বাবুগঞ্জে নির্যাতিতা সালমা আক্তার ও তার সন্তান দুখু মিয়ার জন্য নির্মিত বসতঘরের শুভ উদ্বোধন ও চাবি হস্তান্তর করেন বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া। জাতীয় কবি দুখু মিয়ার শৈশবের দুঃখকষ্টের গল্পটা সবার কমবেশি জানা। তবে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আরেক দুখু মিয়ার গল্পটা তেমন কেউ জানে না। উপজেলার মানিককাঠী গ্রামের এই দুখু মিয়ার হৃদয়বিদারক করুণ কাহিনী যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। দুঃখ আর দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্ম হয়েছিল বলেই নানা তার নাম রেখেছিলেন দুখু মিয়া। মায়ের গর্ভে থাকতেই দুখু মিয়াকে অস্বীকার করে তার বাবা। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া দুখু মিয়াকে মায়ের গর্ভেই হত্যা করতে বসেছিল গ্রাম্য সালিশ। তবে গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে দুখু মিয়াকে প্রাণে বাঁচান মা। পিতৃপরিচয়হীন, ঠিকানাহীন অবস্থায় জন্ম নেওয়া দুখু মিয়ার পিতৃত্ব নির্ধারণে আদালতে চলে দীর্ঘ আইনি লড়াই। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পিতৃত্ব নিশ্চিত করে দুখু মিয়ার জন্মদাতা পিতাকে আদালত যাবজ্জীবন সাজা দিলেও দুখু মিয়া পায়নি সন্তানের অধিকার কিংবা সমাজের স্বীকৃতি। আদালতে জয়ী হলেও সমাজের লাঞ্ছনা আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে চিরতরে গ্রামছাড়া হতে হয় দুখু মিয়া এবং তার জনমদুখিনী মাকে। একপর্যায়ে মা-ছেলের কারণে পুরো পরিবারকেই হতে হয় গ্রামছাড়া। নদীর কচুরিপানার মতো ভাসমান জীবন বরণ করতে হয় ৯ সদস্যের একটি পরিবারকে।
সমাজের প্রতি পদে পদে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নিয়ে দারিদ্র্যের সাথে প্রতি মুহূর্তে লড়াই করা দুখু মিয়া এবং তার যোদ্ধা মা সালমা আক্তারকে স্থায়ী ঠিকানা দিতে অবশেষে উদ্যোগ নেন বরিশাল জেলা প্রশাসক। তিনি বাবুগঞ্জের ইউএনওকে সাথে নিয়ে দুখু মিয়ার জন্য যৌথভাবে কেনেন একখন্ড জমি। অতঃপর সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুদানে সেখানে নির্মাণ করা হয় একটি বসতঘর। সেই বসতঘরের নাম রাখা হয় শান্তির নীড়। বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের বরিশাল বিমানবন্দর মোড় এলাকায় সালমা ও তার দুখু মিয়ার স্বপ্নের ঠিকানা সেই শান্তির নীড়ের চাবি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। একইসাথে সালমাকে দেওয়া হয় দুখু মিয়ার ভরনপোষণে সরকারি ১৬ লাখ টাকা অনুদানের শেষ কিস্তির ১ লাখ ৮২ হাজার টাকার চেক। এসময় সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ.কে.এম আক্তারুজ্জামান তালুকদার, সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ, সেইন্ট বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর কবির, বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফারুক আহমেদ, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমান, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শামীমা ইয়াসমিন ডলি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল হোসেন, বিমানবন্দর প্রেসক্লাব সভাপতি ও সুজন সম্পাদক আরিফ আহমেদ মুন্না প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত ২০০৩ সালের ৯ আগস্ট মানিককাঠী গ্রামের সালাম সরদারের ছেলে গিয়াস উদ্দিন প্রতিবেশি চাচার বাড়িতে গিয়ে চাচাতো বোন চতুর্দশী সালমা আক্তারকে একা পেয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এরপরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন তিনি। এতে গর্ভবতী হয়ে পড়েন সালমা। ঘটনা জানাজানি হলে সরাসরি অস্বীকার করেন অভিযুক্ত গিয়াস উদ্দিন। বিষয়টি পারিবারিক হওয়ায় স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করেন তৎকালীন রহমতপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সিকদার। তিনি গর্ভবতী সালমাকে মেনে নিয়ে গিয়াসকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার রায় দিয়ে সালিশ রোয়েদাদ দেন। এদিকে ওই সালিশ অগ্রাহ্য এবং সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে সালমাকে গর্ভপাতের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন গিয়াস উদ্দিন ও তার পরিবার। সালমাকে দুশ্চরিত্রা আখ্যা দিয়ে স্থানীয় সমাজপতিদের নির্দেশে গর্ভপাত করানোর জন্য সালমা ও তার মাকে বেধড়ক মারপিট করা হয়। একপর্যায়ে সালমা আক্তার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এসব ঘটনা নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে ওঠে প্রশাসন। পরে প্রশাসনের সহায়তায় আদালতের মাধ্যমে বাবুগঞ্জ থানায় একটি নারী নির্যাতনের মামলা দায়ের করেন সালমা আক্তার।
মামলা দায়েরের পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে অভিযুক্ত গিয়াস উদ্দিনকে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়াসের প্রভাবশালী মামারা মারপিট করে ৭ ভাইবোনসহ সালমার পরিবারকেও মানিককাঠী গ্রাম থেকে বিতাড়িত করেন। পরে গর্ভবতী সালমাকে নিয়ে তার ৯ সদস্যের পরিবার এসে আশ্রয় নেয় উত্তর রহমতপুর গ্রামের আলী হোসেনের ইটভাটায়। সেখানে মাটি কাটার কাজ নেন সালমা ও তার মা রেনু রেগম। ইটভাটা মালিক আলী হোসেনের দয়াকরে থাকতে দেওয়া একটি খুপরি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করে সালমার পরিবার। এমন পরিস্থিতিতে ২০০৪ সালের ৯ জুন ভাগ্যবিড়ম্বিত সালমার কোলে জন্ম নেয় ফুটফুটে শিশু দুখু মিয়া। জন্মই যার আজন্ম পাপ; সেই হতভাগ্য নিষ্পাপ শিশুটির নাম রাখা হয় দুখু মিয়া। এক সাগর দুঃখ বুকে নিয়ে নাতির নাম দুখু মিয়া রাখেন সালমার বাবা কালাম সরদার। এদিকে দুখু মিয়া জন্মের ৪ মাস পরে ২০০৪ সালের ৭ অক্টোবর জামিনে ছাড়া পান অভিযুক্ত জন্মদাতা গিয়াস উদ্দিন। জামিনে এসে নিজের ঔরসজাত সন্তানকে অন্যের জারজ সন্তান আখ্যা দিয়ে হত্যার চেষ্টা চালান তিনি। পরে সালমা ও দুখু মিয়ার নিরাপত্তার বিবেচনায় তাদের সেইভ হোমে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
