
২৯ মে, ২০২৫ ১৬:১০
প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ➤ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানান সমস্যায় জর্জরিত। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা। পৃথিবীব্যাপি একটি স্বতঃসিদ্ধ উক্তি আছে- ‘প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচিত হয় সেটির শিক্ষক দ্বারা, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা, মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত প্রয়াসের দ্বারা শিক্ষাকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে।’ অর্থাৎ শিক্ষকরাই হলো প্রতিষ্ঠানের মেইন ফ্যাক্টর বা প্রধান স্তম্ভ তথা মূল চালিকাশক্তি। আমরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি বা করেছি তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা।
শুধু শিক্ষাই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমর্যাদা নিরূপণ হয় শিক্ষা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে- যা মূলত নির্ভর করে শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রয়াসের উপরেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই শিক্ষকরাই নানাভাবে নিগৃহীত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের শোষণ ও অধিকার হরণের মূলে রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে তারা নিজের গদি সুরক্ষা ও কিছু ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের পক্ষে একটি তোষামোদি গ্রুপ সৃষ্টি করেন। নিজের অনুগত বাহিনী তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিদ্যমান ঐক্যের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেন। নানান লোভ-লালসা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আস্থাভাজন শিক্ষকদের নিয়ে দলবাজি শুরু করেন।
ফলে অল্প কিছুদিনেই শিক্ষকদের মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বিভাজন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি ব্রিটিশদের সেই ‘Divide and Rule’ পলিসি অবলম্বন করে নিজের মনের মতো প্রশাসন পরিচালনার অপচেষ্টা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়ে থাকেন নিজের অনুগত সেই তোষামোদি গ্রুপের সহযোগিতায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল, ক্ষমতার দাপট ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হয়। এমন হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ অবনমিত করা হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম পালনে একদল সবসময় সচেষ্ট থাকেন। তাদের কাছে শিক্ষা এবং গবেষণার মূল্য অতি নগণ্য। এদিকে অপর গ্রুপকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। ফলে তারাও শিক্ষা আর গবেষণায় মনোনিবেশ করার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হন।
দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই অবক্ষয়ের চিত্র এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্ণধারদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আজ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নিয়োগের প্রক্রিয়াটাও স্বচ্ছ নয়। কর্ণধার নিয়োগে প্রায়ই মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও ম্যানেজারিয়াল স্কিলনেস, এসব কিছুই বিবেচনা করা হয় না বললেই চলে। নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে তোষামোদি রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংযোগ স্থাপনের দক্ষতা তথা লবিংয়ের উপরই বেশি নির্ভর করে। ফলে অনেক সময়ই প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ফলে এর সরাসরি কুপ্রভাব পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায়।
অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, যার কথা কেউ কখনো চিন্তা করেনি কিংবা যার ওই চেয়ারে বসার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা নেই এমন কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়। লবিং আর তদবিরের জোরে বাগিয়ে নেওয়া হয় চেয়ার। ফলে তাঁর যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সব নিয়মকানুন আর নীতি-নৈতিকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কর্ণধার নিয়োগে সঠিক কোনো নীতিমালা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি, তোষামোদি কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট ঘটনা।
এভাবে অনৈতিক পন্থায় যারা নিয়োগ লাভ করেন সঙ্গত কারণেই তাদের কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহিতা থাকে না। ফলে দায়িত্ব পেয়েই তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেন। অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এসব কারণেই এখন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মিডিয়ার শিরোনাম হয়। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যায়ের কর্নধারদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং চারিত্রিক ও নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের খবর হরহামেশাই শোনা যায়। এজন্য অনেককে চাকরিচ্যুত হয়ে এমনকি শ্রীঘরে পর্যন্ত যেতে হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নানাবিধ বিভাজন সৃষ্টি করেন। এতে তিনি নিজে লাভবান হলেও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। অনেকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে থেকে অনেকে মিথ্যার আশ্রয়, প্রতারণা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, মোনাফেকি আর বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যোগ্যতা হারান তিনি। এসব অযোগ্য ব্যক্তিরা নানান কূটকৌশলে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে নিপতিত করেন।
আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন- ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ দেওয়া হয় না, নিয়োগ নেয়া হয়।ছলেবলে, কৌশলে কিংবা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। ফলে এই নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি, দেশ ও জাতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। তাদের মাঝে থাকে না সততা, দেশপ্রেম, শুদ্ধাচার কিংবা নীতি-নৈতিকতার বালাই। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি- যিনি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন মূলত তাঁর ইচ্ছার উপরেই সবকিছু নির্ভর করে। সর্বত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম এবং কীর্তন হয়। এর ফলে মারাত্মক প্রভাব পড়ে শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে। এসব কারণেই আজ শিক্ষার বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় দেখা দিয়েছে চরম অবক্ষয়। আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে সর্বত্র দৃশ্যমান।
বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান পরিমাপক পদ্ধতি টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) কর্তৃক Ranking-2024’এ বিশ্বের ১০৮ টি দেশের ১,৯০৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের ২১ টি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরের অবস্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ-সাউথ, বাকৃবি, বুয়েট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
তবে এবারই প্রথম দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সামনে চলে এসেছে।
The Times Higher Education World University Ranking-2024 adopts methodology which includes 18 carefully calibrated performance indicators that measure an institution’s performance across five areas: teaching, research environment, research quality, industry, and International outlook.
