
২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৭:২০
কপোতাক্ষের স্নিগ্ধ জলরাশি সেদিন হয়তো জানত না যে, তার কোল ঘেঁষেই জন্ম নিচ্ছে এক মহাকাব্যিক বিদ্রোহ। সাগরদাঁড়ির সেই শান্ত প্রহরটি ছিল মূলত দুই শতাব্দীর এক নিবিড় সন্ধিস্থল—যেখানে জীর্ণ মধ্যযুগ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে আর আধুনিকতার অস্থির সূর্যোদয় ঘটছে দিগন্তে। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন তা কেবল এক কবির জন্ম ছিল না; বরং তা ছিল শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে এক মহাকাব্যিক পথিকের অবিনাশী আখ্যানের সূচনা। তাঁর এই আবির্ভাব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষের নাম, যার স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। হিন্দু কলেজের করিডোরে ডিরোজিয়ান মুক্তবুদ্ধির যে হাওয়া তাঁর কিশোর মনে লেগেছিল, তা তাঁকে শিখিয়েছিল দেবতাকে নয়, মানুষকে পূজা করতে; আর অনুকরণকে নয়, বরং মৌলিক সৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে। ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ভারতের এক প্রদীপ্ত তরুণের সামাজিক শৃঙ্খল ও সামন্ততান্ত্রিক জড়ত্ব ভাঙার এক চরমপন্থী প্রকাশ। মাইকেল যখন নাম পরিবর্তন করে নিজের সত্তাকে এক ‘বৈশ্বিক নাগরিক’ পরিচয়ের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে, বিশ্বনাগরিক হওয়ার প্রথম শর্তই হলো নিজের শিকড়ের গভীরতাকে উপলব্ধি করা।
মধুসূদনের এই বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল তাঁর অসামান্য ভাষাগত পাণ্ডিত্য। হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় প্রায় এক ডজন ভাষায় ব্যুৎপত্তি তাঁকে বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের মূল নির্যাস আস্বাদনের সুযোগ দিয়েছিল। এই ভাষাগত বহুত্ববাদই (Multilingualism) তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল বাংলা ভাষার আটপৌরে কাঠামোর ওপর হোমার-ভার্জিল-দান্তের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আরোপ করতে। তিনি কেবল অমিত্রাক্ষর ছন্দেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং পেত্রার্কীয় ঢঙে বাংলায় প্রথম 'সনেট' বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তন করে নিজের ভুল ও আত্মোপলব্ধির এক অনন্য দর্পণ তৈরি করেছিলেন। মাদ্রাজের দারিদ্র্যপীষ্ট জীবন থেকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ের নির্বাসিত দিনগুলো তাঁকে সেই ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল যে—বিশ্বকে জানতে হলে ভাষার বৈচিত্র্য প্রয়োজন, কিন্তু নিজেকে চিনতে হলে প্রয়োজন নিজের মাতৃভাষা।
কবির ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর মহাকাব্যিক সৃজনের এক অবিচ্ছেদ্য সমান্তরাল আখ্যান। রেবেকা ম্যাকট্যাভিস ও এমিলিয়া হেনরিয়েটার ত্যাগ ও সান্নিধ্য তাঁর সৃষ্টির অন্তরালে এক ধ্রুপদী করুণ রস সঞ্চার করেছে। তবে মধুসূদনের জীবনে এই নারীদের ভূমিকা কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং তাঁর 'বীরাঙ্গনা' কাব্যের আধুনিক ও প্রতিবাদী নারী চরিত্রগুলোর অবচেতন প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৮৭৩ সালে হেনরিয়েটার মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পর কবির প্রয়াণ ঘটে—ইতিহাসের এই নির্মম পরিসমাপ্তি যেন তাঁর নিজের রচিত কোনো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিরই এক জীবন্ত রূপায়ন।
বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত তাঁর প্রথাগত চিন্তাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বা 'বিনির্মাণবাদী' (Deconstructive) দৃষ্টিভঙ্গিতে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কেবল একটি মহাকাব্য নয়, এটি ছিল আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বে প্রাচ্যের তথাকথিত 'অসুর' বা রাবণকে এক আধুনিক বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম বৌদ্ধিক লড়াই। মূলত মধুসূদনের বিদ্রোহ কেবল ছন্দের ছিল না; এটি ছিল দেবকেন্দ্রিক সাহিত্য থেকে মানুষের