এদিকে মামলার একমাত্র অভিযুক্ত গিয়াস উদ্দিন তার সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ করলে আদালতের নির্দেশে সালমার সন্তান দুখু মিয়া এবং গিয়াস উদ্দিনের রক্ত এবং মুখের লালার নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকার ফরেনসিক ল্যাবে পাঠান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাবুগঞ্জ থানার এসআই আলতাফ হোসেন। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে গিয়াস এবং দুখু মিয়ার ডিএনএ প্রোফাইল ম্যাচ করায় গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরপরে অভিযুক্ত গিয়াসের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের পরে বিচারের জন্য ২০০৮ সালে আলোচিত এই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। এদিকে প্রায় ২ বছর সেইভ হোমের সরকারি নিরাপত্তা হেফাজতে থাকার পরে রহমতপুর বিমানবন্দর মোড়ে দুলাল সরদারের বাড়ির একটি পরিত্যক্ত ঘরে দুখু মিয়াকে নিয়ে আশ্রয় পান সালমা আক্তার।
এদিকে সালমার ট্রলি চালক দরিদ্র পিতা কালাম সরদার স্ট্রোকজনিত কারণে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়লে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটতে থাকে তাদের পরিবারের। নিরুপায় হয়ে আড়াই বছরের দুখু মিয়াকে সালমা তার মায়ের কাছে রেখে ২০০৬ সালে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানে রানা প্লাজার পাশের একটি গার্মেন্টসে মাসিক ২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন সালমা। দুই শিফট ডিউটি আর দিনরাত ওভারটাইম করে ৬ হাজার টাকা বেতন পেয়ে ৫ হাজার টাকাই পাঠিয়ে দিতেন মায়ের কাছে। ওই সামান্য টাকা দিয়েই সালমার ছোট ৬ ভাইবোন আর দুখু মিয়ার খরচ চলতো। সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে বিভিন্ন বাড়িতে বুয়ার কাজ নেন সালমার মা রেনু বেগম। এদিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত সালমার বাবার মৃত্যু হলে দুখু মিয়াসহ ৯ সদস্যের পরিবার নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন রেনু বেগম। তবুও দুই মা-মেয়ে মিলে বেঁচে থাকার যুদ্ধে হার না মানা যোদ্ধা হয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন।
সালমার দায়ের করা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পরে রাষ্ট্রপক্ষের ১৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ২০১১ সালের ২৪ মার্চ রায় ঘোষণা করেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আনিছুর রহমান খান। রায়ে মামলার একমাত্র আসামি গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের কারণেই সন্তান জন্মদানের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন বিচারক। একইসঙ্গে দুখু মিয়ার বয়স ২১ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার ভরনপোষণের যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করার আদেশ জারি করেন। আদালতের ওই রায়ের পরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে দুখু মিয়ার ভরনপোষণের জন্য প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ লাখ টাকা করে এ পর্যন্ত ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এই টাকা দিয়েই দুখু মিয়াকে লেখাপড়া করান তার মা সালমা আক্তার। বর্তমানে দুখু মিয়া সরকারি আবুল কালাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
এদিকে সালমার ৫ ভাইয়ের মধ্যে ৩ ভাই বিয়ে করে বাড়িতে বউ আনলে সালমার সাথে তাদের মতবিরোধ তৈরি হয়। ভাইয়ের বউরা সালমার জন্য সমাজে মুখ দেখাতে পারে না, ইত্যাদি নানান অজুহাতে তাকে বাড়িছাড়া করার পায়তারা শুরু করে। ভাইদের সাথে একই সংসারে থাকার কারণে দুখু মিয়ার ভরনপোষণের জন্য সরকার থেকে দেওয়া অনুদানের টাকাও ভোগ করতে পারছিলেন না হতভাগিনী সালমা আক্তার। অনুদানের শেষ কিস্তির টাকার চেক আনতে গেলে কথা প্রসঙ্গে এসব হৃদয়বিদারক ঘটনা জানতে পারেন বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সালমার কাছে তার জীবনের গত ২২ বছরের বিভীষিকাময় ঘটনার আদ্যোপান্ত শুনে তিনি বিস্মিত এবং বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
এরপরেই সালমা ও তার দুখু মিয়ার জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন জেলা প্রশাসক। সালমার বর্তমান ঠিকানার আশেপাশে একখণ্ড জমি খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন বাবুগঞ্জের ইউএনওকে। পরে বরিশাল বিমানবন্দর মোড় এলাকার রহমতপুর মৌজায় ২ শতক খাসজমির সাথে স্থানীয় দীপক মজুমদারের কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ১ শতক জমি কেনা হয়। জেলা প্রশাসকের সাথে জমি কেনায় যৌথভাবে অংশগ্রহণ করেন বাবুগঞ্জের ইউএনও ফারুক আহমেদ। এছাড়াও এনজিওর পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা অনুদান দেন সেইন্ট বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর কবির। পরবর্তীতে সালমার নামে দলিল করা প্রায় ৩ শতাংশ জমির ওপরে বসতঘর নির্মাণের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ আনেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন।
নদীভাঙনে ভিটামাটিহীন/ক্ষতিগ্রস্ত এবং বস্তিবাসীদের জন্য গৃহনির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ওই ৩ লাখ টাকার সাথে বসতঘরের জমিতে ইউএনওর সৌজন্যে বালু ভরাটসহ প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সালমা এবং তার দুখু মিয়ার জন্য নির্মিত হয় স্বপ্নের ঠিকানা শান্তির নীড়। বৃহস্পতিবার বিকেলে শান্তির নীড়ের চাবি আনুষ্ঠানিকভাবে সালমার হাতে হস্তান্তর করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। এসময় তিনি সালমার হাতে দুখু মিয়ার ভরনপোষণে সরকারি অনুদানের শেষ কিস্তির ১ লাখ ৮২ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। ফিতা কাটার মাধ্যমে বসতঘরের উদ্বোধন ও চাবি হস্তান্তরকালে সেখানে দোয়া-মোনাজাত এবং মিষ্টি বিতরণ করা হয়। দোয়া-মোনাজাত পরিচালনা করেন উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের ইমাম ও খানপুরা আলীম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আ.জ.ম সামসুল আলম।
প্রায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের ৩ শতাংশ জমিসহ বসতঘর পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন সালমা আক্তার। নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, 'আমি ধর্ষিতা হয়ে বিচার চাইতে গিয়ে সমাজচ্যুত হয়েছি। গ্রামছাড়া হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি। আমাকে চরিত্রহীনা অপবাদ দিয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছি। না খেয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করেছি। দুমুঠো ভাতের জন্য যখন যে কাজ পেয়েছি তাই করেছি। দুখু মিয়াকে সাথে নিয়ে গত ২২টি বছর জীবনের অবর্ণনীয় কষ্ট দুর্ভোগ সহ্য করেছি। অবশেষে আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন। ডিসি এবং ইউএনও স্যারের মাধ্যমে আজ আমি একটা স্থায়ী ঠিকানা পেলাম। আমার দুখু মিয়াকে নিয়ে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পেলাম। এই ঘর আমার কাছে স্বপ্নের ঠিকানা বলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন সালমা আক্তার।'
