
২৯ মে, ২০২৫ ১৬:১০
প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ➤ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানান সমস্যায় জর্জরিত। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা। পৃথিবীব্যাপি একটি স্বতঃসিদ্ধ উক্তি আছে- ‘প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচিত হয় সেটির শিক্ষক দ্বারা, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা, মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত প্রয়াসের দ্বারা শিক্ষাকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে।’ অর্থাৎ শিক্ষকরাই হলো প্রতিষ্ঠানের মেইন ফ্যাক্টর বা প্রধান স্তম্ভ তথা মূল চালিকাশক্তি। আমরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি বা করেছি তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা।
শুধু শিক্ষাই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমর্যাদা নিরূপণ হয় শিক্ষা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে- যা মূলত নির্ভর করে শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রয়াসের উপরেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই শিক্ষকরাই নানাভাবে নিগৃহীত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের শোষণ ও অধিকার হরণের মূলে রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে তারা নিজের গদি সুরক্ষা ও কিছু ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের পক্ষে একটি তোষামোদি গ্রুপ সৃষ্টি করেন। নিজের অনুগত বাহিনী তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিদ্যমান ঐক্যের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেন। নানান লোভ-লালসা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আস্থাভাজন শিক্ষকদের নিয়ে দলবাজি শুরু করেন।
ফলে অল্প কিছুদিনেই শিক্ষকদের মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বিভাজন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি ব্রিটিশদের সেই ‘Divide and Rule’ পলিসি অবলম্বন করে নিজের মনের মতো প্রশাসন পরিচালনার অপচেষ্টা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়ে থাকেন নিজের অনুগত সেই তোষামোদি গ্রুপের সহযোগিতায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল, ক্ষমতার দাপট ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হয়। এমন হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ অবনমিত করা হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম পালনে একদল সবসময় সচেষ্ট থাকেন। তাদের কাছে শিক্ষা এবং গবেষণার মূল্য অতি নগণ্য। এদিকে অপর গ্রুপকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। ফলে তারাও শিক্ষা আর গবেষণায় মনোনিবেশ করার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হন।
দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই অবক্ষয়ের চিত্র এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্ণধারদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আজ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নিয়োগের প্রক্রিয়াটাও স্বচ্ছ নয়। কর্ণধার নিয়োগে প্রায়ই মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও ম্যানেজারিয়াল স্কিলনেস, এসব কিছুই বিবেচনা করা হয় না বললেই চলে। নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে তোষামোদি রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংযোগ স্থাপনের দক্ষতা তথা লবিংয়ের উপরই বেশি নির্ভর করে। ফলে অনেক সময়ই প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ফলে এর সরাসরি কুপ্রভাব পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায়।
অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, যার কথা কেউ কখনো চিন্তা করেনি কিংবা যার ওই চেয়ারে বসার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা নেই এমন কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়। লবিং আর তদবিরের জোরে বাগিয়ে নেওয়া হয় চেয়ার। ফলে তাঁর যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সব নিয়মকানুন আর নীতি-নৈতিকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কর্ণধার নিয়োগে সঠিক কোনো নীতিমালা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি, তোষামোদি কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট ঘটনা।
এভাবে অনৈতিক পন্থায় যারা নিয়োগ লাভ করেন সঙ্গত কারণেই তাদের কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহিতা থাকে না। ফলে দায়িত্ব পেয়েই তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেন। অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এসব কারণেই এখন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মিডিয়ার শিরোনাম হয়। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যায়ের কর্নধারদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং চারিত্রিক ও নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের খবর হরহামেশাই শোনা যায়। এজন্য অনেককে চাকরিচ্যুত হয়ে এমনকি শ্রীঘরে পর্যন্ত যেতে হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নানাবিধ বিভাজন সৃষ্টি করেন। এতে তিনি নিজে লাভবান হলেও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। অনেকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে থেকে অনেকে মিথ্যার আশ্রয়, প্রতারণা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, মোনাফেকি আর বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যোগ্যতা হারান তিনি। এসব অযোগ্য ব্যক্তিরা নানান কূটকৌশলে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে নিপতিত করেন।
আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন- ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ দেওয়া হয় না, নিয়োগ নেয়া হয়।ছলেবলে, কৌশলে কিংবা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। ফলে এই নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি, দেশ ও জাতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। তাদের মাঝে থাকে না সততা, দেশপ্রেম, শুদ্ধাচার কিংবা নীতি-নৈতিকতার বালাই। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি- যিনি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন মূলত তাঁর ইচ্ছার উপরেই সবকিছু নির্ভর করে। সর্বত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম এবং কীর্তন হয়। এর ফলে মারাত্মক প্রভাব পড়ে শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে। এসব কারণেই আজ শিক্ষার বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় দেখা দিয়েছে চরম অবক্ষয়। আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে সর্বত্র দৃশ্যমান।
বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান পরিমাপক পদ্ধতি টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) কর্তৃক Ranking-2024’এ বিশ্বের ১০৮ টি দেশের ১,৯০৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের ২১ টি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরের অবস্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ-সাউথ, বাকৃবি, বুয়েট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
তবে এবারই প্রথম দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সামনে চলে এসেছে।
The Times Higher Education World University Ranking-2024 adopts methodology which includes 18 carefully calibrated performance indicators that measure an institution’s performance across five areas: teaching, research environment, research quality, industry, and International outlook.
