Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.
Google AdSense
This is a demo ad. Your live ads will be displayed here once AdSense is properly configured.

২৯ মে, ২০২৫ ১৬:১০
প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ➤ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানান সমস্যায় জর্জরিত। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা। পৃথিবীব্যাপি একটি স্বতঃসিদ্ধ উক্তি আছে- ‘প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচিত হয় সেটির শিক্ষক দ্বারা, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা, মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত প্রয়াসের দ্বারা শিক্ষাকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে।’ অর্থাৎ শিক্ষকরাই হলো প্রতিষ্ঠানের মেইন ফ্যাক্টর বা প্রধান স্তম্ভ তথা মূল চালিকাশক্তি। আমরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি বা করেছি তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা।
শুধু শিক্ষাই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমর্যাদা নিরূপণ হয় শিক্ষা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে- যা মূলত নির্ভর করে শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রয়াসের উপরেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই শিক্ষকরাই নানাভাবে নিগৃহীত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের শোষণ ও অধিকার হরণের মূলে রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে তারা নিজের গদি সুরক্ষা ও কিছু ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের পক্ষে একটি তোষামোদি গ্রুপ সৃষ্টি করেন। নিজের অনুগত বাহিনী তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিদ্যমান ঐক্যের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেন। নানান লোভ-লালসা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আস্থাভাজন শিক্ষকদের নিয়ে দলবাজি শুরু করেন।
ফলে অল্প কিছুদিনেই শিক্ষকদের মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বিভাজন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি ব্রিটিশদের সেই ‘Divide and Rule’ পলিসি অবলম্বন করে নিজের মনের মতো প্রশাসন পরিচালনার অপচেষ্টা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়ে থাকেন নিজের অনুগত সেই তোষামোদি গ্রুপের সহযোগিতায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল, ক্ষমতার দাপট ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হয়। এমন হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ অবনমিত করা হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম পালনে একদল সবসময় সচেষ্ট থাকেন। তাদের কাছে শিক্ষা এবং গবেষণার মূল্য অতি নগণ্য। এদিকে অপর গ্রুপকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। ফলে তারাও শিক্ষা আর গবেষণায় মনোনিবেশ করার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হন।
দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই অবক্ষয়ের চিত্র এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্ণধারদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আজ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নিয়োগের প্রক্রিয়াটাও স্বচ্ছ নয়। কর্ণধার নিয়োগে প্রায়ই মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও ম্যানেজারিয়াল স্কিলনেস, এসব কিছুই বিবেচনা করা হয় না বললেই চলে। নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে তোষামোদি রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংযোগ স্থাপনের দক্ষতা তথা লবিংয়ের উপরই বেশি নির্ভর করে। ফলে অনেক সময়ই প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ফলে এর সরাসরি কুপ্রভাব পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায়।
অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, যার কথা কেউ কখনো চিন্তা করেনি কিংবা যার ওই চেয়ারে বসার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা নেই এমন কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়। লবিং আর তদবিরের জোরে বাগিয়ে নেওয়া হয় চেয়ার। ফলে তাঁর যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সব নিয়মকানুন আর নীতি-নৈতিকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কর্ণধার নিয়োগে সঠিক কোনো নীতিমালা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি, তোষামোদি কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট ঘটনা।
এভাবে অনৈতিক পন্থায় যারা নিয়োগ লাভ করেন সঙ্গত কারণেই তাদের কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহিতা থাকে না। ফলে দায়িত্ব পেয়েই তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেন। অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এসব কারণেই এখন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মিডিয়ার শিরোনাম হয়। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যায়ের কর্নধারদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং চারিত্রিক ও নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের খবর হরহামেশাই শোনা যায়। এজন্য অনেককে চাকরিচ্যুত হয়ে এমনকি শ্রীঘরে পর্যন্ত যেতে হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নানাবিধ বিভাজন সৃষ্টি করেন। এতে তিনি নিজে লাভবান হলেও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। অনেকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে থেকে অনেকে মিথ্যার আশ্রয়, প্রতারণা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, মোনাফেকি আর বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যোগ্যতা হারান তিনি। এসব অযোগ্য ব্যক্তিরা নানান কূটকৌশলে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে নিপতিত করেন।
আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন- ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ দেওয়া হয় না, নিয়োগ নেয়া হয়।ছলেবলে, কৌশলে কিংবা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। ফলে এই নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি, দেশ ও জাতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। তাদের মাঝে থাকে না সততা, দেশপ্রেম, শুদ্ধাচার কিংবা নীতি-নৈতিকতার বালাই। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি- যিনি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন মূলত তাঁর ইচ্ছার উপরেই সবকিছু নির্ভর করে। সর্বত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম এবং কীর্তন হয়। এর ফলে মারাত্মক প্রভাব পড়ে শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে। এসব কারণেই আজ শিক্ষার বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় দেখা দিয়েছে চরম অবক্ষয়। আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে সর্বত্র দৃশ্যমান।
বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান পরিমাপক পদ্ধতি টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) কর্তৃক Ranking-2024’এ বিশ্বের ১০৮ টি দেশের ১,৯০৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের ২১ টি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরের অবস্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ-সাউথ, বাকৃবি, বুয়েট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
তবে এবারই প্রথম দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সামনে চলে এসেছে।
The Times Higher Education World University Ranking-2024 adopts methodology which includes 18 carefully calibrated performance indicators that measure an institution’s performance across five areas: teaching, research environment, research quality, industry, and International outlook.
