাস্তবতায় স্বপ্নবিলাসী চড়াদামের বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক স্বল্পব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র দরকার। আমাদের সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দরকার, যার কাঁচামাল তথা জ্বালানি আমাদের দেশে পাওয়া যায় বা দেশেই উৎপাদন হয়। অথচ গণহারে নির্মাণ করা হয়েছে সব কয়লা, গ্যাস আর ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। চিন্তা করা হয়নি এর জ্বালানি কোথা থেকে আসবে। অন্য দেশ যদি না দেয় বা সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় তখন কী হবে। কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লার আমদানি না থাকলে, ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেল না পাওয়া গেলে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ না থাকলে বিদ্যুৎ কি হাওয়া-বাতাস থেকে আসবে?
হ্যাঁ, হাওয়া-বাতাস থেকেও তো বিনামূল্যে বিদ্যুৎ আসে। তবে অতীতের মারাত্মক লেভেলের দেশপ্রেমিক দাবিদার রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের লাভের স্বার্থে তারা কোনো উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। বিনামূল্যে পানি থেকেও বিদ্যুৎ আসে, সূর্যের আলো থেকেও বিদ্যুৎ আসে। কিন্তু তারা ওয়াটার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। কারণ, এতে কোনো জ্বালানি লাগে না। যা লাগে তা প্রকৃতি থেকে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কিন্তু তাহলে তো বারবার জ্বালানি আমদানির নামে কেনাকাটায় চরম লাভের ব্যবসাটা আর থাকে না। রাষ্ট্রের টাকা বারবার লুট আর পাচার করার সুযোগটাও তো তবে হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা এসব দুর্বৃত্তদের অর্থনৈতিক লুটপাটের এই জটিল অংকটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তারা বুঝতে চায়ও না। তারা শুধু চায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা।
আপনি জনগণের জন্য বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ টাকা ইউনিট দামে বিদ্যুৎ কিনলেন, নাকি ভারত থেকে বিদ্যুৎ চুরি করে আনলেন, নাকি নিজের কেন্দ্রের টারবাইন চালু রাখতে ৫ টাকা দামের কয়লা-ইউরেনিয়াম আপনি ৫০ টাকায় কিনে বাকি ৪৫ টাকাই আত্মসাৎ করলেন, সেটা দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে চায় না। তারা শুধু নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা চায়। সারা পৃথিবী যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সন্ধানে ব্যস্ত তখন আমরা ব্যস্ত চেতনার সন্ধানে আর বিরোধী মত দমনে। একদল তো চেতনার লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে পালিয়েছে। কিন্তু কথা হলো- ফ্যাসিস্ট, লুটেরা, গণহত্যাকারী যাকে বলা হয় সেই শেখ হাসিনার সরকার যদি নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারে তাহলে আপনারা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার হয়ে সেটা পারছেন না কেন? জনগণ এই প্রশ্নটা খুব ভালোভাবেই বোঝে। এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি ভূগোল অর্থনীতি বুঝিয়ে, জিডিপি বুঝিয়ে, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি বা হরমুজ প্রণালী বুঝিয়ে কিংবা পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। সরকারে থাকলে সব ব্যর্থতার দায় আপনাদের নিতেই হবে। #
❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, লেখক, কবি, কলামিস্ট ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ।
বাবুগঞ্জঃ ১২ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।

১২ জুলাই, ২০২৬ ১৩:০৪
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা একটি পদ্ধতিগত স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণমানুষের এক অভূতপূর্ব ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন নতুন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আগামীকাল ১৩ জুলাই, ২০২৬, সোমবার শস্যভাণ্ডার খ্যাত ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জনপদে তাঁর এই প্রথম আনুষ্ঠানিক শুভ আগমন। এই ঐতিহাসিক আগমনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ জনপদের কোটি মানুষের মাঝে যে বিপুল আবেগ, গভীর উন্মুখতা এবং হৃদয়ের সুতীব্র আকুলতা দৃশ্যমান, তা কেবল একজন জনপ্রিয় নেতার প্রতি সাধারণ রাজনৈতিক আনুগত্য নয়- বরং এটি হলো দীর্ঘদিনের অবদমিত, বঞ্চিত এবং সুপরিকল্পিতভাবে প্রান্তিকীকরণে বাধ্য করা একটি ভৌগোলিক জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণ।