যে পাঁচটি ইন্ডিকেটরস তথা সূচক দিয়ে শিক্ষার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করা হয় সেগুলোর সব কয়টির সাথেই শিক্ষকগণ ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। সেই শিক্ষকদের নিয়ে যদি নানান বিরোধ ও গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয় তাহলে সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে সন্দেহাতীতভাবে। তাছাড়া কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ভিশন নিয়ে কাজ না করে নিজের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে মহান শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন সেক্ষেত্রে যা হবার তা-ই হবে এবং বর্তমানে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সামগ্রিক বিষয়ে দক্ষতা, মেধা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপরেই মূলত অনেক কিছু নির্ভর করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন যাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ দিলে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন।
সকল বিষয়ে মেধা সৃষ্টি করার পরিবেশ সংরক্ষণ করার প্রাথমিক দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যে কথা দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করেছিলাম তা ছিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কম্পোনেন্ট হলেন শিক্ষক। আর সেই শিক্ষকদের সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের। তাই সততা, নিষ্ঠা ও নীতি-নৈতিকতার সাথেসাথে সব ধরনের লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। এটা না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত হবে।
দেশে শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি মেধা সৃষ্টি করা না যায়, সততা ও দেশপ্রেম তৈরি করা না যায় তাহলে আমরা যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের কথা বলছি তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। শুধু মেধা থাকাই যথেষ্ট নয়। যে মেধার মধ্যে সততা এবং শুদ্ধাচার না থাকে সেই মেধা মূল্যহীন। পক্ষান্তরে এমন মেধা দেশ ও জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। এছাড়া সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) যুগ; যা সম্পূর্ণভাবে নতুন ধারণার উপর ভর করে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে। আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগীকরণ, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতার বিপর্যয় রোধ করতে না পারলে অমানিশার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। #

লেখকঃ প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
প্রাক্তন উপাচার্য,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতা।
প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ➤ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানান সমস্যায় জর্জরিত। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা। পৃথিবীব্যাপি একটি স্বতঃসিদ্ধ উক্তি আছে- ‘প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচিত হয় সেটির শিক্ষক দ্বারা, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা, মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত প্রয়াসের দ্বারা শিক্ষাকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে।’ অর্থাৎ শিক্ষকরাই হলো প্রতিষ্ঠানের মেইন ফ্যাক্টর বা প্রধান স্তম্ভ তথা মূল চালিকাশক্তি। আমরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি বা করেছি তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা।
শুধু শিক্ষাই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমর্যাদা নিরূপণ হয় শিক্ষা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে- যা মূলত নির্ভর করে শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রয়াসের উপরেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই শিক্ষকরাই নানাভাবে নিগৃহীত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের শোষণ ও অধিকার হরণের মূলে রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে তারা নিজের গদি সুরক্ষা ও কিছু ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের পক্ষে একটি তোষামোদি গ্রুপ সৃষ্টি করেন। নিজের অনুগত বাহিনী তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিদ্যমান ঐক্যের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেন। নানান লোভ-লালসা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আস্থাভাজন শিক্ষকদের নিয়ে দলবাজি শুরু করেন।
ফলে অল্প কিছুদিনেই শিক্ষকদের মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বিভাজন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি ব্রিটিশদের সেই ‘Divide and Rule’ পলিসি অবলম্বন করে নিজের মনের মতো প্রশাসন পরিচালনার অপচেষ্টা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়ে থাকেন নিজের অনুগত সেই তোষামোদি গ্রুপের সহযোগিতায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল, ক্ষমতার দাপট ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হয়। এমন হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ অবনমিত করা হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম পালনে একদল সবসময় সচেষ্ট থাকেন। তাদের কাছে শিক্ষা এবং গবেষণার মূল্য অতি নগণ্য। এদিকে অপর গ্রুপকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। ফলে তারাও শিক্ষা আর গবেষণায় মনোনিবেশ করার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হন।
দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই অবক্ষয়ের চিত্র এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্ণধারদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আজ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নিয়োগের প্রক্রিয়াটাও স্বচ্ছ নয়। কর্ণধার নিয়োগে প্রায়ই মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও ম্যানেজারিয়াল স্কিলনেস, এসব কিছুই বিবেচনা করা হয় না বললেই চলে। নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে তোষামোদি রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংযোগ স্থাপনের দক্ষতা তথা লবিংয়ের উপরই বেশি নির্ভর করে। ফলে অনেক সময়ই প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ফলে এর সরাসরি কুপ্রভাব পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায়।
অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, যার কথা কেউ কখনো চিন্তা করেনি কিংবা যার ওই চেয়ারে বসার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা নেই এমন কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়। লবিং আর তদবিরের জোরে বাগিয়ে নেওয়া হয় চেয়ার। ফলে তাঁর যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সব নিয়মকানুন আর নীতি-নৈতিকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কর্ণধার নিয়োগে সঠিক কোনো নীতিমালা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি, তোষামোদি কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট ঘটনা।
এভাবে অনৈতিক পন্থায় যারা নিয়োগ লাভ করেন সঙ্গত কারণেই তাদের কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহিতা থাকে না। ফলে দায়িত্ব পেয়েই তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেন। অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এসব কারণেই এখন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মিডিয়ার শিরোনাম হয়। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যায়ের কর্নধারদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং চারিত্রিক ও নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের খবর হরহামেশাই শোনা যায়। এজন্য অনেককে চাকরিচ্যুত হয়ে এমনকি শ্রীঘরে পর্যন্ত যেতে হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নানাবিধ বিভাজন সৃষ্টি করেন। এতে তিনি নিজে লাভবান হলেও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। অনেকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে থেকে অনেকে মিথ্যার আশ্রয়, প্রতারণা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, মোনাফেকি আর বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যোগ্যতা হারান তিনি। এসব অযোগ্য ব্যক্তিরা নানান কূটকৌশলে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে নিপতিত করেন।
আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন- ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ দেওয়া হয় না, নিয়োগ নেয়া হয়।ছলেবলে, কৌশলে কিংবা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। ফলে এই নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি, দেশ ও জাতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। তাদের মাঝে থাকে না সততা, দেশপ্রেম, শুদ্ধাচার কিংবা নীতি-নৈতিকতার বালাই। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি- যিনি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন মূলত তাঁর ইচ্ছার উপরেই সবকিছু নির্ভর করে। সর্বত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম এবং কীর্তন হয়। এর ফলে মারাত্মক প্রভাব পড়ে শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে। এসব কারণেই আজ শিক্ষার বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় দেখা দিয়েছে চরম অবক্ষয়। আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে সর্বত্র দৃশ্যমান।
বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান পরিমাপক পদ্ধতি টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) কর্তৃক Ranking-2024’এ বিশ্বের ১০৮ টি দেশের ১,৯০৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের ২১ টি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরের অবস্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ-সাউথ, বাকৃবি, বুয়েট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
তবে এবারই প্রথম দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সামনে চলে এসেছে।
The Times Higher Education World University Ranking-2024 adopts methodology which includes 18 carefully calibrated performance indicators that measure an institution’s performance across five areas: teaching, research environment, research quality, industry, and International outlook.
