বরিশাল মহানগর যুবলীগ নেতা মারুফ আহমেদ জিয়া একজন সরকারি কর্মকর্তাকে পিটিয়ে বীরদর্পে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সাহসিকতার নেপথ্য শক্তি নিয়ে কি ইঙ্গিত দিলেন তা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রগতিশীল ধ্যান-ধারনার মানুষের মধ্যে প্রশ্ন এবং উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ঘটনাটি গত ১০ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকালের। ওই দিন জিয়া তার সহযোগীদের নিয়ে বরিশাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের হাজির হয়ে একটি ঠিকাদারী কাজের স্টিমেট জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় বাধ সাধলে দপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ওবায়দুল হককে বেদম প্রহার করেন। এই ঘটনা অনেকটা নীরবে ঘটলেও শুক্রবার রাতে লাঞ্ছিত ওবায়দুল এ সংক্রান্ত থানায় অভিযোগ জানিয়ে মামলা করার পরপরই ঘটনার আদ্যপান্ত প্রকাশ পায় এবং বিষয়টি স্যোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে ফের মিডিয়ার শিরোনাম হন মারুফ আহমেদ জিয়া। বরিশালে পারিবারিক ও রাজনৈতিক কারণে এই যুবক বেশ আলোচিত-সমালোচিত মুখ। এক সময় নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র অনুসারী হিসেবে দাপট দেখিয়ে চলা মারুফ হঠাৎ করে রাজনৈতিক শিবির পরিবর্তন করে নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষ নেন। এবং সদ্য অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে তার পক্ষাবলম্বন করে প্রচারণা এবং নিজেও কাউন্সিলর প্রার্থী হন। অবশ্য নেতা খোকন সেরনিয়াবাত নির্বাচিত হলেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী সাদেকপন্থী মজিবর রহমানের কাছে শোচনীয় পরাজিত হন। একই ব্যক্তির সাথে দুইবার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে রাজনৈতিক সর্বশক্তি প্রয়োগের পরেও পরাজয়ের কারণে বেশ কিছুদিন ধরে মারুফ আহমেদ জিয়া আলোচনায় ছিলেন। এবং পরাজিত হলেও তার দাপট আরও একগুণ বেড়ে যায় বলে স্থানীদের অভিমত। প্রশ্ন সেখানেই হঠাৎ করে একজন প্রকৌশলীকে প্রহার করার পিছনে রাজনৈতিক শক্তি ও সমর্থন তাকে এই সাহসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছে বলে এমনটি বরিশালের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষপট সে কথাই মনে করিয়ে দেয় কি? কারণ ক্ষমতার তারতম্য বিবেচনায় ভাতিজা সাদিক আব্দুল্লাহ অপেক্ষা চাচা খোকন সেরনিয়াবাতের আধিপত্য সৃষ্টি হওয়ায় কেউ কেউ এলাকাভিত্তিক নেতৃত্ব দেওয়ার আড়ালে সন্ত্রাসী জগতের ডন হিসেবে উত্থ্যানের অভিযোগ উঠেছে, যা কিনা সিভিল প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অবগত।
রাজনৈতিক বোদ্ধা ও সমাজ বিশ্লেষকদের ধারনা, জিয়ার পরিবার বরাবরই সব সরকারের আমলে দাপটের সাথেই আছেন বলে নানান ঘটনায় প্রতীয়মাণ হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের গত ১৫ বছর একটানা শাসনামলে জিয়ার দাপট ছিলো সমান্তরাল। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রথমভাগে তার বোন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর আয়েশা তৌহিদ লুনা প্রয়াত সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরনের সমর্থনপুষ্ট হওয়ায় তৎসময় জিয়া যুবলীগ নেতা হিসেবে বাংলা বাজার টু আলেকান্দা এলাকায় নিজের শক্তিকে সমীহের জায়গায় নিয়ে যায়।
সূত্র জানায়, বিএনপি আমলেও জিয়া ছিলেন অদম্য। একদিকে নগর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও সিটি মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ারের সাথে কাউন্সিলর লুনার দহরম-মহরম এবং বড় ভাই জাতীয় পার্টির একাংশের আহ্বায়ক বশির আহমেদ ঝুনুর অতীত প্রভাবকে ব্যবহার করে জিয়ার শক্তির উত্থ্যান ঘটে। যদিও জিয়া আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে আগে থেকে জড়িত।
অভিযোগের সুরে জানা গেলে, সময়ের আবর্তে রাজনীতির চাকা ঘুরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে জিয়া রাজনীতিতে আড়মোড়া দিয়ে ওঠে। এ সময় কাউন্সিলর লুনাও নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে ভোল পাল্টে প্রথমে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং স্থানীয়ভাবে দলের জেলার কর্ণধর আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র প্রয়াতপত্নী বেগম সাহানারা আব্দুল্লাহ’র হাতে ফুল দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ক্ষমতা খর্ব এবং প্রয়াত নেতা শওকত হোসেন হিরন মেয়র হিসেবে বরিশালে দাপটশীল বলয় তৈরী করলে কাউন্সিলর লুনা হয়ে যান এই নেতার প্রিয়ভাজন। পক্ষান্তরে জিয়া হাসনাত সমর্থিত যুবলীগ নেতা হওয়া সত্বেও বোন লুনার বদৌলতে হিরনের নেক নজরে থেকে টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চলতেন। আকস্মিক সদর আসনের সংসদ সদস্য থাকাবস্থায় শওকত হোসেনের মৃত্যু ঘটলে এই ভাই-বোন ক্ষমতার রাজনীতি থেকে কিছুটা চুপসে যান। তাছাড়া পটুয়াখালীর পৌর কাউন্সিলর লুনার স্বামী তৌহিদুল ইসলাম তৌহিদ মৃত্যুবরণ করলে আরও ঘরমুখো হয়ে পড়েন বোন লুনা। কিন্তু সময় বেশি দিন লাগেনি, অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানেই আবারও জিয়া কাকতালীয়ভাবে দাপটের রাজনীতির স্বাদ পেয়েছেন বলে কোন কোন মহল দাবি করছে।
বেশ কয়েকটি সূত্রের দাবি, সেরনিয়াবাত সাদেক আব্দুল্লাহ বরিশাল রাজনীতিতে পদার্পন এবং ২০১৮ সালে অনুুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলীয় মেয়র নির্বাচিত হলে নয়া এই রাজনীতিবিদের সাথে বয়সের মিল থাকায় দু’জনার ভিতর ভিষণ ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে ওঠে। হয়ে যান সাদিকপন্থী শক্তিধর যুবলীগ নেতা। পেয়ে যান নগর যুবলীগের সদস্য পদ। বরাবরই ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা জিয়া অনুধাবন করেন সাদেক আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত এবং তার চাচা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় বরিশালের দলীয় মেয়র প্রার্থী হওয়ায় হাসনাত পরিবারের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
আবার কেউ বলছে, মজিবর রহমানের ছোট ভাই আরেক যুবলীগ নেতা নামও অভিন্ন জিয়াউর রহমান জিয়া রাজনৈতিক কৌশলের দরজা দিয়ে মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র খুব কাছাকাছি চলে যাওয়ায় মারুফ অহমেদ জিয়া বিষয়টি ভালো চোখে নেয়নি, কমিয়ে দেয় মেয়রের কালীবাড়ির বাসভবনে যাতায়াত। হাল সময়ে হঠাৎ করে তিনিও ভোল পাল্টে হয়ে যান খোকন সেরনিয়াবাত ঘরানার রাজনীতিবিদ। সেই সাথে তার বোন লুনাও যুক্ত হয় একই শিবিরে।
অনুসন্ধানে আভাস মেলে যে, অবশ্য এ ক্ষেত্রে মূল টার্গেট ছিলো অথবা ভেবেছিলো খোকন সেরনিয়াবাদের ক্ষমতার প্রভাব অথবা সমর্থন নিয়ে হাসনাত-সাদিক সমর্থিত মজিবর রহমানকে পরাজিত করা এবার হয়তো সহজতর হবে। রাজনীতিতে একই ঘরনার লোক হলেও ১১ নম্বর ওয়ার্ড কেন্দ্রিক আধিপত্য নিয়ে মজিবর রহমানের সাথে মারুফ আহমেদ জিয়ার পরিবারের শীতল বিরোধ চলে আসছিলো। শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে লড়াই চলছে।
এর আগে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে মজিবর রহমানের সাথে লড়াই করে পরাজয় অর্থাৎ কাউন্সিলর হওয়ার ব্যর্থতার পিছনে সাদিকের অতটা সমর্থন পায়নি বিধায় মান-অভিমানের পাল্লাটা সেখান থেকে ভারী হতে থাকে এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন বিকল্প শক্তিধর নেতার আবির্ভাবে, যেখানে আশ্রয়-সমর্থন পাওয়া যায়।
তার ঘনিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, মারুফ আহমেদ জিয়া একাবার মনস্থিরও করেছিলেন বরিশাল সদর আসনের সাংসদ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের স্রোতধারায় নিজেকে সামিল করবেন। এ ক্ষেত্রে কৌশল হচ্ছে, মন্ত্রীর সমর্থন নিয়ে কাউন্সিলর মজিবর রহমানের সাথে ক্ষমতার টক্কর জমিয়ে তোলা। কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অপেক্ষা মেয়র সাদিক অনেক দুর্বল এবং কোন টেন্ডারবাজি বা ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি মনস্ক না হওয়ায় জাহিদ ফারুক শামীমের দরজায় যাই যাই করে আর যাওয়া হয়নি। খোকন সেরনিয়াবাত সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর জাহিদ ফারুক শামীমের সাথে একট্টা হয়ে মাঠে নামনে জিয়া কৌশলে এই প্রতিমন্ত্রীর নজরে নিজেকে নিয়ে আসে এবং খোকন সেরনিয়াবাতের সমর্থনে নতুন করে রাজনৈতিক মাঠ গরমের সুযোগ নিয়ে নিজের শক্তিমাত্রা প্রদর্শনের সুযোগ খুঁজছিলেন। কিন্তু তার বয়স অপেক্ষা যুবলীগ নেতা ওয়াসিম দেওয়ান, ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিন ও বিএম কলেজের সাবেক ভিপি মঈন তুষার নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের ঘনিষ্টতর হওয়ার কারণে প্রাধান্য দেওয়ায় জিয়া নিজেকে এই শিবিরে নিজেকে সেভাবে উপস্থাপন করতে পারছিলেন না। যতটা না পেরেছিলেন সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রে। খোকন সেরনিয়াবাত দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর বরিশাল আওয়ামী লীগ দ্বি-খন্ডিত হয়ে সাদেক আব্দুল্লাহকে চেপে ধরতে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন স্থাপনা দখল এবং প্রশাসনের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি হওয়ায় জিয়ার হয়তো ধারনা ছিলো গণপূর্ত অধিদপ্তরে অঘটন ঘটিয়ে ফায়দা লোটার পাশাপাশি নিজের শক্তি-সমর্থ জানান দিতে।