যে পাঁচটি ইন্ডিকেটরস তথা সূচক দিয়ে শিক্ষার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করা হয় সেগুলোর সব কয়টির সাথেই শিক্ষকগণ ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। সেই শিক্ষকদের নিয়ে যদি নানান বিরোধ ও গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয় তাহলে সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে সন্দেহাতীতভাবে। তাছাড়া কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ভিশন নিয়ে কাজ না করে নিজের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে মহান শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন সেক্ষেত্রে যা হবার তা-ই হবে এবং বর্তমানে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সামগ্রিক বিষয়ে দক্ষতা, মেধা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপরেই মূলত অনেক কিছু নির্ভর করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন যাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ দিলে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন।
সকল বিষয়ে মেধা সৃষ্টি করার পরিবেশ সংরক্ষণ করার প্রাথমিক দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যে কথা দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করেছিলাম তা ছিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কম্পোনেন্ট হলেন শিক্ষক। আর সেই শিক্ষকদের সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের। তাই সততা, নিষ্ঠা ও নীতি-নৈতিকতার সাথেসাথে সব ধরনের লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। এটা না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত হবে।
দেশে শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি মেধা সৃষ্টি করা না যায়, সততা ও দেশপ্রেম তৈরি করা না যায় তাহলে আমরা যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের কথা বলছি তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। শুধু মেধা থাকাই যথেষ্ট নয়। যে মেধার মধ্যে সততা এবং শুদ্ধাচার না থাকে সেই মেধা মূল্যহীন। পক্ষান্তরে এমন মেধা দেশ ও জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। এছাড়া সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) যুগ; যা সম্পূর্ণভাবে নতুন ধারণার উপর ভর করে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে। আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগীকরণ, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতার বিপর্যয় রোধ করতে না পারলে অমানিশার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। #

লেখকঃ প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
প্রাক্তন উপাচার্য,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতা।
প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ➤ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানান সমস্যায় জর্জরিত। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা। পৃথিবীব্যাপি একটি স্বতঃসিদ্ধ উক্তি আছে- ‘প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচিত হয় সেটির শিক্ষক দ্বারা, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা, মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত প্রয়াসের দ্বারা শিক্ষাকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে।’ অর্থাৎ শিক্ষকরাই হলো প্রতিষ্ঠানের মেইন ফ্যাক্টর বা প্রধান স্তম্ভ তথা মূল চালিকাশক্তি। আমরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি বা করেছি তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা।
শুধু শিক্ষাই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমর্যাদা নিরূপণ হয় শিক্ষা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে- যা মূলত নির্ভর করে শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রয়াসের উপরেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই শিক্ষকরাই নানাভাবে নিগৃহীত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের শোষণ ও অধিকার হরণের মূলে রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে তারা নিজের গদি সুরক্ষা ও কিছু ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের পক্ষে একটি তোষামোদি গ্রুপ সৃষ্টি করেন। নিজের অনুগত বাহিনী তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিদ্যমান ঐক্যের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেন। নানান লোভ-লালসা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আস্থাভাজন শিক্ষকদের নিয়ে দলবাজি শুরু করেন।
ফলে অল্প কিছুদিনেই শিক্ষকদের মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বিভাজন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি ব্রিটিশদের সেই ‘Divide and Rule’ পলিসি অবলম্বন করে নিজের মনের মতো প্রশাসন পরিচালনার অপচেষ্টা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়ে থাকেন নিজের অনুগত সেই তোষামোদি গ্রুপের সহযোগিতায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল, ক্ষমতার দাপট ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হয়। এমন হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ অবনমিত করা হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম পালনে একদল সবসময় সচেষ্ট থাকেন। তাদের কাছে শিক্ষা এবং গবেষণার মূল্য অতি নগণ্য। এদিকে অপর গ্রুপকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। ফলে তারাও শিক্ষা আর গবেষণায় মনোনিবেশ করার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হন।
দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই অবক্ষয়ের চিত্র এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্ণধারদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আজ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নিয়োগের প্রক্রিয়াটাও স্বচ্ছ নয়। কর্ণধার নিয়োগে প্রায়ই মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও ম্যানেজারিয়াল স্কিলনেস, এসব কিছুই বিবেচনা করা হয় না বললেই চলে। নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে তোষামোদি রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংযোগ স্থাপনের দক্ষতা তথা লবিংয়ের উপরই বেশি নির্ভর করে। ফলে অনেক সময়ই প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ফলে এর সরাসরি কুপ্রভাব পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায়।
অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, যার কথা কেউ কখনো চিন্তা করেনি কিংবা যার ওই চেয়ারে বসার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা নেই এমন কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়। লবিং আর তদবিরের জোরে বাগিয়ে নেওয়া হয় চেয়ার। ফলে তাঁর যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সব নিয়মকানুন আর নীতি-নৈতিকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কর্ণধার নিয়োগে সঠিক কোনো নীতিমালা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি, তোষামোদি কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট ঘটনা।
এভাবে অনৈতিক পন্থায় যারা নিয়োগ লাভ করেন সঙ্গত কারণেই তাদের কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহিতা থাকে না। ফলে দায়িত্ব পেয়েই তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেন। অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এসব কারণেই এখন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মিডিয়ার শিরোনাম হয়। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যায়ের কর্নধারদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং চারিত্রিক ও নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের খবর হরহামেশাই শোনা যায়। এজন্য অনেককে চাকরিচ্যুত হয়ে এমনকি শ্রীঘরে পর্যন্ত যেতে হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নানাবিধ বিভাজন সৃষ্টি করেন। এতে তিনি নিজে লাভবান হলেও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। অনেকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে থেকে অনেকে মিথ্যার আশ্রয়, প্রতারণা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, মোনাফেকি আর বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যোগ্যতা হারান তিনি। এসব অযোগ্য ব্যক্তিরা নানান কূটকৌশলে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে নিপতিত করেন।
আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন- ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ দেওয়া হয় না, নিয়োগ নেয়া হয়।ছলেবলে, কৌশলে কিংবা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। ফলে এই নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি, দেশ ও জাতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। তাদের মাঝে থাকে না সততা, দেশপ্রেম, শুদ্ধাচার কিংবা নীতি-নৈতিকতার বালাই। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি- যিনি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন মূলত তাঁর ইচ্ছার উপরেই সবকিছু নির্ভর করে। সর্বত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম এবং কীর্তন হয়। এর ফলে মারাত্মক প্রভাব পড়ে শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে। এসব কারণেই আজ শিক্ষার বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় দেখা দিয়েছে চরম অবক্ষয়। আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে সর্বত্র দৃশ্যমান।
বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান পরিমাপক পদ্ধতি টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) কর্তৃক Ranking-2024’এ বিশ্বের ১০৮ টি দেশের ১,৯০৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের ২১ টি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরের অবস্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ-সাউথ, বাকৃবি, বুয়েট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
তবে এবারই প্রথম দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সামনে চলে এসেছে।
The Times Higher Education World University Ranking-2024 adopts methodology which includes 18 carefully calibrated performance indicators that measure an institution’s performance across five areas: teaching, research environment, research quality, industry, and International outlook.