যে পাঁচটি ইন্ডিকেটরস তথা সূচক দিয়ে শিক্ষার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করা হয় সেগুলোর সব কয়টির সাথেই শিক্ষকগণ ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। সেই শিক্ষকদের নিয়ে যদি নানান বিরোধ ও গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয় তাহলে সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে সন্দেহাতীতভাবে। তাছাড়া কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ভিশন নিয়ে কাজ না করে নিজের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে মহান শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন সেক্ষেত্রে যা হবার তা-ই হবে এবং বর্তমানে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সামগ্রিক বিষয়ে দক্ষতা, মেধা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপরেই মূলত অনেক কিছু নির্ভর করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন যাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ দিলে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন।
সকল বিষয়ে মেধা সৃষ্টি করার পরিবেশ সংরক্ষণ করার প্রাথমিক দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যে কথা দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করেছিলাম তা ছিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কম্পোনেন্ট হলেন শিক্ষক। আর সেই শিক্ষকদের সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের। তাই সততা, নিষ্ঠা ও নীতি-নৈতিকতার সাথেসাথে সব ধরনের লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। এটা না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত হবে।
দেশে শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি মেধা সৃষ্টি করা না যায়, সততা ও দেশপ্রেম তৈরি করা না যায় তাহলে আমরা যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের কথা বলছি তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। শুধু মেধা থাকাই যথেষ্ট নয়। যে মেধার মধ্যে সততা এবং শুদ্ধাচার না থাকে সেই মেধা মূল্যহীন। পক্ষান্তরে এমন মেধা দেশ ও জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। এছাড়া সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) যুগ; যা সম্পূর্ণভাবে নতুন ধারণার উপর ভর করে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে। আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগীকরণ, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতার বিপর্যয় রোধ করতে না পারলে অমানিশার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। #

লেখকঃ প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
প্রাক্তন উপাচার্য,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতা।
প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন ➤ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানান সমস্যায় জর্জরিত। সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা এবং স্বেচ্ছাচারিতা। পৃথিবীব্যাপি একটি স্বতঃসিদ্ধ উক্তি আছে- ‘প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচিত হয় সেটির শিক্ষক দ্বারা, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা, মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ডের সম্মিলিত প্রয়াসের দ্বারা শিক্ষাকর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে।’ অর্থাৎ শিক্ষকরাই হলো প্রতিষ্ঠানের মেইন ফ্যাক্টর বা প্রধান স্তম্ভ তথা মূল চালিকাশক্তি। আমরা যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করি বা করেছি তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকেই আমার আজকের এই লেখার অবতারণা।
শুধু শিক্ষাই নয়, সারা বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মানমর্যাদা নিরূপণ হয় শিক্ষা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে- যা মূলত নির্ভর করে শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রয়াসের উপরেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই শিক্ষকরাই নানাভাবে নিগৃহীত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের শোষণ ও অধিকার হরণের মূলে রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারগণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে তারা নিজের গদি সুরক্ষা ও কিছু ব্যক্তিস্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের পক্ষে একটি তোষামোদি গ্রুপ সৃষ্টি করেন। নিজের অনুগত বাহিনী তৈরি করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বিদ্যমান ঐক্যের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করেন। নানান লোভ-লালসা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজের পক্ষে টেনে আস্থাভাজন শিক্ষকদের নিয়ে দলবাজি শুরু করেন।