একজন অপরাধবিজ্ঞানী (Criminologist) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে যখন আমি বরিশালের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূচিত্র অবলোকন করি, তখন জনগণের এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশার আড়ালে এক গভীর নাগরিক পরিপক্বতা লক্ষ করি। এখানে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, কোনো তাড়াহুড়া কিংবা অতি-উচ্ছ্বাসের আতিশয্য নেই। দীর্ঘ স্বৈরাচারের নির্যাতন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন সয়ে সয়ে এই জনপদের মানুষ যে ধৈর্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে, আজ তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তাদের প্রাণপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ককে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদায় বরণ করে নেওয়ার সুশৃঙ্খল মানসিকতার মধ্য দিয়ে।
স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষত এবং বরিশালের পদ্ধতিগত প্রান্তিকীকরণ: একটি অপরাধবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ: বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার বাংলাদেশের যে কয়টি জনপদকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাঞ্জাবিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও আক্ষরিক অর্থেই ‘জাহান্নাম’ বানিয়ে ফেলেছিল, তার মধ্যে বরিশাল ছিল অন্যতম। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে আমরা বলতে পারি “State-Sponsored Structural Crime” বা রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষিত কাঠামোগত অপরাধ। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া, সেখানকার অবকাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এবং জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করা এক ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক অপরাধ।
বিগত সরকারের আমলে বরিশাল বিভাগকে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত দেড় দশকে সরকারের মেগা প্রজেক্টগুলোর বণ্টন এবং regional budget allocation বা আঞ্চলিক বাজেট বরাদ্দে বরিশাল বিভাগ সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেয়েছে। শুধু তা-ই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা এই উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি বড় অংশই পদ্ধতিগত দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের কারণে অপচয় ও পাচার হয়েছে। টিআইবি’র তথ্যমতে, জলবায়ু প্রকল্পের বড় অঙ্কের অর্থ রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে লোপাট হওয়ায় বরিশালের নদীভাঙন কবলিত মানুষগুলো আরও বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।
একইভাবে, বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর সাম্প্রতিক দারিদ্র্য ম্যাপ ও অর্থনৈতিক সূচকগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যোগাযোগের অভাব, শিল্পায়নের অনুপস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের চরম সংকটের কারণে বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি ছিল। ফ্যাসিবাদী চক্র এই অঞ্চলকে কেবল তাদের ভোট ব্যাংক কিংবা বলপ্রয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, কিন্তু বিনিময়ে বরিশালের মানুষকে দিয়েছে কেবলই বঞ্চনা আর অবক্ষয়।
শতভাগ ব্যালট বিপ্লব: জনগণের উপহার ও আস্থার চুক্তি: ফ্যাসিবাদের সেই দুঃসহ অন্ধকারের মোক্ষম জবাব বরিশালের সচেতন জনগণ দিয়েছে ২০২৬ সালের নির্বাচনে। বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি সংসদীয় আসনের সবকয়টিতেই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জনাব তারেক রহমানের মনোনীত প্রার্থীদের তথা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) বিপুল ভোটে জয়ী করে এক অবিস্মরণীয় ‘ব্যালট বিপ্লব’ ঘটিয়েছে। এই শতভাগ আসন উপহার দেওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক বিজয় নয়; রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি হলো জনগণের পক্ষ থেকে তাদের নেতার সাথে একটি “Social Contract” বা সামাজিক ও রাজনৈতিক আস্থার চুক্তি।
বরিশালের মানুষ তাদের ভোটকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রমাণ করেছে যে, জুলুম, নির্যাতন এবং গুম-খুনের অপরাজনীতি দিয়ে এই অঞ্চলের সাহসী জনতাকে দাবিয়ে রাখা যায় না। তারা তাদের প্রাণের নেতাকে সকল আসন উপহার দিয়ে মূলত এই নতুন বাংলাদেশের পুনর্গঠনে এবং দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় নিজেদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করেছে।