গত ১০ আগস্ট সকালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঘটনায় প্রকাশ পায় তিনি এই দপ্তরে দীর্ঘদিন যাবৎ টেন্ডারবাজি করে আসছিলেন। ওই দপ্তরে ঘুরে এ ধরনের বেশ কয়েকটি অভিযোগ জানাও গেল। তবে প্রত্যক্ষদর্শী দুইজন ব্যক্তির বর্ণনায় জিয়া দাপ্তরিক কাজ বাগিয়ে নিতে আগের যতনা পেশি শক্তি প্রয়োগ করতেন তার চেয়ে বেশি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র অনুসারী হিসেবে নিজের প্রভাব উপস্থাপন করতেন। বরিশালের বর্তমান হালচাল বলে দেয় যে, খোকন সেরনিয়াবাতের বিজয় নয়, প্রার্থী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পরার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসন ও বে-সরকারি সকল দপ্তরে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র যতটুকু প্রভাব ছিলো তাও যেন শেষ হয়ে নয়া মেয়রের সমর্থনে রাবনের গীত গাইছে। সেই সুযোগই নিতে চেয়েছিলেন যুবলীগ নেতা জিয়া। নচেৎ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের একটি টেন্ডারের স্টিমেটের কাগজ দ্বিতীয় দফা আনতে গিয়ে রাজনৈতিক বল প্রয়োগ করার প্রক্রিয়ায় উপ-সহকারী প্রকৌশলী ওবায়দুল হকের সাথে বাকবিতণ্ডা থেকে একপর্যায় দুর্দান্ত সাহস দেখাতে গিয়ে দুই সহযোগী নিয়ে তাকে প্রহার করে।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই ঘটনায় প্রশাসনের এই উন্নয়নমূলক এই সেক্টরের বরিশাল টু ঢাকার কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হন। এবং তাদের ভিতর উত্তেজনার পারদ ক্রমেই বাড়ছিল। এমন খবর নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম যে কোনো মাধ্যমে অবগত হন। ঘটনাটি যেদিন ঘটে সেদিন উভয় নেতা বরিশালেই ছিলেন এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু দুই নেতার কেউই জিয়াকে তলব করে সতর্কবার্তা বা সংযত হওয়ার আদেশ বা নির্দেশ কোনটাই দেয়নি। কারণ তারা চায়নি এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর ন্যায় প্রসাশনের সাথে দূরত্ব তৈরী হোক। ফলশ্রুতিতে তাদের নীরবতায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও আঁচ করে নেয় জিয়া যুবলীগ নেতা হলেও বর্তমান বরিশালের নিয়ন্ত্রক মন্ত্রী বা মেয়র কেউই জিয়ার কর্মকাণ্ডের পক্ষে নেই। অথবা তার দ্বায়ভার নিতে নারাজ।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্র বলছে, তারাও দুই নেতার মনভাব আমলে এনে এই যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন। এবং মিডিয়ার কাছে তারা শক্ত স্টেটমেন্ট বা মন্তব্য রাখেন। যার প্রমাণ এ ঘটনায় গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা অফিসিয়ালি আলোচনা করেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে এই ঘটনায় মামলা করা উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি আইনীভাবে মোকাবিলা করবে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন। শেষাংশে এসে ঘটলও সেটাই। লাঞ্ছিত ওই প্রকৌশলী পরদিন গত শুক্রবার রাতে মারুফ আহমেদ জিয়াকে প্রধান ও অপর দুই সহযোগী তিতাস ও আজদকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।
আবার অপর একটি সূত্রের দাবি, এই মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে নয়া মেয়র ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর প্রথমে পরোক্ষ ইঙ্গিত থাকলেও এখন আসামীদের যেন না ধরা হয়, সে বিষয়ে কোতয়ালি মডেল থানা পুলিশকে দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই সূত্রের অভিযোগ এই নাটের ঘুড়ি উড়িয়েছেন বোন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর আয়েশা তৌহিদ লুনা। এই নারী নেত্রী ফের নতুন করে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন এবং দুই নেতার আশির্বাদে পুনরায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হতে সহায়ক হন। লুনার সাথে নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতপত্নী লুনা আব্দুল্লাহর নামের মিল থাকায় ইতিমধ্যে উভয়ের ভিতর বিশেষ ঘনিষ্টতা গড়ে উঠায় সেখান থেকেই ভাই জিয়ার অনুকূলে সুপারিশ রেখে এ যাত্রা রক্ষার তাগিদ রাখেন। সূত্রের দেয়া এ তথ্য কতখানি সত্য তার বাস্তবিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও দায়িত্বশীল দুই নেতা অদ্যবধি দলীয় নেতা জিয়াকে নিয়ে কোন আনুষ্ঠনিক মন্তব্য প্রকাশ করেননি। এদিকে থানা পুলিশ ঘটনার চার দিন অতিবাহিত হলেও মারুফ আহমেদ জিয়ার টুটি ছুতে পারেনি, আটক হয়নি অপর দুইজন।
মডেল কোতয়ালি থানার ওসি আনোয়ার হোসেনের দাবি, আসামিদের আটকে জোরতর চেষ্টা চলছে। কিন্তু পুলিশের সার্বিক ভূমিকা সন্দেহজনক হওয়ায় ওই সূত্রের দাবি বা অভিযোগ একেবারে যে অমূলক নয়, তা নিয়ে নগরীতে কম-বেশি নানা মহলে আলোচনা শোনা যায়। যদি বাস্তবিক অর্থে রাজনীতির অন্দরমহলে সেটি যদি ঘটে থাকে তাহলে তা শুভ ইঙ্গিত বহন করেনা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা অতিত উদাহরণকে সামনে টেনে এনে বলেন, প্রয়াত নেতা শওকত হোসেন হিরন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র থাকাবস্থার শেষাংশে এসে তার অনুসারীদের সামাল দিতে পারেননি। যে কারণে বিএম কলেজের নতুন অধ্যক্ষ শংকর চন্দ্রকে দায়িত্ব গ্রহণে তার অনুসারীরা বাঁধা দিতে প্রকাশ্য লাঞ্ছিত করায় মেয়র হিরন তুমুল বিতর্কের মাঝে পড়েছিলেন। বিভিন্ন দপ্তরে তার অনুসারীদের দাপট বিপুল জনপ্রিয় এই নেতার প্রতি নগর উন্নয়নমূলক কাজের জন্য মানুষের বিশেষ দুর্বলতা থাকলেও চাপা ক্ষোভ ছিলো। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সিটি মেয়র নির্বাচনে বিএনপির দুর্বল প্রার্থী প্রয়াত নেতা আহসান হাবিব কামালের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে বিষয়ীভূত পরাজয়।
আবার সাদেক আব্দুল্লাহ রাজনীতির শুরুতে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তার ইমেজ ধরে রাখতে পারেননি। কয়েকজন খলিফা দ্বারা বেষ্টিত তরুণ এই নেতার কাছে নগরবাসী যে আশার আলো দেখছিলো, তা ক্রমেই নিভে যায় তার অনুসারীদের এলাকাভিত্তিক দাপট ও একনায়কতন্ত্র সৃষ্টির কারণে। এক্ষেত্রে তার অনভিজ্ঞ রাজনীতিকে দায়ী বলে মনে করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষদের অভিমত হচ্ছে, মেয়র হিসেবে সাদেক আব্দুল্লাহ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যেমন দূরে সরে গেছে, তেমনি প্রশাসনের ভিতরেও তার ইমেজ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ভাটা পড়ে। এ কারণেই কপাল খুলে যায় খোকন সেরনিয়াবাতের। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সম্পর্কে ফুপাতো ভাই খোকন সেরনিয়াবাতকে বরিশালের রাজনীতির নেতৃত্বে অগ্রভাগে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দিয়ে মেয়র নির্বাচিত করে স্থানীয় রাজনীতির পটপরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। দলীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে খোকন সেরনিয়াবাতের বক্তব্য ও কথাবার্তায় আঁচ করা যায় তিনি অতীতের নেতৃত্বের ন্যায় নিজেকে বিলীন করে দিতে নারাজ। বরং নতুন কিছু দিতে চায় বঞ্চিত বরিশালবাসীকে। সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যেতে পারে যদি কিনা মারুফ আহমেদ জিয়াদের ন্যায় ডনরূপি রাজনীতিবিদদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাস-দুর্নীতির বটবৃক্ষ রোপন করার সুযোগ দেন। এমন শঙ্কার পাশাপাশি চাচা-ভাতিজার লড়াই কোথায় গিয়ে পৌঁছায় তা অনুধাবনে আনতে নেতা-কর্মীদের বিশাল একটি অংশ অনেকে হঠাৎ করে নীরব অবস্থান নেওয়ায় বরিশালের ক্ষমতাসীন রাজনীতিতে স্থবিরতা বিরাজ করছে।
এমন বিবেচনা জিয়ার ভেতর না থাকায় তিনি যে কাণ্ড ঘটালেন তাতে নাম ফুটেছে ঠিকই কিন্তু তার দিকে নগরবাসীর নজর পড়েছে আগামীর আলামত অনুধাবনে। ফলে বরিশালের ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নে জিয়া এখন প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।’

০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪৬
বড় বড় ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—এসব থাকলেই একটি শহর বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কার্যকর নাগরিক সেবা, সুশাসন, নিরাপদ জীবন ও টেকসই অর্থনীতি। এসব সূচকে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে না পারায় বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকাতেই জায়গা হয়নি বাংলাদেশের কোনো শহরের।
বরং এক বছরের ব্যবধানে দেশের প্রধান শহরগুলোর বৈশ্বিক অবস্থান আরও পিছিয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রাজধানী ঢাকায়। গত বছর ৪৮২তম অবস্থানে থাকা ঢাকা এবার ৩৩ ধাপ পিছিয়ে নেমে গেছে ৫১৫তম অবস্থানে। ফলে বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে রাজধানী।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ২০২৬ সালের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে বিশ্বের ১৬৩টি দেশের এক হাজার শহরকে অর্থনীতি, মানবসম্পদ, জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ ও শাসন—এই পাঁচ সূচকে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আট শহরের মধ্যে ঢাকার পর অবস্থান চট্টগ্রামের। তবে চট্টগ্রামও পিছিয়েছে ১৪ ধাপ; রয়েছে ৭৬৩তম স্থানে। রাজশাহী ৬৬ ধাপ পিছিয়ে ৭৭৯তম এবং খুলনা রয়েছে ৮১১তম অবস্থানে। সিলেটের অবস্থান ৮৩৪তম, কুমিল্লা ৮৮৩তম, ময়মনসিংহ ৮৯৫তম এবং বগুড়া ৩২ ধাপ পিছিয়ে ৯২৬তম অবস্থানে।
অর্থাৎ দেশের কোনো শহরই বৈশ্বিক শীর্ষ ৫০০-তে জায়গা করে নিতে পারেনি।