জয়গানে উত্তরণের প্রথম মহাকাব্যিক বিপ্লব। মিল্টন তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ স্যাটানকে বিদ্রোহী করলেও শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বই বিজয়ী করেছেন; এমনকি হোমার বা দান্তের মহাকাব্যেও দৈব বিধানই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু মধুসূদন সচেতনভাবে প্রথাগত দেবতাকে হীনবল করে রাবণের দেশপ্রেম ও মানবিক সত্তাকে মহিমান্বিত করেছেন—যা পাশ্চাত্যের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বা 'ওরিয়েন্টালিজম'-এর বিপরীতে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। তিনি প্রহসন থেকে নাটক এবং মহাকাব্য থেকে সনেট—সবখানেই মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভেঙে প্রবর্তন করেছিলেন এক 'সেক্যুলার হিউম্যানিজম' বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ, যেখানে ঈশ্বর নয়, মানুষই হয়ে উঠেছে সকল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মধুসূদনের প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান তাঁর 'ডায়াসপোরা চেতনা' বা ঘর ও বাহিরের অন্তহীন দ্বন্দ্বে—যা আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অভিবাসী মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে ধারণ করে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পরম মমতায় আত্মস্থ করে মনস্তাত্ত্বিক 'ডিকলোনাইজেশন' বা পরাধীন মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের 'কপোতাক্ষ' বা শিকড়ের কাছে ফিরে আসতে হয়। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন নিঃস্ব অবস্থায় আলিপুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই মহাকবি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, সৃজনশীল বিদ্রোহ ছাড়া কোনো জাতির আধুনিকতা পূর্ণতা পায় না।
পাশ্চাত্যের দর্পণ ছুঁয়ে প্রাচ্যের শিকড়ে ফেরার এক মহাকাব্যিক পথিকের নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর কলম কেবল অমিত্রাক্ষরের ছন্দ বুণেনি, বরং ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে বদলে দিয়েছিল একটি পরাধীন জাতির সাহিত্যিক রুচি ও আত্মপরিচয় খোঁজার গভীর দর্শন। বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি কেবল এক ধূমকেতু নন, বরং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই ধ্রুবতারা, যা আজও আমাদের শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে পথ দেখায়। তিনি চেয়েছিলেন 'পাশ্চাত্যের মিল্টন' হতে, অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস—আজ তিনি আমাদের কাছে অমর হয়ে আছেন ‘বাংলার মধুসূদন’ হিসেবেই।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com।
কপোতাক্ষের স্নিগ্ধ জলরাশি সেদিন হয়তো জানত না যে, তার কোল ঘেঁষেই জন্ম নিচ্ছে এক মহাকাব্যিক বিদ্রোহ। সাগরদাঁড়ির সেই শান্ত প্রহরটি ছিল মূলত দুই শতাব্দীর এক নিবিড় সন্ধিস্থল—যেখানে জীর্ণ মধ্যযুগ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে আর আধুনিকতার অস্থির সূর্যোদয় ঘটছে দিগন্তে। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন তা কেবল এক কবির জন্ম ছিল না; বরং তা ছিল শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে এক মহাকাব্যিক পথিকের অবিনাশী আখ্যানের সূচনা। তাঁর এই আবির্ভাব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষের নাম, যার স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। হিন্দু কলেজের করিডোরে ডিরোজিয়ান মুক্তবুদ্ধির যে হাওয়া তাঁর কিশোর মনে লেগেছিল, তা তাঁকে শিখিয়েছিল দেবতাকে নয়, মানুষকে পূজা করতে; আর অনুকরণকে নয়, বরং মৌলিক সৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে। ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ভারতের এক প্রদীপ্ত তরুণের সামাজিক শৃঙ্খল ও সামন্ততান্ত্রিক জড়ত্ব ভাঙার এক চরমপন্থী প্রকাশ। মাইকেল যখন নাম পরিবর্তন করে নিজের সত্তাকে এক ‘বৈশ্বিক নাগরিক’ পরিচয়ের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে, বিশ্বনাগরিক হওয়ার প্রথম শর্তই হলো নিজের শিকড়ের গভীরতাকে উপলব্ধি করা।