বৈশ্বিক উন্নয়ন অংশীদারদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বরিশালের রূপান্তর সম্ভাবনা: নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো সমতাভিত্তিক উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসমূহ বাংলাদেশের এই নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সুশাসন এবং জবাবদিহিমূলক নীতির প্রতি গভীর আস্থা ব্যক্ত করছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নীতি:
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি বিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণে যে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তার সুফল সরাসরি গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করবে। বরিশাল যেহেতু দীর্ঘকাল ধরে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার, তাই বিশ্বব্যাংকের সহায়তাপুষ্ট নতুন প্রকল্পগুলো এই অঞ্চলের সুশাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
এডিবি’র অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও যোগাযোগ খাত: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) সম্প্রতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিশেষ করে পরিবহন অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগের (Transport Connectivity) ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি অনুমোদন করেছে। এডিবি’র এই স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন পলিসি বরিশালের জন্য একটি আশীর্বাদ। ‘বাংলার ভেনিস’ খ্যাত বরিশালের নদীভিত্তিক অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নৌপথের আধুনিকায়ন, পায়রা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে এডিবি’র এই নতুন অর্থায়ন অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।
টিআইবি’র দুর্নীতিমুক্ত টেকসই মডেল: Transparency International Bangladesh (TIB)-এর প্রস্তাবিত দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক মডেলকে ধারণ করে নতুন প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তাতে বরিশালের স্থানীয় প্রশাসন, টেন্ডারবাজি ও নদীশাসন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। ফলে প্রতিটি সরকারি টাকার শতভাগ সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
আকাশচুম্বী প্রত্যাশা বনাম জনগণের রাজনৈতিক পরিপক্বতা: একটি দীর্ঘ অত্যাচারিত জনপদের মানুষের প্রত্যাশা নতুন নেতার কাছে আকাশচুম্বী হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বরিশালের জনগণের রাজনৈতিক চেতনা অত্যন্ত গভীর। তারা বোঝেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার দীর্ঘ ১৫ বছরে রাষ্ট্রের যে গভীর ক্ষত ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গেছে, তা রাতারাতি বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় দূর করা সম্ভব নয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি টেকসই স্বনির্ভর রাষ্ট্র নির্মাণ করতে সময় এবং ধৈর্যের প্রয়োজন।
তাই তো বরিশালের মানুষের মাঝে কোনো ক্ষোভ, তাড়া কিংবা অযৌক্তিক দাবি আদায়ের কোনো উগ্র বাড়াবাড়ি নেই। তাদের সমস্ত মনোযোগ এখন তাদের প্রিয় নেতাকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, নিখাদ ভালোবাসা এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানানোর আয়োজনে। এই সুশৃঙ্খল আচরণ বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ কেবল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই করেনি, তারা উন্নত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চাতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় বরিশাল: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বরিশাল সফর কেবল একটি রুটিন রাষ্ট্রীয় সফর নয়। এটি মূলত ফ্যাসিবাদের অন্ধকার থেকে মুক্ত হওয়া এক নতুন সুপ্রভাতের দিকে বরিশালের যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা। এই সফরের মধ্য দিয়ে বরিশালের অবহেলিত গ্যাস সংযোগ, বন্ধ হয়ে থাকা শিল্পকারখানা সচল করা, আইটি পার্ক স্থাপন এবং কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পায়নের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
এক সময়ের অবহেলিত, শোষিত ও জাহান্নামে পরিণত করা বরিশাল আজ ডানা ঝাপটে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠছে। প্রিয় নেতার হাত ধরে এই জনপদ তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের এক অনন্য রোল মডেলে পরিণত হবে -এটাই আজ সমগ্র বরিশালবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস। গণতন্ত্রের নবযাত্রার কাণ্ডারি, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি- লক্ষ কোটি মানুষের ভালোবাসার এই বরিশালে আপনাকে জানাই প্রাণঢালা সুস্বাগতম!
