শুক্রবার অন্যতম পবিত্র দিবস। প্রতি মাসে চার-পাঁচবার এবং বছরে প্রায় বায়ান্নবার পবিত্র এ দিবসটির আগমন হয়। মহান রবের ঘোষিত অনুপম মর্যাদার শ্রেষ্ঠ দিন-রাতগুলোতে ইবাদত করার প্রত্যয় প্রকৃত মুমিন মুসলিমগণকে তিনশ চৌষট্টি দিনের প্রহর গুনতে হলেও সপ্তাহের পালাক্রমে চলমান শুক্রবার তথা জুমাবারের জন্য মাত্র ছয়টি দিন অপেক্ষা করতে হয়। মহান রাব্বুল আলামিন মাত্র ছয় দিনে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেন, যা পরিপূর্ণতায় বিকশিত হয় সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবারে। এই মর্মে পবিত্র কুরআনে কয়েকটি আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিনের ঘোষণা রয়েছে। প্রখ্যাত তাফসিরবিশারদ আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.)-এর সহিহ বর্ণনায় জানা যায়, ছয় দিনে জগৎ সৃষ্টি হয়েছে তা রোববার থেকে শুরু করে শুক্রবারে শেষ হয়। আবার পৃথিবী ধ্বংস তথা কেয়ামত সংঘটিত হবে ঠিক শুক্রবারে। এই দিনে হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে হজরত আদম (আ.) ও মাতা হাওয়া (আ.)-কে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল এবং এই দিনেই তাদের দুজনকে পৃথিবীর দুটি অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়েছিল। হজরত আদম (আ.)-কে শাস্তি স্বরূপ রাখা হয়েছিল শ্রীলঙ্কায় এবং মাতা হাওয়া (আ.)-কে রাখা হয়েছিল সৌদি আরবের জেদ্দা শহরে। আবার এই দিনেই তাদের দুজনকে মহান রাব্বুল আলামিন ক্ষমা করে দিয়ে একত্র করে দিয়েছিলেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এ দিন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এ দিন সেখান থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়েছে, জুমার দিনই কেয়ামত সংঘটিত হবে। (মুসলিম : ১৮৬২)
একজন মানুষের জীবদ্দশায় যতবার সূর্যোদয় হবে এবং যতগুলো সকাল ভাগ্যে জুটবে তার ভেতরে সবচেয়ে মহিমাপূর্ণ দিনটি সে পাবে শুক্রবার তথা জুমার দিন। একটি দিন বলতে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে বোঝায়। এর অর্থ, সব প্রকার ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল ইবাদতের জন্য এই দিনটি সর্বোৎকৃষ্ট এবং মঙ্গলজনক। আরবি জুমা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো একত্রিত করা। আগের যুগে এই দিনকে ‘উরুবা’ বলা হতো। জুমার দিনে চার ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি জোহরের পরিবর্তে দুই রাকাত সালাত আদায় করা ফরজ এবং খুতবা পাঠ ও শোনা ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারিত করা হয়েছে। জুমার সালাত ফরজ হয় প্রথম হিজরিতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরতকালে কুবাতে অবস্থান শেষে শুক্রবার মদিনা পৌঁছেন এবং বনি সালেম গোত্রের উপত্যকায় পৌঁছে জোহরের ওয়াক্ত হলে সেখানেই তিনি জুমার সালাত আদায় করেন। এটাই ইতিহাসের প্রথম জুমার সালাত। জুমার নামাজের বিষয়ে পবিত্র কুরআনে সুরা জুমার ১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে দ্রুত গমন করো এবং কেনাবেচা বন্ধ করো। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বোঝ। অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা জুমা, আয়াত : ৯-১০)
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ১১৪টি সুরার মধ্যে পৃথক ও স্বাতন্ত্র্য একটি সুরা নাজিল করেছেন, যা নামকরণ করা হয়েছে ‘সুরা জুমা’ নামে। যেমন মহান আল্লাহ মুমিনদের উদ্দেশ্য করে শুক্রবারে আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেনাবেচা বন্ধসহ দুনিয়াবি সব কাজ পরিত্যাগ করে নামাজের জন্য ছুটতে আদেশ করেছেন এবং এও বলেছেন, নামাজ শেষে আবার তোমরা কর্মে ছড়িয়ে পড়ে দিনটিতে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, মুসলিম সমাজে শয়তানের প্ররোচনায় কিছু মানুষ শুক্রবার দিনটিকে এমনভাবে বিমুখীকরণ করে রেখেছে, যার অন্ত নেই। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সপ্তাহের ছুটির দিন হলো শুক্রবার, আর যে কারণে এই দিনে বেচাকেনা সবচেয়ে বেশি জমজমাট থাকে। এই উপমহাদেশে পশ্চিমা বণিকরা বেচাকেনার উদ্দেশ্যে এসে শাসনের গোড়াপত্তন করেই শেষ হয়নি, বরং কয়েকশ বছর শাসনের নামে শোষণ করে অমুসলিম কালচারের বীজ বপন করে যায়। সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে কুরআনে যে ব্যাপারে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে, আজকের মুসলিম সমাজ শুক্রবারের জুমার আজান হওয়ার পরেও সেই হাট-বাজারে ব্যস্ত হয়ে থাকে।