অর্থনীতিতে এগিয়ে, পরিবেশে তলানিতে ঢাকা
সূচকটির মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে অর্থনীতির জন্য ৩০, মানবসম্পদের জন্য ২৫, জীবনযাত্রার মানের জন্য ২৫ এবং পরিবেশ ও শাসনের জন্য ১০ করে নম্বর রাখা হয়েছে। শহরের অর্থনীতির আকার ও প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ, জনমিতিক প্রবণতা, স্বাস্থ্য, আর্থিক সক্ষমতা, নাগরিক সুবিধা, পরিবেশ, জলবায়ু ঝুঁকি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক অধিকার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতি সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ঢাকা। বিশ্বে এ সূচকে রাজধানীর অবস্থান ২৮৬তম। মানবসম্পদেও ঢাকার অবস্থান ১৭৮তম।
কিন্তু পরিবেশের চিত্র একেবারেই বিপরীত। এই সূচকে ঢাকার অবস্থান ৯৩০তম। অর্থাৎ অর্থনীতি ও মানবসম্পদে তুলনামূলক শক্ত অবস্থান থাকলেও পরিবেশগত দুর্বলতা সামগ্রিক র্যাংকিংয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে।
শুধু ঢাকা নয়, পরিবেশ সূচকে দেশের প্রায় সব বড় শহরের অবস্থানই উদ্বেগজনক। সিলেট ৭৩৫তম, রাজশাহী ৮৫২তম, চট্টগ্রাম ৯২৪তম, ময়মনসিংহ ৯৪০তম এবং খুলনা ৯৭৪তম অবস্থানে রয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম মিজানুর রহমান বলেন, রাজশাহীর পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। বায়ুদূষণ বৃদ্ধি, গাছপালা কমে যাওয়া, তীব্র গরম, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট এবং নদীদূষণ শহটির পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করছে।
অবকাঠামো আছে, স্বস্তির নগরজীবন নেই
জীবনযাত্রার মানের সূচকেও বাংলাদেশের শহরগুলোর চিত্র খুব শক্তিশালী নয়। এ সূচকে দেশের মধ্যে এগিয়ে রাজশাহী—বিশ্বে ৫৪২তম। এরপর খুলনা ৬১২তম এবং চট্টগ্রাম ৬৫৩তম অবস্থানে রয়েছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন ভবন, সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণ করলেই শহরের জীবনমান বাড়ে না। প্রয়োজন বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন।
অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, পানির সংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে শহরগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চাপ বাড়ছে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. মহিনুজ্জামান বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা ও পানির সংকট দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টির সময় রাস্তা পানিতে ডুবে যায়, আবার বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় পানির সংকট থাকে। এ পরিস্থিতি শহরগুলোর পরিবেশগত ঝুঁকি স্পষ্ট করে।
ঢাকামুখী চাপ কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ওপর বাড়তি জনসংখ্যার চাপ কমাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো গেলে রাজধানীমুখী মানুষের চাপ কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে পরিকল্পিত আবাসন, সবুজ এলাকা সংরক্ষণ, কার্যকর গণপরিবহন, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার মান বাড়াতে হবে। তা না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও শহরের বাসযোগ্যতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।
বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ শহরের তালিকায় রয়েছে নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, সিয়াটল ও সান ফ্রান্সিসকো। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের শহরগুলোর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারতের দিল্লি, বেঙ্গালুরু, মুম্বাই, চেন্নাই ও হায়দরাবাদ।
এদিকে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সেও ঢাকার অবস্থান নিয়ে নেতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। দুটি আন্তর্জাতিক সূচকের ফলাফলই একই প্রশ্ন সামনে আনছে—শহর বড় হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কি নাগরিক জীবনের মানও বাড়ছে?
বড় বড় ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি—এসব থাকলেই একটি শহর বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। প্রয়োজন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, কার্যকর নাগরিক সেবা, সুশাসন, নিরাপদ জীবন ও টেকসই অর্থনীতি। এসব সূচকে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে না পারায় বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকাতেই জায়গা হয়নি বাংলাদেশের কোনো শহরের।
বরং এক বছরের ব্যবধানে দেশের প্রধান শহরগুলোর বৈশ্বিক অবস্থান আরও পিছিয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে রাজধানী ঢাকায়। গত বছর ৪৮২তম অবস্থানে থাকা ঢাকা এবার ৩৩ ধাপ পিছিয়ে নেমে গেছে ৫১৫তম অবস্থানে। ফলে বিশ্বের সেরা ৫০০ শহরের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে রাজধানী।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের ২০২৬ সালের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্সে বিশ্বের ১৬৩টি দেশের এক হাজার শহরকে অর্থনীতি, মানবসম্পদ, জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ ও শাসন—এই পাঁচ সূচকে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের আট শহরের মধ্যে ঢাকার পর অবস্থান চট্টগ্রামের। তবে চট্টগ্রামও পিছিয়েছে ১৪ ধাপ; রয়েছে ৭৬৩তম স্থানে। রাজশাহী ৬৬ ধাপ পিছিয়ে ৭৭৯তম এবং খুলনা রয়েছে ৮১১তম অবস্থানে। সিলেটের অবস্থান ৮৩৪তম, কুমিল্লা ৮৮৩তম, ময়মনসিংহ ৮৯৫তম এবং বগুড়া ৩২ ধাপ পিছিয়ে ৯২৬তম অবস্থানে।
অর্থাৎ দেশের কোনো শহরই বৈশ্বিক শীর্ষ ৫০০-তে জায়গা করে নিতে পারেনি।
অর্থনীতিতে এগিয়ে, পরিবেশে তলানিতে ঢাকা
সূচকটির মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে অর্থনীতির জন্য ৩০, মানবসম্পদের জন্য ২৫, জীবনযাত্রার মানের জন্য ২৫ এবং পরিবেশ ও শাসনের জন্য ১০ করে নম্বর রাখা হয়েছে। শহরের অর্থনীতির আকার ও প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, ব্যবসার পরিবেশ, জনমিতিক প্রবণতা, স্বাস্থ্য, আর্থিক সক্ষমতা, নাগরিক সুবিধা, পরিবেশ, জলবায়ু ঝুঁকি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক অধিকার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতি সূচকে বাংলাদেশের শহরগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ঢাকা। বিশ্বে এ সূচকে রাজধানীর অবস্থান ২৮৬তম। মানবসম্পদেও ঢাকার অবস্থান ১৭৮তম।
কিন্তু পরিবেশের চিত্র একেবারেই বিপরীত। এই সূচকে ঢাকার অবস্থান ৯৩০তম। অর্থাৎ অর্থনীতি ও মানবসম্পদে তুলনামূলক শক্ত অবস্থান থাকলেও পরিবেশগত দুর্বলতা সামগ্রিক র্যাংকিংয়ে বড় চাপ তৈরি করেছে।
শুধু ঢাকা নয়, পরিবেশ সূচকে দেশের প্রায় সব বড় শহরের অবস্থানই উদ্বেগজনক। সিলেট ৭৩৫তম, রাজশাহী ৮৫২তম, চট্টগ্রাম ৯২৪তম, ময়মনসিংহ ৯৪০তম এবং খুলনা ৯৭৪তম অবস্থানে রয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম মিজানুর রহমান বলেন, রাজশাহীর পরিবেশ দিন দিন খারাপ হচ্ছে। বায়ুদূষণ বৃদ্ধি, গাছপালা কমে যাওয়া, তীব্র গরম, বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি সংকট এবং নদীদূষণ শহটির পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করছে।
অবকাঠামো আছে, স্বস্তির নগরজীবন নেই
জীবনযাত্রার মানের সূচকেও বাংলাদেশের শহরগুলোর চিত্র খুব শক্তিশালী নয়। এ সূচকে দেশের মধ্যে এগিয়ে রাজশাহী—বিশ্বে ৫৪২তম। এরপর খুলনা ৬১২তম এবং চট্টগ্রাম ৬৫৩তম অবস্থানে রয়েছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন ভবন, সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণ করলেই শহরের জীবনমান বাড়ে না। প্রয়োজন বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন।
অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, যানজট, বায়ুদূষণ, জলাবদ্ধতা, পানির সংকট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সব মিলিয়ে শহরগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় চাপ বাড়ছে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. মহিনুজ্জামান বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা ও পানির সংকট দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টির সময় রাস্তা পানিতে ডুবে যায়, আবার বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় পানির সংকট থাকে। এ পরিস্থিতি শহরগুলোর পরিবেশগত ঝুঁকি স্পষ্ট করে।
ঢাকামুখী চাপ কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ওপর বাড়তি জনসংখ্যার চাপ কমাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো গেলে রাজধানীমুখী মানুষের চাপ কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে পরিকল্পিত আবাসন, সবুজ এলাকা সংরক্ষণ, কার্যকর গণপরিবহন, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার মান বাড়াতে হবে। তা না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও শহরের বাসযোগ্যতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাবে না।
বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ শহরের তালিকায় রয়েছে নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস, সিয়াটল ও সান ফ্রান্সিসকো। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের শহরগুলোর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভারতের দিল্লি, বেঙ্গালুরু, মুম্বাই, চেন্নাই ও হায়দরাবাদ।