মধুসূদনের এই বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল তাঁর অসামান্য ভাষাগত পাণ্ডিত্য। হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় প্রায় এক ডজন ভাষায় ব্যুৎপত্তি তাঁকে বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের মূল নির্যাস আস্বাদনের সুযোগ দিয়েছিল। এই ভাষাগত বহুত্ববাদই (Multilingualism) তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল বাংলা ভাষার আটপৌরে কাঠামোর ওপর হোমার-ভার্জিল-দান্তের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আরোপ করতে। তিনি কেবল অমিত্রাক্ষর ছন্দেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং পেত্রার্কীয় ঢঙে বাংলায় প্রথম 'সনেট' বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তন করে নিজের ভুল ও আত্মোপলব্ধির এক অনন্য দর্পণ তৈরি করেছিলেন। মাদ্রাজের দারিদ্র্যপীষ্ট জীবন থেকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ের নির্বাসিত দিনগুলো তাঁকে সেই ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল যে—বিশ্বকে জানতে হলে ভাষার বৈচিত্র্য প্রয়োজন, কিন্তু নিজেকে চিনতে হলে প্রয়োজন নিজের মাতৃভাষা।
কবির ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর মহাকাব্যিক সৃজনের এক অবিচ্ছেদ্য সমান্তরাল আখ্যান। রেবেকা ম্যাকট্যাভিস ও এমিলিয়া হেনরিয়েটার ত্যাগ ও সান্নিধ্য তাঁর সৃষ্টির অন্তরালে এক ধ্রুপদী করুণ রস সঞ্চার করেছে। তবে মধুসূদনের জীবনে এই নারীদের ভূমিকা কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং তাঁর 'বীরাঙ্গনা' কাব্যের আধুনিক ও প্রতিবাদী নারী চরিত্রগুলোর অবচেতন প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৮৭৩ সালে হেনরিয়েটার মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পর কবির প্রয়াণ ঘটে—ইতিহাসের এই নির্মম পরিসমাপ্তি যেন তাঁর নিজের রচিত কোনো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিরই এক জীবন্ত রূপায়ন।
বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত তাঁর প্রথাগত চিন্তাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বা 'বিনির্মাণবাদী' (Deconstructive) দৃষ্টিভঙ্গিতে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কেবল একটি মহাকাব্য নয়, এটি ছিল আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বে প্রাচ্যের তথাকথিত 'অসুর' বা রাবণকে এক আধুনিক বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম বৌদ্ধিক লড়াই। মূলত মধুসূদনের বিদ্রোহ কেবল ছন্দের ছিল না; এটি ছিল দেবকেন্দ্রিক সাহিত্য থেকে মানুষের জয়গানে উত্তরণের প্রথম মহাকাব্যিক বিপ্লব। মিল্টন তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ স্যাটানকে বিদ্রোহী করলেও শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বই বিজয়ী করেছেন; এমনকি হোমার বা দান্তের মহাকাব্যেও দৈব বিধানই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু মধুসূদন সচেতনভাবে প্রথাগত দেবতাকে হীনবল করে রাবণের দেশপ্রেম ও মানবিক সত্তাকে মহিমান্বিত করেছেন—যা পাশ্চাত্যের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বা 'ওরিয়েন্টালিজম'-এর বিপরীতে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। তিনি প্রহসন থেকে নাটক এবং মহাকাব্য থেকে সনেট—সবখানেই মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভেঙে প্রবর্তন করেছিলেন এক 'সেক্যুলার হিউম্যানিজম' বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ, যেখানে ঈশ্বর নয়, মানুষই হয়ে উঠেছে সকল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মধুসূদনের প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান তাঁর 'ডায়াসপোরা চেতনা' বা ঘর ও বাহিরের অন্তহীন দ্বন্দ্বে—যা আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অভিবাসী মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে ধারণ করে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পরম মমতায় আত্মস্থ করে মনস্তাত্ত্বিক 'ডিকলোনাইজেশন' বা পরাধীন মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের 'কপোতাক্ষ' বা শিকড়ের কাছে ফিরে আসতে হয়। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন নিঃস্ব অবস্থায় আলিপুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই মহাকবি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, সৃজনশীল বিদ্রোহ ছাড়া কোনো জাতির আধুনিকতা পূর্ণতা পায় না।