যে পাঁচটি ইন্ডিকেটরস তথা সূচক দিয়ে শিক্ষার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করা হয় সেগুলোর সব কয়টির সাথেই শিক্ষকগণ ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। সেই শিক্ষকদের নিয়ে যদি নানান বিরোধ ও গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয় তাহলে সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে সন্দেহাতীতভাবে। তাছাড়া কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ভিশন নিয়ে কাজ না করে নিজের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে মহান শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন সেক্ষেত্রে যা হবার তা-ই হবে এবং বর্তমানে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সামগ্রিক বিষয়ে দক্ষতা, মেধা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপরেই মূলত অনেক কিছু নির্ভর করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন যাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ দিলে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন।
সকল বিষয়ে মেধা সৃষ্টি করার পরিবেশ সংরক্ষণ করার প্রাথমিক দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যে কথা দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করেছিলাম তা ছিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কম্পোনেন্ট হলেন শিক্ষক। আর সেই শিক্ষকদের সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের। তাই সততা, নিষ্ঠা ও নীতি-নৈতিকতার সাথেসাথে সব ধরনের লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। এটা না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত হবে।
দেশে শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি মেধা সৃষ্টি করা না যায়, সততা ও দেশপ্রেম তৈরি করা না যায় তাহলে আমরা যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের কথা বলছি তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। শুধু মেধা থাকাই যথেষ্ট নয়। যে মেধার মধ্যে সততা এবং শুদ্ধাচার না থাকে সেই মেধা মূল্যহীন। পক্ষান্তরে এমন মেধা দেশ ও জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। এছাড়া সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) যুগ; যা সম্পূর্ণভাবে নতুন ধারণার উপর ভর করে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে। আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগীকরণ, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতার বিপর্যয় রোধ করতে না পারলে অমানিশার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। #

লেখকঃ প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
প্রাক্তন উপাচার্য,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতা।
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৩:৪৬
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ২০:১৯
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ২০:১৪
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৯:৩৬

২৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৭:২০
কপোতাক্ষের স্নিগ্ধ জলরাশি সেদিন হয়তো জানত না যে, তার কোল ঘেঁষেই জন্ম নিচ্ছে এক মহাকাব্যিক বিদ্রোহ। সাগরদাঁড়ির সেই শান্ত প্রহরটি ছিল মূলত দুই শতাব্দীর এক নিবিড় সন্ধিস্থল—যেখানে জীর্ণ মধ্যযুগ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে আর আধুনিকতার অস্থির সূর্যোদয় ঘটছে দিগন্তে। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন তা কেবল এক কবির জন্ম ছিল না; বরং তা ছিল শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে এক মহাকাব্যিক পথিকের অবিনাশী আখ্যানের সূচনা। তাঁর এই আবির্ভাব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষের নাম, যার স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। হিন্দু কলেজের করিডোরে ডিরোজিয়ান মুক্তবুদ্ধির যে হাওয়া তাঁর কিশোর মনে লেগেছিল, তা তাঁকে শিখিয়েছিল দেবতাকে নয়, মানুষকে পূজা করতে; আর অনুকরণকে নয়, বরং মৌলিক সৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে। ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ভারতের এক প্রদীপ্ত তরুণের সামাজিক শৃঙ্খল ও সামন্ততান্ত্রিক জড়ত্ব ভাঙার এক চরমপন্থী প্রকাশ। মাইকেল যখন নাম পরিবর্তন করে নিজের সত্তাকে এক ‘বৈশ্বিক নাগরিক’ পরিচয়ের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে, বিশ্বনাগরিক হওয়ার প্রথম শর্তই হলো নিজের শিকড়ের গভীরতাকে উপলব্ধি করা।
মধুসূদনের এই বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল তাঁর অসামান্য ভাষাগত পাণ্ডিত্য। হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় প্রায় এক ডজন ভাষায় ব্যুৎপত্তি তাঁকে বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের মূল নির্যাস আস্বাদনের সুযোগ দিয়েছিল। এই ভাষাগত বহুত্ববাদই (Multilingualism) তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল বাংলা ভাষার আটপৌরে কাঠামোর ওপর হোমার-ভার্জিল-দান্তের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আরোপ করতে। তিনি কেবল অমিত্রাক্ষর ছন্দেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং পেত্রার্কীয় ঢঙে বাংলায় প্রথম 'সনেট' বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তন করে নিজের ভুল ও আত্মোপলব্ধির এক অনন্য দর্পণ তৈরি করেছিলেন। মাদ্রাজের দারিদ্র্যপীষ্ট জীবন থেকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ের নির্বাসিত দিনগুলো তাঁকে সেই ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল যে—বিশ্বকে জানতে হলে ভাষার বৈচিত্র্য প্রয়োজন, কিন্তু নিজেকে চিনতে হলে প্রয়োজন নিজের মাতৃভাষা।