এদিকে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সেও ঢাকার অবস্থান নিয়ে নেতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে। দুটি আন্তর্জাতিক সূচকের ফলাফলই একই প্রশ্ন সামনে আনছে—শহর বড় হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কি নাগরিক জীবনের মানও বাড়ছে?

০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:৩৩
বরিশালের গৌরনদীর চাঁদশী গ্রামের এক সাধারণ ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল এমন এক নারীর পথচলা, যিনি উনিশ শতকের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে চোখ রেখে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নারী অধিকার আন্দোলনে তৈরি করেছিলেন ইতিহাস। তিনি কাদম্বিনী বসু, বাংলার নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রদূত।
১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই চাঁদশী গ্রামে ব্রজকিশোর বসুর ঘরে জন্ম কাদম্বিনীর। ডাকনাম ছিল ‘বিনি’। বাবা ছিলেন বিহারের ভাগলপুর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বাবার কাছেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় পাড়ি জমান ব্রজকিশোর।
কলকাতায় হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন কাদম্বিনী। বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে ভর্তি হন বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে। পরিবারের নিরাপদ গণ্ডি পেরিয়ে বোর্ডিংয়ে একা থাকা, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া—সবকিছুই ধীরে ধীরে তাঁকে করে তোলে আত্মবিশ্বাসী।
সেখানেই শিক্ষক হিসেবে পান দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে। পরে সেই শিক্ষকই হন তাঁর জীবনসঙ্গী। বিয়ের পর কাদম্বিনী বসু হয়ে ওঠেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।
তখন নারীর উচ্চশিক্ষাই ছিল সমাজের চোখে ‘দুঃসাহস’। কিন্তু কাদম্বিনী থামেননি।
১৮৭৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নারীদের প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয়। ১৮৭৮ সালে শত শত ছাত্রের মধ্যে একমাত্র নারী হিসেবে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেন কাদম্বিনী। মাত্র এক নম্বরের জন্য প্রথম শ্রেণি না পেলেও দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে প্রবেশিকা পাসের ইতিহাস গড়েন তিনি।
তাঁর এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষার ফল ছিল না, এটি ছিল নারীর উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে দেওয়ার এক বড় ধাক্কা।
এরপর এফএ পাস করে বিএ পড়েন। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিসরে নারীর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ছিল বিরল ঘটনা। কাদম্বিনী গণিত নিয়ে স্নাতক হয়ে দেখিয়ে দেন, নারীর মেধার সামনে সমাজের তৈরি দেয়ালও টেকে না। কিন্তু এখানেই থামেননি তিনি।
স্নাতক হওয়ার পর চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৮৪ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে নারী চিকিৎসাশিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন দরজা খুলে দেন। ১৮৮৬ সালে চিকিৎসাবিদ্যার ডিগ্রি অর্জনের পর চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হন। নারী শিক্ষা, চিকিৎসা ও অধিকার আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি।
একদিকে সমাজের কটাক্ষ, অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক বাধা, কোনোটিই কাদম্বিনীর পথ আটকাতে পারেনি। তাঁর প্রতিটি অর্জন পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য তৈরি করেছে নতুন পথ।
বরিশালের গৌরনদীর চাঁদশীর সেই কন্যাই হয়ে উঠেছিলেন বাংলার নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ইতিহাস আজও বলে, একজন নারী যখন বাধার সামনে দাঁড়িয়ে পথ তৈরি করেন, সেই পথ দিয়েই একদিন এগিয়ে যায় গোটা সমাজব্যবস্থা।
বরিশালের গৌরনদীর চাঁদশী গ্রামের এক সাধারণ ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল এমন এক নারীর পথচলা, যিনি উনিশ শতকের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে চোখ রেখে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নারী অধিকার আন্দোলনে তৈরি করেছিলেন ইতিহাস। তিনি কাদম্বিনী বসু, বাংলার নারী জাগরণের অন্যতম অগ্রদূত।
১৮৬১ সালের ১৮ জুলাই চাঁদশী গ্রামে ব্রজকিশোর বসুর ঘরে জন্ম কাদম্বিনীর। ডাকনাম ছিল ‘বিনি’। বাবা ছিলেন বিহারের ভাগলপুর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বাবার কাছেই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় পাড়ি জমান ব্রজকিশোর।
কলকাতায় হিন্দু মহিলা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন কাদম্বিনী। বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে গেলে ভর্তি হন বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয়ে। পরিবারের নিরাপদ গণ্ডি পেরিয়ে বোর্ডিংয়ে একা থাকা, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া—সবকিছুই ধীরে ধীরে তাঁকে করে তোলে আত্মবিশ্বাসী।
সেখানেই শিক্ষক হিসেবে পান দ্বারকানাথ গাঙ্গুলীকে। পরে সেই শিক্ষকই হন তাঁর জীবনসঙ্গী। বিয়ের পর কাদম্বিনী বসু হয়ে ওঠেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী।
তখন নারীর উচ্চশিক্ষাই ছিল সমাজের চোখে ‘দুঃসাহস’। কিন্তু কাদম্বিনী থামেননি।
১৮৭৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নারীদের প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয়। ১৮৭৮ সালে শত শত ছাত্রের মধ্যে একমাত্র নারী হিসেবে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বসেন কাদম্বিনী। মাত্র এক নম্বরের জন্য প্রথম শ্রেণি না পেলেও দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম বাঙালি নারী হিসেবে প্রবেশিকা পাসের ইতিহাস গড়েন তিনি।
তাঁর এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষার ফল ছিল না, এটি ছিল নারীর উচ্চশিক্ষার দরজা খুলে দেওয়ার এক বড় ধাক্কা।
এরপর এফএ পাস করে বিএ পড়েন। ১৮৮৩ সালের জানুয়ারিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পরিসরে নারীর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ছিল বিরল ঘটনা। কাদম্বিনী গণিত নিয়ে স্নাতক হয়ে দেখিয়ে দেন, নারীর মেধার সামনে সমাজের তৈরি দেয়ালও টেকে না। কিন্তু এখানেই থামেননি তিনি।
স্নাতক হওয়ার পর চিকিৎসাশাস্ত্র পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৮৪ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে নারী চিকিৎসাশিক্ষার ক্ষেত্রেও নতুন দরজা খুলে দেন। ১৮৮৬ সালে চিকিৎসাবিদ্যার ডিগ্রি অর্জনের পর চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হন। নারী শিক্ষা, চিকিৎসা ও অধিকার আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি।
একদিকে সমাজের কটাক্ষ, অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক বাধা, কোনোটিই কাদম্বিনীর পথ আটকাতে পারেনি। তাঁর প্রতিটি অর্জন পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য তৈরি করেছে নতুন পথ।
বরিশালের গৌরনদীর চাঁদশীর সেই কন্যাই হয়ে উঠেছিলেন বাংলার নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
১৯২৩ সালের ৩ অক্টোবর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ইতিহাস আজও বলে, একজন নারী যখন বাধার সামনে দাঁড়িয়ে পথ তৈরি করেন, সেই পথ দিয়েই একদিন এগিয়ে যায় গোটা সমাজব্যবস্থা।

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:০৭
জীবনানন্দের জন্মভিটা থেকে কীর্তনখোলার ঢেউ, বিবির পুকুরের চা আর সুন্দরবন-৭-এর চাঁদভেজা রাত—বরিশালের সঙ্গে দুই দশকের স্মৃতির খেরোখাতা
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ
বরিশাল গেলে কীর্তনখোলার কাছে যেতেই হয়। ছোট ডিঙি নৌকায় কিছুক্ষণ কীর্তনখোলার বুকে ভেসে না থাকলে বরিশাল-ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নদীর জলের যে কী দুর্বার আবেদন, কীর্তনখোলার কাছে না গেলে তা টেরই পাওয়া যায় না।
বৃহস্পতিবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। বরিশালে ঢুকেই চলে গেলাম ত্রিশ গোডাউন ঘাটে। নদীপাড়, নদীপাড় ঘেঁষে ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা—বরিশাল যেন নতুন করে বাংলার ভেনিস হয়ে উঠছে। শহরঘেঁষে এমন দুর্দান্ত সুন্দর একটি নদী আছে বলেই হয়তো এই শহরে জীবনানন্দ দাশের জন্ম।
এর আগেই পশ্চিম বগুড়া রোডে জীবনানন্দের জন্মভিটায় ঢুঁ মেরেছিলাম। সড়কের নাম কবির নামে রাখা হলেও বগুড়া রোডের পুরোনো নামটি এখনো মুছে যায়নি। জন্মভিটায় গড়ে উঠেছে স্মৃতি পাঠাগার। তখনও সেটি খোলার সময় হয়নি। তাই ভেতরে যাওয়ার সুযোগ হলো না। তবে সার্বিক অবস্থা দেখে মর্মাহত হয়েছি।
২০১৯ সালে শেক্সপিয়ারের জন্মভিটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রবেশমূল্য বেশ চড়া, তবুও প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়। রয়েছে স্যুভেনির বিক্রির ব্যবস্থাও। শেক্সপিয়ারের জন্মভিটার সঙ্গে জীবনানন্দের জন্মভিটার তুলনা চলে না—এ কথা ঠিক। কিন্তু জীবনানন্দ ও তাঁর কবিতার আবেদনও যে হাজার বছরেও কমবে না, সে বিশ্বাস রাখি।
এমন একজন কবির জন্মভিটাকে কত আকর্ষণীয়ভাবেই না উপস্থাপন করা যেত! গুণীজনের কদর করতে না পারার দৃষ্টান্ত হিসেবে হয়তো কোনো একদিন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও আমাদের নাম উঠে যাবে!