লেখক:
অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা একটি পদ্ধতিগত স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণমানুষের এক অভূতপূর্ব ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন নতুন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আগামীকাল ১৩ জুলাই, ২০২৬, সোমবার শস্যভাণ্ডার খ্যাত ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জনপদে তাঁর এই প্রথম আনুষ্ঠানিক শুভ আগমন। এই ঐতিহাসিক আগমনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ জনপদের কোটি মানুষের মাঝে যে বিপুল আবেগ, গভীর উন্মুখতা এবং হৃদয়ের সুতীব্র আকুলতা দৃশ্যমান, তা কেবল একজন জনপ্রিয় নেতার প্রতি সাধারণ রাজনৈতিক আনুগত্য নয়- বরং এটি হলো দীর্ঘদিনের অবদমিত, বঞ্চিত এবং সুপরিকল্পিতভাবে প্রান্তিকীকরণে বাধ্য করা একটি ভৌগোলিক জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণ।
একজন অপরাধবিজ্ঞানী (Criminologist) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে যখন আমি বরিশালের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূচিত্র অবলোকন করি, তখন জনগণের এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশার আড়ালে এক গভীর নাগরিক পরিপক্বতা লক্ষ করি। এখানে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, কোনো তাড়াহুড়া কিংবা অতি-উচ্ছ্বাসের আতিশয্য নেই। দীর্ঘ স্বৈরাচারের নির্যাতন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন সয়ে সয়ে এই জনপদের মানুষ যে ধৈর্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে, আজ তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তাদের প্রাণপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ককে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদায় বরণ করে নেওয়ার সুশৃঙ্খল মানসিকতার মধ্য দিয়ে।
স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষত এবং বরিশালের পদ্ধতিগত প্রান্তিকীকরণ: একটি অপরাধবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ: বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার বাংলাদেশের যে কয়টি জনপদকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাঞ্জাবিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও আক্ষরিক অর্থেই ‘জাহান্নাম’ বানিয়ে ফেলেছিল, তার মধ্যে বরিশাল ছিল অন্যতম। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে আমরা বলতে পারি “State-Sponsored Structural Crime” বা রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষিত কাঠামোগত অপরাধ। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া, সেখানকার অবকাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এবং জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করা এক ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক অপরাধ।
বিগত সরকারের আমলে বরিশাল বিভাগকে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত দেড় দশকে সরকারের মেগা প্রজেক্টগুলোর বণ্টন এবং regional budget allocation বা আঞ্চলিক বাজেট বরাদ্দে বরিশাল বিভাগ সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেয়েছে। শুধু তা-ই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা এই উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি বড় অংশই পদ্ধতিগত দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের কারণে অপচয় ও পাচার হয়েছে। টিআইবি’র তথ্যমতে, জলবায়ু প্রকল্পের বড় অঙ্কের অর্থ রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে লোপাট হওয়ায় বরিশালের নদীভাঙন কবলিত মানুষগুলো আরও বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।
একইভাবে, বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর সাম্প্রতিক দারিদ্র্য ম্যাপ ও অর্থনৈতিক সূচকগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যোগাযোগের অভাব, শিল্পায়নের অনুপস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের চরম সংকটের কারণে বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি ছিল। ফ্যাসিবাদী চক্র এই অঞ্চলকে কেবল তাদের ভোট ব্যাংক কিংবা বলপ্রয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, কিন্তু বিনিময়ে বরিশালের মানুষকে দিয়েছে কেবলই বঞ্চনা আর অবক্ষয়।
শতভাগ ব্যালট বিপ্লব: জনগণের উপহার ও আস্থার চুক্তি: ফ্যাসিবাদের সেই দুঃসহ অন্ধকারের মোক্ষম জবাব বরিশালের সচেতন জনগণ দিয়েছে ২০২৬ সালের নির্বাচনে। বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি সংসদীয় আসনের সবকয়টিতেই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জনাব তারেক রহমানের মনোনীত প্রার্থীদের তথা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) বিপুল ভোটে জয়ী করে এক অবিস্মরণীয় ‘ব্যালট বিপ্লব’ ঘটিয়েছে। এই শতভাগ আসন উপহার দেওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক বিজয় নয়; রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি হলো জনগণের পক্ষ থেকে তাদের নেতার সাথে একটি “Social Contract” বা সামাজিক ও রাজনৈতিক আস্থার চুক্তি।