এই দিনটি মুসলমানের জন্য বিশেষ মহিমাপূর্ণ, যা মহান আল্লাহ খুশি হয়ে মুসলমানদের দান করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ আমাদের পূর্ববর্তীদের জুমার দিন সম্পর্কে সঠিক পথের সন্ধান দেননি বিরোধে লিপ্ত হওয়ার কারণে। তাই ইহুদিদের জন্য শনিবার এবং খ্রিস্টানদের জন্য রোববার এবং মুসলিমদের জন্য জুমার দিন নির্ধারণ করলেন। তিনি জুমার দিন, শনিবার ও রোববার এভাবে বিন্যাস করলেন যে, ওইসব জাতি কেয়ামাতের দিন আমাদের পশ্চাৎবর্তী হবে। আমরা পৃথিবীবাসীর মধ্যে শেষে আগমনকারী উম্মত এবং কেয়ামতের দিন হব সর্বপ্রথম। যাদের সমগ্র সৃষ্টির সর্বপ্রথম বিচার অনুষ্ঠিত হবে’ (মুসলিম : ১৮৬৭)। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জন্য জুমার দিন বরাদ্দ করলেও তারা বেছে নিয়েছে শনিবার ও রোববার। এই জন্য মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে তাদের জন্য লানত নির্ধারণ করলেন। অতএব যারা মুসলিম হয়েও ইহুদি-খ্রিস্টানদের মতো শুক্রবারের মর্যাদা রক্ষায় গাফিলতি করবে কিংবা ইহুদি-খ্রিস্টানের মতো এই দিনটিকে পরিত্যাগ করবে তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।
জুমার দিন ভাগ্যবান মুসলমানদের জন্য ইবাদত-বন্দেগি ও দোয়া-দরুদের সুবর্ণ সুযোগ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে উত্তম পোশাক পরিধান করবে এবং সুগন্ধি ব্যবহার করবে, যদি তার কাছে থাকে। তারপর জুমার নামাজে আসে এবং অন্য মুসল্লিদের গায়ের ওপর দিয়ে টপকে সামনের দিকে না যায়। নামাজ আদায় করে। তারপর ইমাম খুতবার জন্য বের হওয়ার পর থেকে সালাম পর্যন্ত চুপ করে থাকে। তা হলে তার এই আমল পূর্ববর্তী জুমার দিন থেকে পরের জুমা পর্যন্ত সব সগিরা গুনাহর জন্য কাফফারা হবে’ (আবু দাউদ : ৩৪৩)। আবু হুরায়রা (রা.) আরও বলেন, রাসুল (সা.) আমাদের সঙ্গে একদিন শুক্রবারের ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায়রত অবস্থায় থাকে এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন। এরপর রাসুল (সা.) তাঁর হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন (বুখারি)। ফিকহ শাস্ত্রবিদগণ জুমার দিনে দোয়া কবুলের সময়টা আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিবের নামাজ পর্যন্ত বলে ব্যাখ্যা করেছেন। সুতরাং এ দিনে যত পারি ইবাদত করি, বেশি বেশি সালাত আদায় করি, জিকির করি, দোয়া-দরুদ পাঠ করি, মহান রবের খুশিতে অন্তরে পরকালের ভয় এনে ইসলাম পরিপন্থী কাজগুলো প্রত্যাখ্যান করি। মহান আল্লাহ সবাইকে তওফিক দিন।

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:০৭
জীবনানন্দের জন্মভিটা থেকে কীর্তনখোলার ঢেউ, বিবির পুকুরের চা আর সুন্দরবন-৭-এর চাঁদভেজা রাত—বরিশালের সঙ্গে দুই দশকের স্মৃতির খেরোখাতা
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ
বরিশাল গেলে কীর্তনখোলার কাছে যেতেই হয়। ছোট ডিঙি নৌকায় কিছুক্ষণ কীর্তনখোলার বুকে ভেসে না থাকলে বরিশাল-ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নদীর জলের যে কী দুর্বার আবেদন, কীর্তনখোলার কাছে না গেলে তা টেরই পাওয়া যায় না।
বৃহস্পতিবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। বরিশালে ঢুকেই চলে গেলাম ত্রিশ গোডাউন ঘাটে। নদীপাড়, নদীপাড় ঘেঁষে ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা—বরিশাল যেন নতুন করে বাংলার ভেনিস হয়ে উঠছে। শহরঘেঁষে এমন দুর্দান্ত সুন্দর একটি নদী আছে বলেই হয়তো এই শহরে জীবনানন্দ দাশের জন্ম।
এর আগেই পশ্চিম বগুড়া রোডে জীবনানন্দের জন্মভিটায় ঢুঁ মেরেছিলাম। সড়কের নাম কবির নামে রাখা হলেও বগুড়া রোডের পুরোনো নামটি এখনো মুছে যায়নি। জন্মভিটায় গড়ে উঠেছে স্মৃতি পাঠাগার। তখনও সেটি খোলার সময় হয়নি। তাই ভেতরে যাওয়ার সুযোগ হলো না। তবে সার্বিক অবস্থা দেখে মর্মাহত হয়েছি।
২০১৯ সালে শেক্সপিয়ারের জন্মভিটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রবেশমূল্য বেশ চড়া, তবুও প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়। রয়েছে স্যুভেনির বিক্রির ব্যবস্থাও। শেক্সপিয়ারের জন্মভিটার সঙ্গে জীবনানন্দের জন্মভিটার তুলনা চলে না—এ কথা ঠিক। কিন্তু জীবনানন্দ ও তাঁর কবিতার আবেদনও যে হাজার বছরেও কমবে না, সে বিশ্বাস রাখি।
এমন একজন কবির জন্মভিটাকে কত আকর্ষণীয়ভাবেই না উপস্থাপন করা যেত! গুণীজনের কদর করতে না পারার দৃষ্টান্ত হিসেবে হয়তো কোনো একদিন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও আমাদের নাম উঠে যাবে!
বরিশাল শহরের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। তখন সবে পড়াশোনা শেষ করেছি, টেলিকমে কাজ করি। অফিস থেকে এক মাসের জন্য বরিশালে পাঠিয়ে দিল। উত্তরের ডাঙার ছেলে এসে পড়লাম নদী-খালবেষ্টিত এই শহরে। শহরে পরিচিত বলতে তেমন কেউ নেই। দিনে এদিক-সেদিক ঘুরি, সন্ধ্যা হলে শহরে ফিরে আসি। বেশির ভাগ সময় সদর রোডের হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালে থাকতাম।
পাশেই অশ্বিনীকুমার হল। সেখানে কালচারাল প্রোগ্রাম, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ হয়। অল্প কিছু দূরেই বিবির পুকুর। পুকুর ঘিরে বাঁধানো সুন্দর হাঁটার পথ। জলও বেশ স্বচ্ছ, ময়লা-আবর্জনা নেই। এক কোণে ছিল টং দোকান। সেখানে খুব ভালো আদা-লেবু চা বানাত। সময় পেলেই টংয়ে গিয়ে বসতাম। চা খেতে খেতে দেখতাম বরিশাইল্লা মানুষ।
একবার মন চাইল, লঞ্চে করে ঢাকা ফিরব। তখন সুন্দরবন-৭ নামে অত্যাধুনিক একটি লঞ্চ চলত। শেরেবাংলা রোডে টিকিট কাটার জন্য কাউন্টার খুঁজছিলাম।
এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সুন্দরবনের কাউন্টার কোন দিকে?’
