
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১৮:৩১
হেনরী স্বপন>> জাতিধর্ম নির্বিশেষে ব্যবহৃত উন্মুক্ত পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য বিবিরতালাব (তালাব: ফার্সি শব্দ- জলাশয়) খনন করা হয়েছিল। কালক্রমে এটি এখন বিবিরপুকুর হয়ে বরিশালবাসীর আত্মার অংশ হয়ে উঠেছে। বরিশালবাসীর সুপেয় জলের অভাব মোচনের জন্য জনদরদী জিন্নাত বিবি আঠারোশতকে এই পুকুরটি খনন করেছিলেন, বলে জানা যায়। এই পুকুরের চারপাশে ৪টি ঘাটলা ছিল। তখন সেই ঘাট থেকে বরিশালের সকল ধর্মের সব মানুষ খাবার পানি সসরবরাহ করতেন। কেউ স্নান করত না এবং ধোয়াকাচার কাজও হত না। সে সময় এই নিয়গুলো কঠোরভাবে পালিত হতো। যেহেতু তৎকালীন সময় রাখালবাবুর পুকুর থেকে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা খাবার জল সসরবরাহ কতে পারতেন। কিন্তু বিবিরতালাব থেকে সকল সম্প্রদায়ের সব মানুষ এই পুকুরের পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারত। তাই, এই পুকুরটিকে অসামপ্রদায়িক চেতনার উল্লেগযোগ্য নিদর্শনও বলা যায়।
এই জলাশয় খনন করে জেন্নাত বিবি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে এমোন একটি ট্রাস্টি দলিলও করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, “পুকুরটি কেনোদিন ভরাট করা যাবে না, এর চাপাশের ঘাটলায় গোসল, সাবান সোডার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। জলাশয়ের পানি পরিস্কার রাখতে হবে এবং পাড়ঘেঁষে কোনও ইমারত, দেয়াল, তোরণ নির্মাণ করে পুকুরের সৌন্দর্য ক্ষুন্ন হয়, এমনও কিছুই করা যাবে না।”
যেহেতু, ১৯০০-১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ভূমি জরিপে জিন্নাত ও কেরি’র নামোল্লেখ আছে। সরকারের জাজেস সেরেস্তায় খুঁজলে এই চুক্তির দলিলও পাওয়া যাবে, হয়তো। অথচ, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় মহল্লাবাসী ও অগণিত ফাস্টফুড ব্যবসায়ী কেউ চুক্তির কিছুই মানছে না। বরং এরাই দিনের পর দিন ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরের সৌন্দর্যকে গলাটিপে হত্যা করছে। কেননা, সিটি কর্পোরেশনের কর্তারা অর্থের বিনিময়ে মোবাইল কোম্পানির স্থায়ী বিলবোর্ড স্থাপনরে মাধ্যমে পুকুরটির যতোটা শোভা বিনষ্ট করেছনে। ততধিক উচ্ছিষ্ট খাবারের বর্জ্য ফেলে এটিকে দুর্গন্ধময় জলাশয়ে পরিণত করছে, তেমনি এর চারপাশে যত্রতত্র বিলবোর্ড, দলীয় পোস্টার ফেস্টুনে কতিপয় রানৈতিক নেতাদের ছবিতে ছবিতে সয়লাব করে, পুকুরটির স্বাভাবিক অঙ্গছেদন এবং শোভা বিনষ্ট করছেন।
সম্প্রতি বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশন নগর ভবনের আধিপতি মো. রায়হান কাওছার সাহেব এককালে যে বিবিরতালাবের সুপেয় জলে আমাদের জীবনের তৃষ্ণা মিটেছে, সেই পুকুরের জলে ঝলমলে সূর্যের আলোর রোশনাই ফেরাতে এর চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছেন। রাজনৈতিক দখলদারদের আমলা নির্ভরতা ও দলীয় হামটি-ডামটির তোয়াক্কা না করে, বরিশালবাসীর প্রাণভোমরা পুকুরটির সেই তিলত্তোমা রূপÑ স্বঅবয়বে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে তিনি যে, ঈর্ষণীয় এবং অনন্য ন্যায়পালের উদ্যোগের মতোই মহান কাজ করে চলেছেন এজন্য সিটিবাসী আপনাকে মনেও রাখবে বহুকাল।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, বরিশাল।