কবির ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর মহাকাব্যিক সৃজনের এক অবিচ্ছেদ্য সমান্তরাল আখ্যান। রেবেকা ম্যাকট্যাভিস ও এমিলিয়া হেনরিয়েটার ত্যাগ ও সান্নিধ্য তাঁর সৃষ্টির অন্তরালে এক ধ্রুপদী করুণ রস সঞ্চার করেছে। তবে মধুসূদনের জীবনে এই নারীদের ভূমিকা কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং তাঁর 'বীরাঙ্গনা' কাব্যের আধুনিক ও প্রতিবাদী নারী চরিত্রগুলোর অবচেতন প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৮৭৩ সালে হেনরিয়েটার মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পর কবির প্রয়াণ ঘটে—ইতিহাসের এই নির্মম পরিসমাপ্তি যেন তাঁর নিজের রচিত কোনো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিরই এক জীবন্ত রূপায়ন।
বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত তাঁর প্রথাগত চিন্তাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বা 'বিনির্মাণবাদী' (Deconstructive) দৃষ্টিভঙ্গিতে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কেবল একটি মহাকাব্য নয়, এটি ছিল আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বে প্রাচ্যের তথাকথিত 'অসুর' বা রাবণকে এক আধুনিক বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম বৌদ্ধিক লড়াই। মূলত মধুসূদনের বিদ্রোহ কেবল ছন্দের ছিল না; এটি ছিল দেবকেন্দ্রিক সাহিত্য থেকে মানুষের জয়গানে উত্তরণের প্রথম মহাকাব্যিক বিপ্লব। মিল্টন তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ স্যাটানকে বিদ্রোহী করলেও শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বই বিজয়ী করেছেন; এমনকি হোমার বা দান্তের মহাকাব্যেও দৈব বিধানই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু মধুসূদন সচেতনভাবে প্রথাগত দেবতাকে হীনবল করে রাবণের দেশপ্রেম ও মানবিক সত্তাকে মহিমান্বিত করেছেন—যা পাশ্চাত্যের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বা 'ওরিয়েন্টালিজম'-এর বিপরীতে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। তিনি প্রহসন থেকে নাটক এবং মহাকাব্য থেকে সনেট—সবখানেই মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভেঙে প্রবর্তন করেছিলেন এক 'সেক্যুলার হিউম্যানিজম' বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ, যেখানে ঈশ্বর নয়, মানুষই হয়ে উঠেছে সকল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মধুসূদনের প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান তাঁর 'ডায়াসপোরা চেতনা' বা ঘর ও বাহিরের অন্তহীন দ্বন্দ্বে—যা আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অভিবাসী মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে ধারণ করে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পরম মমতায় আত্মস্থ করে মনস্তাত্ত্বিক 'ডিকলোনাইজেশন' বা পরাধীন মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের 'কপোতাক্ষ' বা শিকড়ের কাছে ফিরে আসতে হয়। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন নিঃস্ব অবস্থায় আলিপুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই মহাকবি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, সৃজনশীল বিদ্রোহ ছাড়া কোনো জাতির আধুনিকতা পূর্ণতা পায় না।
পাশ্চাত্যের দর্পণ ছুঁয়ে প্রাচ্যের শিকড়ে ফেরার এক মহাকাব্যিক পথিকের নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর কলম কেবল অমিত্রাক্ষরের ছন্দ বুণেনি, বরং ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে বদলে দিয়েছিল একটি পরাধীন জাতির সাহিত্যিক রুচি ও আত্মপরিচয় খোঁজার গভীর দর্শন। বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি কেবল এক ধূমকেতু নন, বরং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই ধ্রুবতারা, যা আজও আমাদের শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে পথ দেখায়। তিনি চেয়েছিলেন 'পাশ্চাত্যের মিল্টন' হতে, অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস—আজ তিনি আমাদের কাছে অমর হয়ে আছেন ‘বাংলার মধুসূদন’ হিসেবেই।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com।
কপোতাক্ষের স্নিগ্ধ জলরাশি সেদিন হয়তো জানত না যে, তার কোল ঘেঁষেই জন্ম নিচ্ছে এক মহাকাব্যিক বিদ্রোহ। সাগরদাঁড়ির সেই শান্ত প্রহরটি ছিল মূলত দুই শতাব্দীর এক নিবিড় সন্ধিস্থল—যেখানে জীর্ণ মধ্যযুগ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করছে আর আধুনিকতার অস্থির সূর্যোদয় ঘটছে দিগন্তে। ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যখন মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তখন তা কেবল এক কবির জন্ম ছিল না; বরং তা ছিল শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে এক মহাকাব্যিক পথিকের অবিনাশী আখ্যানের সূচনা। তাঁর এই আবির্ভাব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেই ঐতিহাসিক সংঘর্ষের নাম, যার স্ফুলিঙ্গ পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের চিরচেনা মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। হিন্দু কলেজের করিডোরে ডিরোজিয়ান মুক্তবুদ্ধির যে হাওয়া তাঁর কিশোর মনে লেগেছিল, তা তাঁকে শিখিয়েছিল দেবতাকে নয়, মানুষকে পূজা করতে; আর অনুকরণকে নয়, বরং মৌলিক সৃষ্টিকে আলিঙ্গন করতে। ১৮৪৩ সালে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করা ছিল মূলত ঔপনিবেশিক ভারতের এক প্রদীপ্ত তরুণের সামাজিক শৃঙ্খল ও সামন্ততান্ত্রিক জড়ত্ব ভাঙার এক চরমপন্থী প্রকাশ। মাইকেল যখন নাম পরিবর্তন করে নিজের সত্তাকে এক ‘বৈশ্বিক নাগরিক’ পরিচয়ের সাথে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে, বিশ্বনাগরিক হওয়ার প্রথম শর্তই হলো নিজের শিকড়ের গভীরতাকে উপলব্ধি করা।