তিনি জানেন না। তাঁর কাছ থেকে সরে সামনে এগোতেই দেখি, কাউন্টার একেবারে চোখের সামনে।
সামনেই কাউন্টার, অথচ জানেন না? বিষয়টি আমাকে বেশ অবাক করল। ফিরে এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি নির্বিকারভাবে বললেন, ‘হেইয়া জাইন্না মোর কাম কী!’
সেদিন লোকটির ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, এটি আসলে এক অসাধারণ কথা—এক ভিন্ন দার্শনিক তত্ত্ব। জীবনে বহু মানুষের কাছে এই দর্শনের পাঠ শুনেছি। সেই দোকানদারের কাছেই যেন তার হাতেখড়ি হয়েছিল।
সুন্দরবন-৭-এ কেবিন নিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগে বরিশাল নদীবন্দর ছেড়ে লঞ্চটি কীর্তনখোলায় ভাসতে শুরু করল। কেবিন ছেড়ে চলে গেলাম উপরের খোলা ডেকে।
আকাশে চাঁদ। চাঁদের আলো নদীর জলে পড়ে তৈরি করেছে অপূর্ব এক দৃশ্য। কয়েকজন ছেলে গান গাইছে, সঙ্গে গিটার। কেউ গল্প করছে। রাত যত গভীর হচ্ছে, শব্দও তত কমে আসছে। নদীর বুক চিরে সুন্দরবন-৭ এগিয়ে চলেছে।
কী শীতল বাতাস! প্রচণ্ড গরমের সময়ও ঠান্ডা লাগার মতো অবস্থা। এমন পরিবেশ ছেড়ে কেবিনে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ডেকের ওপরই বসে থাকলাম।
আহা, ভ্রমণ কত সুন্দর হতে পারে!
এরপর আর লঞ্চে যাওয়া হয়নি। কিন্তু সেই স্মৃতির জাবর কাটতে এখনো বরিশাল লঞ্চঘাটে ঢুঁ মারি।
সে সময়ের বরিশাল অনেকটাই মফস্বলের মতো ছিল। শহরটাকে বেশি আপন মনে হতো। এখন বরিশালে কসমোপলিটান ভাব এসেছে। তারপরও ভালো লাগায় ভাটা পড়েনি।
এক ফাঁকে ব্রজমোহন কলেজেও ঢুকে পড়লাম। প্রাচীন ও সুন্দর ভবনগুলো এখনো মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসে দেখা মিলল জীবনানন্দ দাশ চত্বরের।
সাগরদী, বান্দ রোড, বাইপাস হয়ে নথুল্লাবাদের দিকে যাই। এর আগে সড়ক বিভাগের অফিসও নজরে পড়ে। তখন বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে। দেখে-শুনে চলে গেলাম ভুরঘাটা। আমাদের বরিশাল আসার মূল কারণই ছিল সেখানে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত সেখানেও পৌঁছালাম।
ফেরার পথে অমল দা নিয়ে গেলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মভিটায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পাথারিয়া বাজার পেরিয়ে পূর্ব মাইজপাড়া।
সুনীলের জন্মভিটার অবস্থা জীবনানন্দের চেয়েও খারাপ। অথচ ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার উপমা, স্থান কিংবা চরিত্রগুলোর অনেকটাই যেন এই বাড়ির আশপাশের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে আছে। সঙ্গে থাকা এক ভাই কিছুটা ধারণা দিলেন, জায়গাগুলোর সঙ্গে কবিতার স্মৃতির যোগসূত্রের কথা বললেন।
ফেরার পথে পাথারিয়া বাজারের দুধ চায়ের কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। এক কাপ চা খেলাম। তারপর আরও এক কাপ হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম।
ড্রাইভার কুদ্দুস তখন ঢাকার দিকে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন।
পেছনে পড়ে রইল বরিশাল—কীর্তনখোলার জল, চাঁদের আলো, লঞ্চের ডেক, বিবির পুকুরের আদা-লেবু চা, জীবনানন্দের স্মৃতি আর সুনীলের জন্মভিটার নীরবতা।
শহর বদলায়, রাস্তা বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু কিছু শহর স্মৃতির ভেতর থেকে যায় আগের মতোই। বরিশাল আমার কাছে তেমনই এক শহর—যেখানে নদীর জল ছুঁয়ে গেলে পুরোনো দিনের দরজা খুলে যায়, আর কীর্তনখোলার বাতাসে ভেসে আসে জীবনের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গন্ধ।
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ, কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা
জীবনানন্দের জন্মভিটা থেকে কীর্তনখোলার ঢেউ, বিবির পুকুরের চা আর সুন্দরবন-৭-এর চাঁদভেজা রাত—বরিশালের সঙ্গে দুই দশকের স্মৃতির খেরোখাতা
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ
বরিশাল গেলে কীর্তনখোলার কাছে যেতেই হয়। ছোট ডিঙি নৌকায় কিছুক্ষণ কীর্তনখোলার বুকে ভেসে না থাকলে বরিশাল-ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নদীর জলের যে কী দুর্বার আবেদন, কীর্তনখোলার কাছে না গেলে তা টেরই পাওয়া যায় না।
বৃহস্পতিবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না। বরিশালে ঢুকেই চলে গেলাম ত্রিশ গোডাউন ঘাটে। নদীপাড়, নদীপাড় ঘেঁষে ঝকঝকে পিচঢালা রাস্তা—বরিশাল যেন নতুন করে বাংলার ভেনিস হয়ে উঠছে। শহরঘেঁষে এমন দুর্দান্ত সুন্দর একটি নদী আছে বলেই হয়তো এই শহরে জীবনানন্দ দাশের জন্ম।
এর আগেই পশ্চিম বগুড়া রোডে জীবনানন্দের জন্মভিটায় ঢুঁ মেরেছিলাম। সড়কের নাম কবির নামে রাখা হলেও বগুড়া রোডের পুরোনো নামটি এখনো মুছে যায়নি। জন্মভিটায় গড়ে উঠেছে স্মৃতি পাঠাগার। তখনও সেটি খোলার সময় হয়নি। তাই ভেতরে যাওয়ার সুযোগ হলো না। তবে সার্বিক অবস্থা দেখে মর্মাহত হয়েছি।
২০১৯ সালে শেক্সপিয়ারের জন্মভিটা দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রবেশমূল্য বেশ চড়া, তবুও প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীর ভিড়। রয়েছে স্যুভেনির বিক্রির ব্যবস্থাও। শেক্সপিয়ারের জন্মভিটার সঙ্গে জীবনানন্দের জন্মভিটার তুলনা চলে না—এ কথা ঠিক। কিন্তু জীবনানন্দ ও তাঁর কবিতার আবেদনও যে হাজার বছরেও কমবে না, সে বিশ্বাস রাখি।
এমন একজন কবির জন্মভিটাকে কত আকর্ষণীয়ভাবেই না উপস্থাপন করা যেত! গুণীজনের কদর করতে না পারার দৃষ্টান্ত হিসেবে হয়তো কোনো একদিন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও আমাদের নাম উঠে যাবে!