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফারুক আহমেদ বলেন, 'নির্যাতিতা সালমাকে একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়ে দেওয়ার মহতী কাজে সম্পৃক্ত হতে পেরে আনন্দ লাগছে। জেলা প্রশাসক মহোদয় এই কাজে আমাকে সম্পৃক্ত করেছেন এবং কিছু অবদান রাখার সুযোগ করে দিয়েছেন এজন্য তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সালমা আক্তার এবং তার দুখু মিয়া সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। তাদের সহযোগিতা করার জন্য বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন সবসময় পাশে থাকবে।'
বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, 'ভাগ্যবিড়ম্বিত অসহায় সালমা আক্তার আজ মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পেয়েছে। তার সন্তান দুখু মিয়ার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছে একটা এনজিও। মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে এ পর্যন্ত দুখু মিয়ার ভরনপোষণে ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে তার চাকরির বিষয়টা আমাদের সবার বিবেচনায় থাকবে। আমাদের সমাজে পিছিয়ে পড়া দুঃস্থ-অসহায় নির্যাতিত মানুষদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করা আমাদের সকলের নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। এই কাজটি যখন সম্মিলিতভাবে করা হয় তখন সমাজে একটা ভালো উদাহরণ তৈরি হয়। আমরা যদি দায়িত্ব নিয়ে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অসহায় মানুষের জন্য কাজ করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে আমরা একটা সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারবো।' #

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:০৭
জীবনানন্দের জন্মভিটা থেকে কীর্তনখোলার ঢেউ, বিবির পুকুরের চা আর সুন্দরবন-৭-এর চাঁদভেজা রাত—বরিশালের সঙ্গে দুই দশকের স্মৃতির খেরোখাতা
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ
বরিশাল গেলে কীর্তনখোলার কাছে যেতেই হয়। ছোট ডিঙি নৌকায় কিছুক্ষণ কীর্তনখোলার বুকে ভেসে না থাকলে বরিশাল-ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নদীর জলের যে কী দুর্বার আবেদন, কীর্তনখোলার কাছে না গেলে তা টেরই পাওয়া যায় না।
বৃহস্পতিবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। বরিশালে ঢুকেই চলে গেলাম ত্রিশ গোডাউন ঘাটে। নদীপাড়, নদীপাড় ঘেঁষে ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা—বরিশাল যেন নতুন করে বাংলার ভেনিস হয়ে উঠছে। শহরঘেঁষে এমন দুর্দান্ত সুন্দর একটি নদী আছে বলেই হয়তো এই শহরে জীবনানন্দ দাশের জন্ম।
এর আগেই পশ্চিম বগুড়া রোডে জীবনানন্দের জন্মভিটায় ঢুঁ মেরেছিলাম। সড়কের নাম কবির নামে রাখা হলেও বগুড়া রোডের পুরোনো নামটি এখনো মুছে যায়নি। জন্মভিটায় গড়ে উঠেছে স্মৃতি পাঠাগার। তখনও সেটি খোলার সময় হয়নি। তাই ভেতরে যাওয়ার সুযোগ হলো না। তবে সার্বিক অবস্থা দেখে মর্মাহত হয়েছি।
২০১৯ সালে শেক্সপিয়ারের জন্মভিটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রবেশমূল্য বেশ চড়া, তবুও প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়। রয়েছে স্যুভেনির বিক্রির ব্যবস্থাও। শেক্সপিয়ারের জন্মভিটার সঙ্গে জীবনানন্দের জন্মভিটার তুলনা চলে না—এ কথা ঠিক। কিন্তু জীবনানন্দ ও তাঁর কবিতার আবেদনও যে হাজার বছরেও কমবে না, সে বিশ্বাস রাখি।
এমন একজন কবির জন্মভিটাকে কত আকর্ষণীয়ভাবেই না উপস্থাপন করা যেত! গুণীজনের কদর করতে না পারার দৃষ্টান্ত হিসেবে হয়তো কোনো একদিন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও আমাদের নাম উঠে যাবে!
বরিশাল শহরের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। তখন সবে পড়াশোনা শেষ করেছি, টেলিকমে কাজ করি। অফিস থেকে এক মাসের জন্য বরিশালে পাঠিয়ে দিল। উত্তরের ডাঙার ছেলে এসে পড়লাম নদী-খালবেষ্টিত এই শহরে। শহরে পরিচিত বলতে তেমন কেউ নেই। দিনে এদিক-সেদিক ঘুরি, সন্ধ্যা হলে শহরে ফিরে আসি। বেশির ভাগ সময় সদর রোডের হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালে থাকতাম।
পাশেই অশ্বিনীকুমার হল। সেখানে কালচারাল প্রোগ্রাম, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ হয়। অল্প কিছু দূরেই বিবির পুকুর। পুকুর ঘিরে বাঁধানো সুন্দর হাঁটার পথ। জলও বেশ স্বচ্ছ, ময়লা-আবর্জনা নেই। এক কোণে ছিল টং দোকান। সেখানে খুব ভালো আদা-লেবু চা বানাত। সময় পেলেই টংয়ে গিয়ে বসতাম। চা খেতে খেতে দেখতাম বরিশাইল্লা মানুষ।
একবার মন চাইল, লঞ্চে করে ঢাকা ফিরব। তখন সুন্দরবন-৭ নামে অত্যাধুনিক একটি লঞ্চ চলত। শেরেবাংলা রোডে টিকিট কাটার জন্য কাউন্টার খুঁজছিলাম।
এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সুন্দরবনের কাউন্টার কোন দিকে?’
তিনি জানেন না। তাঁর কাছ থেকে সরে সামনে এগোতেই দেখি, কাউন্টার একেবারে চোখের সামনে।
সামনেই কাউন্টার, অথচ জানেন না? বিষয়টি আমাকে বেশ অবাক করল। ফিরে এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি নির্বিকারভাবে বললেন, ‘হেইয়া জাইন্না মোর কাম কী!’
সেদিন লোকটির ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, এটি আসলে এক অসাধারণ কথা—এক ভিন্ন দার্শনিক তত্ত্ব। জীবনে বহু মানুষের কাছে এই দর্শনের পাঠ শুনেছি। সেই দোকানদারের কাছেই যেন তার হাতেখড়ি হয়েছিল।
সুন্দরবন-৭-এ কেবিন নিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগে বরিশাল নদীবন্দর ছেড়ে লঞ্চটি কীর্তনখোলায় ভাসতে শুরু করল। কেবিন ছেড়ে চলে গেলাম উপরের খোলা ডেকে।
আকাশে চাঁদ। চাঁদের আলো নদীর জলে পড়ে তৈরি করেছে অপূর্ব এক দৃশ্য। কয়েকজন ছেলে গান গাইছে, সঙ্গে গিটার। কেউ গল্প করছে। রাত যত গভীর হচ্ছে, শব্দও তত কমে আসছে। নদীর বুক চিরে সুন্দরবন-৭ এগিয়ে চলেছে।
কী শীতল বাতাস! প্রচণ্ড গরমের সময়ও ঠান্ডা লাগার মতো অবস্থা। এমন পরিবেশ ছেড়ে কেবিনে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ডেকের ওপরই বসে থাকলাম।
আহা, ভ্রমণ কত সুন্দর হতে পারে!