যে পাঁচটি ইন্ডিকেটরস তথা সূচক দিয়ে শিক্ষার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করা হয় সেগুলোর সব কয়টির সাথেই শিক্ষকগণ ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। সেই শিক্ষকদের নিয়ে যদি নানান বিরোধ ও গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয় তাহলে সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে সন্দেহাতীতভাবে। তাছাড়া কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ভিশন নিয়ে কাজ না করে নিজের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে মহান শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন সেক্ষেত্রে যা হবার তা-ই হবে এবং বর্তমানে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সামগ্রিক বিষয়ে দক্ষতা, মেধা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপরেই মূলত অনেক কিছু নির্ভর করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন যাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ দিলে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন।
সকল বিষয়ে মেধা সৃষ্টি করার পরিবেশ সংরক্ষণ করার প্রাথমিক দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যে কথা দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করেছিলাম তা ছিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কম্পোনেন্ট হলেন শিক্ষক। আর সেই শিক্ষকদের সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের। তাই সততা, নিষ্ঠা ও নীতি-নৈতিকতার সাথেসাথে সব ধরনের লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। এটা না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত হবে।
দেশে শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি মেধা সৃষ্টি করা না যায়, সততা ও দেশপ্রেম তৈরি করা না যায় তাহলে আমরা যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের কথা বলছি তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। শুধু মেধা থাকাই যথেষ্ট নয়। যে মেধার মধ্যে সততা এবং শুদ্ধাচার না থাকে সেই মেধা মূল্যহীন। পক্ষান্তরে এমন মেধা দেশ ও জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। এছাড়া সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) যুগ; যা সম্পূর্ণভাবে নতুন ধারণার উপর ভর করে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে। আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগীকরণ, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতার বিপর্যয় রোধ করতে না পারলে অমানিশার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। #

লেখকঃ প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
প্রাক্তন উপাচার্য,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতা।

০৭ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৩৮

২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০১:৩১

০৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৯:০০
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
ইসলামের ইতিহাসে ১৭ই রমজান এক অনন্য ও গৌরবোজ্জ্বল দিন। আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মদিনার অদূরে বদর প্রান্তরে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের এক চূড়ান্ত লড়াই। যা ইতিহাসে 'বদর যুদ্ধ' নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ কেবল দুটি দলের লড়াই ছিল না, বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যার মধ্যকার পার্থক্যকারী এক মহাসংগ্রাম। আল-কুরআনে এই দিনটিকে 'ইয়াওমুল ফুরকান' বা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণকারী দিন হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
অসম লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট:
বদরের যুদ্ধ ছিল লোকবল ও সমরশক্তির বিচারে সম্পূর্ণ অসম। একদিকে মক্কার কুরাইশদের এক হাজার সুসজ্জিত সৈন্যের বিশাল বাহিনী, যাদের ছিল পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, উট ও ঘোড়া। অন্যদিকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে মাত্র ৩১৩ জন সাহাবীর একটি ছোট দল। তাঁদের কাছে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া এবং ৭০টি উট। কিন্তু সংখ্যা বা অস্ত্রের চেয়ে বড় ছিল তাঁদের অটুট ঈমান এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল ভরসা।
আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়:
রণক্ষেত্রে ৩১৩ জন মুজাহিদ আল্লাহর অসীম সাহায্যে মক্কার প্রতাপশালী বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের পাঠিয়ে মুমিনদের সাহায্য করেছিলেন। যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান আবু জাহেলসহ ৭০ জন শীর্ষ নেতা নিহত হয় এবং আরও ৭০ জন বন্দী হয়। বিপরীতে মাত্র ১৪ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সংখ্যা বা সাজসরঞ্জাম নয়, বরং আল্লাহর সাহায্য ও সঠিক আদর্শই হলো প্রকৃত শক্তির উৎস।
বদরের যুদ্ধের শিক্ষা ও তাৎপর্য:
বদর দিবস আমাদের বর্তমান সময়ের মুসলমানদের জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে:
১. ঈমানি শক্তিই আসল শক্তি: সংখ্যায় কম হলেও যদি লক্ষ্য সঠিক থাকে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা থাকে, তবে জয় নিশ্চিত। বদর আমাদের শেখায় যে, জাগতিক উপকরণের চেয়ে আত্মিক শক্তি অনেক বেশি প্রভাবশালী।
২. বিপদে ধৈর্য ও প্রার্থনা: যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে নবীজি (সা.) আল্লাহর দরবারে যেভাবে রোনাজারি করেছিলেন, তা আমাদের শেখায় যে কোনো সংকটে সবার আগে স্রষ্টার মুখাপেক্ষী হতে হবে।