বরিশাল শহরের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কুড়ি বছর পেরিয়ে গেছে। তখন সবে পড়াশোনা শেষ করেছি, টেলিকমে কাজ করি। অফিস থেকে এক মাসের জন্য বরিশালে পাঠিয়ে দিল। উত্তরের ডাঙার ছেলে এসে পড়লাম নদী-খালবেষ্টিত এই শহরে। শহরে পরিচিত বলতে তেমন কেউ নেই। দিনে এদিক-সেদিক ঘুরি, সন্ধ্যা হলে শহরে ফিরে আসি। বেশির ভাগ সময় সদর রোডের হোটেল আলী ইন্টারন্যাশনালে থাকতাম।
পাশেই অশ্বিনীকুমার হল। সেখানে কালচারাল প্রোগ্রাম, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ হয়। অল্প কিছু দূরেই বিবির পুকুর। পুকুর ঘিরে বাঁধানো সুন্দর হাঁটার পথ। জলও বেশ স্বচ্ছ, ময়লা-আবর্জনা নেই। এক কোণে ছিল টং দোকান। সেখানে খুব ভালো আদা-লেবু চা বানাত। সময় পেলেই টংয়ে গিয়ে বসতাম। চা খেতে খেতে দেখতাম বরিশাইল্লা মানুষ।
একবার মন চাইল, লঞ্চে করে ঢাকা ফিরব। তখন সুন্দরবন-৭ নামে অত্যাধুনিক একটি লঞ্চ চলত। শেরেবাংলা রোডে টিকিট কাটার জন্য কাউন্টার খুঁজছিলাম।
এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘সুন্দরবনের কাউন্টার কোন দিকে?’
তিনি জানেন না। তাঁর কাছ থেকে সরে সামনে এগোতেই দেখি, কাউন্টার একেবারে চোখের সামনে।
সামনেই কাউন্টার, অথচ জানেন না? বিষয়টি আমাকে বেশ অবাক করল। ফিরে এসে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি নির্বিকারভাবে বললেন, ‘হেইয়া জাইন্না মোর কাম কী!’
সেদিন লোকটির ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছিলাম। পরে বুঝেছি, এটি আসলে এক অসাধারণ কথা—এক ভিন্ন দার্শনিক তত্ত্ব। জীবনে বহু মানুষের কাছে এই দর্শনের পাঠ শুনেছি। সেই দোকানদারের কাছেই যেন তার হাতেখড়ি হয়েছিল।
সুন্দরবন-৭-এ কেবিন নিয়েছিলাম। সন্ধ্যার আগে বরিশাল নদীবন্দর ছেড়ে লঞ্চটি কীর্তনখোলায় ভাসতে শুরু করল। কেবিন ছেড়ে চলে গেলাম উপরের খোলা ডেকে।
আকাশে চাঁদ। চাঁদের আলো নদীর জলে পড়ে তৈরি করেছে অপূর্ব এক দৃশ্য। কয়েকজন ছেলে গান গাইছে, সঙ্গে গিটার। কেউ গল্প করছে। রাত যত গভীর হচ্ছে, শব্দও তত কমে আসছে। নদীর বুক চিরে সুন্দরবন-৭ এগিয়ে চলেছে।
কী শীতল বাতাস! প্রচণ্ড গরমের সময়ও ঠান্ডা লাগার মতো অবস্থা। এমন পরিবেশ ছেড়ে কেবিনে ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। ডেকের ওপরই বসে থাকলাম।
আহা, ভ্রমণ কত সুন্দর হতে পারে!