এরপর আর লঞ্চে যাওয়া হয়নি। কিন্তু সেই স্মৃতির জাবর কাটতে এখনো বরিশাল লঞ্চঘাটে ঢুঁ মারি।
সে সময়ের বরিশাল অনেকটাই মফস্বলের মতো ছিল। শহরটাকে বেশি আপন মনে হতো। এখন বরিশালে কসমোপলিটান ভাব এসেছে। তারপরও ভালো লাগায় ভাটা পড়েনি।
এক ফাঁকে ব্রজমোহন কলেজেও ঢুকে পড়লাম। প্রাচীন ও সুন্দর ভবনগুলো এখনো মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসে দেখা মিলল জীবনানন্দ দাশ চত্বরের।
সাগরদী, বান্দ রোড, বাইপাস হয়ে নথুল্লাবাদের দিকে যাই। এর আগে সড়ক বিভাগের অফিসও নজরে পড়ে। তখন বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে। দেখে-শুনে চলে গেলাম ভুরঘাটা। আমাদের বরিশাল আসার মূল কারণই ছিল সেখানে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত সেখানেও পৌঁছালাম।
ফেরার পথে অমল দা নিয়ে গেলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মভিটায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পাথারিয়া বাজার পেরিয়ে পূর্ব মাইজপাড়া।
সুনীলের জন্মভিটার অবস্থা জীবনানন্দের চেয়েও খারাপ। অথচ ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার উপমা, স্থান কিংবা চরিত্রগুলোর অনেকটাই যেন এই বাড়ির আশপাশের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে আছে। সঙ্গে থাকা এক ভাই কিছুটা ধারণা দিলেন, জায়গাগুলোর সঙ্গে কবিতার স্মৃতির যোগসূত্রের কথা বললেন।
ফেরার পথে পাথারিয়া বাজারের দুধ চায়ের কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। এক কাপ চা খেলাম। তারপর আরও এক কাপ হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম।
ড্রাইভার কুদ্দুস তখন ঢাকার দিকে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন।
পেছনে পড়ে রইল বরিশাল—কীর্তনখোলার জল, চাঁদের আলো, লঞ্চের ডেক, বিবির পুকুরের আদা-লেবু চা, জীবনানন্দের স্মৃতি আর সুনীলের জন্মভিটার নীরবতা।
শহর বদলায়, রাস্তা বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু কিছু শহর স্মৃতির ভেতর থেকে যায় আগের মতোই। বরিশাল আমার কাছে তেমনই এক শহর—যেখানে নদীর জল ছুঁয়ে গেলে পুরোনো দিনের দরজা খুলে যায়, আর কীর্তনখোলার বাতাসে ভেসে আসে জীবনের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গন্ধ।
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ, কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা
জীবনানন্দের জন্মভিটা থেকে কীর্তনখোলার ঢেউ, বিবির পুকুরের চা আর সুন্দরবন-৭-এর চাঁদভেজা রাত—বরিশালের সঙ্গে দুই দশকের স্মৃতির খেরোখাতা
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ
বরিশাল গেলে কীর্তনখোলার কাছে যেতেই হয়। ছোট ডিঙি নৌকায় কিছুক্ষণ কীর্তনখোলার বুকে ভেসে না থাকলে বরিশাল-ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নদীর জলের যে কী দুর্বার আবেদন, কীর্তনখোলার কাছে না গেলে তা টেরই পাওয়া যায় না।
বৃহস্পতিবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। বরিশালে ঢুকেই চলে গেলাম ত্রিশ গোডাউন ঘাটে। নদীপাড়, নদীপাড় ঘেঁষে ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা—বরিশাল যেন নতুন করে বাংলার ভেনিস হয়ে উঠছে। শহরঘেঁষে এমন দুর্দান্ত সুন্দর একটি নদী আছে বলেই হয়তো এই শহরে জীবনানন্দ দাশের জন্ম।
এর আগেই পশ্চিম বগুড়া রোডে জীবনানন্দের জন্মভিটায় ঢুঁ মেরেছিলাম। সড়কের নাম কবির নামে রাখা হলেও বগুড়া রোডের পুরোনো নামটি এখনো মুছে যায়নি। জন্মভিটায় গড়ে উঠেছে স্মৃতি পাঠাগার। তখনও সেটি খোলার সময় হয়নি। তাই ভেতরে যাওয়ার সুযোগ হলো না। তবে সার্বিক অবস্থা দেখে মর্মাহত হয়েছি।
২০১৯ সালে শেক্সপিয়ারের জন্মভিটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রবেশমূল্য বেশ চড়া, তবুও প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়। রয়েছে স্যুভেনির বিক্রির ব্যবস্থাও। শেক্সপিয়ারের জন্মভিটার সঙ্গে জীবনানন্দের জন্মভিটার তুলনা চলে না—এ কথা ঠিক। কিন্তু জীবনানন্দ ও তাঁর কবিতার আবেদনও যে হাজার বছরেও কমবে না, সে বিশ্বাস রাখি।
এমন একজন কবির জন্মভিটাকে কত আকর্ষণীয়ভাবেই না উপস্থাপন করা যেত! গুণীজনের কদর করতে না পারার দৃষ্টান্ত হিসেবে হয়তো কোনো একদিন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও আমাদের নাম উঠে যাবে!
বরিশাল শহরের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। তখন সবে পড়াশোনা শেষ করেছি, টেলিকমে কাজ করি। অফিস থেকে এক মাসের জন্য বরিশালে পাঠিয়ে দিল। উত্তরের ডাঙার ছেলে এসে পড়লাম নদী-খালবেষ্টিত এই শহরে। শহরে পরিচিত বলতে তেমন কেউ নেই। দিনে এদিক-সেদিক ঘুরি, সন্ধ্যা হলে শহরে ফিরে আসি। বেশির ভাগ সময় সদর রোডের হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালে থাকতাম।
পাশেই অশ্বিনীকুমার হল। সেখানে কালচারাল প্রোগ্রাম, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ হয়। অল্প কিছু দূরেই বিবির পুকুর। পুকুর ঘিরে বাঁধানো সুন্দর হাঁটার পথ। জলও বেশ স্বচ্ছ, ময়লা-আবর্জনা নেই। এক কোণে ছিল টং দোকান। সেখানে খুব ভালো আদা-লেবু চা বানাত। সময় পেলেই টংয়ে গিয়ে বসতাম। চা খেতে খেতে দেখতাম বরিশাইল্লা মানুষ।
একবার মন চাইল, লঞ্চে করে ঢাকা ফিরব। তখন সুন্দরবন-৭ নামে অত্যাধুনিক একটি লঞ্চ চলত। শেরেবাংলা রোডে টিকিট কাটার জন্য কাউন্টার খুঁজছিলাম।
এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সুন্দরবনের কাউন্টার কোন দিকে?’
তিনি জানেন না। তাঁর কাছ থেকে সরে সামনে এগোতেই দেখি, কাউন্টার একেবারে চোখের সামনে।
সামনেই কাউন্টার, অথচ জানেন না? বিষয়টি আমাকে বেশ অবাক করল। ফিরে এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি নির্বিকারভাবে বললেন, ‘হেইয়া জাইন্না মোর কাম কী!’
সেদিন লোকটির ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, এটি আসলে এক অসাধারণ কথা—এক ভিন্ন দার্শনিক তত্ত্ব। জীবনে বহু মানুষের কাছে এই দর্শনের পাঠ শুনেছি। সেই দোকানদারের কাছেই যেন তার হাতেখড়ি হয়েছিল।
সুন্দরবন-৭-এ কেবিন নিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগে বরিশাল নদীবন্দর ছেড়ে লঞ্চটি কীর্তনখোলায় ভাসতে শুরু করল। কেবিন ছেড়ে চলে গেলাম উপরের খোলা ডেকে।
আকাশে চাঁদ। চাঁদের আলো নদীর জলে পড়ে তৈরি করেছে অপূর্ব এক দৃশ্য। কয়েকজন ছেলে গান গাইছে, সঙ্গে গিটার। কেউ গল্প করছে। রাত যত গভীর হচ্ছে, শব্দও তত কমে আসছে। নদীর বুক চিরে সুন্দরবন-৭ এগিয়ে চলেছে।
কী শীতল বাতাস! প্রচণ্ড গরমের সময়ও ঠান্ডা লাগার মতো অবস্থা। এমন পরিবেশ ছেড়ে কেবিনে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ডেকের ওপরই বসে থাকলাম।
আহা, ভ্রমণ কত সুন্দর হতে পারে!