৩. অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: সত্যের পথে টিকে থাকতে হলে অন্যায়ের কাছে মাথা নত করা যাবে না। মুমিনরা যুগে যুগে বদরের চেতনা নিয়ে জুলুম ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে—এটাই এই দিবসের মূল বার্তা।
বর্তমান বিশ্বে যেখানে মুসলমানরা নানা সংকটের মুখোমুখি, সেখানে বদর দিবসের চেতনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বদর আমাদের অলসতা ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হতে শেখায়। সত্যের পথে অটল থাকা এবং এক আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাওয়ার নামই হলো বদর। এই দিনটি আমাদের প্রতিবছর মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধকারের শক্তি যতই প্রবল হোক না কেন, সত্যের আলোয় তা একদিন দূরীভূত হবেই।
লেখক: মাওলানা মির্জা নাইমুল হাসান বেগ।
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)
সংগীত যখন কেবল বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার দালিলিক হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন শিল্পী আর স্রষ্টার লৌকিক পরিচয় ছাপিয়ে তা এক চিরন্তন মরমী রূপ ধারণ করে। এই দর্শনের অন্যতম অমর সারথি আব্দুল লতিফ ১৯২৭ সালের ৭ মার্চ বরিশালের রায়পাশা গ্রামের মেঠোপথের ধূলিকণায় প্রথম পদচিহ্ন এঁকেছিলেন। পিতা আমিনুদ্দিন আহমদ এবং মাতা আজিমুন্নেসার এই সন্তান শৈশব থেকেই ছিলেন ছকবাঁধা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের প্রতি ঘোরতর বিবাগী। স্থানীয় রায়পাশা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হাতেখড়ির পর তিনি ভর্তি হন বরিশাল সদরের ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জিলা স্কুলে। কিন্তু জিলা স্কুলের প্রথাগত পড়াশোনা আর অঙ্কের কঠিন হিসাব যাঁর কিশোর মনকে টানতে পারেনি, তাঁর জন্য অবারিত পাঠশালা হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। জীবনানন্দ দাশের কুয়াশায় ঢাকা ধানসিঁড়ি নদীর মায়াবী হাহাকার আর কীর্তনখোলার উত্তাল ঢেউ থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আদি সংগীত-ব্যাকরণ। ১৯৪৪ সালে জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করার পর উচ্চশিক্ষার চিরাচরিত মোহ ত্যাগ করে তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়।
কলকাতার ওস্তাদ সুরেন্দ্রনাথ দাসের কাছে দীর্ঘ তিন বছর উচ্চাঙ্গ সংগীতের কঠোর তালিম নিলেও তাঁর অন্তরের টান ছিল বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধে। ১৯৪৩-৪৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মঞ্চে গান গেয়ে জনতাকে জাগিয়ে তোলা সেই কিশোরটি জানতেন না যে, অভাবের তাড়নায় কলকাতায় তাবু সেলাইয়ের কষ্টকর কাজই একদিন তাঁর হৃদয়ে সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতার বীজ বুনে দেবে। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে দেশভাগের রক্তক্ষরণ আর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিভীষিকা যখন কলকাতাকে গ্রাস করে, তখন তরুণ লতিফ স্টিমারে চড়ে ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় জন্মভিটা বরিশালে। ১৯৪৭-এর শেষ ভাগে বরিশালের শান্ত মেঠোপথে কিছুকাল অতিবাহিত করার পর তাঁর শিল্পীসত্তা তাঁকে টেনে নিয়ে আসে ঢাকার নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ে। ১৯৪৮ সালের শুরুর দিকেই তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং সেই বছরেরই ৫ আগস্ট ঢাকা বেতার কেন্দ্রে তাঁর প্রথম গান পরিবেশনার মাধ্যমে এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মহাপ্রলয়ের মুখবন্ধ রচনা করেন। ১৯৪৮ সালেই তিনি ঢাকা বেতারের সংগীত প্রযোজক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন, যা তাঁর শিল্পীসত্তাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও শিল্পবোধ এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকেরা যখন বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মুখের ভাষাকে চিরতরে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন লতিফের কলম ও কণ্ঠ হয়ে উঠল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী শৈল্পিক মেনিফেস্টো। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ গানটিতে ‘কাইড়া’র মতো শক্তিশালী আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ছিল মূলত নাগরিক আভিজাত্যের কৃত্রিম পর্দা ছিঁড়ে সাধারণ মানুষের ভাষাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসার এক চূড়ান্ত চপেটাঘাত। সংগীততাত্ত্বিক বিচারে, আব্দুল লতিফ এখানে এক অদ্ভুত সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে ঢাকার ব্রিটানিয়া সিনেমা হলে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ কবিতায় যখন তিনি প্রথম সুরারোপ করেন, সেখানে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ৩/৪ ছন্দের (দাদরা ঘরানার) এক করুণ ও বিষাদমাখা মরমী হাহাকার। লতিফ সাহেব নিজেই বলতেন, “আমি যখন সুর করি, তখন আমার চোখের সামনে ভাসে মায়ের মৃত মুখ, আর আলতাফ যখন সুর করেছে, তখন তার চোখে ছিল রাজপথের মিছিল।” যদিও আজ আলতাফ মাহমুদের ৪/৪ ছন্দের ‘মার্চিং’ সুরটিই বেশি জনপ্রিয়, কিন্তু ইতিহাসের সত্য এই যে, প্রথম কয়েক বছর লতিফ সাহেবের সেই মরমী সুরেই বাংলার আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল।