এরপর আর লঞ্চে যাওয়া হয়নি। কিন্তু সেই স্মৃতির জাবর কাটতে এখনো বরিশাল লঞ্চঘাটে ঢুঁ মারি।
সে সময়ের বরিশাল অনেকটাই মফস্বলের মতো ছিল। শহরটাকে বেশি আপন মনে হতো। এখন বরিশালে কসমোপলিটান ভাব এসেছে। তারপরও ভালো লাগায় ভাটা পড়েনি।
এক ফাঁকে ব্রজমোহন কলেজেও ঢুকে পড়লাম। প্রাচীন ও সুন্দর ভবনগুলো এখনো মুগ্ধতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কলেজ ক্যাম্পাসে দেখা মিলল জীবনানন্দ দাশ চত্বরের।
সাগরদী, বান্দ রোড, বাইপাস হয়ে নথুল্লাবাদের দিকে যাই। এর আগে সড়ক বিভাগের অফিসও নজরে পড়ে। তখন বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে। দেখে-শুনে চলে গেলাম ভুরঘাটা। আমাদের বরিশাল আসার মূল কারণই ছিল সেখানে যাওয়া। শেষ পর্যন্ত সেখানেও পৌঁছালাম।
ফেরার পথে অমল দা নিয়ে গেলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মভিটায়। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পাথারিয়া বাজার পেরিয়ে পূর্ব মাইজপাড়া।
সুনীলের জন্মভিটার অবস্থা জীবনানন্দের চেয়েও খারাপ। অথচ ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার উপমা, স্থান কিংবা চরিত্রগুলোর অনেকটাই যেন এই বাড়ির আশপাশের বাস্তবতার সঙ্গে মিশে আছে। সঙ্গে থাকা এক ভাই কিছুটা ধারণা দিলেন, জায়গাগুলোর সঙ্গে কবিতার স্মৃতির যোগসূত্রের কথা বললেন।
ফেরার পথে পাথারিয়া বাজারের দুধ চায়ের কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। এক কাপ চা খেলাম। তারপর আরও এক কাপ হাতে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম।
ড্রাইভার কুদ্দুস তখন ঢাকার দিকে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছেন।
পেছনে পড়ে রইল বরিশাল—কীর্তনখোলার জল, চাঁদের আলো, লঞ্চের ডেক, বিবির পুকুরের আদা-লেবু চা, জীবনানন্দের স্মৃতি আর সুনীলের জন্মভিটার নীরবতা।
শহর বদলায়, রাস্তা বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু কিছু শহর স্মৃতির ভেতর থেকে যায় আগের মতোই। বরিশাল আমার কাছে তেমনই এক শহর—যেখানে নদীর জল ছুঁয়ে গেলে পুরোনো দিনের দরজা খুলে যায়, আর কীর্তনখোলার বাতাসে ভেসে আসে জীবনের কোনো এক হারিয়ে যাওয়া সময়ের গন্ধ।
মো. সাজেদুর রহমান সাজিদ, কর্মকর্তা, সড়ক বিভাগ, ঢাকা

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০১:৪৯
"আমি শপথ করছি যে, সরকারি আবুল কালাম কলেজের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসবো। আমার ক্যাম্পাসকে সর্বদা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন এবং মাদকমুক্ত রাখবো। নিজে কখনো মাদক গ্রহণ করবো না এবং এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউকে মাদক গ্রহণ করতে দেবো না। মা-বাবা এবং শিক্ষকের সাথে কখনো অশোভন আচরণ করবো না। তাদের অমর্যাদা হয় এমন কাজ থেকে সর্বদা বিরত থাকবো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম পরিপন্থী বা রাষ্ট্রবিরোধী কাজে কখনো লিপ্ত হব না। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা অর্জনের চেষ্টা করবো। সবার আগে নিজের দেশকে ভালোবাসবো। একজন দেশপ্রেমিক সুনাগরিক হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে পরিবারের, সমাজের এবং দেশের জন্য সর্বদা কাজ করবো। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন। আমিন।" সমস্বরে এমনই এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী শপথ করেছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার সরকারি আবুল কালাম কলেজের শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সরকারি আবুল কালাম কলেজ মিলনায়তনে একাদশ শ্রেণির এক বর্ণাঢ্য নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওই অঙ্গীকার করেন কলেজের উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে ওই শপথবাক্য পাঠ করান বরিশাল বিমানবন্দর প্রেসক্লাব সভাপতি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বাবুগঞ্জ উপজেলা সম্পাদক আরিফ আহমেদ মুন্না।
সরকারি আবুল কালাম কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অনুপম রায়ের সভাপতিত্বে এবং বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নুরুন্নবী রাসেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ওই নবীন বরণ অনুষ্ঠানে এসময় বক্তব্য রাখেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, পৌরনীতি ও সুশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জহিরুল হক রোকন, হিসাব বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আলী হোসেন শরীফ, ছাত্রনেতা নাঈম হাসান, তাজিম আহমেদ, রাকিব সিকদার, মেহেদী হাসান, শিক্ষার্থী তাইয়্যেবা রহমান প্রমুখ।
নবীন বরণ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বের ব্যান্ড-শোসহ বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সরকারি আবুল কালাম কলেজের বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নুরুন্নবী রাসেল। এসময় তিনি নব্বই দশকের জনপ্রিয় তাঁর এভারগ্রীণ ব্যান্ডের কালজয়ী ঐতিহাসিক গান 'ভেঙে দাও ফারাক্কা' গেয়ে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন। কলেজ শিক্ষকদের মধ্য থেকে এছাড়াও সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রভাষক নুসরাত জাহান ও প্রভাষক লেলিন তালুকদার। কবিতা আবৃত্তি করেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অনুপম রায়। এসময় মনোজ্ঞ সঙ্গীতের সুরের মূর্ছনায় শিক্ষার্থীদের মাতোয়ারা করে বরিশাল শিল্পগোষ্ঠীর ব্যান্ডদল। #