এরপর আর লঞ্চে যাওয়া হয়নি। কিন্তু সেই স্মৃতির জাবর কাটতে এখনো বরিশাল লঞ্চঘাটে ঢুঁ মারি।
সে সময়ের বরিশাল অনেকটাই মফস্বলের মতো ছিল। শহরটাকে বেশি আপন মনে হতো। এখন বরিশালে কসমোপলিটান ভাব এসেছে। তারপরও ভালো লাগায় ভাটা পড়েনি।
এক ফাঁকে ব্রজমোহন কলেজেও ঢুকে পড়লাম। প্রাচীন ও সুন্দর ভবনগুলো এখনো মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসে দেখা মিলল জীবনানন্দ দাশ চত্বরের।
সাগরদী, বান্দ রোড, বাইপাস হয়ে নথুল্লাবাদের দিকে যাই। এর আগে সড়ক বিভাগের অফিসও নজরে পড়ে। তখন বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে। দেখে-শুনে চলে গেলাম ভুরঘাটা। আমাদের বরিশাল আসার মূল কারণই ছিল সেখানে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত সেখানেও পৌঁছালাম।
ফেরার পথে অমল দা নিয়ে গেলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মভিটায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পাথারিয়া বাজার পেরিয়ে পূর্ব মাইজপাড়া।
সুনীলের জন্মভিটার অবস্থা জীবনানন্দের চেয়েও খারাপ। অথচ ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার উপমা, স্থান কিংবা চরিত্রগুলোর অনেকটাই যেন এই বাড়ির আশপাশের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে আছে। সঙ্গে থাকা এক ভাই কিছুটা ধারণা দিলেন, জায়গাগুলোর সঙ্গে কবিতার স্মৃতির যোগসূত্রের কথা বললেন।
ফেরার পথে পাথারিয়া বাজারের দুধ চায়ের কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। এক কাপ চা খেলাম। তারপর আরও এক কাপ হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম।
ড্রাইভার কুদ্দুস তখন ঢাকার দিকে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন।
পেছনে পড়ে রইল বরিশাল—কীর্তনখোলার জল, চাঁদের আলো, লঞ্চের ডেক, বিবির পুকুরের আদা-লেবু চা, জীবনানন্দের স্মৃতি আর সুনীলের জন্মভিটার নীরবতা।
শহর বদলায়, রাস্তা বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু কিছু শহর স্মৃতির ভেতর থেকে যায় আগের মতোই। বরিশাল আমার কাছে তেমনই এক শহর—যেখানে নদীর জল ছুঁয়ে গেলে পুরোনো দিনের দরজা খুলে যায়, আর কীর্তনখোলার বাতাসে ভেসে আসে জীবনের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গন্ধ।
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ, কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:৪৯
"আমি শপথ করছি যে, সরকারি আবুল কালাম কলেজের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসবো। আমার ক্যাম্পাসকে সর্বদা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন এবং মাদকমুক্ত রাখবো। নিজে কখনো মাদক গ্রহণ করবো না এবং এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউকে মাদক গ্রহণ করতে দেবো না। মা-বাবা এবং শিক্ষকের সাথে কখনো অশোভন আচরণ করবো না। তাদের অমর্যাদা হয় এমন কাজ থেকে সর্বদা বিরত থাকবো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম পরিপন্থী বা রাষ্ট্রবিরোধী কাজে কখনো লিপ্ত হব না। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা অর্জনের চেষ্টা করবো। সবার আগে নিজের দেশকে ভালোবাসবো। একজন দেশপ্রেমিক সুনাগরিক হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে পরিবারের, সমাজের এবং দেশের জন্য সর্বদা কাজ করবো। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন। আমিন।" সমস্বরে এমনই এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী শপথ করেছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার সরকারি আবুল কালাম কলেজের শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সরকারি আবুল কালাম কলেজ মিলনায়তনে একাদশ শ্রেণির এক বর্ণাঢ্য নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওই অঙ্গীকার করেন কলেজের উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে ওই শপথবাক্য পাঠ করান বরিশাল বিমানবন্দর প্রেসক্লাব সভাপতি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বাবুগঞ্জ উপজেলা সম্পাদক আরিফ আহমেদ মুন্না।
সরকারি আবুল কালাম কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অনুপম রায়ের সভাপতিত্বে এবং বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নুরুন্নবী রাসেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ওই নবীন বরণ অনুষ্ঠানে এসময় বক্তব্য রাখেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, পৌরনীতি ও সুশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জহিরুল হক রোকন, হিসাব বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আলী হোসেন শরীফ, ছাত্রনেতা নাঈম হাসান, তাজিম আহমেদ, রাকিব সিকদার, মেহেদী হাসান, শিক্ষার্থী তাইয়্যেবা রহমান প্রমুখ।
নবীন বরণ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বের ব্যান্ড-শোসহ বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সরকারি আবুল কালাম কলেজের বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নুরুন্নবী রাসেল। এসময় তিনি নব্বই দশকের জনপ্রিয় তাঁর এভারগ্রীণ ব্যান্ডের কালজয়ী ঐতিহাসিক গান 'ভেঙে দাও ফারাক্কা' গেয়ে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন। কলেজ শিক্ষকদের মধ্য থেকে এছাড়াও সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রভাষক নুসরাত জাহান ও প্রভাষক লেলিন তালুকদার। কবিতা আবৃত্তি করেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অনুপম রায়। এসময় মনোজ্ঞ সঙ্গীতের সুরের মূর্ছনায় শিক্ষার্থীদের মাতোয়ারা করে বরিশাল শিল্পগোষ্ঠীর ব্যান্ডদল। #
"আমি শপথ করছি যে, সরকারি আবুল কালাম কলেজের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসবো। আমার ক্যাম্পাসকে সর্বদা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন এবং মাদকমুক্ত রাখবো। নিজে কখনো মাদক গ্রহণ করবো না এবং এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউকে মাদক গ্রহণ করতে দেবো না। মা-বাবা এবং শিক্ষকের সাথে কখনো অশোভন আচরণ করবো না। তাদের অমর্যাদা হয় এমন কাজ থেকে সর্বদা বিরত থাকবো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম পরিপন্থী বা রাষ্ট্রবিরোধী কাজে কখনো লিপ্ত হব না। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা অর্জনের চেষ্টা করবো। সবার আগে নিজের দেশকে ভালোবাসবো। একজন দেশপ্রেমিক সুনাগরিক হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে পরিবারের, সমাজের এবং দেশের জন্য সর্বদা কাজ করবো। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন। আমিন।" সমস্বরে এমনই এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী শপথ করেছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার সরকারি আবুল কালাম কলেজের শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সরকারি আবুল কালাম কলেজ মিলনায়তনে একাদশ শ্রেণির এক বর্ণাঢ্য নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওই অঙ্গীকার করেন কলেজের উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে ওই শপথবাক্য পাঠ করান বরিশাল বিমানবন্দর প্রেসক্লাব সভাপতি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বাবুগঞ্জ উপজেলা সম্পাদক আরিফ আহমেদ মুন্না।
সরকারি আবুল কালাম কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অনুপম রায়ের সভাপতিত্বে এবং বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নুরুন্নবী রাসেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ওই নবীন বরণ অনুষ্ঠানে এসময় বক্তব্য রাখেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, পৌরনীতি ও সুশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জহিরুল হক রোকন, হিসাব বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আলী হোসেন শরীফ, ছাত্রনেতা নাঈম হাসান, তাজিম আহমেদ, রাকিব সিকদার, মেহেদী হাসান, শিক্ষার্থী তাইয়্যেবা রহমান প্রমুখ।