আব্দুল লতিফের এই শৈল্পিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট বৈশ্বিক প্রতিবাদী সংগীতের ইতিহাসের সমান্তরাল। তিনি ছিলেন বাংলার সেই শিল্পী, যাঁর কাজের ধরন চিলির ভিক্টর জারা বা আমেরিকার বব ডিলানের চেতনার সমান্তরাল। ভিক্টর জারা যেমন মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষায় গিটারকে হাতিয়ার করেছিলেন, লতিফও তেমনি লোকজ মরমীবাদ এবং আধুনিক দ্রোহের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গদের ‘স্পিরিচুয়াল মিউজিক’ যেমন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে এক আধ্যাত্মিক ঢাল ছিল, লতিফের লোকজ সুরও তেমনি বাঙালির সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে এক অবিনাশী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তিনি জানতেন, কেবল স্লোগানে বিপ্লব হয় না; তার জন্য প্রয়োজন এমন এক সুর, যা মানুষের হৃদয়ে অধিকারের তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর ‘হকের নায়ে চড়বি কারা আয়’ গানটি বাংলার ঘরে ঘরে এক রাজনৈতিক মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল, যা প্রমাণ করে একজন শিল্পী কত দ্রুত রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমান্তরালে জনমত গড়ে তুলতে পারেন।
আব্দুল লতিফ কেবল গানের পাখি ছিলেন না, তিনি ছিলেন গ্রাম-বাংলার চিরায়ত ‘পুঁথি পাঠ’ ঐতিহ্যের এক আধুনিক জাদুকর। বেতারে তাঁর দরাজ কণ্ঠের সেই দুলকি তালের পুঁথি পাঠ যেন মেঘনা-কীর্তনখোলার ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ত বাঙালির অন্দরমহলে। তিনি পুঁথিকে কেবল বিনোদন হিসেবে দেখেননি, বরং একে বাঙালির নিজস্ব ‘গণমাধ্যম’ হিসেবে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ‘মিশর কুমারী’, ‘আকাশ আর মাটি’ থেকে শুরু করে জহির রায়হানের ‘শেষ পর্যন্ত’—বিশটিরও বেশি চলচ্চিত্রে তাঁর গায়কী ও সুর ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। গবেষক হিসেবেও তাঁর অবদান অতুলনীয়; ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত ‘ভাষার গান দেশের গান’ এবং ‘দিলরবাব’ ও ‘দয়ারে আইসাছে পালকি’-র মতো গ্রন্থগুলো সংগীত গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। পটুয়া কামরুল হাসানের বোন নাজমা বেগমের সাথে পরিণয় তাঁর এই দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ যাত্রাকে করেছিল আরও সুশোভিত। এছাড়া 'বাংলাদেশ ফোকলোর পরিষদ' প্রতিষ্ঠায় তাঁর অগ্রণী ভূমিকা তাঁকে একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক সংগঠক হিসেবে অমরতা দিয়েছে।
১৯৭৩ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ১৯৭৪ সালে পূর্ব জার্মানি সফরসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব তাঁর বিশ্বজনীন স্বীকৃতিকেই সুপ্রতিষ্ঠিত করে। একুশে পদক (১৯৭৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০০২) প্রাপ্ত এই কিংদবন্তি ২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে অক্সিজেন সিলিন্ডারের কৃত্রিম সাহারায় বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল তাঁর আজীবনের সংগ্রামী দর্শনেরই এক জীবন্ত রূপক। বর্তমান সময়ে, যখন আমাদের শেকড়বিচ্ছিন্ন সংস্কৃতি যান্ত্রিক আকাশ-সংস্কৃতির মরুভূমিকে আলিঙ্গন করছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে মৌলিক লোকজ সুরগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তখন আব্দুল লতিফ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, শিল্পের আসল শক্তি সস্তা হাততালিতে নয়, বরং মাটির গভীরতার সাথে মানুষের প্রাণের সংযোগে। রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আমাদের চূড়ান্ত দাবি হওয়া উচিত—আব্দুল লতিফের অপ্রকাশিত কাজগুলো দ্রুত উদ্ধার করা এবং তাঁর সংগীতের সঠিক সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। লৌকিক পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে তিনি আজ লীন হয়ে আছেন এ দেশের প্রতিটি মিছিলে, প্রতিটি একুশের ভোরে আর বাঙালির প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠে—এক চিরন্তন ও অবিনাশী সুরের রেখা হয়ে।আজ এই মহান সুর-সংগ্রামীর প্রয়াণ বার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)
বিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নে, যখন বিশ্বসাহিত্য আধুনিকতার রুক্ষ ও যান্ত্রিক অভিঘাতে এক পরিচয়হীন শূন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছিল এক নাক্ষত্রিক স্থপতির মতো। ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার পলিধৌত বাহেরচর গ্রামে যে প্রাণস্পন্দনের শুরু, তা কেবল একটি জীবনের অঙ্কুরোদ্গম ছিল না—বরং তা ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সন্ধানের দার্শনিক ইশতেহার। আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই বাহেরচরের আদিম পলি আর মরমী আবহ তাঁর সত্তাকে এক দ্বান্দ্বিক অথচ সুষম বিন্যাসে গড়ে তুলেছিল; যেখানে একাধারে মিশে ছিল বাংলার লোকজ সহজপন্থা এবং ইংরেজি সাহিত্যের রাজকীয় আভিজাত্যের ধ্রুপদী দীপ্তি। হার্ভার্ডের বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যাকরণ আর বাহেরচরের মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাঁর ভেতর এমন এক ‘পোয়েটিক জেনিয়াস’ তৈরি করেছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল নাগরিক ড্রয়িংরুমের অলঙ্কার হিসেবে দেখেনি, বরং তাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ষিত জমিন ও ঐতিহ্যের শাশ্বত বেদিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার বর্তমানের সমষ্টি নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংকলন—যেখানে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি শস্যের দানার মতো পবিত্র।