পাশ্চাত্যের দর্পণ ছুঁয়ে প্রাচ্যের শিকড়ে ফেরার এক মহাকাব্যিক পথিকের নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর কলম কেবল অমিত্রাক্ষরের ছন্দ বুণেনি, বরং ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে বদলে দিয়েছিল একটি পরাধীন জাতির সাহিত্যিক রুচি ও আত্মপরিচয় খোঁজার গভীর দর্শন। বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি কেবল এক ধূমকেতু নন, বরং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই ধ্রুবতারা, যা আজও আমাদের শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে পথ দেখায়। তিনি চেয়েছিলেন 'পাশ্চাত্যের মিল্টন' হতে, অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস—আজ তিনি আমাদের কাছে অমর হয়ে আছেন ‘বাংলার মধুসূদন’ হিসেবেই।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com।

০১ মে, ২০২৬ ১৫:৫৭
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)
১৮৮৬ সালের মে মাসে শিকাগোর হে মার্কেটে যখন শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে রক্ত দিচ্ছিলেন, তার ঠিক ১৪০ বছর পর ২০২৬ সালের এই মে দিবসেও বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মান্তা জনপদে শ্রমের সংজ্ঞাটি আজও আদিম ও অমানবিক রয়ে গেছে। মেঘনার মোহনায় ভোরের সূর্য যখন উঁকি দেয়, ভোলার দড়ির চর বা বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে কোনো কারখানার সাইরেন বাজে না; বাজে কেবল বৈঠার শব্দ আর লোনা জলের ঝাপটা। মান্তাদের কাছে 'গৃহ' মানে এক চিলতে চলন্ত নৌকা, আর 'শ্রম' মানে উত্তাল জলধির বুকে প্রাণের বাজি। আধুনিক অর্থনীতির এই অনিশ্চিত শ্রেণিটি ঘাম আর জল এক করে দিলেও জাতীয় জিডিপিতে মৎস্য খাতের ৩.৫০ শতাংশের বেশি অবদানে তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির স্বীকৃতি আজও মেলেনি। মূলত 'কাঠামোগত বর্জন' এই জনপদকে নাগরিকত্বের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক ‘অদৃশ্য সর্বহারা’য় পরিণত করে রেখেছে।
এই ব্রাত্য জনপদের শ্রম-শোষণের ধরনটি এক জটিল ও নিষ্ঠুর অর্থনৈতিক সমীকরণ। বরিশাল, পটুয়াখালী ও ভোলার মেঘনা অববাহিকায় ভাসমান প্রায় ৪০ হাজার মানুষের এই বিশাল গোষ্ঠী মূলত ‘দাদন’ প্রথার এক অদৃশ্য শিকলে বন্দী। এক ভয়াবহ গাণিতিক বৈষম্যের শিকার এই মানুষগুলো—শহরের ডাইনিং টেবিলে যে মৎস্য সম্পদের বাজারমূল্য প্রতি কেজি এক হাজার টাকা, স্থানীয় প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এই শোষণচক্রে মান্তা শ্রমিক সেই মাছের বিনিময়ে পান বড়জোর একশো থেকে দেড়শো টাকা। এই ‘ঋণ-দাসত্ব’ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ২৯ নম্বর কনভেনশনের সরাসরি লঙ্ঘন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২(৬৫) ধারায় ‘শ্রমিক’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক কল-কারখানা কেন্দ্রিক। এই আইনি শূন্যতার সুযোগে মান্তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘শ্রমিক’ হিসেবে স্বীকৃত নন; ফলে পেশাগত দুর্ঘটনা বা অসুস্থতায় কোনো বিমা বা আইনি সুরক্ষা তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের হালং বে কিংবা কম্বোডিয়ার টনলে স্যাপ হ্রদের ভাসমান জনগোষ্ঠীর সাথে মান্তাদের জীবনচিত্রের মিল থাকলেও, ‘তথ্যগত দারিদ্র্য’ ও ডিজিটাল বৈষম্যের নিরিখে বাংলাদেশের মান্তারা অনেক বেশি পিছিয়ে। এই শ্রমের সবচেয়ে নিগৃহীত অংশ হলো নারী ও শিশুরা। নৌকার এক প্রান্তে মা যখন রান্নায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে বাবা তখন জাল সারছেন, আর শিশুটি বৈঠা হাতে শিখছে জীবনের ভারসাম্য। কিন্তু এই বিশাল 