বরিশাল শহরের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। তখন সবে পড়াশোনা শেষ করেছি, টেলিকমে কাজ করি। অফিস থেকে এক মাসের জন্য বরিশালে পাঠিয়ে দিল। উত্তরের ডাঙার ছেলে এসে পড়লাম নদী-খালবেষ্টিত এই শহরে। শহরে পরিচিত বলতে তেমন কেউ নেই। দিনে এদিক-সেদিক ঘুরি, সন্ধ্যা হলে শহরে ফিরে আসি। বেশির ভাগ সময় সদর রোডের হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালে থাকতাম।
পাশেই অশ্বিনীকুমার হল। সেখানে কালচারাল প্রোগ্রাম, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ হয়। অল্প কিছু দূরেই বিবির পুকুর। পুকুর ঘিরে বাঁধানো সুন্দর হাঁটার পথ। জলও বেশ স্বচ্ছ, ময়লা-আবর্জনা নেই। এক কোণে ছিল টং দোকান। সেখানে খুব ভালো আদা-লেবু চা বানাত। সময় পেলেই টংয়ে গিয়ে বসতাম। চা খেতে খেতে দেখতাম বরিশাইল্লা মানুষ।
একবার মন চাইল, লঞ্চে করে ঢাকা ফিরব। তখন সুন্দরবন-৭ নামে অত্যাধুনিক একটি লঞ্চ চলত। শেরেবাংলা রোডে টিকিট কাটার জন্য কাউন্টার খুঁজছিলাম।
এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সুন্দরবনের কাউন্টার কোন দিকে?’
তিনি জানেন না। তাঁর কাছ থেকে সরে সামনে এগোতেই দেখি, কাউন্টার একেবারে চোখের সামনে।
সামনেই কাউন্টার, অথচ জানেন না? বিষয়টি আমাকে বেশ অবাক করল। ফিরে এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি নির্বিকারভাবে বললেন, ‘হেইয়া জাইন্না মোর কাম কী!’
সেদিন লোকটির ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, এটি আসলে এক অসাধারণ কথা—এক ভিন্ন দার্শনিক তত্ত্ব। জীবনে বহু মানুষের কাছে এই দর্শনের পাঠ শুনেছি। সেই দোকানদারের কাছেই যেন তার হাতেখড়ি হয়েছিল।
সুন্দরবন-৭-এ কেবিন নিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগে বরিশাল নদীবন্দর ছেড়ে লঞ্চটি কীর্তনখোলায় ভাসতে শুরু করল। কেবিন ছেড়ে চলে গেলাম উপরের খোলা ডেকে।
আকাশে চাঁদ। চাঁদের আলো নদীর জলে পড়ে তৈরি করেছে অপূর্ব এক দৃশ্য। কয়েকজন ছেলে গান গাইছে, সঙ্গে গিটার। কেউ গল্প করছে। রাত যত গভীর হচ্ছে, শব্দও তত কমে আসছে। নদীর বুক চিরে সুন্দরবন-৭ এগিয়ে চলেছে।
কী শীতল বাতাস! প্রচণ্ড গরমের সময়ও ঠান্ডা লাগার মতো অবস্থা। এমন পরিবেশ ছেড়ে কেবিনে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ডেকের ওপরই বসে থাকলাম।
আহা, ভ্রমণ কত সুন্দর হতে পারে!
এরপর আর লঞ্চে যাওয়া হয়নি। কিন্তু সেই স্মৃতির জাবর কাটতে এখনো বরিশাল লঞ্চঘাটে ঢুঁ মারি।
সে সময়ের বরিশাল অনেকটাই মফস্বলের মতো ছিল। শহরটাকে বেশি আপন মনে হতো। এখন বরিশালে কসমোপলিটান ভাব এসেছে। তারপরও ভালো লাগায় ভাটা পড়েনি।
এক ফাঁকে ব্রজমোহন কলেজেও ঢুকে পড়লাম। প্রাচীন ও সুন্দর ভবনগুলো এখনো মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসে দেখা মিলল জীবনানন্দ দাশ চত্বরের।
সাগরদী, বান্দ রোড, বাইপাস হয়ে নথুল্লাবাদের দিকে যাই। এর আগে সড়ক বিভাগের অফিসও নজরে পড়ে। তখন বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে। দেখে-শুনে চলে গেলাম ভুরঘাটা। আমাদের বরিশাল আসার মূল কারণই ছিল সেখানে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত সেখানেও পৌঁছালাম।
ফেরার পথে অমল দা নিয়ে গেলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মভিটায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পাথারিয়া বাজার পেরিয়ে পূর্ব মাইজপাড়া।
সুনীলের জন্মভিটার অবস্থা জীবনানন্দের চেয়েও খারাপ। অথচ ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার উপমা, স্থান কিংবা চরিত্রগুলোর অনেকটাই যেন এই বাড়ির আশপাশের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে আছে। সঙ্গে থাকা এক ভাই কিছুটা ধারণা দিলেন, জায়গাগুলোর সঙ্গে কবিতার স্মৃতির যোগসূত্রের কথা বললেন।
ফেরার পথে পাথারিয়া বাজারের দুধ চায়ের কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। এক কাপ চা খেলাম। তারপর আরও এক কাপ হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম।
ড্রাইভার কুদ্দুস তখন ঢাকার দিকে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন।
পেছনে পড়ে রইল বরিশাল—কীর্তনখোলার জল, চাঁদের আলো, লঞ্চের ডেক, বিবির পুকুরের আদা-লেবু চা, জীবনানন্দের স্মৃতি আর সুনীলের জন্মভিটার নীরবতা।
শহর বদলায়, রাস্তা বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু কিছু শহর স্মৃতির ভেতর থেকে যায় আগের মতোই। বরিশাল আমার কাছে তেমনই এক শহর—যেখানে নদীর জল ছুঁয়ে গেলে পুরোনো দিনের দরজা খুলে যায়, আর কীর্তনখোলার বাতাসে ভেসে আসে জীবনের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গন্ধ।
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ, কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা
জীবনানন্দের জন্মভিটা থেকে কীর্তনখোলার ঢেউ, বিবির পুকুরের চা আর সুন্দরবন-৭-এর চাঁদভেজা রাত—বরিশালের সঙ্গে দুই দশকের স্মৃতির খেরোখাতা
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ
বরিশাল গেলে কীর্তনখোলার কাছে যেতেই হয়। ছোট ডিঙি নৌকায় কিছুক্ষণ কীর্তনখোলার বুকে ভেসে না থাকলে বরিশাল-ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নদীর জলের যে কী দুর্বার আবেদন, কীর্তনখোলার কাছে না গেলে তা টেরই পাওয়া যায় না।
বৃহস্পতিবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। বরিশালে ঢুকেই চলে গেলাম ত্রিশ গোডাউন ঘাটে। নদীপাড়, নদীপাড় ঘেঁষে ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা—বরিশাল যেন নতুন করে বাংলার ভেনিস হয়ে উঠছে। শহরঘেঁষে এমন দুর্দান্ত সুন্দর একটি নদী আছে বলেই হয়তো এই শহরে জীবনানন্দ দাশের জন্ম।
এর আগেই পশ্চিম বগুড়া রোডে জীবনানন্দের জন্মভিটায় ঢুঁ মেরেছিলাম। সড়কের নাম কবির নামে রাখা হলেও বগুড়া রোডের পুরোনো নামটি এখনো মুছে যায়নি। জন্মভিটায় গড়ে উঠেছে স্মৃতি পাঠাগার। তখনও সেটি খোলার সময় হয়নি। তাই ভেতরে যাওয়ার সুযোগ হলো না। তবে সার্বিক অবস্থা দেখে মর্মাহত হয়েছি।
২০১৯ সালে শেক্সপিয়ারের জন্মভিটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রবেশমূল্য বেশ চড়া, তবুও প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়। রয়েছে স্যুভেনির বিক্রির ব্যবস্থাও। শেক্সপিয়ারের জন্মভিটার সঙ্গে জীবনানন্দের জন্মভিটার তুলনা চলে না—এ কথা ঠিক। কিন্তু জীবনানন্দ ও তাঁর কবিতার আবেদনও যে হাজার বছরেও কমবে না, সে বিশ্বাস রাখি।
এমন একজন কবির জন্মভিটাকে কত আকর্ষণীয়ভাবেই না উপস্থাপন করা যেত! গুণীজনের কদর করতে না পারার দৃষ্টান্ত হিসেবে হয়তো কোনো একদিন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও আমাদের নাম উঠে যাবে!