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যভুবনের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি অনন্য নান্দনিক অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) ছিল রোমান্টিক সংবেদনশীলতা ও লোকজ ছন্দের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন, যেখানে তিনি ঐতিহ্যের অলঙ্কার দিয়ে আধুনিকতার অবয়ব গড়েছিলেন। বিশেষ করে ‘কমলিনী-র হাসি’ গ্রন্থে নারীর শাশ্বত রূপ ও তাঁর অন্তর্লীন হাসিকে তিনি যেভাবে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে জাদুকরী বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাব্যে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ সুফি দর্শনের সেই চিরন্তন হাহাকারকে আধুনিক নাগরিক চেতনার সাথে যুক্ত করে, যেখানে তিনি মরমী ঢংয়ে প্রশ্ন তোলেন— “তুমি কে / এই অন্ধকারে একা ব’সে আছো? / তোমার চোখের তারা কি নক্ষত্রের প্রতিচ্ছায়া?” (খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ১৯৯৬)। ওবায়দুল্লাহর কাব্যিক শ্রেষ্ঠত্বের শিখর স্পর্শ করে তাঁর কালজয়ী ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৮২)। কার্ল ইয়ুং-এর ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতনার তত্ত্বের আলোকে এই কাব্যটি বাঙালির হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক স্মৃতির এক মহাকাব্যিক ইশতেহার। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন, ওবায়দুল্লাহ সেই মাটির ইতিহাসকেই দিয়েছেন এক বীরত্বগাথার রূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি / তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল / তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন / অরণ্য এবং পদের কথা বলতেন”—তখন তিনি আসলে একজন কবির ব্যক্তি-পরিচয় ছাপিয়ে এক জাতির শেকড়ের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠেন। তাঁর শব্দশৈলী ছিল মিতব্যয়ী কিন্তু আবেদন ছিল মহাজাগতিক। তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে— “যে কবিতা শুনতে জানে না / সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।” (আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, ১৯৮২)।
ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণে ওবায়দুল্লাহর তুলনা অনিবার্যভাবে টি. এস. এলিয়টের ‘ঐতিহাসিক বোধ’-এর সাথে চলে আসে। এলিয়ট যেমন পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের আধুনিকায়নের পথ দেখিয়েছিলেন, ওবায়দুল্লাহ তেমনি বাংলার লুপ্তপ্রায় মিথ ও লোকগাথাকে আধুনিক কবিতার শরীরে সঞ্চারিত করে আধুনিকতার একটি ‘দেশজ মডেল’ তৈরি করেছেন। তবে তাঁর মহত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতন্ত্রের যান্ত্রিক শীতলতা বনাম কবিতার মানবিক উষ্ণতার সার্থক মেলবন্ধন। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে কিংবা জাতিসংঘের এফএও (FAO)-এর এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নীতি-নির্ধারণ করেছেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা কেবল ফাইলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল বৈপ্লবিক ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প, যা ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক ছিল মূলত মাটির প্রতি তাঁর এক শৈল্পিক অঙ্গীকার। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাত ও কবিতা সমার্থক—এই মরমী দর্শনই তাঁর প্রশাসনিক মেধা ও সাহিত্যিক জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছে। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলগুলো আজও প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের কবির চোখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক মুক্তি।
শিল্পের এই দায়বদ্ধতা পাবলো নেরুদার মতো তাঁর কাব্যেও প্রকৃতি ও রাজনীতিকে এক পরাবাস্তব রসায়নে গেঁথেছে। ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তাঁর সেই হাহাকার এক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের নাম। সেখানে তিনি কাতরকণ্ঠে অমোঘ প্রার্থনায় নিমগ্ন হন— “হে ঈশ্বর / আমাদের বৃষ্টির জল দাও / যেন আমাদের পাপ ধুয়ে যায় / যেন শস্যের গহন থেকে আবার জীবন জেগে ওঠে।” (বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, ১৯৭১)। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে সিভিল সার্ভিসের (CSP) নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর যে সূক্ষ্ম নৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তা তিনি জয় করেছিলেন শিল্পের সাহসিকতায়। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম ‘একুশের সংকলন’-এর নেপথ্যে তাঁর অর্থায়ন ও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তাঁর সহকর্মীরা বলতেন, ওবায়দুল্লাহ ফাইলে বন্দি কোনো আমলা ছিলেন না, বরং এক ঋজু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ক্ষমতার অলিন্দেও তাঁর কবিত্ব ও নৈতিকতাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাঁর বাসভবনে ‘আলাপন’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ছিল মূলত সমকালীন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের এক মিলনমেলা, যা ক্ষমতার যান্ত্রিকতাকে সৃজনশীলতার স্পর্শে মানবিক করার এক বিরল নজির।