"আমি শপথ করছি যে, সরকারি আবুল কালাম কলেজের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসবো। আমার ক্যাম্পাসকে সর্বদা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন এবং মাদকমুক্ত রাখবো। নিজে কখনো মাদক গ্রহণ করবো না এবং এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউকে মাদক গ্রহণ করতে দেবো না। মা-বাবা এবং শিক্ষকের সাথে কখনো অশোভন আচরণ করবো না। তাদের অমর্যাদা হয় এমন কাজ থেকে সর্বদা বিরত থাকবো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম পরিপন্থী বা রাষ্ট্রবিরোধী কাজে কখনো লিপ্ত হব না। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা অর্জনের চেষ্টা করবো। সবার আগে নিজের দেশকে ভালোবাসবো। একজন দেশপ্রেমিক সুনাগরিক হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে পরিবারের, সমাজের এবং দেশের জন্য সর্বদা কাজ করবো। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সহায় হোন। আমিন।" সমস্বরে এমনই এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী শপথ করেছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার সরকারি আবুল কালাম কলেজের শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সরকারি আবুল কালাম কলেজ মিলনায়তনে একাদশ শ্রেণির এক বর্ণাঢ্য নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ওই অঙ্গীকার করেন কলেজের উপস্থিত শিক্ষার্থীরা। অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে ওই শপথবাক্য পাঠ করান বরিশাল বিমানবন্দর প্রেসক্লাব সভাপতি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বাবুগঞ্জ উপজেলা সম্পাদক আরিফ আহমেদ মুন্না।
সরকারি আবুল কালাম কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অনুপম রায়ের সভাপতিত্বে এবং বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক নুরুন্নবী রাসেলের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত ওই নবীন বরণ অনুষ্ঠানে এসময় বক্তব্য রাখেন ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, পৌরনীতি ও সুশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জহিরুল হক রোকন, হিসাব বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক আলী হোসেন শরীফ, ছাত্রনেতা নাঈম হাসান, তাজিম আহমেদ, রাকিব সিকদার, মেহেদী হাসান, শিক্ষার্থী তাইয়্যেবা রহমান প্রমুখ।
নবীন বরণ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বের ব্যান্ড-শোসহ বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সরকারি আবুল কালাম কলেজের বাংলা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নুরুন্নবী রাসেল। এসময় তিনি নব্বই দশকের জনপ্রিয় তাঁর এভারগ্রীণ ব্যান্ডের কালজয়ী ঐতিহাসিক গান 'ভেঙে দাও ফারাক্কা' গেয়ে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন। কলেজ শিক্ষকদের মধ্য থেকে এছাড়াও সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রভাষক নুসরাত জাহান ও প্রভাষক লেলিন তালুকদার। কবিতা আবৃত্তি করেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অনুপম রায়। এসময় মনোজ্ঞ সঙ্গীতের সুরের মূর্ছনায় শিক্ষার্থীদের মাতোয়ারা করে বরিশাল শিল্পগোষ্ঠীর ব্যান্ডদল। #

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:০০
প্রকৃতি যখন নিজের হাতে কোনো ক্যানভাস সাজায়, তখন তার রূপ কেমন হতে পারে, তা বরিশালের সাতলা বিলে না গেলে অনুধাবন করা অসম্ভব। শরতের ভোরের আলো ফুটতেই এখানে চোখ জুড়িয়ে যায় এক অলৌকিক দৃশ্যে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এক জলাশয়, আর তার বুক চিরে মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে কোটি কোটি লাল শাপলা। দূর থেকে মনে হবে যেন সবুজ পাতার বিছানায় কেউ লাল গালিচা পেতে রেখেছে, কিংবা ভোরের উদীয়মান সূর্যটাই টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পানির বুকে।বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা হলেও, একসঙ্গে এত শাপলার মেলা দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। তাই বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার এই সাতলা গ্রামটি এখন সারা দেশে পরিচিত 'শাপলার রাজধানী' বা 'লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য' হিসেবে।
বছরের অন্য সময়ে সাতলা বিল দেখতে আর দশটা সাধারণ জলাভূমির মতোই মনে হয়। শুষ্ক মৌসুমে এখানে চাষ হয় ইরি ধান। কিন্তু বর্ষার পানি আসতেই বিলটি তার রূপ বদলাতে শুরু করে। মে-জুন মাস থেকে বিলে পানি জমতে শুরু করলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় লাল শাপলা। আগস্ট থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত চলে শাপলার এই রাজত্ব। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে বিলের সৌন্দর্য পৌঁছায় তার চূড়ায়। ভোরের আলোয় লাল শাপলার মেলাসাতলা বিলের আসল রূপ দেখতে হলে আপনাকে ঘুমকে ছুটি দিতে হবে। সূর্য ওঠার ঠিক আগে, যখন চারপাশ হালকা কুয়াশায় ঢাকা থাকে, তখন বিলের রূপ সবচেয়ে মোহনীয় দেখায়। ভোরের নরম আলোয় পাপড়ি মেলে ধরা শাপলাগুলোর ওপর যখন ভোরের শিশিরবিন্দু জমে থাকে, তখন মনে হয় যেন মুক্তো ছড়ানো রয়েছে। সকাল ৮টা বা ৯টা বেজে যাওয়ার পর যখন রোদের তীব্রতা বাড়ে, তখন ফুলগুলো ধীরে ধীরে বুজে যায়। তাই সাতলার সৌন্দর্য উপভোগ করার মোক্ষম সময় হলো ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টা।বিলের জীবন ও জীবিকাসাতলা বিল শুধু পর্যটকদের জন্যই আনন্দের খোরাক নয়, এটি স্থানীয় শত শত পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। বিলের বুকজুড়ে যখন নৌকায় করে পর্যটকেরা ঘুরে বেড়ায়, স্থানীয় মাঝিরা গল্প শোনায় এই বিলের। অনেকে আবার বিল থেকে শাপলা তুলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এই শাপলা দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু তরকারি। শুধু তাই নয়, বিলের মিষ্টি শালুকও স্থানীয়দের অন্যতম প্রিয় খাবার।
বরিশাল সদর কিংবা উজিরপুর উপজেলা থেকে খুব সহজেই সাতলা বিলে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে লঞ্চ বা বাসে বরিশাল এসে, সেখান থেকে মাহিন্দ্র (থ্রি-হুইলার) বা বাস যোগে শিকারপুর হয়ে শাতলা যাওয়া যায়। এছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে করেও উজিরপুর বা সাতলা যাওয়া সম্ভব। বিলে ঘোরার জন্য স্থানীয় ঘাটে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা পাওয়া যায়, যা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে ভাড়া নেওয়া যায়।