বরিশালের মানুষ তাদের ভোটকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রমাণ করেছে যে, জুলুম, নির্যাতন এবং গুম-খুনের অপরাজনীতি দিয়ে এই অঞ্চলের সাহসী জনতাকে দাবিয়ে রাখা যায় না। তারা তাদের প্রাণের নেতাকে সকল আসন উপহার দিয়ে মূলত এই নতুন বাংলাদেশের পুনর্গঠনে এবং দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় নিজেদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করেছে।
বৈশ্বিক উন্নয়ন অংশীদারদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বরিশালের রূপান্তর সম্ভাবনা: নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো সমতাভিত্তিক উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসমূহ বাংলাদেশের এই নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সুশাসন এবং জবাবদিহিমূলক নীতির প্রতি গভীর আস্থা ব্যক্ত করছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নীতি:
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি বিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণে যে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তার সুফল সরাসরি গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করবে। বরিশাল যেহেতু দীর্ঘকাল ধরে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার, তাই বিশ্বব্যাংকের সহায়তাপুষ্ট নতুন প্রকল্পগুলো এই অঞ্চলের সুশাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
এডিবি’র অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও যোগাযোগ খাত: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) সম্প্রতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিশেষ করে পরিবহন অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগের (Transport Connectivity) ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি অনুমোদন করেছে। এডিবি’র এই স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন পলিসি বরিশালের জন্য একটি আশীর্বাদ। ‘বাংলার ভেনিস’ খ্যাত বরিশালের নদীভিত্তিক অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নৌপথের আধুনিকায়ন, পায়রা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে এডিবি’র এই নতুন অর্থায়ন অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।
টিআইবি’র দুর্নীতিমুক্ত টেকসই মডেল: Transparency International Bangladesh (TIB)-এর প্রস্তাবিত দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক মডেলকে ধারণ করে নতুন প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তাতে বরিশালের স্থানীয় প্রশাসন, টেন্ডারবাজি ও নদীশাসন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। ফলে প্রতিটি সরকারি টাকার শতভাগ সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
আকাশচুম্বী প্রত্যাশা বনাম জনগণের রাজনৈতিক পরিপক্বতা: একটি দীর্ঘ অত্যাচারিত জনপদের মানুষের প্রত্যাশা নতুন নেতার কাছে আকাশচুম্বী হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বরিশালের জনগণের রাজনৈতিক চেতনা অত্যন্ত গভীর। তারা বোঝেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার দীর্ঘ ১৫ বছরে রাষ্ট্রের যে গভীর ক্ষত ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গেছে, তা রাতারাতি বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় দূর করা সম্ভব নয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি টেকসই স্বনির্ভর রাষ্ট্র নির্মাণ করতে সময় এবং ধৈর্যের প্রয়োজন।
তাই তো বরিশালের মানুষের মাঝে কোনো ক্ষোভ, তাড়া কিংবা অযৌক্তিক দাবি আদায়ের কোনো উগ্র বাড়াবাড়ি নেই। তাদের সমস্ত মনোযোগ এখন তাদের প্রিয় নেতাকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, নিখাদ ভালোবাসা এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানানোর আয়োজনে। এই সুশৃঙ্খল আচরণ বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ কেবল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই করেনি, তারা উন্নত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চাতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় বরিশাল: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বরিশাল সফর কেবল একটি রুটিন রাষ্ট্রীয় সফর নয়। এটি মূলত ফ্যাসিবাদের অন্ধকার থেকে মুক্ত হওয়া এক নতুন সুপ্রভাতের দিকে বরিশালের যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা। এই সফরের মধ্য দিয়ে বরিশালের অবহেলিত গ্যাস সংযোগ, বন্ধ হয়ে থাকা শিল্পকারখানা সচল করা, আইটি পার্ক স্থাপন এবং কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পায়নের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
এক সময়ের অবহেলিত, শোষিত ও জাহান্নামে পরিণত করা বরিশাল আজ ডানা ঝাপটে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠছে। প্রিয় নেতার হাত ধরে এই জনপদ তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের এক অনন্য রোল মডেলে পরিণত হবে -এটাই আজ সমগ্র বরিশালবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস। গণতন্ত্রের নবযাত্রার কাণ্ডারি, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি- লক্ষ কোটি মানুষের ভালোবাসার এই বরিশালে আপনাকে জানাই প্রাণঢালা সুস্বাগতম!