আজ ২০ ২৬ সালের এই নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক সভ্যতায়, যখন মানবসত্তা কৃত্রিম মেধার গোলকধাঁধায় তার আদিম স্পন্দন হারিয়ে ফেলছে, তখন ওবায়দুল্লাহর ‘পলিমাটির সৌরভ’ আমাদের ক্লান্ত অস্তিত্বে এক পৈত্তিক আশ্লেষ হয়ে ধরা দেয়। তথ্যের পাহাড় আর অ্যালগরিদমের শীতল অরণ্যে যখন মানবিক আবেগগুলো প্রাণহীন সংজ্ঞায় পর্যবসিত, তখন তাঁর কবিতা আমাদের সেই চিরন্তন শেকড়ের স্পন্দন শুনিয়ে যায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—আমরা নিছক কোনো যান্ত্রিক কোড নই, বরং এই বাংলার কর্ষিত মৃত্তিকার এক একটি জীবন্ত নক্ষত্র। চিরকালীনতার আলোয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সৃষ্টিকর্ম কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং তা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অতলস্পর্শী দর্পণ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’ কেবল একটি শোকগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে জাদুকরী বাস্তবতার এক শাশ্বত মহাকাব্য। মাতৃভাষার প্রতি সেই ব্যাকুলতা তিনি গেঁথেছিলেন এইভাবে— “মাগো, ওরা বলে / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো মা, তাই কি হয়?” (কবিতা- ‘মাগো, ওরা বলে’, কাব্যগ্রন্থ- সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, ১৯৮২)।
কুমড়ো ফুল কিংবা লতা-পাতার বুননে তিনি মায়ের আকুতিকে যেভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ঐতিহ্যেরই নামান্তর। বর্তমানের যান্ত্রিক মরুভূমিতে যখন মানুষ তার শিকড় হারিয়ে দিশেহারা, তখন ওবায়দুল্লাহর কবিতা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো নন্দনকাননে, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বাঁচে। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ এই ঋষিপ্রতিম কবি নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও, তিনি রেখে গেছেন এমন এক দার্শনিক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শেখায়—প্রকৃত মুক্তি ঐতিহ্যের বিনাশে নয়, বরং তার পুনর্জাগরণে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আজ কেবল একজন ব্যক্তি বা কবির নাম নয়, তিনি আমাদের পলিমাটির সেই অমর প্রজ্ঞা, যা যুগ-যুগান্তরের ধূলি সরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের শ্বেতপদ্মটিকে জাগিয়ে রাখে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় b_golap@yahoo.com)
বিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নে, যখন বিশ্বসাহিত্য আধুনিকতার রুক্ষ ও যান্ত্রিক অভিঘাতে এক পরিচয়হীন শূন্যতায় নিমজ্জিত ছিল, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর আবির্ভাব ঘটেছিল এক নাক্ষত্রিক স্থপতির মতো। ১৯৩৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার পলিধৌত বাহেরচর গ্রামে যে প্রাণস্পন্দনের শুরু, তা কেবল একটি জীবনের অঙ্কুরোদ্গম ছিল না—বরং তা ছিল একটি উত্তর-ঔপনিবেশিক জাতিসত্তার আত্মপরিচয় সন্ধানের দার্শনিক ইশতেহার। আড়িয়াল খাঁ ও সন্ধ্যা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই বাহেরচরের আদিম পলি আর মরমী আবহ তাঁর সত্তাকে এক দ্বান্দ্বিক অথচ সুষম বিন্যাসে গড়ে তুলেছিল; যেখানে একাধারে মিশে ছিল বাংলার লোকজ সহজপন্থা এবং ইংরেজি সাহিত্যের রাজকীয় আভিজাত্যের ধ্রুপদী দীপ্তি। হার্ভার্ডের বৈশ্বিক প্রশাসনিক ব্যাকরণ আর বাহেরচরের মাটির সোঁদা ঘ্রাণ তাঁর ভেতর এমন এক ‘পোয়েটিক জেনিয়াস’ তৈরি করেছিল, যা আধুনিকতাকে কেবল নাগরিক ড্রয়িংরুমের অলঙ্কার হিসেবে দেখেনি, বরং তাকে নিয়ে গিয়েছিল কর্ষিত জমিন ও ঐতিহ্যের শাশ্বত বেদিতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ কেবল তার বর্তমানের সমষ্টি নয়, বরং সে তার পূর্বপুরুষের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত সংকলন—যেখানে প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস এক একটি শস্যের দানার মতো পবিত্র।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কাব্যভুবনের বিবর্তন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিটি সৃষ্টিই একেকটি অনন্য নান্দনিক অধ্যায়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাতনরী হার’ (১৯৫৫) ছিল রোমান্টিক সংবেদনশীলতা ও লোকজ ছন্দের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন, যেখানে তিনি ঐতিহ্যের অলঙ্কার দিয়ে আধুনিকতার অবয়ব গড়েছিলেন। বিশেষ করে ‘কমলিনী-র হাসি’ গ্রন্থে নারীর শাশ্বত রূপ ও তাঁর অন্তর্লীন হাসিকে তিনি যেভাবে দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্যে জাদুকরী বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। তাঁর কাব্যে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ সুফি দর্শনের সেই চিরন্তন হাহাকারকে আধুনিক নাগরিক চেতনার সাথে যুক্ত করে, যেখানে তিনি মরমী ঢংয়ে প্রশ্ন তোলেন— “তুমি কে / এই অন্ধকারে একা ব’সে আছো? / তোমার চোখের তারা কি নক্ষত্রের প্রতিচ্ছায়া?” (খাঁচার ভিতর অচিন পাখি, ১৯৯৬)। ওবায়দুল্লাহর কাব্যিক শ্রেষ্ঠত্বের শিখর স্পর্শ করে তাঁর কালজয়ী ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ (১৯৮২)। কার্ল ইয়ুং-এর ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতনার তত্ত্বের আলোকে এই কাব্যটি বাঙালির হাজার বছরের নৃতাত্ত্বিক স্মৃতির এক মহাকাব্যিক ইশতেহার। জীবনানন্দ দাশ যে রূপসী বাংলার ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখেছিলেন, ওবায়দুল্লাহ সেই মাটির ইতিহাসকেই দিয়েছেন এক বীরত্বগাথার রূপ। তিনি যখন উচ্চারণ করেন— “আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি / তাঁর করতলে পলিমাটির সৌরভ ছিল / তিনি অতিক্রান্ত পাহাড়ের কথা বলতেন / অরণ্য এবং পদের কথা বলতেন”—তখন তিনি আসলে একজন কবির ব্যক্তি-পরিচয় ছাপিয়ে এক জাতির শেকড়ের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠেন। তাঁর শব্দশৈলী ছিল মিতব্যয়ী কিন্তু আবেদন ছিল মহাজাগতিক। তাঁর সেই বজ্রনির্ঘোষ ঘোষণা আজও আমাদের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে— “যে কবিতা শুনতে জানে না / সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে।” (আমি কিংবদন্তির কথা বলছি, ১৯৮২)।