বরিশাল শহরের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। তখন সবে পড়াশোনা শেষ করেছি, টেলিকমে কাজ করি। অফিস থেকে এক মাসের জন্য বরিশালে পাঠিয়ে দিল। উত্তরের ডাঙার ছেলে এসে পড়লাম নদী-খালবেষ্টিত এই শহরে। শহরে পরিচিত বলতে তেমন কেউ নেই। দিনে এদিক-সেদিক ঘুরি, সন্ধ্যা হলে শহরে ফিরে আসি। বেশির ভাগ সময় সদর রোডের হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালে থাকতাম।
পাশেই অশ্বিনীকুমার হল। সেখানে কালচারাল প্রোগ্রাম, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ হয়। অল্প কিছু দূরেই বিবির পুকুর। পুকুর ঘিরে বাঁধানো সুন্দর হাঁটার পথ। জলও বেশ স্বচ্ছ, ময়লা-আবর্জনা নেই। এক কোণে ছিল টং দোকান। সেখানে খুব ভালো আদা-লেবু চা বানাত। সময় পেলেই টংয়ে গিয়ে বসতাম। চা খেতে খেতে দেখতাম বরিশাইল্লা মানুষ।
একবার মন চাইল, লঞ্চে করে ঢাকা ফিরব। তখন সুন্দরবন-৭ নামে অত্যাধুনিক একটি লঞ্চ চলত। শেরেবাংলা রোডে টিকিট কাটার জন্য কাউন্টার খুঁজছিলাম।
এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সুন্দরবনের কাউন্টার কোন দিকে?’
তিনি জানেন না। তাঁর কাছ থেকে সরে সামনে এগোতেই দেখি, কাউন্টার একেবারে চোখের সামনে।
সামনেই কাউন্টার, অথচ জানেন না? বিষয়টি আমাকে বেশ অবাক করল। ফিরে এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি নির্বিকারভাবে বললেন, ‘হেইয়া জাইন্না মোর কাম কী!’
সেদিন লোকটির ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, এটি আসলে এক অসাধারণ কথা—এক ভিন্ন দার্শনিক তত্ত্ব। জীবনে বহু মানুষের কাছে এই দর্শনের পাঠ শুনেছি। সেই দোকানদারের কাছেই যেন তার হাতেখড়ি হয়েছিল।
সুন্দরবন-৭-এ কেবিন নিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগে বরিশাল নদীবন্দর ছেড়ে লঞ্চটি কীর্তনখোলায় ভাসতে শুরু করল। কেবিন ছেড়ে চলে গেলাম উপরের খোলা ডেকে।
আকাশে চাঁদ। চাঁদের আলো নদীর জলে পড়ে তৈরি করেছে অপূর্ব এক দৃশ্য। কয়েকজন ছেলে গান গাইছে, সঙ্গে গিটার। কেউ গল্প করছে। রাত যত গভীর হচ্ছে, শব্দও তত কমে আসছে। নদীর বুক চিরে সুন্দরবন-৭ এগিয়ে চলেছে।
কী শীতল বাতাস! প্রচণ্ড গরমের সময়ও ঠান্ডা লাগার মতো অবস্থা। এমন পরিবেশ ছেড়ে কেবিনে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ডেকের ওপরই বসে থাকলাম।
আহা, ভ্রমণ কত সুন্দর হতে পারে!
এরপর আর লঞ্চে যাওয়া হয়নি। কিন্তু সেই স্মৃতির জাবর কাটতে এখনো বরিশাল লঞ্চঘাটে ঢুঁ মারি।
সে সময়ের বরিশাল অনেকটাই মফস্বলের মতো ছিল। শহরটাকে বেশি আপন মনে হতো। এখন বরিশালে কসমোপলিটান ভাব এসেছে। তারপরও ভালো লাগায় ভাটা পড়েনি।
এক ফাঁকে ব্রজমোহন কলেজেও ঢুকে পড়লাম। প্রাচীন ও সুন্দর ভবনগুলো এখনো মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসে দেখা মিলল জীবনানন্দ দাশ চত্বরের।
সাগরদী, বান্দ রোড, বাইপাস হয়ে নথুল্লাবাদের দিকে যাই। এর আগে সড়ক বিভাগের অফিসও নজরে পড়ে। তখন বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে। দেখে-শুনে চলে গেলাম ভুরঘাটা। আমাদের বরিশাল আসার মূল কারণই ছিল সেখানে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত সেখানেও পৌঁছালাম।
ফেরার পথে অমল দা নিয়ে গেলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মভিটায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পাথারিয়া বাজার পেরিয়ে পূর্ব মাইজপাড়া।
সুনীলের জন্মভিটার অবস্থা জীবনানন্দের চেয়েও খারাপ। অথচ ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার উপমা, স্থান কিংবা চরিত্রগুলোর অনেকটাই যেন এই বাড়ির আশপাশের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে আছে। সঙ্গে থাকা এক ভাই কিছুটা ধারণা দিলেন, জায়গাগুলোর সঙ্গে কবিতার স্মৃতির যোগসূত্রের কথা বললেন।
ফেরার পথে পাথারিয়া বাজারের দুধ চায়ের কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। এক কাপ চা খেলাম। তারপর আরও এক কাপ হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম।
ড্রাইভার কুদ্দুস তখন ঢাকার দিকে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন।
পেছনে পড়ে রইল বরিশাল—কীর্তনখোলার জল, চাঁদের আলো, লঞ্চের ডেক, বিবির পুকুরের আদা-লেবু চা, জীবনানন্দের স্মৃতি আর সুনীলের জন্মভিটার নীরবতা।
শহর বদলায়, রাস্তা বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু কিছু শহর স্মৃতির ভেতর থেকে যায় আগের মতোই। বরিশাল আমার কাছে তেমনই এক শহর—যেখানে নদীর জল ছুঁয়ে গেলে পুরোনো দিনের দরজা খুলে যায়, আর কীর্তনখোলার বাতাসে ভেসে আসে জীবনের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গন্ধ।
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ, কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা

২৯ মে, ২০২৫ ১৬:৫৩
বরিশাল মহানগর যুবলীগ নেতা মারুফ আহমেদ জিয়া একজন সরকারি কর্মকর্তাকে পিটিয়ে বীরদর্পে সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সাহসিকতার নেপথ্য শক্তি নিয়ে কি ইঙ্গিত দিলেন তা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রগতিশীল ধ্যান-ধারনার মানুষের মধ্যে প্রশ্ন এবং উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ঘটনাটি গত ১০ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকালের। ওই দিন জিয়া তার সহযোগীদের নিয়ে বরিশাল গণপূর্ত অধিদপ্তরের হাজির হয়ে একটি ঠিকাদারী কাজের স্টিমেট জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় বাধ সাধলে দপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ওবায়দুল হককে বেদম প্রহার করেন। এই ঘটনা অনেকটা নীরবে ঘটলেও শুক্রবার রাতে লাঞ্ছিত ওবায়দুল এ সংক্রান্ত থানায় অভিযোগ জানিয়ে মামলা করার পরপরই ঘটনার আদ্যপান্ত প্রকাশ পায় এবং বিষয়টি স্যোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে ফের মিডিয়ার শিরোনাম হন মারুফ আহমেদ জিয়া। বরিশালে পারিবারিক ও রাজনৈতিক কারণে এই যুবক বেশ আলোচিত-সমালোচিত মুখ। এক সময় নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র অনুসারী হিসেবে দাপট দেখিয়ে চলা মারুফ হঠাৎ করে রাজনৈতিক শিবির পরিবর্তন করে নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষ নেন। এবং সদ্য অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে তার পক্ষাবলম্বন করে প্রচারণা এবং নিজেও কাউন্সিলর প্রার্থী হন। অবশ্য নেতা খোকন সেরনিয়াবাত নির্বাচিত হলেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী সাদেকপন্থী মজিবর রহমানের কাছে শোচনীয় পরাজিত হন। একই ব্যক্তির সাথে দুইবার প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে রাজনৈতিক সর্বশক্তি প্রয়োগের পরেও পরাজয়ের কারণে বেশ কিছুদিন ধরে মারুফ আহমেদ জিয়া আলোচনায় ছিলেন। এবং পরাজিত হলেও তার দাপট আরও একগুণ বেড়ে যায় বলে স্থানীদের অভিমত। প্রশ্ন সেখানেই হঠাৎ করে একজন প্রকৌশলীকে প্রহার করার পিছনে রাজনৈতিক শক্তি ও সমর্থন তাকে এই সাহসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছে বলে এমনটি বরিশালের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষপট সে কথাই মনে করিয়ে দেয় কি? কারণ ক্ষমতার তারতম্য বিবেচনায় ভাতিজা সাদিক আব্দুল্লাহ অপেক্ষা চাচা খোকন সেরনিয়াবাতের আধিপত্য সৃষ্টি হওয়ায় কেউ কেউ এলাকাভিত্তিক নেতৃত্ব দেওয়ার আড়ালে সন্ত্রাসী জগতের ডন হিসেবে উত্থ্যানের অভিযোগ উঠেছে, যা কিনা সিভিল প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অবগত।