লেখক:
অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।

০৩ জুন, ২০২৬ ১২:১০
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে বাগেরহাটে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। ইসলাম প্রচার করতে এসে তিনি সেখানে সুপেয় পানির অভাবে মসজিদের পাশে খনন করেছিলেন প্রায় ২০০ একর আয়তনের বিশালাকৃতির একটি দিঘি। নিজের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি নদীর দুইটি কুমির এনে মিঠা পানির দিঘিতে বন্দী করেছিলেন। ভালোবেসে তাদের নামকরণ করেছিলেন কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নামে। তাঁর জীবদ্দশায় কুমির দুটি তাঁর হাতের ইশারায় চলতো। তিনি নাম ধরে ডাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে পাহাড়ের মতো তারা ভেসে উঠতো এবং মানুষের কাছে আসতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কালাপাহাড় পুরুষ এবং ধলাপাহাড় নারী কুমির হওয়ায় তারা দিঘিতে বেশকিছু বাচ্চা জন্ম দিয়েছিল। খানজাহান আলীর (রহ.) মৃত্যুর পরেও সেই কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধররা কয়েকশো বছর ধরে এই দিঘিতে বেঁচেছিল।
পরবর্তীকালে অযত্ন-অবহেলা, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা আর খাদ্যের অভাবে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বাচ্চা কুমিরগুলো একে একে মারা যেতে শুরু করে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর দিঘি। এতে মাজার ব্যবসায় ধ্বস নামে। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে নতুন ৩টি কুমির কিনে এনে খানজাহান আলীর দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। ঐতিহ্যের নামে মূলতঃ মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ। কিন্তু পরিচর্যার অভাব ও খাদ্য সংকটে ২টি কুমির মারা যায়। দিঘিতে অবশিষ্ট একটা কুমির টিকে থাকে। এই কুমিরের সাথে হযরত খানজাহান আলী (রহ.), তাঁর বংশধর কিংবা তাঁর আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাজার ব্যবসায়ী একদল ভন্ডের সাথে এই কুমিরের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আগত ভক্ত মাজার পূজারীরা আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আশায় কুমিরের জন্য টাকা দেয়, খাবার দেয়। খাবার হিসেবে মুরগি, ছাগল এবং মাংস কিনে দেয়। তবে সেগুলো কুমিরের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। কুমিরের মুখের সামনে থেকে ঘুরিয়ে এনে সেগুলো আবার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। মাজারের কাছে গড়ে উঠেছে আগরবাতি, মোমবাতি, তাগা, ফিতা, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁকসহ রকমারি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলে সেখানে চলছে নানান প্রতারণা আর পর্যটকদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। মাজার থেকে আয় হওয়া টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়। এই মাজার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত মাজারের খাদেম, স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কিছু মাদকসেবী, সরকার দলীয় কতিপয় নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি।
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল আর বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আমার উদাত্ত আহবান এবং বিনীত অনুরোধ থাকবে- দিঘির এই কুমিরকে অনতিবিলম্বে মিরপুরের চিড়িয়াখানা, চট্টগ্রামের কুমির প্রজনন কেন্দ্র কিংবা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে অবমুক্ত করা হোক। একটি মাংসাশী হিংস্র প্রাণিকে কোনো অবস্থাতেই একটি লোকালয়ের দর্শনীয় স্থানে রাখা যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে যেমন মানুষ শিরক করার মতো পাপাচারে লিপ্ত হবে, অন্যদিকে ফাতেমার মতো অনাথ পথশিশুরা কুমিরের খাদ্যবস্তুতে পরিনত হবে। আমার অনুসন্ধান করা এই ভেতরের গল্পটা দেশের ৯৯% মানুষ জানে না। অনেকেই ভক্তি সহকারে এই কুমিরের কাছে মানত করে। হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) প্রতিনিধি মনে করে। সরল বিশ্বাসী ধর্মভীরু এসব মানুষকে জেনেশুনে ধোঁকা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
তাছাড়া হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) আমলে ছেড়ে দেওয়া কুমির কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধরেরা কখনো কাউকে আক্রমণ করার ইতিহাস নেই। তবে ভারত থেকে আনা এই কুমিরটি বারবার হিংস্র আচরণ করছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এই কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিঘির প্রধান ঘাটে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ কুমিরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমণ করেছিল হিংস্র স্বভাবের মাদ্রাজি এই কুমির। ২০০৯ সালে মাজারে মানত করতে আসা এক মায়ের হাত থেকে তার শিশু সন্তানকে প্রথম এই কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরে দিঘির মাঝখানে শিশুটির মৃতদেহ ভেসে ওঠে। গতকাল এর সর্বশেষ আক্রমণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে মাজারে আশ্রিত ৭ বছরের অনাথ পথশিশু ফাতেমা আক্তার। কুমিরের আক্রমণে একের পর এক এসব হতাহতের ঘটনা ঘটলেও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, তাদের কাছে মাজার আর কুমির ব্যবসাই ছিল মুখ্য। পরিশেষে বলতে চাই- ভন্ডদের মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেখানে ভিনদেশ থেকে কিনে আনা কুমির পালনের কোনো প্রয়োজন নেই। অনাথ ফাতেমার জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে অন্তত মাজারের কুমির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হোক। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও সুশাসনকর্মী।
২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।