ঐতিহ্যের এই পুনর্নির্মাণে ওবায়দুল্লাহর তুলনা অনিবার্যভাবে টি. এস. এলিয়টের ‘ঐতিহাসিক বোধ’-এর সাথে চলে আসে। এলিয়ট যেমন পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের আধুনিকায়নের পথ দেখিয়েছিলেন, ওবায়দুল্লাহ তেমনি বাংলার লুপ্তপ্রায় মিথ ও লোকগাথাকে আধুনিক কবিতার শরীরে সঞ্চারিত করে আধুনিকতার একটি ‘দেশজ মডেল’ তৈরি করেছেন। তবে তাঁর মহত্তম বৈশিষ্ট্য ছিল আমলাতন্ত্রের যান্ত্রিক শীতলতা বনাম কবিতার মানবিক উষ্ণতার সার্থক মেলবন্ধন। তিনি যখন বিশ্বব্যাংকের উচ্চপদে কিংবা জাতিসংঘের এফএও (FAO)-এর এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নীতি-নির্ধারণ করেছেন, তখন তাঁর প্রজ্ঞা কেবল ফাইলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কৃষি ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর আমলেই প্রবর্তিত হয়েছিল বৈপ্লবিক ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প, যা ভূমিহীন মানুষের অস্তিত্বের ঠিকানা দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ‘সবুজ বিপ্লবের’ ডাক ছিল মূলত মাটির প্রতি তাঁর এক শৈল্পিক অঙ্গীকার। তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে ভাত ও কবিতা সমার্থক—এই মরমী দর্শনই তাঁর প্রশাসনিক মেধা ও সাহিত্যিক জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছে। বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবে তাঁর গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলগুলো আজও প্রমাণ করে যে, একজন সত্যিকারের কবির চোখে উন্নয়ন কেবল সংখ্যা নয়, বরং মানুষের সামগ্রিক মুক্তি।
শিল্পের এই দায়বদ্ধতা পাবলো নেরুদার মতো তাঁর কাব্যেও প্রকৃতি ও রাজনীতিকে এক পরাবাস্তব রসায়নে গেঁথেছে। ‘বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা’ (১৯৭১) কাব্যগ্রন্থে তাঁর সেই হাহাকার এক রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক শুদ্ধিকরণের নাম। সেখানে তিনি কাতরকণ্ঠে অমোঘ প্রার্থনায় নিমগ্ন হন— “হে ঈশ্বর / আমাদের বৃষ্টির জল দাও / যেন আমাদের পাপ ধুয়ে যায় / যেন শস্যের গহন থেকে আবার জীবন জেগে ওঠে।” (বৃষ্টি ও সাহসী পুরুষের জন্য প্রার্থনা, ১৯৭১)। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনে সিভিল সার্ভিসের (CSP) নবীন কর্মকর্তা হিসেবে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দপ্তরে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর যে সূক্ষ্ম নৈতিক টানাপোড়েন ছিল, তা তিনি জয় করেছিলেন শিল্পের সাহসিকতায়। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম ‘একুশের সংকলন’-এর নেপথ্যে তাঁর অর্থায়ন ও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ। তাঁর সহকর্মীরা বলতেন, ওবায়দুল্লাহ ফাইলে বন্দি কোনো আমলা ছিলেন না, বরং এক ঋজু ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি ক্ষমতার অলিন্দেও তাঁর কবিত্ব ও নৈতিকতাকে অমলিন রেখেছিলেন। তাঁর বাসভবনে ‘আলাপন’-এর বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ছিল মূলত সমকালীন শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের এক মিলনমেলা, যা ক্ষমতার যান্ত্রিকতাকে সৃজনশীলতার স্পর্শে মানবিক করার এক বিরল নজির।
আজ ২০ ২৬ সালের এই নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক সভ্যতায়, যখন মানবসত্তা কৃত্রিম মেধার গোলকধাঁধায় তার আদিম স্পন্দন হারিয়ে ফেলছে, তখন ওবায়দুল্লাহর ‘পলিমাটির সৌরভ’ আমাদের ক্লান্ত অস্তিত্বে এক পৈত্তিক আশ্লেষ হয়ে ধরা দেয়। তথ্যের পাহাড় আর অ্যালগরিদমের শীতল অরণ্যে যখন মানবিক আবেগগুলো প্রাণহীন সংজ্ঞায় পর্যবসিত, তখন তাঁর কবিতা আমাদের সেই চিরন্তন শেকড়ের স্পন্দন শুনিয়ে যায়। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—আমরা নিছক কোনো যান্ত্রিক কোড নই, বরং এই বাংলার কর্ষিত মৃত্তিকার এক একটি জীবন্ত নক্ষত্র। চিরকালীনতার আলোয় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সৃষ্টিকর্ম কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং তা আমাদের আত্মপরিচয়ের এক অতলস্পর্শী দর্পণ। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘মাগো, ওরা বলে’ কেবল একটি শোকগাথা হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে জাদুকরী বাস্তবতার এক শাশ্বত মহাকাব্য। মাতৃভাষার প্রতি সেই ব্যাকুলতা তিনি গেঁথেছিলেন এইভাবে— “মাগো, ওরা বলে / তোমার কোলে শুয়ে / গল্প শুনতে দেবে না। / বলো মা, তাই কি হয়?” (কবিতা- ‘মাগো, ওরা বলে’, কাব্যগ্রন্থ- সহিষ্ণু প্রতীক্ষা, ১৯৮২)।
কুমড়ো ফুল কিংবা লতা-পাতার বুননে তিনি মায়ের আকুতিকে যেভাবে মহাজাগতিক ব্যাপ্তি দিয়েছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী ঐতিহ্যেরই নামান্তর। বর্তমানের যান্ত্রিক মরুভূমিতে যখন মানুষ তার শিকড় হারিয়ে দিশেহারা, তখন ওবায়দুল্লাহর কবিতা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই হারানো নন্দনকাননে, যেখানে আধুনিকতা আর ঐতিহ্য পরস্পরকে আলিঙ্গন করে বাঁচে। ২০০১ সালের ১৯ মার্চ এই ঋষিপ্রতিম কবি নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করলেও, তিনি রেখে গেছেন এমন এক দার্শনিক আলোকবর্তিকা, যা আমাদের শেখায়—প্রকৃত মুক্তি ঐতিহ্যের বিনাশে নয়, বরং তার পুনর্জাগরণে। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ আজ কেবল একজন ব্যক্তি বা কবির নাম নয়, তিনি আমাদের পলিমাটির সেই অমর প্রজ্ঞা, যা যুগ-যুগান্তরের ধূলি সরিয়ে আমাদের অস্তিত্বের শ্বেতপদ্মটিকে জাগিয়ে রাখে।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় b_golap@yahoo.com)
১১ মার্চ, ২০২৬ ১৩:৩৮
১১ মার্চ, ২০২৬ ১৩:১০
১১ মার্চ, ২০২৬ ১২:৫৪
১১ মার্চ, ২০২৬ ১২:৪৫