রাজনৈতিক বোদ্ধা ও সমাজ বিশ্লেষকদের ধারনা, জিয়ার পরিবার বরাবরই সব সরকারের আমলে দাপটের সাথেই আছেন বলে নানান ঘটনায় প্রতীয়মাণ হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের গত ১৫ বছর একটানা শাসনামলে জিয়ার দাপট ছিলো সমান্তরাল। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রথমভাগে তার বোন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর আয়েশা তৌহিদ লুনা প্রয়াত সিটি মেয়র শওকত হোসেন হিরনের সমর্থনপুষ্ট হওয়ায় তৎসময় জিয়া যুবলীগ নেতা হিসেবে বাংলা বাজার টু আলেকান্দা এলাকায় নিজের শক্তিকে সমীহের জায়গায় নিয়ে যায়।
সূত্র জানায়, বিএনপি আমলেও জিয়া ছিলেন অদম্য। একদিকে নগর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও সিটি মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ারের সাথে কাউন্সিলর লুনার দহরম-মহরম এবং বড় ভাই জাতীয় পার্টির একাংশের আহ্বায়ক বশির আহমেদ ঝুনুর অতীত প্রভাবকে ব্যবহার করে জিয়ার শক্তির উত্থ্যান ঘটে। যদিও জিয়া আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে আগে থেকে জড়িত।
অভিযোগের সুরে জানা গেলে, সময়ের আবর্তে রাজনীতির চাকা ঘুরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে জিয়া রাজনীতিতে আড়মোড়া দিয়ে ওঠে। এ সময় কাউন্সিলর লুনাও নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে ভোল পাল্টে প্রথমে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং স্থানীয়ভাবে দলের জেলার কর্ণধর আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ’র প্রয়াতপত্নী বেগম সাহানারা আব্দুল্লাহ’র হাতে ফুল দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর ক্ষমতা খর্ব এবং প্রয়াত নেতা শওকত হোসেন হিরন মেয়র হিসেবে বরিশালে দাপটশীল বলয় তৈরী করলে কাউন্সিলর লুনা হয়ে যান এই নেতার প্রিয়ভাজন। পক্ষান্তরে জিয়া হাসনাত সমর্থিত যুবলীগ নেতা হওয়া সত্বেও বোন লুনার বদৌলতে হিরনের নেক নজরে থেকে টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চলতেন। আকস্মিক সদর আসনের সংসদ সদস্য থাকাবস্থায় শওকত হোসেনের মৃত্যু ঘটলে এই ভাই-বোন ক্ষমতার রাজনীতি থেকে কিছুটা চুপসে যান। তাছাড়া পটুয়াখালীর পৌর কাউন্সিলর লুনার স্বামী তৌহিদুল ইসলাম তৌহিদ মৃত্যুবরণ করলে আরও ঘরমুখো হয়ে পড়েন বোন লুনা। কিন্তু সময় বেশি দিন লাগেনি, অল্প কয়েক দিনের ব্যবধানেই আবারও জিয়া কাকতালীয়ভাবে দাপটের রাজনীতির স্বাদ পেয়েছেন বলে কোন কোন মহল দাবি করছে।
বেশ কয়েকটি সূত্রের দাবি, সেরনিয়াবাত সাদেক আব্দুল্লাহ বরিশাল রাজনীতিতে পদার্পন এবং ২০১৮ সালে অনুুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলীয় মেয়র নির্বাচিত হলে নয়া এই রাজনীতিবিদের সাথে বয়সের মিল থাকায় দু’জনার ভিতর ভিষণ ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে ওঠে। হয়ে যান সাদিকপন্থী শক্তিধর যুবলীগ নেতা। পেয়ে যান নগর যুবলীগের সদস্য পদ। বরাবরই ক্ষমতার বলয়ের মধ্যে থাকা জিয়া অনুধাবন করেন সাদেক আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত এবং তার চাচা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় বরিশালের দলীয় মেয়র প্রার্থী হওয়ায় হাসনাত পরিবারের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
আবার কেউ বলছে, মজিবর রহমানের ছোট ভাই আরেক যুবলীগ নেতা নামও অভিন্ন জিয়াউর রহমান জিয়া রাজনৈতিক কৌশলের দরজা দিয়ে মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র খুব কাছাকাছি চলে যাওয়ায় মারুফ অহমেদ জিয়া বিষয়টি ভালো চোখে নেয়নি, কমিয়ে দেয় মেয়রের কালীবাড়ির বাসভবনে যাতায়াত। হাল সময়ে হঠাৎ করে তিনিও ভোল পাল্টে হয়ে যান খোকন সেরনিয়াবাত ঘরানার রাজনীতিবিদ। সেই সাথে তার বোন লুনাও যুক্ত হয় একই শিবিরে।
অনুসন্ধানে আভাস মেলে যে, অবশ্য এ ক্ষেত্রে মূল টার্গেট ছিলো অথবা ভেবেছিলো খোকন সেরনিয়াবাদের ক্ষমতার প্রভাব অথবা সমর্থন নিয়ে হাসনাত-সাদিক সমর্থিত মজিবর রহমানকে পরাজিত করা এবার হয়তো সহজতর হবে। রাজনীতিতে একই ঘরনার লোক হলেও ১১ নম্বর ওয়ার্ড কেন্দ্রিক আধিপত্য নিয়ে মজিবর রহমানের সাথে মারুফ আহমেদ জিয়ার পরিবারের শীতল বিরোধ চলে আসছিলো। শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে লড়াই চলছে।
এর আগে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত সিটি নির্বাচনে মজিবর রহমানের সাথে লড়াই করে পরাজয় অর্থাৎ কাউন্সিলর হওয়ার ব্যর্থতার পিছনে সাদিকের অতটা সমর্থন পায়নি বিধায় মান-অভিমানের পাল্লাটা সেখান থেকে ভারী হতে থাকে এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন বিকল্প শক্তিধর নেতার আবির্ভাবে, যেখানে আশ্রয়-সমর্থন পাওয়া যায়।
তার ঘনিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, মারুফ আহমেদ জিয়া একাবার মনস্থিরও করেছিলেন বরিশাল সদর আসনের সাংসদ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের স্রোতধারায় নিজেকে সামিল করবেন। এ ক্ষেত্রে কৌশল হচ্ছে, মন্ত্রীর সমর্থন নিয়ে কাউন্সিলর মজিবর রহমানের সাথে ক্ষমতার টক্কর জমিয়ে তোলা। কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অপেক্ষা মেয়র সাদিক অনেক দুর্বল এবং কোন টেন্ডারবাজি বা ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি মনস্ক না হওয়ায় জাহিদ ফারুক শামীমের দরজায় যাই যাই করে আর যাওয়া হয়নি। খোকন সেরনিয়াবাত সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর জাহিদ ফারুক শামীমের সাথে একট্টা হয়ে মাঠে নামনে জিয়া কৌশলে এই প্রতিমন্ত্রীর নজরে নিজেকে নিয়ে আসে এবং খোকন সেরনিয়াবাতের সমর্থনে নতুন করে রাজনৈতিক মাঠ গরমের সুযোগ নিয়ে নিজের শক্তিমাত্রা প্রদর্শনের সুযোগ খুঁজছিলেন। কিন্তু তার বয়স অপেক্ষা যুবলীগ নেতা ওয়াসিম দেওয়ান, ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিন ও বিএম কলেজের সাবেক ভিপি মঈন তুষার নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের ঘনিষ্টতর হওয়ার কারণে প্রাধান্য দেওয়ায় জিয়া নিজেকে এই শিবিরে নিজেকে সেভাবে উপস্থাপন করতে পারছিলেন না। যতটা না পেরেছিলেন সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রে। খোকন সেরনিয়াবাত দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর বরিশাল আওয়ামী লীগ দ্বি-খন্ডিত হয়ে সাদেক আব্দুল্লাহকে চেপে ধরতে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন স্থাপনা দখল এবং প্রশাসনের মধ্যে প্রভাব সৃষ্টি হওয়ায় জিয়ার হয়তো ধারনা ছিলো গণপূর্ত অধিদপ্তরে অঘটন ঘটিয়ে ফায়দা লোটার পাশাপাশি নিজের শক্তি-সমর্থ জানান দিতে।