হেনরী স্বপন>> জাতিধর্ম নির্বিশেষে ব্যবহৃত উন্মুক্ত পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য বিবিরতালাব (তালাব: ফার্সি শব্দ- জলাশয়) খনন করা হয়েছিল। কালক্রমে এটি এখন বিবিরপুকুর হয়ে বরিশালবাসীর আত্মার অংশ হয়ে উঠেছে। বরিশালবাসীর সুপেয় জলের অভাব মোচনের জন্য জনদরদী জিন্নাত বিবি আঠারোশতকে এই পুকুরটি খনন করেছিলেন, বলে জানা যায়। এই পুকুরের চারপাশে ৪টি ঘাটলা ছিল। তখন সেই ঘাট থেকে বরিশালের সকল ধর্মের সব মানুষ খাবার পানি সসরবরাহ করতেন। কেউ স্নান করত না এবং ধোয়াকাচার কাজও হত না। সে সময় এই নিয়গুলো কঠোরভাবে পালিত হতো। যেহেতু তৎকালীন সময় রাখালবাবুর পুকুর থেকে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা খাবার জল সসরবরাহ কতে পারতেন। কিন্তু বিবিরতালাব থেকে সকল সম্প্রদায়ের সব মানুষ এই পুকুরের পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারত। তাই, এই পুকুরটিকে অসামপ্রদায়িক চেতনার উল্লেগযোগ্য নিদর্শনও বলা যায়।
এই জলাশয় খনন করে জেন্নাত বিবি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে এমোন একটি ট্রাস্টি দলিলও করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, “পুকুরটি কেনোদিন ভরাট করা যাবে না, এর চাপাশের ঘাটলায় গোসল, সাবান সোডার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। জলাশয়ের পানি পরিস্কার রাখতে হবে এবং পাড়ঘেঁষে কোনও ইমারত, দেয়াল, তোরণ নির্মাণ করে পুকুরের সৌন্দর্য ক্ষুন্ন হয়, এমনও কিছুই করা যাবে না।”
যেহেতু, ১৯০০-১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ভূমি জরিপে জিন্নাত ও কেরি’র নামোল্লেখ আছে। সরকারের জাজেস সেরেস্তায় খুঁজলে এই চুক্তির দলিলও পাওয়া যাবে, হয়তো। অথচ, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় মহল্লাবাসী ও অগণিত ফাস্টফুড ব্যবসায়ী কেউ চুক্তির কিছুই মানছে না। বরং এরাই দিনের পর দিন ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরের সৌন্দর্যকে গলাটিপে হত্যা করছে। কেননা, সিটি কর্পোরেশনের কর্তারা অর্থের বিনিময়ে মোবাইল কোম্পানির স্থায়ী বিলবোর্ড স্থাপনরে মাধ্যমে পুকুরটির যতোটা শোভা বিনষ্ট করেছনে। ততধিক উচ্ছিষ্ট খাবারের বর্জ্য ফেলে এটিকে দুর্গন্ধময় জলাশয়ে পরিণত করছে, তেমনি এর চারপাশে যত্রতত্র বিলবোর্ড, দলীয় পোস্টার ফেস্টুনে কতিপয় রানৈতিক নেতাদের ছবিতে ছবিতে সয়লাব করে, পুকুরটির স্বাভাবিক অঙ্গছেদন এবং শোভা বিনষ্ট করছেন।
সম্প্রতি বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশন নগর ভবনের আধিপতি মো. রায়হান কাওছার সাহেব এককালে যে বিবিরতালাবের সুপেয় জলে আমাদের জীবনের তৃষ্ণা মিটেছে, সেই পুকুরের জলে ঝলমলে সূর্যের আলোর রোশনাই ফেরাতে এর চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছেন। রাজনৈতিক দখলদারদের আমলা নির্ভরতা ও দলীয় হামটি-ডামটির তোয়াক্কা না করে, বরিশালবাসীর প্রাণভোমরা পুকুরটির সেই তিলত্তোমা রূপÑ স্বঅবয়বে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে তিনি যে, ঈর্ষণীয় এবং অনন্য ন্যায়পালের উদ্যোগের মতোই মহান কাজ করে চলেছেন এজন্য সিটিবাসী আপনাকে মনেও রাখবে বহুকাল।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, বরিশাল।

১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:৩৫
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)