'সেবামূলক শ্রমে' নারীর অবদানের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বা সামাজিক স্বীকৃতি নেই। মান্তা পরিবারের রহিমা আক্ষেপ করে বলেন, "নদী যেমন মাছ দেয়, তেমনি আমাগো পরিচয়ও ভাসাইয়া নিয়া যায়।" রহিমা ও কালামের সন্তান আকাশের চোখে স্বপ্ন—সে ওপাড়ে গড়ে ওঠা রঙিন দালানের স্কুলে যাবে। কিন্তু স্থায়ী ঠিকানার দালিলিক প্রমাণ না থাকায় তার শিক্ষার অধিকার আজ মেঘনার ঘোলা জলেই নিমজ্জিত। যেখানে পৃথিবী আজ চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) জোয়ারে ভাসছে, সেখানে আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশু এক নিষ্ঠুর ‘ডিজিটাল বর্ণপ্রথার’ শিকার হয়ে মৌলিক বর্ণমালার আলো থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মান্তাদের এই সংকট আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক করুণ উপাখ্যান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আর নদীবক্ষে লোনা জলের অনুপ্রবেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য শিকারের কৌশলকে অকেজো করে দিচ্ছে, যা তাদের ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হিসেবে বিশ্ব পরিমণ্ডলে পরিচিতি দিচ্ছে। বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, যখন মা-ইলিশ রক্ষার সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, তখন ডাঙ্গার জেলেরা সামাজিক সহায়তার আওতায় এলেও ঠিকানাহীন মান্তারা প্রায়ই ‘ব্যুরোক্রেটিক প্যারালাইসিস’ বা আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতার কারণে তালিকা থেকে বাদ পড়েন। রপ্তানিমুখী মৎস্য শিল্পের মূল জোগানদাতা হয়েও তারা থেকে যাচ্ছেন সামাজিক সুরক্ষা জালের বাইরে। তাদের আহরিত সম্পদ বিশ্ববাজারে বৈদেশিক মুদ্রা আনলেও, বিনিময়ে তারা পাচ্ছেন কেবল দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা। কেবল অর্থনৈতিক নয়, এই প্রান্তিক জনপদ আজ এক গভীর সাংস্কৃতিক অবলুপ্তির মুখোমুখি। নদী দখল এবং আধুনিক মৎস্য শিল্পের যান্ত্রিক চাপে মান্তাদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই উত্তরণের পথে তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অনন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
মান্তা ও দক্ষিণ উপকূলের এই শ্রমজীবীদের 'জলমগ্ন শ্রম'-কে মূলধারার অর্থনীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ‘ফিশারিজ লেবার কোড’ প্রণয়ন, স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটি নির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দুর্গম জলসীমায় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং পৈতৃক পরিচয় নির্বিশেষে ‘ভাসমান এনআইডি কার্ড’ বা বিশেষ ভোটার তালিকার পূর্ণ নিশ্চয়তা প্রদান করা অপরিহার্য। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর মূলমন্ত্র ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’—এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে মান্তাদের জীবনের নৌকাকে কেবল মাছ ধরার যন্ত্র নয়, বরং অফলাইন লার্নিং মডিউল সমৃদ্ধ একটি 'ভাসমান লার্নিং সেন্টারে' রূপান্তর করতে হবে। নদী যেমন তার সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সাগরে মেশে, তেমনি মান্তাদের এই ব্রাত্য জীবনকেও নাগরিকত্বের মোহনায় ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক অঙ্গীকার হওয়া উচিত। ডাঙ্গার মানুষ আর জলের মানুষের মধ্যকার এই অদৃশ্য প্রাচীর মুছে গিয়ে যেদিন আকাশের মতো হাজারো মান্তা শিশুর শিক্ষার অধিকার আর শ্রমিকের ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হবে, সেদিনই প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে শিকাগোর সেই রক্তভেজা মে দিবসের বৈশ্বিক চেতনা।

বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়)

১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:৩৫
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)

১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৪৭
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.