নবীন বরণ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বের ব্যান্ড-শোসহ বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সরকারি আবুল কালাম কলেজের বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নুরুন্নবী রাসেল। এসময় তিনি নব্বই দশকের জনপ্রিয় তাঁর এভারগ্রীণ ব্যান্ডের কালজয়ী ঐতিহাসিক গান 'ভেঙে দাও ফারাক্কা' গেয়ে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন। কলেজ শিক্ষকদের মধ্য থেকে এছাড়াও সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রভাষক নুসরাত জাহান ও প্রভাষক লেলিন তালুকদার। কবিতা আবৃত্তি করেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অনুপম রায়। এসময় মনোজ্ঞ সঙ্গীতের সুরের মূর্ছনায় শিক্ষার্থীদের মাতোয়ারা করে বরিশাল শিল্পগোষ্ঠীর ব্যান্ডদল। #

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:০০
প্রকৃতি যখন নিজের হাতে কোনো ক্যানভাস সাজায়, তখন তার রূপ কেমন হতে পারে, তা বরিশালের সাতলা বিলে না গেলে অনুধাবন করা অসম্ভব। শরতের ভোরের আলো ফুটতেই এখানে চোখ জুড়িয়ে যায় এক অলৌকিক দৃশ্যে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এক জলাশয়, আর তার বুক চিরে মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে কোটি কোটি লাল শাপলা। দূর থেকে মনে হবে যেন সবুজ পাতার বিছানায় কেউ লাল গালিচা পেতে রেখেছে, কিংবা ভোরের উদীয়মান সূর্যটাই টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পানির বুকে।বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা হলেও, একসঙ্গে এত শাপলার মেলা দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। তাই বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার এই সাতলা গ্রামটি এখন সারা দেশে পরিচিত 'শাপলার রাজধানী' বা 'লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য' হিসেবে।
বছরের অন্য সময়ে সাতলা বিল দেখতে আর দশটা সাধারণ জলাভূমির মতোই মনে হয়। শুষ্ক মৌসুমে এখানে চাষ হয় ইরি ধান। কিন্তু বর্ষার পানি আসতেই বিলটি তার রূপ বদলাতে শুরু করে। মে-জুন মাস থেকে বিলে পানি জমতে শুরু করলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় লাল শাপলা। আগস্ট থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত চলে শাপলার এই রাজত্ব। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে বিলের সৌন্দর্য পৌঁছায় তার চূড়ায়। ভোরের আলোয় লাল শাপলার মেলাসাতলা বিলের আসল রূপ দেখতে হলে আপনাকে ঘুমকে ছুটি দিতে হবে। সূর্য ওঠার ঠিক আগে, যখন চারপাশ হালকা কুয়াশায় ঢাকা থাকে, তখন বিলের রূপ সবচেয়ে মোহনীয় দেখায়। ভোরের নরম আলোয় পাপড়ি মেলে ধরা শাপলাগুলোর ওপর যখন ভোরের শিশিরবিন্দু জমে থাকে, তখন মনে হয় যেন মুক্তো ছড়ানো রয়েছে। সকাল ৮টা বা ৯টা বেজে যাওয়ার পর যখন রোদের তীব্রতা বাড়ে, তখন ফুলগুলো ধীরে ধীরে বুজে যায়। তাই সাতলার সৌন্দর্য উপভোগ করার মোক্ষম সময় হলো ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টা।বিলের জীবন ও জীবিকাসাতলা বিল শুধু পর্যটকদের জন্যই আনন্দের খোরাক নয়, এটি স্থানীয় শত শত পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। বিলের বুকজুড়ে যখন নৌকায় করে পর্যটকেরা ঘুরে বেড়ায়, স্থানীয় মাঝিরা গল্প শোনায় এই বিলের। অনেকে আবার বিল থেকে শাপলা তুলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এই শাপলা দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু তরকারি। শুধু তাই নয়, বিলের মিষ্টি শালুকও স্থানীয়দের অন্যতম প্রিয় খাবার।
বরিশাল সদর কিংবা উজিরপুর উপজেলা থেকে খুব সহজেই সাতলা বিলে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে লঞ্চ বা বাসে বরিশাল এসে, সেখান থেকে মাহিন্দ্র (থ্রি-হুইলার) বা বাস যোগে শিকারপুর হয়ে শাতলা যাওয়া যায়। এছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে করেও উজিরপুর বা সাতলা যাওয়া সম্ভব। বিলে ঘোরার জন্য স্থানীয় ঘাটে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা পাওয়া যায়, যা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে ভাড়া নেওয়া যায়।
প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। ভ্রমণের সময় প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা কোনো বর্জ্য বিলে ফেলে পানি দূষিত করবেন না। মনে রাখবেন, ফুল গাছের চেয়ে পানির বুকেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর। তাই অকারণে ফুল ছিঁড়ে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য নষ্ট করা থেকে বিরত থাকাই একজন সচেতন ভ্রমণকারীর পরিচয়। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি মুছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এক চিলতে শান্তি পেতে চাইলে, শরতের কোনো এক ভোরে ঘুরে আসতেই পারেন লাল শাপলার এই স্বর্গরাজ্য থেকে।’
প্রকৃতি যখন নিজের হাতে কোনো ক্যানভাস সাজায়, তখন তার রূপ কেমন হতে পারে, তা বরিশালের সাতলা বিলে না গেলে অনুধাবন করা অসম্ভব। শরতের ভোরের আলো ফুটতেই এখানে চোখ জুড়িয়ে যায় এক অলৌকিক দৃশ্যে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এক জলাশয়, আর তার বুক চিরে মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে কোটি কোটি লাল শাপলা। দূর থেকে মনে হবে যেন সবুজ পাতার বিছানায় কেউ লাল গালিচা পেতে রেখেছে, কিংবা ভোরের উদীয়মান সূর্যটাই টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পানির বুকে।বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা হলেও, একসঙ্গে এত শাপলার মেলা দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। তাই বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার এই সাতলা গ্রামটি এখন সারা দেশে পরিচিত 'শাপলার রাজধানী' বা 'লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য' হিসেবে।
বছরের অন্য সময়ে সাতলা বিল দেখতে আর দশটা সাধারণ জলাভূমির মতোই মনে হয়। শুষ্ক মৌসুমে এখানে চাষ হয় ইরি ধান। কিন্তু বর্ষার পানি আসতেই বিলটি তার রূপ বদলাতে শুরু করে। মে-জুন মাস থেকে বিলে পানি জমতে শুরু করলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় লাল শাপলা। আগস্ট থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত চলে শাপলার এই রাজত্ব। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে বিলের সৌন্দর্য পৌঁছায় তার চূড়ায়। ভোরের আলোয় লাল শাপলার মেলাসাতলা বিলের আসল রূপ দেখতে হলে আপনাকে ঘুমকে ছুটি দিতে হবে। সূর্য ওঠার ঠিক আগে, যখন চারপাশ হালকা কুয়াশায় ঢাকা থাকে, তখন বিলের রূপ সবচেয়ে মোহনীয় দেখায়। ভোরের নরম আলোয় পাপড়ি মেলে ধরা শাপলাগুলোর ওপর যখন ভোরের শিশিরবিন্দু জমে থাকে, তখন মনে হয় যেন মুক্তো ছড়ানো রয়েছে। সকাল ৮টা বা ৯টা বেজে যাওয়ার পর যখন রোদের তীব্রতা বাড়ে, তখন ফুলগুলো ধীরে ধীরে বুজে যায়। তাই সাতলার সৌন্দর্য উপভোগ করার মোক্ষম সময় হলো ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টা।বিলের জীবন ও জীবিকাসাতলা বিল শুধু পর্যটকদের জন্যই আনন্দের খোরাক নয়, এটি স্থানীয় শত শত পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। বিলের বুকজুড়ে যখন নৌকায় করে পর্যটকেরা ঘুরে বেড়ায়, স্থানীয় মাঝিরা গল্প শোনায় এই বিলের। অনেকে আবার বিল থেকে শাপলা তুলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এই শাপলা দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু তরকারি। শুধু তাই নয়, বিলের মিষ্টি শালুকও স্থানীয়দের অন্যতম প্রিয় খাবার।
বরিশাল সদর কিংবা উজিরপুর উপজেলা থেকে খুব সহজেই সাতলা বিলে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে লঞ্চ বা বাসে বরিশাল এসে, সেখান থেকে মাহিন্দ্র (থ্রি-হুইলার) বা বাস যোগে শিকারপুর হয়ে শাতলা যাওয়া যায়। এছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে করেও উজিরপুর বা সাতলা যাওয়া সম্ভব। বিলে ঘোরার জন্য স্থানীয় ঘাটে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা পাওয়া যায়, যা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে ভাড়া নেওয়া যায়।