প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। ভ্রমণের সময় প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা কোনো বর্জ্য বিলে ফেলে পানি দূষিত করবেন না। মনে রাখবেন, ফুল গাছের চেয়ে পানির বুকেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর। তাই অকারণে ফুল ছিঁড়ে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য নষ্ট করা থেকে বিরত থাকাই একজন সচেতন ভ্রমণকারীর পরিচয়। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি মুছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এক চিলতে শান্তি পেতে চাইলে, শরতের কোনো এক ভোরে ঘুরে আসতেই পারেন লাল শাপলার এই স্বর্গরাজ্য থেকে।’
প্রকৃতি যখন নিজের হাতে কোনো ক্যানভাস সাজায়, তখন তার রূপ কেমন হতে পারে, তা বরিশালের সাতলা বিলে না গেলে অনুধাবন করা অসম্ভব। শরতের ভোরের আলো ফুটতেই এখানে চোখ জুড়িয়ে যায় এক অলৌকিক দৃশ্যে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এক জলাশয়, আর তার বুক চিরে মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে আছে কোটি কোটি লাল শাপলা। দূর থেকে মনে হবে যেন সবুজ পাতার বিছানায় কেউ লাল গালিচা পেতে রেখেছে, কিংবা ভোরের উদীয়মান সূর্যটাই টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পানির বুকে।বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা হলেও, একসঙ্গে এত শাপলার মেলা দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। তাই বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার এই সাতলা গ্রামটি এখন সারা দেশে পরিচিত 'শাপলার রাজধানী' বা 'লাল শাপলার স্বর্গরাজ্য' হিসেবে।
বছরের অন্য সময়ে সাতলা বিল দেখতে আর দশটা সাধারণ জলাভূমির মতোই মনে হয়। শুষ্ক মৌসুমে এখানে চাষ হয় ইরি ধান। কিন্তু বর্ষার পানি আসতেই বিলটি তার রূপ বদলাতে শুরু করে। মে-জুন মাস থেকে বিলে পানি জমতে শুরু করলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় লাল শাপলা। আগস্ট থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত চলে শাপলার এই রাজত্ব। তবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে বিলের সৌন্দর্য পৌঁছায় তার চূড়ায়। ভোরের আলোয় লাল শাপলার মেলাসাতলা বিলের আসল রূপ দেখতে হলে আপনাকে ঘুমকে ছুটি দিতে হবে। সূর্য ওঠার ঠিক আগে, যখন চারপাশ হালকা কুয়াশায় ঢাকা থাকে, তখন বিলের রূপ সবচেয়ে মোহনীয় দেখায়। ভোরের নরম আলোয় পাপড়ি মেলে ধরা শাপলাগুলোর ওপর যখন ভোরের শিশিরবিন্দু জমে থাকে, তখন মনে হয় যেন মুক্তো ছড়ানো রয়েছে। সকাল ৮টা বা ৯টা বেজে যাওয়ার পর যখন রোদের তীব্রতা বাড়ে, তখন ফুলগুলো ধীরে ধীরে বুজে যায়। তাই সাতলার সৌন্দর্য উপভোগ করার মোক্ষম সময় হলো ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টা।বিলের জীবন ও জীবিকাসাতলা বিল শুধু পর্যটকদের জন্যই আনন্দের খোরাক নয়, এটি স্থানীয় শত শত পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। বিলের বুকজুড়ে যখন নৌকায় করে পর্যটকেরা ঘুরে বেড়ায়, স্থানীয় মাঝিরা গল্প শোনায় এই বিলের। অনেকে আবার বিল থেকে শাপলা তুলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন। এই শাপলা দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু তরকারি। শুধু তাই নয়, বিলের মিষ্টি শালুকও স্থানীয়দের অন্যতম প্রিয় খাবার।
বরিশাল সদর কিংবা উজিরপুর উপজেলা থেকে খুব সহজেই সাতলা বিলে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে লঞ্চ বা বাসে বরিশাল এসে, সেখান থেকে মাহিন্দ্র (থ্রি-হুইলার) বা বাস যোগে শিকারপুর হয়ে শাতলা যাওয়া যায়। এছাড়া ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে করেও উজিরপুর বা সাতলা যাওয়া সম্ভব। বিলে ঘোরার জন্য স্থানীয় ঘাটে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা পাওয়া যায়, যা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে ভাড়া নেওয়া যায়।
প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার। ভ্রমণের সময় প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা কোনো বর্জ্য বিলে ফেলে পানি দূষিত করবেন না। মনে রাখবেন, ফুল গাছের চেয়ে পানির বুকেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর। তাই অকারণে ফুল ছিঁড়ে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য নষ্ট করা থেকে বিরত থাকাই একজন সচেতন ভ্রমণকারীর পরিচয়। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি মুছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এক চিলতে শান্তি পেতে চাইলে, শরতের কোনো এক ভোরে ঘুরে আসতেই পারেন লাল শাপলার এই স্বর্গরাজ্য থেকে।’

২১ নভেম্বর, ২০২৫ ১২:১৬
শুক্রবার অন্যতম পবিত্র দিবস। প্রতি মাসে চার-পাঁচবার এবং বছরে প্রায় বায়ান্নবার পবিত্র এ দিবসটির আগমন হয়। মহান রবের ঘোষিত অনুপম মর্যাদার শ্রেষ্ঠ দিন-রাতগুলোতে ইবাদত করার প্রত্যয় প্রকৃত মুমিন মুসলিমগণকে তিনশ চৌষট্টি দিনের প্রহর গুনতে হলেও সপ্তাহের পালাক্রমে চলমান শুক্রবার তথা জুমাবারের জন্য মাত্র ছয়টি দিন অপেক্ষা করতে হয়। মহান রাব্বুল আলামিন মাত্র ছয় দিনে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেন, যা পরিপূর্ণতায় বিকশিত হয় সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবারে। এই মর্মে পবিত্র কুরআনে কয়েকটি আয়াতে মহান রাব্বুল আলামিনের ঘোষণা রয়েছে। প্রখ্যাত তাফসিরবিশারদ আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.)-এর সহিহ বর্ণনায় জানা যায়, ছয় দিনে জগৎ সৃষ্টি হয়েছে তা রোববার থেকে শুরু করে শুক্রবারে শেষ হয়। আবার পৃথিবী ধ্বংস তথা কেয়ামত সংঘটিত হবে ঠিক শুক্রবারে। এই দিনে হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে হজরত আদম (আ.) ও মাতা হাওয়া (আ.)-কে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছিল এবং এই দিনেই তাদের দুজনকে পৃথিবীর দুটি অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়েছিল। হজরত আদম (আ.)-কে শাস্তি স্বরূপ রাখা হয়েছিল শ্রীলঙ্কায় এবং মাতা হাওয়া (আ.)-কে রাখা হয়েছিল সৌদি আরবের জেদ্দা শহরে। আবার এই দিনেই তাদের দুজনকে মহান রাব্বুল আলামিন ক্ষমা করে দিয়ে একত্র করে দিয়েছিলেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এ দিন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এ দিন তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এ দিন সেখান থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়েছে, জুমার দিনই কেয়ামত সংঘটিত হবে। (মুসলিম : ১৮৬২)