মধুসূদনের এই বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার নেপথ্যে ছিল তাঁর অসামান্য ভাষাগত পাণ্ডিত্য। হিব্রু, গ্রিক, ল্যাটিন থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় প্রায় এক ডজন ভাষায় ব্যুৎপত্তি তাঁকে বিশ্বের ধ্রুপদী সাহিত্যের মূল নির্যাস আস্বাদনের সুযোগ দিয়েছিল। এই ভাষাগত বহুত্ববাদই (Multilingualism) তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল বাংলা ভাষার আটপৌরে কাঠামোর ওপর হোমার-ভার্জিল-দান্তের ধ্রুপদী গাম্ভীর্য আরোপ করতে। তিনি কেবল অমিত্রাক্ষর ছন্দেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং পেত্রার্কীয় ঢঙে বাংলায় প্রথম 'সনেট' বা চতুর্দশপদী কবিতার প্রবর্তন করে নিজের ভুল ও আত্মোপলব্ধির এক অনন্য দর্পণ তৈরি করেছিলেন। মাদ্রাজের দারিদ্র্যপীষ্ট জীবন থেকে ফ্রান্সের ভার্সাইয়ের নির্বাসিত দিনগুলো তাঁকে সেই ধ্রুব সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল যে—বিশ্বকে জানতে হলে ভাষার বৈচিত্র্য প্রয়োজন, কিন্তু নিজেকে চিনতে হলে প্রয়োজন নিজের মাতৃভাষা।
কবির ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজেডি ছিল তাঁর মহাকাব্যিক সৃজনের এক অবিচ্ছেদ্য সমান্তরাল আখ্যান। রেবেকা ম্যাকট্যাভিস ও এমিলিয়া হেনরিয়েটার ত্যাগ ও সান্নিধ্য তাঁর সৃষ্টির অন্তরালে এক ধ্রুপদী করুণ রস সঞ্চার করেছে। তবে মধুসূদনের জীবনে এই নারীদের ভূমিকা কেবল ব্যক্তিগত আবেগ নয়, বরং তাঁর 'বীরাঙ্গনা' কাব্যের আধুনিক ও প্রতিবাদী নারী চরিত্রগুলোর অবচেতন প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ১৮৭৩ সালে হেনরিয়েটার মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পর কবির প্রয়াণ ঘটে—ইতিহাসের এই নির্মম পরিসমাপ্তি যেন তাঁর নিজের রচিত কোনো মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিরই এক জীবন্ত রূপায়ন।
বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে মধুসূদনের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত তাঁর প্রথাগত চিন্তাকে ভেঙে নতুন করে গড়ার বা 'বিনির্মাণবাদী' (Deconstructive) দৃষ্টিভঙ্গিতে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ কেবল একটি মহাকাব্য নয়, এটি ছিল আর্য-অনার্য দ্বন্দ্বে প্রাচ্যের তথাকথিত 'অসুর' বা রাবণকে এক আধুনিক বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রথম বৌদ্ধিক লড়াই। মূলত মধুসূদনের বিদ্রোহ কেবল ছন্দের ছিল না; এটি ছিল দেবকেন্দ্রিক সাহিত্য থেকে মানুষের জয়গানে উত্তরণের প্রথম মহাকাব্যিক বিপ্লব। মিল্টন তাঁর ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ স্যাটানকে বিদ্রোহী করলেও শেষ পর্যন্ত ঐশ্বরিক শক্তির শ্রেষ্ঠত্বই বিজয়ী করেছেন; এমনকি হোমার বা দান্তের মহাকাব্যেও দৈব বিধানই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু মধুসূদন সচেতনভাবে প্রথাগত দেবতাকে হীনবল করে রাবণের দেশপ্রেম ও মানবিক সত্তাকে মহিমান্বিত করেছেন—যা পাশ্চাত্যের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি বা 'ওরিয়েন্টালিজম'-এর বিপরীতে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। তিনি প্রহসন থেকে নাটক এবং মহাকাব্য থেকে সনেট—সবখানেই মধ্যযুগীয় স্থবিরতা ভেঙে প্রবর্তন করেছিলেন এক 'সেক্যুলার হিউম্যানিজম' বা ইহজাগতিক মানবতাবাদ, যেখানে ঈশ্বর নয়, মানুষই হয়ে উঠেছে সকল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে মধুসূদনের প্রাসঙ্গিকতা আজও অম্লান তাঁর 'ডায়াসপোরা চেতনা' বা ঘর ও বাহিরের অন্তহীন দ্বন্দ্বে—যা আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি অভিবাসী মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকটকে ধারণ করে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পরম মমতায় আত্মস্থ করে মনস্তাত্ত্বিক 'ডিকলোনাইজেশন' বা পরাধীন মানসিকতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের 'কপোতাক্ষ' বা শিকড়ের কাছে ফিরে আসতে হয়। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন নিঃস্ব অবস্থায় আলিপুর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা এই মহাকবি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, সৃজনশীল বিদ্রোহ ছাড়া কোনো জাতির আধুনিকতা পূর্ণতা পায় না।
পাশ্চাত্যের দর্পণ ছুঁয়ে প্রাচ্যের শিকড়ে ফেরার এক মহাকাব্যিক পথিকের নাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাঁর কলম কেবল অমিত্রাক্ষরের ছন্দ বুণেনি, বরং ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ভেতর দাঁড়িয়ে বদলে দিয়েছিল একটি পরাধীন জাতির সাহিত্যিক রুচি ও আত্মপরিচয় খোঁজার গভীর দর্শন। বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি কেবল এক ধূমকেতু নন, বরং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেই ধ্রুবতারা, যা আজও আমাদের শেকড় ও শিখরের দ্বন্দ্বে পথ দেখায়। তিনি চেয়েছিলেন 'পাশ্চাত্যের মিল্টন' হতে, অথচ নিয়তির কী নির্মম পরিহাস—আজ তিনি আমাদের কাছে অমর হয়ে আছেন ‘বাংলার মধুসূদন’ হিসেবেই।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com।

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১৮:৩১
হেনরী স্বপন>> জাতিধর্ম নির্বিশেষে ব্যবহৃত উন্মুক্ত পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য বিবিরতালাব (তালাব: ফার্সি শব্দ- জলাশয়) খনন করা হয়েছিল। কালক্রমে এটি এখন বিবিরপুকুর হয়ে বরিশালবাসীর আত্মার অংশ হয়ে উঠেছে। বরিশালবাসীর সুপেয় জলের অভাব মোচনের জন্য জনদরদী জিন্নাত বিবি আঠারোশতকে এই পুকুরটি খনন করেছিলেন, বলে জানা যায়। এই পুকুরের চারপাশে ৪টি ঘাটলা ছিল। তখন সেই ঘাট থেকে বরিশালের সকল ধর্মের সব মানুষ খাবার পানি সসরবরাহ করতেন। কেউ স্নান করত না এবং ধোয়াকাচার কাজও হত না। সে সময় এই নিয়গুলো কঠোরভাবে পালিত হতো। যেহেতু তৎকালীন সময় রাখালবাবুর পুকুর থেকে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা খাবার জল সসরবরাহ কতে পারতেন। কিন্তু বিবিরতালাব থেকে সকল সম্প্রদায়ের সব মানুষ এই পুকুরের পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারত। তাই, এই পুকুরটিকে অসামপ্রদায়িক চেতনার উল্লেগযোগ্য নিদর্শনও বলা যায়।