প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। ভ্রমণের সময় প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা কোনো বর্জ্য বিলে ফেলে পানি দূষিত করবেন না। মনে রাখবেন, ফুল গাছের চেয়ে পানির বুকেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর। তাই অকারণে ফুল ছিঁড়ে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য নষ্ট করা থেকে বিরত থাকাই একজন সচেতন ভ্রমণকারীর পরিচয়। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি মুছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এক চিলতে শান্তি পেতে চাইলে, শরতের কোনো এক ভোরে ঘুরে আসতেই পারেন লাল শাপলার এই স্বর্গরাজ্য থেকে।’

২৪ অক্টোবর, ২০২৫ ২২:২৯
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ডাক নাম ছিল দুখু মিয়া। জাতীয় কবি দুখু মিয়ার শৈশবের দুঃখকষ্টের গল্পটা সবার কমবেশি জানা। তবে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আরেক দুখু মিয়ার গল্পটা তেমন কেউ জানে না। উপজেলার মানিককাঠী গ্রামের এই দুখু মিয়ার হৃদয়বিদারক করুণ কাহিনী যেন সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। দুঃখ আর দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্ম হয়েছিল বলেই নানা তার নাম রেখেছিলেন দুখু মিয়া। মায়ের গর্ভে থাকতেই দুখু মিয়াকে অস্বীকার করে তার বাবা। ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া দুখু মিয়াকে মায়ের গর্ভেই হত্যা করতে বসেছিল গ্রাম্য সালিশ। তবে গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে দুখু মিয়াকে প্রাণে বাঁচান মা। পিতৃপরিচয়হীন, ঠিকানাহীন অবস্থায় জন্ম নেওয়া দুখু মিয়ার পিতৃত্ব নির্ধারণে আদালতে চলে দীর্ঘ আইনি লড়াই। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পিতৃত্ব নিশ্চিত করে দুখু মিয়ার জন্মদাতা পিতাকে আদালত যাবজ্জীবন সাজা দিলেও দুখু মিয়া পায়নি সন্তানের অধিকার কিংবা সমাজের স্বীকৃতি। আদালতে জয়ী হলেও সমাজের লাঞ্ছনা আর দারিদ্র্যের কষাঘাতে চিরতরে গ্রামছাড়া হতে হয় দুখু মিয়া এবং তার জনমদুখিনী মাকে। একপর্যায়ে মা-ছেলের কারণে পুরো পরিবারকেই হতে হয় গ্রামছাড়া। নদীর কচুরিপানার মতো ভাসমান জীবন বরণ করতে হয় ৯ সদস্যের একটি পরিবারকে।
সমাজের প্রতি পদে পদে লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নিয়ে দারিদ্র্যের সাথে প্রতি মুহূর্তে লড়াই করা দুখু মিয়া এবং তার যোদ্ধা মা সালমা আক্তারকে স্থায়ী ঠিকানা দিতে অবশেষে উদ্যোগ নেন বরিশাল জেলা প্রশাসক। তিনি বাবুগঞ্জের ইউএনওকে সাথে নিয়ে দুখু মিয়ার জন্য যৌথভাবে কেনেন একখন্ড জমি। অতঃপর সমাজসেবা অধিদপ্তরের অনুদানে সেখানে নির্মাণ করা হয় একটি বসতঘর। সেই বসতঘরের নাম রাখা হয় শান্তির নীড়। বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের বরিশাল বিমানবন্দর মোড় এলাকায় সালমা ও তার দুখু মিয়ার স্বপ্নের ঠিকানা সেই শান্তির নীড়ের চাবি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। একইসাথে সালমাকে দেওয়া হয় দুখু মিয়ার ভরনপোষণে সরকারি ১৬ লাখ টাকা অনুদানের শেষ কিস্তির ১ লাখ ৮২ হাজার টাকার চেক। এসময় সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ.কে.এম আক্তারুজ্জামান তালুকদার, সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ, সেইন্ট বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর কবির, বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফারুক আহমেদ, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমান, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শামীমা ইয়াসমিন ডলি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সোহেল হোসেন, বিমানবন্দর প্রেসক্লাব সভাপতি ও সুজন সম্পাদক আরিফ আহমেদ মুন্না প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত ২০০৩ সালের ৯ আগস্ট মানিককাঠী গ্রামের সালাম সরদারের ছেলে গিয়াস উদ্দিন প্রতিবেশি চাচার বাড়িতে গিয়ে চাচাতো বোন চতুর্দশী সালমা আক্তারকে একা পেয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এরপরে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন তিনি। এতে গর্ভবতী হয়ে পড়েন সালমা। ঘটনা জানাজানি হলে সরাসরি অস্বীকার করেন অভিযুক্ত গিয়াস উদ্দিন। বিষয়টি পারিবারিক হওয়ায় স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করেন তৎকালীন রহমতপুর ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সিকদার। তিনি গর্ভবতী সালমাকে মেনে নিয়ে গিয়াসকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার রায় দিয়ে সালিশ রোয়েদাদ দেন। এদিকে ওই সালিশ অগ্রাহ্য এবং সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করে সালমাকে গর্ভপাতের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন গিয়াস উদ্দিন ও তার পরিবার। সালমাকে দুশ্চরিত্রা আখ্যা দিয়ে স্থানীয় সমাজপতিদের নির্দেশে গর্ভপাত করানোর জন্য সালমা ও তার মাকে বেধড়ক মারপিট করা হয়। একপর্যায়ে সালমা আক্তার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এসব ঘটনা নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে ওঠে প্রশাসন। পরে প্রশাসনের সহায়তায় আদালতের মাধ্যমে বাবুগঞ্জ থানায় একটি নারী নির্যাতনের মামলা দায়ের করেন সালমা আক্তার।
মামলা দায়েরের পরে পুলিশ গ্রেপ্তার করে অভিযুক্ত গিয়াস উদ্দিনকে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়াসের প্রভাবশালী মামারা মারপিট করে ৭ ভাইবোনসহ সালমার পরিবারকেও মানিককাঠী গ্রাম থেকে বিতাড়িত করেন। পরে গর্ভবতী সালমাকে নিয়ে তার ৯ সদস্যের পরিবার এসে আশ্রয় নেয় উত্তর রহমতপুর গ্রামের আলী হোসেনের ইটভাটায়। সেখানে মাটি কাটার কাজ নেন সালমা ও তার মা রেনু রেগম। ইটভাটা মালিক আলী হোসেনের দয়াকরে থাকতে দেওয়া একটি খুপরি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করে সালমার পরিবার। এমন পরিস্থিতিতে ২০০৪ সালের ৯ জুন ভাগ্যবিড়ম্বিত সালমার কোলে জন্ম নেয় ফুটফুটে শিশু দুখু মিয়া। জন্মই যার আজন্ম পাপ; সেই হতভাগ্য নিষ্পাপ শিশুটির নাম রাখা হয় দুখু মিয়া। এক সাগর দুঃখ বুকে নিয়ে নাতির নাম দুখু মিয়া রাখেন সালমার বাবা কালাম সরদার। এদিকে দুখু মিয়া জন্মের ৪ মাস পরে ২০০৪ সালের ৭ অক্টোবর জামিনে ছাড়া পান অভিযুক্ত জন্মদাতা গিয়াস উদ্দিন। জামিনে এসে নিজের ঔরসজাত সন্তানকে অন্যের জারজ সন্তান আখ্যা দিয়ে হত্যার চেষ্টা চালান তিনি। পরে সালমা ও দুখু মিয়ার নিরাপত্তার বিবেচনায় তাদের সেইভ হোমে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
এদিকে মামলার একমাত্র অভিযুক্ত গিয়াস উদ্দিন তার সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ করলে আদালতের নির্দেশে সালমার সন্তান দুখু মিয়া এবং গিয়াস উদ্দিনের রক্ত এবং মুখের লালার নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ঢাকার ফরেনসিক ল্যাবে পাঠান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাবুগঞ্জ থানার এসআই আলতাফ হোসেন। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টে গিয়াস এবং দুখু মিয়ার ডিএনএ প্রোফাইল ম্যাচ করায় গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরপরে অভিযুক্ত গিয়াসের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের পরে বিচারের জন্য ২০০৮ সালে আলোচিত এই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। এদিকে প্রায় ২ বছর সেইভ হোমের সরকারি নিরাপত্তা হেফাজতে থাকার পরে রহমতপুর বিমানবন্দর মোড়ে দুলাল সরদারের বাড়ির একটি পরিত্যক্ত ঘরে দুখু মিয়াকে নিয়ে আশ্রয় পান সালমা আক্তার।