একজন মানুষের জীবদ্দশায় যতবার সূর্যোদয় হবে এবং যতগুলো সকাল ভাগ্যে জুটবে তার ভেতরে সবচেয়ে মহিমাপূর্ণ দিনটি সে পাবে শুক্রবার তথা জুমার দিন। একটি দিন বলতে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে বোঝায়। এর অর্থ, সব প্রকার ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নফল ইবাদতের জন্য এই দিনটি সর্বোৎকৃষ্ট এবং মঙ্গলজনক। আরবি জুমা শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো একত্রিত করা। আগের যুগে এই দিনকে ‘উরুবা’ বলা হতো। জুমার দিনে চার ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি জোহরের পরিবর্তে দুই রাকাত সালাত আদায় করা ফরজ এবং খুতবা পাঠ ও শোনা ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারিত করা হয়েছে। জুমার সালাত ফরজ হয় প্রথম হিজরিতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরতকালে কুবাতে অবস্থান শেষে শুক্রবার মদিনা পৌঁছেন এবং বনি সালেম গোত্রের উপত্যকায় পৌঁছে জোহরের ওয়াক্ত হলে সেখানেই তিনি জুমার সালাত আদায় করেন। এটাই ইতিহাসের প্রথম জুমার সালাত। জুমার নামাজের বিষয়ে পবিত্র কুরআনে সুরা জুমার ১০ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণে দ্রুত গমন করো এবং কেনাবেচা বন্ধ করো। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বোঝ। অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা জুমা, আয়াত : ৯-১০)
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ১১৪টি সুরার মধ্যে পৃথক ও স্বাতন্ত্র্য একটি সুরা নাজিল করেছেন, যা নামকরণ করা হয়েছে ‘সুরা জুমা’ নামে। যেমন মহান আল্লাহ মুমিনদের উদ্দেশ্য করে শুক্রবারে আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেনাবেচা বন্ধসহ দুনিয়াবি সব কাজ পরিত্যাগ করে নামাজের জন্য ছুটতে আদেশ করেছেন এবং এও বলেছেন, নামাজ শেষে আবার তোমরা কর্মে ছড়িয়ে পড়ে দিনটিতে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, মুসলিম সমাজে শয়তানের প্ররোচনায় কিছু মানুষ শুক্রবার দিনটিকে এমনভাবে বিমুখীকরণ করে রেখেছে, যার অন্ত নেই। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সপ্তাহের ছুটির দিন হলো শুক্রবার, আর যে কারণে এই দিনে বেচাকেনা সবচেয়ে বেশি জমজমাট থাকে। এই উপমহাদেশে পশ্চিমা বণিকরা বেচাকেনার উদ্দেশ্যে এসে শাসনের গোড়াপত্তন করেই শেষ হয়নি, বরং কয়েকশ বছর শাসনের নামে শোষণ করে অমুসলিম কালচারের বীজ বপন করে যায়। সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে কুরআনে যে ব্যাপারে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে, আজকের মুসলিম সমাজ শুক্রবারের জুমার আজান হওয়ার পরেও সেই হাট-বাজারে ব্যস্ত হয়ে থাকে।
এই দিনটি মুসলমানের জন্য বিশেষ মহিমাপূর্ণ, যা মহান আল্লাহ খুশি হয়ে মুসলমানদের দান করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ আমাদের পূর্ববর্তীদের জুমার দিন সম্পর্কে সঠিক পথের সন্ধান দেননি বিরোধে লিপ্ত হওয়ার কারণে। তাই ইহুদিদের জন্য শনিবার এবং খ্রিস্টানদের জন্য রোববার এবং মুসলিমদের জন্য জুমার দিন নির্ধারণ করলেন। তিনি জুমার দিন, শনিবার ও রোববার এভাবে বিন্যাস করলেন যে, ওইসব জাতি কেয়ামাতের দিন আমাদের পশ্চাৎবর্তী হবে। আমরা পৃথিবীবাসীর মধ্যে শেষে আগমনকারী উম্মত এবং কেয়ামতের দিন হব সর্বপ্রথম। যাদের সমগ্র সৃষ্টির সর্বপ্রথম বিচার অনুষ্ঠিত হবে’ (মুসলিম : ১৮৬৭)। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের জন্য জুমার দিন বরাদ্দ করলেও তারা বেছে নিয়েছে শনিবার ও রোববার। এই জন্য মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে তাদের জন্য লানত নির্ধারণ করলেন। অতএব যারা মুসলিম হয়েও ইহুদি-খ্রিস্টানদের মতো শুক্রবারের মর্যাদা রক্ষায় গাফিলতি করবে কিংবা ইহুদি-খ্রিস্টানের মতো এই দিনটিকে পরিত্যাগ করবে তারাও তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।
জুমার দিন ভাগ্যবান মুসলমানদের জন্য ইবাদত-বন্দেগি ও দোয়া-দরুদের সুবর্ণ সুযোগ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে উত্তম পোশাক পরিধান করবে এবং সুগন্ধি ব্যবহার করবে, যদি তার কাছে থাকে। তারপর জুমার নামাজে আসে এবং অন্য মুসল্লিদের গায়ের ওপর দিয়ে টপকে সামনের দিকে না যায়। নামাজ আদায় করে। তারপর ইমাম খুতবার জন্য বের হওয়ার পর থেকে সালাম পর্যন্ত চুপ করে থাকে। তা হলে তার এই আমল পূর্ববর্তী জুমার দিন থেকে পরের জুমা পর্যন্ত সব সগিরা গুনাহর জন্য কাফফারা হবে’ (আবু দাউদ : ৩৪৩)। আবু হুরায়রা (রা.) আরও বলেন, রাসুল (সা.) আমাদের সঙ্গে একদিন শুক্রবারের ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায়রত অবস্থায় থাকে এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন। এরপর রাসুল (সা.) তাঁর হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন (বুখারি)। ফিকহ শাস্ত্রবিদগণ জুমার দিনে দোয়া কবুলের সময়টা আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিবের নামাজ পর্যন্ত বলে ব্যাখ্যা করেছেন। সুতরাং এ দিনে যত পারি ইবাদত করি, বেশি বেশি সালাত আদায় করি, জিকির করি, দোয়া-দরুদ পাঠ করি, মহান রবের খুশিতে অন্তরে পরকালের ভয় এনে ইসলাম পরিপন্থী কাজগুলো প্রত্যাখ্যান করি। মহান আল্লাহ সবাইকে তওফিক দিন।
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:৩১
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:৫২
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ২১:২৫
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৯:৪৮