গত ১০ আগস্ট সকালে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঘটনায় প্রকাশ পায় তিনি এই দপ্তরে দীর্ঘদিন যাবৎ টেন্ডারবাজি করে আসছিলেন। ওই দপ্তরে ঘুরে এ ধরনের বেশ কয়েকটি অভিযোগ জানাও গেল। তবে প্রত্যক্ষদর্শী দুইজন ব্যক্তির বর্ণনায় জিয়া দাপ্তরিক কাজ বাগিয়ে নিতে আগের যতনা পেশি শক্তি প্রয়োগ করতেন তার চেয়ে বেশি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র অনুসারী হিসেবে নিজের প্রভাব উপস্থাপন করতেন। বরিশালের বর্তমান হালচাল বলে দেয় যে, খোকন সেরনিয়াবাতের বিজয় নয়, প্রার্থী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পরার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে প্রশাসন ও বে-সরকারি সকল দপ্তরে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ’র যতটুকু প্রভাব ছিলো তাও যেন শেষ হয়ে নয়া মেয়রের সমর্থনে রাবনের গীত গাইছে। সেই সুযোগই নিতে চেয়েছিলেন যুবলীগ নেতা জিয়া। নচেৎ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের একটি টেন্ডারের স্টিমেটের কাগজ দ্বিতীয় দফা আনতে গিয়ে রাজনৈতিক বল প্রয়োগ করার প্রক্রিয়ায় উপ-সহকারী প্রকৌশলী ওবায়দুল হকের সাথে বাকবিতণ্ডা থেকে একপর্যায় দুর্দান্ত সাহস দেখাতে গিয়ে দুই সহযোগী নিয়ে তাকে প্রহার করে।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই ঘটনায় প্রশাসনের এই উন্নয়নমূলক এই সেক্টরের বরিশাল টু ঢাকার কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হন। এবং তাদের ভিতর উত্তেজনার পারদ ক্রমেই বাড়ছিল। এমন খবর নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাত ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীম যে কোনো মাধ্যমে অবগত হন। ঘটনাটি যেদিন ঘটে সেদিন উভয় নেতা বরিশালেই ছিলেন এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু দুই নেতার কেউই জিয়াকে তলব করে সতর্কবার্তা বা সংযত হওয়ার আদেশ বা নির্দেশ কোনটাই দেয়নি। কারণ তারা চায়নি এই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর ন্যায় প্রসাশনের সাথে দূরত্ব তৈরী হোক। ফলশ্রুতিতে তাদের নীরবতায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও আঁচ করে নেয় জিয়া যুবলীগ নেতা হলেও বর্তমান বরিশালের নিয়ন্ত্রক মন্ত্রী বা মেয়র কেউই জিয়ার কর্মকাণ্ডের পক্ষে নেই। অথবা তার দ্বায়ভার নিতে নারাজ।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একটি সূত্র বলছে, তারাও দুই নেতার মনভাব আমলে এনে এই যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন। এবং মিডিয়ার কাছে তারা শক্ত স্টেটমেন্ট বা মন্তব্য রাখেন। যার প্রমাণ এ ঘটনায় গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা অফিসিয়ালি আলোচনা করেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে এই ঘটনায় মামলা করা উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি আইনীভাবে মোকাবিলা করবে বলে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন। শেষাংশে এসে ঘটলও সেটাই। লাঞ্ছিত ওই প্রকৌশলী পরদিন গত শুক্রবার রাতে মারুফ আহমেদ জিয়াকে প্রধান ও অপর দুই সহযোগী তিতাস ও আজদকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।
আবার অপর একটি সূত্রের দাবি, এই মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে নয়া মেয়র ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর প্রথমে পরোক্ষ ইঙ্গিত থাকলেও এখন আসামীদের যেন না ধরা হয়, সে বিষয়ে কোতয়ালি মডেল থানা পুলিশকে দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই সূত্রের অভিযোগ এই নাটের ঘুড়ি উড়িয়েছেন বোন সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর আয়েশা তৌহিদ লুনা। এই নারী নেত্রী ফের নতুন করে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন এবং দুই নেতার আশির্বাদে পুনরায় কাউন্সিলর নির্বাচিত হতে সহায়ক হন। লুনার সাথে নয়া মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতপত্নী লুনা আব্দুল্লাহর নামের মিল থাকায় ইতিমধ্যে উভয়ের ভিতর বিশেষ ঘনিষ্টতা গড়ে উঠায় সেখান থেকেই ভাই জিয়ার অনুকূলে সুপারিশ রেখে এ যাত্রা রক্ষার তাগিদ রাখেন। সূত্রের দেয়া এ তথ্য কতখানি সত্য তার বাস্তবিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও দায়িত্বশীল দুই নেতা অদ্যবধি দলীয় নেতা জিয়াকে নিয়ে কোন আনুষ্ঠনিক মন্তব্য প্রকাশ করেননি। এদিকে থানা পুলিশ ঘটনার চার দিন অতিবাহিত হলেও মারুফ আহমেদ জিয়ার টুটি ছুতে পারেনি, আটক হয়নি অপর দুইজন।
মডেল কোতয়ালি থানার ওসি আনোয়ার হোসেনের দাবি, আসামিদের আটকে জোরতর চেষ্টা চলছে। কিন্তু পুলিশের সার্বিক ভূমিকা সন্দেহজনক হওয়ায় ওই সূত্রের দাবি বা অভিযোগ একেবারে যে অমূলক নয়, তা নিয়ে নগরীতে কম-বেশি নানা মহলে আলোচনা শোনা যায়। যদি বাস্তবিক অর্থে রাজনীতির অন্দরমহলে সেটি যদি ঘটে থাকে তাহলে তা শুভ ইঙ্গিত বহন করেনা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা অতিত উদাহরণকে সামনে টেনে এনে বলেন, প্রয়াত নেতা শওকত হোসেন হিরন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র থাকাবস্থার শেষাংশে এসে তার অনুসারীদের সামাল দিতে পারেননি। যে কারণে বিএম কলেজের নতুন অধ্যক্ষ শংকর চন্দ্রকে দায়িত্ব গ্রহণে তার অনুসারীরা বাঁধা দিতে প্রকাশ্য লাঞ্ছিত করায় মেয়র হিরন তুমুল বিতর্কের মাঝে পড়েছিলেন। বিভিন্ন দপ্তরে তার অনুসারীদের দাপট বিপুল জনপ্রিয় এই নেতার প্রতি নগর উন্নয়নমূলক কাজের জন্য মানুষের বিশেষ দুর্বলতা থাকলেও চাপা ক্ষোভ ছিলো। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত সিটি মেয়র নির্বাচনে বিএনপির দুর্বল প্রার্থী প্রয়াত নেতা আহসান হাবিব কামালের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে বিষয়ীভূত পরাজয়।
আবার সাদেক আব্দুল্লাহ রাজনীতির শুরুতে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তার ইমেজ ধরে রাখতে পারেননি। কয়েকজন খলিফা দ্বারা বেষ্টিত তরুণ এই নেতার কাছে নগরবাসী যে আশার আলো দেখছিলো, তা ক্রমেই নিভে যায় তার অনুসারীদের এলাকাভিত্তিক দাপট ও একনায়কতন্ত্র সৃষ্টির কারণে। এক্ষেত্রে তার অনভিজ্ঞ রাজনীতিকে দায়ী বলে মনে করে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষদের অভিমত হচ্ছে, মেয়র হিসেবে সাদেক আব্দুল্লাহ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যেমন দূরে সরে গেছে, তেমনি প্রশাসনের ভিতরেও তার ইমেজ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ভাটা পড়ে। এ কারণেই কপাল খুলে যায় খোকন সেরনিয়াবাতের। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই সম্পর্কে ফুপাতো ভাই খোকন সেরনিয়াবাতকে বরিশালের রাজনীতির নেতৃত্বে অগ্রভাগে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সিটি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দিয়ে মেয়র নির্বাচিত করে স্থানীয় রাজনীতির পটপরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। দলীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানে খোকন সেরনিয়াবাতের বক্তব্য ও কথাবার্তায় আঁচ করা যায় তিনি অতীতের নেতৃত্বের ন্যায় নিজেকে বিলীন করে দিতে নারাজ। বরং নতুন কিছু দিতে চায় বঞ্চিত বরিশালবাসীকে। সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে যেতে পারে যদি কিনা মারুফ আহমেদ জিয়াদের ন্যায় ডনরূপি রাজনীতিবিদদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাস-দুর্নীতির বটবৃক্ষ রোপন করার সুযোগ দেন। এমন শঙ্কার পাশাপাশি চাচা-ভাতিজার লড়াই কোথায় গিয়ে পৌঁছায় তা অনুধাবনে আনতে নেতা-কর্মীদের বিশাল একটি অংশ অনেকে হঠাৎ করে নীরব অবস্থান নেওয়ায় বরিশালের ক্ষমতাসীন রাজনীতিতে স্থবিরতা বিরাজ করছে।
এমন বিবেচনা জিয়ার ভেতর না থাকায় তিনি যে কাণ্ড ঘটালেন তাতে নাম ফুটেছে ঠিকই কিন্তু তার দিকে নগরবাসীর নজর পড়েছে আগামীর আলামত অনুধাবনে। ফলে বরিশালের ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেই প্রশ্নে জিয়া এখন প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।’
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:০৭
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:৩২
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:২২
১২ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪:০৬