এদিকে সালমার ট্রলি চালক দরিদ্র পিতা কালাম সরদার স্ট্রোকজনিত কারণে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়লে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটতে থাকে তাদের পরিবারের। নিরুপায় হয়ে আড়াই বছরের দুখু মিয়াকে সালমা তার মায়ের কাছে রেখে ২০০৬ সালে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানে রানা প্লাজার পাশের একটি গার্মেন্টসে মাসিক ২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেন সালমা। দুই শিফট ডিউটি আর দিনরাত ওভারটাইম করে ৬ হাজার টাকা বেতন পেয়ে ৫ হাজার টাকাই পাঠিয়ে দিতেন মায়ের কাছে। ওই সামান্য টাকা দিয়েই সালমার ছোট ৬ ভাইবোন আর দুখু মিয়ার খরচ চলতো। সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে বিভিন্ন বাড়িতে বুয়ার কাজ নেন সালমার মা রেনু বেগম। এদিকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত সালমার বাবার মৃত্যু হলে দুখু মিয়াসহ ৯ সদস্যের পরিবার নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন রেনু বেগম। তবুও দুই মা-মেয়ে মিলে বেঁচে থাকার যুদ্ধে হার না মানা যোদ্ধা হয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন।
সালমার দায়ের করা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পরে রাষ্ট্রপক্ষের ১৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ১২ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ২০১১ সালের ২৪ মার্চ রায় ঘোষণা করেন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক আনিছুর রহমান খান। রায়ে মামলার একমাত্র আসামি গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের কারণেই সন্তান জন্মদানের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন বিচারক। একইসঙ্গে দুখু মিয়ার বয়স ২১ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তার ভরনপোষণের যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্রকে বহন করার আদেশ জারি করেন। আদালতের ওই রায়ের পরে মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে দুখু মিয়ার ভরনপোষণের জন্য প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ লাখ টাকা করে এ পর্যন্ত ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এই টাকা দিয়েই দুখু মিয়াকে লেখাপড়া করান তার মা সালমা আক্তার। বর্তমানে দুখু মিয়া সরকারি আবুল কালাম কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
এদিকে সালমার ৫ ভাইয়ের মধ্যে ৩ ভাই বিয়ে করে বাড়িতে বউ আনলে সালমার সাথে তাদের মতবিরোধ তৈরি হয়। ভাইয়ের বউরা সালমার জন্য সমাজে মুখ দেখাতে পারে না, ইত্যাদি নানান অজুহাতে তাকে বাড়িছাড়া করার পায়তারা শুরু করে। ভাইদের সাথে একই সংসারে থাকার কারণে দুখু মিয়ার ভরনপোষণের জন্য সরকার থেকে দেওয়া অনুদানের টাকাও ভোগ করতে পারছিলেন না হতভাগিনী সালমা আক্তার। অনুদানের শেষ কিস্তির টাকার চেক আনতে গেলে কথা প্রসঙ্গে এসব হৃদয়বিদারক ঘটনা জানতে পারেন বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। সালমার কাছে তার জীবনের গত ২২ বছরের বিভীষিকাময় ঘটনার আদ্যোপান্ত শুনে তিনি বিস্মিত এবং বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
এরপরেই সালমা ও তার দুখু মিয়ার জন্য একটি স্থায়ী ঠিকানা নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন জেলা প্রশাসক। সালমার বর্তমান ঠিকানার আশেপাশে একখণ্ড জমি খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন বাবুগঞ্জের ইউএনওকে। পরে বরিশাল বিমানবন্দর মোড় এলাকার রহমতপুর মৌজায় ২ শতক খাসজমির সাথে স্থানীয় দীপক মজুমদারের কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ১ শতক জমি কেনা হয়। জেলা প্রশাসকের সাথে জমি কেনায় যৌথভাবে অংশগ্রহণ করেন বাবুগঞ্জের ইউএনও ফারুক আহমেদ। এছাড়াও এনজিওর পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা অনুদান দেন সেইন্ট বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক কাজী জাহাঙ্গীর কবির। পরবর্তীতে সালমার নামে দলিল করা প্রায় ৩ শতাংশ জমির ওপরে বসতঘর নির্মাণের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ আনেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন।
নদীভাঙনে ভিটামাটিহীন/ক্ষতিগ্রস্ত এবং বস্তিবাসীদের জন্য গৃহনির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ওই ৩ লাখ টাকার সাথে বসতঘরের জমিতে ইউএনওর সৌজন্যে বালু ভরাটসহ প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সালমা এবং তার দুখু মিয়ার জন্য নির্মিত হয় স্বপ্নের ঠিকানা শান্তির নীড়। বৃহস্পতিবার বিকেলে শান্তির নীড়ের চাবি আনুষ্ঠানিকভাবে সালমার হাতে হস্তান্তর করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। এসময় তিনি সালমার হাতে দুখু মিয়ার ভরনপোষণে সরকারি অনুদানের শেষ কিস্তির ১ লাখ ৮২ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। ফিতা কাটার মাধ্যমে বসতঘরের উদ্বোধন ও চাবি হস্তান্তরকালে সেখানে দোয়া-মোনাজাত এবং মিষ্টি বিতরণ করা হয়। দোয়া-মোনাজাত পরিচালনা করেন উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের ইমাম ও খানপুরা আলীম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আ.জ.ম সামসুল আলম।
প্রায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের ৩ শতাংশ জমিসহ বসতঘর পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন সালমা আক্তার। নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, 'আমি ধর্ষিতা হয়ে বিচার চাইতে গিয়ে সমাজচ্যুত হয়েছি। গ্রামছাড়া হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি। আমাকে চরিত্রহীনা অপবাদ দিয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ সবাই দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে। মামলা চালাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছি। না খেয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করেছি। দুমুঠো ভাতের জন্য যখন যে কাজ পেয়েছি তাই করেছি। দুখু মিয়াকে সাথে নিয়ে গত ২২টি বছর জীবনের অবর্ণনীয় কষ্ট দুর্ভোগ সহ্য করেছি। অবশেষে আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন। ডিসি এবং ইউএনও স্যারের মাধ্যমে আজ আমি একটা স্থায়ী ঠিকানা পেলাম। আমার দুখু মিয়াকে নিয়ে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পেলাম। এই ঘর আমার কাছে স্বপ্নের ঠিকানা বলে ডুকরে কেঁদে ওঠেন সালমা আক্তার।'
বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফারুক আহমেদ বলেন, 'নির্যাতিতা সালমাকে একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়ে দেওয়ার মহতী কাজে সম্পৃক্ত হতে পেরে আনন্দ লাগছে। জেলা প্রশাসক মহোদয় এই কাজে আমাকে সম্পৃক্ত করেছেন এবং কিছু অবদান রাখার সুযোগ করে দিয়েছেন এজন্য তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সালমা আক্তার এবং তার দুখু মিয়া সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। তাদের সহযোগিতা করার জন্য বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন সবসময় পাশে থাকবে।'
বরিশাল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন বলেন, 'ভাগ্যবিড়ম্বিত অসহায় সালমা আক্তার আজ মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পেয়েছে। তার সন্তান দুখু মিয়ার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছে একটা এনজিও। মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে এ পর্যন্ত দুখু মিয়ার ভরনপোষণে ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে তার চাকরির বিষয়টা আমাদের সবার বিবেচনায় থাকবে। আমাদের সমাজে পিছিয়ে পড়া দুঃস্থ-অসহায় নির্যাতিত মানুষদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করা আমাদের সকলের নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব। এই কাজটি যখন সম্মিলিতভাবে করা হয় তখন সমাজে একটা ভালো উদাহরণ তৈরি হয়। আমরা যদি দায়িত্ব নিয়ে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অসহায় মানুষের জন্য কাজ করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে আমরা একটা সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারবো।' #
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:২২
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:২১
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:৪৪
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:৪০