সময়ের অবারিত প্রান্তরে কিছু জীবন কেবল পঞ্জিকার পাতায় লীন হতে আসে না, তারা আসে অন্ধকারের বুকে নক্ষত্রের রেখা এঁকে দিতে। সৃষ্টির নিগূঢ় রসায়ন যখন শিল্পতৃষ্ণা আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহের অনলকে একই বিন্দুতে মিলিয়ে দেয়, তখনই ধরণীর ধূলিকণায় আবির্ভাব ঘটে এমন এক ঋষিপ্রতিম পুরুষের—যাঁর নামনিখিল কুমার সেনগুপ্ত, যিনি নিখিল সেন নামেই ভুবনবিদিত। ১৯৩১-এর সেই শুভলগ্নে, ১৬ই এপ্রিল; বরিশালেরকাশিপুর ইউনিয়নের কলসগ্রামেরএক নিভৃত আঙিনায়যতীশ চন্দ্র সেনগুপ্ত ও সরোজিনী সেনগুপ্তারঘরে প্রস্ফুটিত হয়েছিল এই অনন্য জীবনকুসুম। শৈশবের সেই দিনগুলোতে কলসগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় আরমাধবপাশা চন্দ্রদ্বীপ ইনস্টিটিউশনেরমেঠো পথ ছিল তাঁর প্রথম পাঠশালা।১৯৪১ সালেমাত্র দশ বছর বয়সে কলসগ্রামের বিদ্যালয় মাঠে‘সিরাজের স্বপ্ন’নাটকের অভিনয়ে তাঁর শিল্পযাত্রার প্রথম স্পন্দন অনুভূত হয়। সেই বছরই ৮ আগস্ট কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের পরদিন বিদ্যালয় আয়োজিত শোকসভায়‘ভারত তীর্থ’কবিতাটি আবৃত্তি করে তিনি প্রথম জানান দিয়েছিলেন এক বিশ্বজনীন আবৃত্তি-প্রতিভার। ১৯৪৭ সালে ম্যাট্রিক পাসের পর উত্তাল সময়ে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানেকলকাতা সিটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনতাঁর সমাজবীক্ষাকে করেছিল আরও গূঢ়, শাণিত ও দার্শনিক।
১৯৫১ সালের অক্টোবরের শেষদিকে যখন তিনি পুনরায় জন্মভূমিতে ফিরে আসেন, তখন তাঁর শিল্পচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেন আবৃত্তিকার ও অভিনেতা গোলাম মোস্তফা। ১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কর্ণকাঠী গাউসেল আজম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মহান শিক্ষাব্রতীর যাত্রা। কিন্তু শাসকের রক্তচক্ষু তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি; আইয়ুব সরকারের হুলিয়া আর শিক্ষকতা নিষিদ্ধ হওয়ার খাঁড়া মাথায় নিয়েও তিনি ছিলেন অকুতোভয়। মণি সিং, মনোরমা বসু মাসীমা ও আবদুর রব সেরনিয়াবাতদের মতো মহীরুহদের উদ্দীপনায় ১৯৫৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির পতাকাতলে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেলা যুবলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতির গুরুদায়িত্ব পালন—সবখানেই তিনি ছিলেন প্রগতির অগ্রদূত। এই দ্রোহের মূল্য দিতে গিয়ে পঞ্চাশের দশকে তাঁকে তিনবার কারবরণ করতে হয় এবং ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধের সময় কাটাতে হয় দীর্ঘ নজরবন্দী জীবন। কলমকেই তিনি করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শাণিত অস্ত্র। সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী পদচারণা ছিল ‘সংবাদ’, ‘লোকবাণী’, ন্যাপের মুখপত্র ‘নতুন বাংলা’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘একতা’র পাতায়।
নিখিল সেনের শিল্পীসত্তা ছিল এক অতল সমুদ্রের মতো বিশাল, যেখানে লীন হয়ে গিয়েছিল সুর, শব্দ আর দ্রোহের মোহনা। সেতারের তারে ওস্তাদ আলী হোসেন ও রমেশ চক্রবর্তীর কাছে নেওয়া তালিম তাঁর হৃদয়ে যে নান্দনিক সুরের ঝংকার তুলেছিল, তা তিনি বিলিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার নাট্য ও আবৃত্তি আন্দোলনে। ১৯৫৩ সালে ‘বরিশাল থিয়েটার’ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি যে আন্দোলনের বীজ বুনেছিলেন, তা পরবর্তীতে ‘বরিশাল নাটক’ এবং ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’র পতাকাতলে এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। ৩২টি নাটকের সার্থক নির্দেশনার পাশাপাশি অগণিত নাটকে তাঁর বলিষ্ঠ অভিনয় ইতিহাসের হাহাকারকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলত। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের প্রথম আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তৈরি করেছিলেন একদল শব্দসৈনিক। রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, জাতীয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, জীবনানন্দ একাডেমী এবং অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ—সবখানেই তাঁর উপস্থিতি ছিল এক আজন্ম সংস্কৃতির আরাধনা।