এই জলাশয় খনন করে জেন্নাত বিবি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে এমোন একটি ট্রাস্টি দলিলও করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, “পুকুরটি কেনোদিন ভরাট করা যাবে না, এর চাপাশের ঘাটলায় গোসল, সাবান সোডার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। জলাশয়ের পানি পরিস্কার রাখতে হবে এবং পাড়ঘেঁষে কোনও ইমারত, দেয়াল, তোরণ নির্মাণ করে পুকুরের সৌন্দর্য ক্ষুন্ন হয়, এমনও কিছুই করা যাবে না।”
যেহেতু, ১৯০০-১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ভূমি জরিপে জিন্নাত ও কেরি’র নামোল্লেখ আছে। সরকারের জাজেস সেরেস্তায় খুঁজলে এই চুক্তির দলিলও পাওয়া যাবে, হয়তো। অথচ, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় মহল্লাবাসী ও অগণিত ফাস্টফুড ব্যবসায়ী কেউ চুক্তির কিছুই মানছে না। বরং এরাই দিনের পর দিন ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরের সৌন্দর্যকে গলাটিপে হত্যা করছে। কেননা, সিটি কর্পোরেশনের কর্তারা অর্থের বিনিময়ে মোবাইল কোম্পানির স্থায়ী বিলবোর্ড স্থাপনরে মাধ্যমে পুকুরটির যতোটা শোভা বিনষ্ট করেছনে। ততধিক উচ্ছিষ্ট খাবারের বর্জ্য ফেলে এটিকে দুর্গন্ধময় জলাশয়ে পরিণত করছে, তেমনি এর চারপাশে যত্রতত্র বিলবোর্ড, দলীয় পোস্টার ফেস্টুনে কতিপয় রানৈতিক নেতাদের ছবিতে ছবিতে সয়লাব করে, পুকুরটির স্বাভাবিক অঙ্গছেদন এবং শোভা বিনষ্ট করছেন।
সম্প্রতি বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশন নগর ভবনের আধিপতি মো. রায়হান কাওছার সাহেব এককালে যে বিবিরতালাবের সুপেয় জলে আমাদের জীবনের তৃষ্ণা মিটেছে, সেই পুকুরের জলে ঝলমলে সূর্যের আলোর রোশনাই ফেরাতে এর চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছেন। রাজনৈতিক দখলদারদের আমলা নির্ভরতা ও দলীয় হামটি-ডামটির তোয়াক্কা না করে, বরিশালবাসীর প্রাণভোমরা পুকুরটির সেই তিলত্তোমা রূপÑ স্বঅবয়বে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে তিনি যে, ঈর্ষণীয় এবং অনন্য ন্যায়পালের উদ্যোগের মতোই মহান কাজ করে চলেছেন এজন্য সিটিবাসী আপনাকে মনেও রাখবে বহুকাল।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, বরিশাল।
হেনরী স্বপন>> জাতিধর্ম নির্বিশেষে ব্যবহৃত উন্মুক্ত পানীয় জলের চাহিদা মেটানোর জন্য বিবিরতালাব (তালাব: ফার্সি শব্দ- জলাশয়) খনন করা হয়েছিল। কালক্রমে এটি এখন বিবিরপুকুর হয়ে বরিশালবাসীর আত্মার অংশ হয়ে উঠেছে। বরিশালবাসীর সুপেয় জলের অভাব মোচনের জন্য জনদরদী জিন্নাত বিবি আঠারোশতকে এই পুকুরটি খনন করেছিলেন, বলে জানা যায়। এই পুকুরের চারপাশে ৪টি ঘাটলা ছিল। তখন সেই ঘাট থেকে বরিশালের সকল ধর্মের সব মানুষ খাবার পানি সসরবরাহ করতেন। কেউ স্নান করত না এবং ধোয়াকাচার কাজও হত না। সে সময় এই নিয়গুলো কঠোরভাবে পালিত হতো। যেহেতু তৎকালীন সময় রাখালবাবুর পুকুর থেকে কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা খাবার জল সসরবরাহ কতে পারতেন। কিন্তু বিবিরতালাব থেকে সকল সম্প্রদায়ের সব মানুষ এই পুকুরের পানি খাবার পানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারত। তাই, এই পুকুরটিকে অসামপ্রদায়িক চেতনার উল্লেগযোগ্য নিদর্শনও বলা যায়।
এই জলাশয় খনন করে জেন্নাত বিবি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে এমোন একটি ট্রাস্টি দলিলও করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন যে, “পুকুরটি কেনোদিন ভরাট করা যাবে না, এর চাপাশের ঘাটলায় গোসল, সাবান সোডার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। জলাশয়ের পানি পরিস্কার রাখতে হবে এবং পাড়ঘেঁষে কোনও ইমারত, দেয়াল, তোরণ নির্মাণ করে পুকুরের সৌন্দর্য ক্ষুন্ন হয়, এমনও কিছুই করা যাবে না।”
যেহেতু, ১৯০০-১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ভূমি জরিপে জিন্নাত ও কেরি’র নামোল্লেখ আছে। সরকারের জাজেস সেরেস্তায় খুঁজলে এই চুক্তির দলিলও পাওয়া যাবে, হয়তো। অথচ, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় মহল্লাবাসী ও অগণিত ফাস্টফুড ব্যবসায়ী কেউ চুক্তির কিছুই মানছে না। বরং এরাই দিনের পর দিন ঐতিহ্যবাহী এই পুকুরের সৌন্দর্যকে গলাটিপে হত্যা করছে। কেননা, সিটি কর্পোরেশনের কর্তারা অর্থের বিনিময়ে মোবাইল কোম্পানির স্থায়ী বিলবোর্ড স্থাপনরে মাধ্যমে পুকুরটির যতোটা শোভা বিনষ্ট করেছনে। ততধিক উচ্ছিষ্ট খাবারের বর্জ্য ফেলে এটিকে দুর্গন্ধময় জলাশয়ে পরিণত করছে, তেমনি এর চারপাশে যত্রতত্র বিলবোর্ড, দলীয় পোস্টার ফেস্টুনে কতিপয় রানৈতিক নেতাদের ছবিতে ছবিতে সয়লাব করে, পুকুরটির স্বাভাবিক অঙ্গছেদন এবং শোভা বিনষ্ট করছেন।
সম্প্রতি বর্তমানে বরিশাল সিটি করপোরেশন নগর ভবনের আধিপতি মো. রায়হান কাওছার সাহেব এককালে যে বিবিরতালাবের সুপেয় জলে আমাদের জীবনের তৃষ্ণা মিটেছে, সেই পুকুরের জলে ঝলমলে সূর্যের আলোর রোশনাই ফেরাতে এর চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছেন। রাজনৈতিক দখলদারদের আমলা নির্ভরতা ও দলীয় হামটি-ডামটির তোয়াক্কা না করে, বরিশালবাসীর প্রাণভোমরা পুকুরটির সেই তিলত্তোমা রূপÑ স্বঅবয়বে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনতে তিনি যে, ঈর্ষণীয় এবং অনন্য ন্যায়পালের উদ্যোগের মতোই মহান কাজ করে চলেছেন এজন্য সিটিবাসী আপনাকে মনেও রাখবে বহুকাল।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক, বরিশাল।

২৬ জুলাই, ২০২৫ ১৩:০৪
ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে বাংলাদেশ বিমানের সর্বশেষ ফ্লাইটটিও আজ বন্ধ হয়ে গেলো। এর আগে বন্ধ হয়েছিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এবং নভো এয়ারের বিমান। আমার কাছে এই ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। ২০২২ সালের জুন মাসে পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পরেই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলাম- 'বরিশাল রুটে বিমানে যাত্রী কমতে কমতে একদিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।' বাবুগঞ্জের একজন গুণীজন অবশ্য আমার সাথে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন- 'বিমানের যাত্রীরা বাসে চড়বে না। তাই লঞ্চের যাত্রী কমলেও বিমানের যাত্রী কমবে না। বিমান কখনোই বন্ধ হবে না।' ২০২২ সালে পদ্মাসেতু চালুর সময় ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে সরকারি বাংলাদেশ বিমান এবং বেসরকারি ইউএস-বাংলা ও নভো এয়ারের তিনটি ফ্লাইট নিয়মিত চলাচল করতো। এরমধ্যে ইউএস-বাংলা প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে ডবল ট্রিপ দিতো। তবুও আগাম বুকিং করে না রাখলে টিকেট পাওয়া যেতো না। তখন সেই অবস্থা দেখেই হয়তো তিনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু আজ ৩ বছরের মাথায় যাত্রী সংকটে একে একে ৩টি এয়ারলাইন্সের বিমানই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিমানের পাশাপাশি পদ্মাসেতুর বিরাট প্রভাব পড়েছে বরিশালের নৌপথেও। ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা নৌপথে প্রতিদিন চলাচলকারী বিলাসবহুল ৯-১০টা লঞ্চ থেকে যাত্রী কমতে কমতে এখন মাত্র ২টা লঞ্চে নেমেছে। রোটেশন পদ্ধতিতে প্রতিদিন ২টি লঞ্চ চললেও তাতে বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়া আশানুরূপ যাত্রী নেই। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই আমি সেদিন চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলাম- 'পদ্মাসেতু চালুর পরে বরিশালে যদি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক কলকারখানা গড়ে না ওঠে তাহলে লঞ্চশিল্প হুমকির মুখে পড়বে এবং বরিশালে বিমান টিকবেই না।' শুধু পর্যটন কুয়াকাটাকে বেইজ করে ঢাকা-কুয়াকাটার মধ্যবর্তী জায়গা বরিশালে একটি বিমানবন্দর টিকে থাকার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। এই বিমানবন্দরের অবস্থান যদি পটুয়াখালী জেলার যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে হতো তাহলে এটা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এবং পায়রা বন্দরের কল্যাণে মাথা উঁচু করেই টিকে থাকতো। বরিশালে ইকোনমি জোন অর্থাৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি না হলে বরিশালে বিমান টিকবে না এটা বুঝতে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বরিশাল বিভাগীয় শহর হলেও এখানে কোনো বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা কিংবা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা না থাকায় এই অঞ্চলে ভিআইপি-সিআইপিদের যাতায়াত নেই বললেই চলে। তাহলে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে বিমানে চড়বে কারা? বিমানে সাধারণ যাত্রী উঠবে কেন? শখ পূরণ করতে ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে কয়দিন সাধারণ মানুষ বিমানে চড়তে পারে? তাছাড়া কুয়াকাটার পর্যটকরা বিমানে উঠলে তাদের মিরপুর কিংবা মতিঝিল থেকে ঢাকার উত্তরা বিমানবন্দরে যেতে সময় লাগে ৩ ঘন্টা। আবার বরিশাল বিমানবন্দরে নেমে কুয়াকাটা যেতেও লাগে প্রায় আড়াই থেকে ৩ ঘন্টার বেশি। তাহলে পর্যটকরা তাদের কুয়াকাটা ভ্রমনের জন্য বিমানের অর্ধেক পথকে কেন বেছে নেবেন? পদ্মাসেতু চালুর পরে বরিশাল থেকে সড়কপথে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান বা মতিঝিল যেতে সময় লাগে সাড়ে ৩ ঘন্টা। এদিকে ঢাকার উত্তরায় বিমানবন্দরে নেমে যানজটের কারণে গুলিস্তান কিংবা মতিঝিল আসতে পিক আওয়ারে কখনো কখনো সময় লাগে ৩ ঘন্টার বেশি। বিমানে আকাশপথে বরিশাল থেকে ঢাকা যেতে মাত্র ২০ মিনিট সময় লাগলেও ঢাকার উত্তরা বিমানবন্দরে নেমে মতিঝিল, গুলিস্তান বা মিরপুরের গন্তব্যে যেতে সময় লাগে কমপক্ষে ২ থেকে কখনো ৩ ঘন্টার বেশি। একই সময়ে বরং সড়কপথে পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে বরিশাল চলে আসা সহজ। তাহলে কোন সুবিধার জন্য যাত্রীরা বিমানকে বেছে নেবেন?
বিমানের নিয়মিত যাত্রীরা এখন পদ্মাসেতু পাড়ি দিয়েই নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টায় বরিশাল চলে আসেন। যারা নিজের গাড়ি বরিশাল আনেন না তারা আসেন বিলাসবহুল সোহাগ পরিবহনের অত্যাধুনিক স্ক্যানিয়া বাস কিংবা গ্রীণলাইনের ভলভো গাড়িতে। অভ্যন্তরীণ ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী ৬৭-৭০ আসনের বিমানগুলোর সিটের চেয়ে এসব গাড়ির সিট অনেক বেশি উন্নত, বিলাসবহুল এবং আরামদায়ক। ৪৫০০ টাকার একই সেবা ও সুবিধা যদি ১২০০ বা ১৫০০ টাকায় পাওয়া যায় তাহলে সময় এবং টাকার শ্রাদ্ধ করে মানুষ কেন বিমানে উঠবে? সঙ্গত কারণেই এখন ভ্রমনে আসা পর্যটকরা ঢাকা-কুয়াকাটা রুটের বিলাসবহুল ডাইরেক্ট বাসে কুয়াকাটা ভ্রমন করেন। বিমানবন্দর পটুয়াখালী কিংবা বরগুনা জেলার সুবিধাজনক স্থানে না নিলে বরিশাল বিভাগে আপাতত যাত্রীবাহী বিমানের স্থায়ী মৃত্যু সুনিশ্চিত। এটাই ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ভবিষ্যতে বরিশাল কেন্দ্রিক বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা গড়ে না উঠলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। পিছিয়ে পড়বে প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহাসিক নগরী এই বরিশাল। বরিশালের আকাশে আর কখনোই উড়বে না যাত্রীবাহী বিমান। ভোলার গ্যাস বরিশালে এনে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে এবং বরিশালের ছোট পর্যটন স্পটগুলো নিয়ে একটি পর্যটন জোন তৈরি করতে না পারলে বরিশালের আকাশপথে স্বপ্নের বিমান চিরতরে দাফন হয়ে যাবে। পরবর্তীতে কুয়াকাটা পর্যন্ত ৬ লেনের মহাসড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী লঞ্চের কুলখানিও সম্পন্ন হবে বলে আমার ধারণা। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও মানবাধিকারকর্মী।
বাবুগঞ্জঃ ২৬ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।
ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে বাংলাদেশ বিমানের সর্বশেষ ফ্লাইটটিও আজ বন্ধ হয়ে গেলো। এর আগে বন্ধ হয়েছিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এবং নভো এয়ারের বিমান। আমার কাছে এই ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। ২০২২ সালের জুন মাসে পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পরেই ভবিষ্যৎবাণী করেছিলাম- 'বরিশাল রুটে বিমানে যাত্রী কমতে কমতে একদিন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।' বাবুগঞ্জের একজন গুণীজন অবশ্য আমার সাথে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন- 'বিমানের যাত্রীরা বাসে চড়বে না। তাই লঞ্চের যাত্রী কমলেও বিমানের যাত্রী কমবে না। বিমান কখনোই বন্ধ হবে না।' ২০২২ সালে পদ্মাসেতু চালুর সময় ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে সরকারি বাংলাদেশ বিমান এবং বেসরকারি ইউএস-বাংলা ও নভো এয়ারের তিনটি ফ্লাইট নিয়মিত চলাচল করতো। এরমধ্যে ইউএস-বাংলা প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে ডবল ট্রিপ দিতো। তবুও আগাম বুকিং করে না রাখলে টিকেট পাওয়া যেতো না। তখন সেই অবস্থা দেখেই হয়তো তিনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। কিন্তু আজ ৩ বছরের মাথায় যাত্রী সংকটে একে একে ৩টি এয়ারলাইন্সের বিমানই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিমানের পাশাপাশি পদ্মাসেতুর বিরাট প্রভাব পড়েছে বরিশালের নৌপথেও। ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা নৌপথে প্রতিদিন চলাচলকারী বিলাসবহুল ৯-১০টা লঞ্চ থেকে যাত্রী কমতে কমতে এখন মাত্র ২টা লঞ্চে নেমেছে। রোটেশন পদ্ধতিতে প্রতিদিন ২টি লঞ্চ চললেও তাতে বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়া আশানুরূপ যাত্রী নেই। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই আমি সেদিন চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলাম- 'পদ্মাসেতু চালুর পরে বরিশালে যদি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং বাণিজ্যিক কলকারখানা গড়ে না ওঠে তাহলে লঞ্চশিল্প হুমকির মুখে পড়বে এবং বরিশালে বিমান টিকবেই না।' শুধু পর্যটন কুয়াকাটাকে বেইজ করে ঢাকা-কুয়াকাটার মধ্যবর্তী জায়গা বরিশালে একটি বিমানবন্দর টিকে থাকার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। এই বিমানবন্দরের অবস্থান যদি পটুয়াখালী জেলার যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে হতো তাহলে এটা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত এবং পায়রা বন্দরের কল্যাণে মাথা উঁচু করেই টিকে থাকতো। বরিশালে ইকোনমি জোন অর্থাৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি না হলে বরিশালে বিমান টিকবে না এটা বুঝতে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বরিশাল বিভাগীয় শহর হলেও এখানে কোনো বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা কিংবা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা না থাকায় এই অঞ্চলে ভিআইপি-সিআইপিদের যাতায়াত নেই বললেই চলে। তাহলে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে বিমানে চড়বে কারা? বিমানে সাধারণ যাত্রী উঠবে কেন? শখ পূরণ করতে ৪-৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে কয়দিন সাধারণ মানুষ বিমানে চড়তে পারে? তাছাড়া কুয়াকাটার পর্যটকরা বিমানে উঠলে তাদের মিরপুর কিংবা মতিঝিল থেকে ঢাকার উত্তরা বিমানবন্দরে যেতে সময় লাগে ৩ ঘন্টা। আবার বরিশাল বিমানবন্দরে নেমে কুয়াকাটা যেতেও লাগে প্রায় আড়াই থেকে ৩ ঘন্টার বেশি। তাহলে পর্যটকরা তাদের কুয়াকাটা ভ্রমনের জন্য বিমানের অর্ধেক পথকে কেন বেছে নেবেন? পদ্মাসেতু চালুর পরে বরিশাল থেকে সড়কপথে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান বা মতিঝিল যেতে সময় লাগে সাড়ে ৩ ঘন্টা। এদিকে ঢাকার উত্তরায় বিমানবন্দরে নেমে যানজটের কারণে গুলিস্তান কিংবা মতিঝিল আসতে পিক আওয়ারে কখনো কখনো সময় লাগে ৩ ঘন্টার বেশি। বিমানে আকাশপথে বরিশাল থেকে ঢাকা যেতে মাত্র ২০ মিনিট সময় লাগলেও ঢাকার উত্তরা বিমানবন্দরে নেমে মতিঝিল, গুলিস্তান বা মিরপুরের গন্তব্যে যেতে সময় লাগে কমপক্ষে ২ থেকে কখনো ৩ ঘন্টার বেশি। একই সময়ে বরং সড়কপথে পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে বরিশাল চলে আসা সহজ। তাহলে কোন সুবিধার জন্য যাত্রীরা বিমানকে বেছে নেবেন?
বিমানের নিয়মিত যাত্রীরা এখন পদ্মাসেতু পাড়ি দিয়েই নিজের প্রাইভেট কার নিয়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টায় বরিশাল চলে আসেন। যারা নিজের গাড়ি বরিশাল আনেন না তারা আসেন বিলাসবহুল সোহাগ পরিবহনের অত্যাধুনিক স্ক্যানিয়া বাস কিংবা গ্রীণলাইনের ভলভো গাড়িতে। অভ্যন্তরীণ ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে চলাচলকারী ৬৭-৭০ আসনের বিমানগুলোর সিটের চেয়ে এসব গাড়ির সিট অনেক বেশি উন্নত, বিলাসবহুল এবং আরামদায়ক। ৪৫০০ টাকার একই সেবা ও সুবিধা যদি ১২০০ বা ১৫০০ টাকায় পাওয়া যায় তাহলে সময় এবং টাকার শ্রাদ্ধ করে মানুষ কেন বিমানে উঠবে? সঙ্গত কারণেই এখন ভ্রমনে আসা পর্যটকরা ঢাকা-কুয়াকাটা রুটের বিলাসবহুল ডাইরেক্ট বাসে কুয়াকাটা ভ্রমন করেন। বিমানবন্দর পটুয়াখালী কিংবা বরগুনা জেলার সুবিধাজনক স্থানে না নিলে বরিশাল বিভাগে আপাতত যাত্রীবাহী বিমানের স্থায়ী মৃত্যু সুনিশ্চিত। এটাই ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা। ভবিষ্যতে বরিশাল কেন্দ্রিক বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা গড়ে না উঠলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। পিছিয়ে পড়বে প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহাসিক নগরী এই বরিশাল। বরিশালের আকাশে আর কখনোই উড়বে না যাত্রীবাহী বিমান। ভোলার গ্যাস বরিশালে এনে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে এবং বরিশালের ছোট পর্যটন স্পটগুলো নিয়ে একটি পর্যটন জোন তৈরি করতে না পারলে বরিশালের আকাশপথে স্বপ্নের বিমান চিরতরে দাফন হয়ে যাবে। পরবর্তীতে কুয়াকাটা পর্যন্ত ৬ লেনের মহাসড়ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে বরিশালের ঐতিহ্যবাহী লঞ্চের কুলখানিও সম্পন্ন হবে বলে আমার ধারণা। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও মানবাধিকারকর্মী।
বাবুগঞ্জঃ ২৬ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ।

Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.