নিখিল সেনের জীবনকে যখন আমরা বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে রাখি, তখন তাঁর মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত সব বিপ্লবীদের ছায়া। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট যেমন থিয়েটারকে করেছিলেন সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক অস্ত্র, নিখিল সেনও তেমনি তাঁর প্রতিটি মঞ্চায়নকে করেছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে শৈল্পিক লড়াই। লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী কবি পাবলো নেরুদার কলম যেমন আর্তমানবতার পক্ষে জেগে উঠেছিল, নিখিল সেনের সাংবাদিকতা ও কণ্ঠস্বরও ছিল ঠিক তেমনি প্রান্তিক মানুষের সপক্ষে এক অবিনাশী সুর। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলার মতো তিনিও আদর্শের জন্য দীর্ঘ কারাবরণ ও জুলুম সহ্য করেও অবিচল ছিলেন। তাঁর শিল্প সাধনা কেবল নান্দনিকতার মোড়ক ছিল না; বরং তা ছিল সেবাস্তিয়ান বাখের সিম্ফনির মতো সুশৃঙ্খল এবং ভিক্টর হুগোর রচনার মতো গণমুখী।
তাঁর এই দীর্ঘ আট দশকের তপোনিষ্ঠ শিল্পসাধনা কেবল করতালি কিংবা স্তুতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পেয়েছে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। সময়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে ২০১৮ সালে রাষ্ট্র তাঁকে দেশের ২য় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'একুশে পদক'-এ ভূষিত করে। এর আগে ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন পদক, ২০০৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী পদক এবং ২০১৫ সালে শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননাসহ অগণিত স্বীকৃতি তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষ্য দেয়। ১৯৫৮ সালে শিক্ষা আন্দোলনের মিছিলে নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত তাঁর দরাজ কণ্ঠে গাওয়া ‘তালেব মাস্টার’ কবিতা শুনলে আজও মানুষের রক্তে শিহরণ জাগে।
দীর্ঘ ৮৮ বছরের এক বর্ণিল ও ঋদ্ধ জীবন শেষে, ২০১৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এই মহাপ্রাণ বিদায় নেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর হয়ে আছেন বরিশালের অশ্বিনীকুমার হলের মঞ্চে, প্রতিটি প্রগতিশীল মিছিলে আর বাঙালির শুদ্ধ সাংস্কৃতিক চেতনার স্পন্দনে। কীর্তনখোলার জল আজও তাঁর স্মৃতি বহন করে বয়ে চলে, আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয় নিখিল সেনের সেই মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় কেবল শিল্পের জন্য নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য এক নিরন্তর আরতি। তিনি এমন এক জ্যোতিষ্ক, যাঁর আলোকবর্তিকা আমাদের পথ হারানো সময়ে অনন্তকাল সত্য ও সুন্দরের ধ্রুবপথ দেখাবে।
আজ ১৬ই এপ্রিল; শব্দ ও সুরের এই মহান জাদুকরের জন্মতিথি। জন্মক্ষণে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি কীর্তনখোলার তীরের এই অকুতোভয় শব্দসারথিকে, যাঁর কণ্ঠ আজও আমাদের বেঁচে থাকার শক্তি যোগায়।
শুভ জন্মদিন, শ্রদ্ধেয় নিখিল সেন।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: গবেষক, সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)

১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৪৭
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।
একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হলো তার সচেতন ও বিবেকবান নাগরিক সমাজ। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছে, তা হলো ‘পদলেহন’ বা অন্ধ তোষামোদ। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা কেবল একজন ব্যক্তির নৈতিক স্থলন ঘটায় না, বরং গোটা জাতির বিবেককে পঙ্গু করে দেয়।
[ব্যক্তিত্বের অবমাননা ও নৈতিক সংকট]
মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মসম্মানবোধ। যখন কোনো ব্যক্তি স্রেফ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য বা কোনো বৈষয়িক লাভের আশায় কোনো নেতার অন্যায্য কাজের প্রশংসা করেন বা চাটুকারিতা করেন, তখন তিনি মূলত নিজের ব্যক্তিত্বকেই হত্যা করেন। পদলেহনকারী ব্যক্তি কখনোই স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারেন না। তার প্রতিটি শব্দ ও কাজ পরিচালিত হয় অন্যের ইশারায়। এই দাসত্ব মানসিকতা মানুষের সহজাত সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস কেড়ে নেয়।
[গণতন্ত্রের জন্য হুমকি]
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সমালোচনা ও জবাবদিহিতা। শাসক দলের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া এবং জনস্বার্থে গঠনমূলক সমালোচনা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কিন্তু যখন চারদিকে শুধু ‘জি-হুজুর’ বলা মানুষের ভিড় বাড়ে, তখন শাসকরা নিজেদের অপরাজেয় এবং অভ্রান্ত ভাবতে শুরু করেন। তোষামোদকারীরা নেতাদের সামনে সত্যের আয়না ধরতে দেয় না, ফলে শাসকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইতিহাসে দেখা গেছে, যে শাসকের চারপাশে চাটুকারের সংখ্যা যত বেশি, তার পতন তত দ্রুত ও করুণ হয়েছে। কারণ, বিপদের সময় এই পদলেহনকারীরাই সবার আগে পক্ষ ত্যাগ করে।
[সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব]
একটি সমাজে যখন পদলেহনকারীরা পুরস্কৃত হয় এবং সত্যবাদীরা কোণঠাসা হয়, তখন তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে মেধা, যোগ্যতা বা সততা দিয়ে নয়, বরং দালালি আর তেলবাজি করেই জীবনে সফল হওয়া সম্ভব। এর ফলে পেশাদারিত্ব নষ্ট হয় এবং অযোগ্য মানুষরা গুরুত্বপূর্ণ সব স্থান দখল করে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে ফেলে।
[আদর্শিক অবস্থান ও সমাধান]
নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা ভালো, কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন দাসে পরিণত না করে। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার অন্ধ অনুসারী না হয়ে তার আদর্শের অনুসারী হন। সত্যকে সত্য বলা এবং মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহস রাখাটাই হলো প্রকৃত বীরত্ব। শাসক দলের নেতাদের তুষ্ট করার চেয়ে জনকল্যাণ ও ন্যায়ের পথে অটল থাকা অনেক বেশি সম্মানজনক।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতার শীর্ষে, কাল তিনি সাধারণ নাগরিক। কিন্তু আপনার মেরুদণ্ড এবং বিবেক যদি আপনি বিকিয়ে দেন, তবে সেই ক্ষতি কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ইতিহাসে সেই সব মানুষই অমর হয়ে থাকেন, যারা ক্ষমতার দাপটে মাথা নত করেননি, বরং মাথা উঁচু করে সত্যের জয়গান গেয়েছেন।
লেখক হাসিবুল ইসলাম
সভাপতি, নিউজ এডিটরস্ কাউন্সিল, বরিশাল, বরিশাল ব্যুরো চিফ দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ এবং বার্তা সম্পাদক বরিশালটাইমস।

০৭ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৩৮
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.