ফলে অল্প কিছুদিনেই শিক্ষকদের মধ্যে সুস্পষ্ট একটি বিভাজন তৈরি হয়। এক্ষেত্রে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি ব্রিটিশদের সেই ‘Divide and Rule’ পলিসি অবলম্বন করে নিজের মনের মতো প্রশাসন পরিচালনার অপচেষ্টা করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হয়ে থাকেন নিজের অনুগত সেই তোষামোদি গ্রুপের সহযোগিতায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল, ক্ষমতার দাপট ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যই এসব করা হয়। এমন হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার মানসেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এবং শিক্ষার পরিবেশ অবনমিত করা হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম পালনে একদল সবসময় সচেষ্ট থাকেন। তাদের কাছে শিক্ষা এবং গবেষণার মূল্য অতি নগণ্য। এদিকে অপর গ্রুপকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। ফলে তারাও শিক্ষা আর গবেষণায় মনোনিবেশ করার পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হন।
দেশের শিক্ষাঙ্গনে এই অবক্ষয়ের চিত্র এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। কর্ণধারদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য আজ শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নিয়োগের প্রক্রিয়াটাও স্বচ্ছ নয়। কর্ণধার নিয়োগে প্রায়ই মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা, সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও ম্যানেজারিয়াল স্কিলনেস, এসব কিছুই বিবেচনা করা হয় না বললেই চলে। নিয়োগ প্রদানের ক্ষেত্রে তোষামোদি রাজনৈতিক বিবেচনা ও সংযোগ স্থাপনের দক্ষতা তথা লবিংয়ের উপরই বেশি নির্ভর করে। ফলে অনেক সময়ই প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না এসব নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। ফলে এর সরাসরি কুপ্রভাব পড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায়।
অনেক সময় এমনও দেখা যায় যে, যার কথা কেউ কখনো চিন্তা করেনি কিংবা যার ওই চেয়ারে বসার বিন্দুমাত্র যোগ্যতা নেই এমন কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়। লবিং আর তদবিরের জোরে বাগিয়ে নেওয়া হয় চেয়ার। ফলে তাঁর যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সব নিয়মকানুন আর নীতি-নৈতিকতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের কর্ণধার নিয়োগে সঠিক কোনো নীতিমালা না থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বজনপ্রীতি, তোষামোদি কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে কার্যসম্পাদন হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেট ঘটনা।
এভাবে অনৈতিক পন্থায় যারা নিয়োগ লাভ করেন সঙ্গত কারণেই তাদের কোনো দায়বদ্ধতা কিংবা জবাবদিহিতা থাকে না। ফলে দায়িত্ব পেয়েই তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন। সর্বক্ষেত্রে স্বৈরাচারী আচরণ শুরু করেন। অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জন করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। এসব কারণেই এখন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মিডিয়ার শিরোনাম হয়। বেশকিছু বিশ্ববিদ্যায়ের কর্নধারদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার এবং চারিত্রিক ও নৈতিক স্খলনসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগের খবর হরহামেশাই শোনা যায়। এজন্য অনেককে চাকরিচ্যুত হয়ে এমনকি শ্রীঘরে পর্যন্ত যেতে হয়।
অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নানাবিধ বিভাজন সৃষ্টি করেন। এতে তিনি নিজে লাভবান হলেও শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। অনেকে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে থেকে অনেকে মিথ্যার আশ্রয়, প্রতারণা, কথা দিয়ে কথা না রাখা, মোনাফেকি আর বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। ফলে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যোগ্যতা হারান তিনি। এসব অযোগ্য ব্যক্তিরা নানান কূটকৌশলে কাঙ্ক্ষিত নিয়োগ বাগিয়ে নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণাকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে নিপতিত করেন।
আমার এক বন্ধু আক্ষেপ করে বলেন- ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ দেওয়া হয় না, নিয়োগ নেয়া হয়।ছলেবলে, কৌশলে কিংবা মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে। ফলে এই নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি, দেশ ও জাতির প্রতি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না। তাদের মাঝে থাকে না সততা, দেশপ্রেম, শুদ্ধাচার কিংবা নীতি-নৈতিকতার বালাই। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি- যিনি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হন মূলত তাঁর ইচ্ছার উপরেই সবকিছু নির্ভর করে। সর্বত্র কর্তার ইচ্ছায় কর্ম এবং কীর্তন হয়। এর ফলে মারাত্মক প্রভাব পড়ে শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে। এসব কারণেই আজ শিক্ষার বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় দেখা দিয়েছে চরম অবক্ষয়। আমাদের ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থার প্রভাব বর্তমানে সুস্পষ্টভাবে সর্বত্র দৃশ্যমান।
বিশ্বের বহুল প্রচলিত ও স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণগত মান পরিমাপক পদ্ধতি টাইমস হায়ার এডুকেশন (THE) কর্তৃক Ranking-2024’এ বিশ্বের ১০৮ টি দেশের ১,৯০৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে বাংলাদেশের ২১ টি বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে ৮০১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে স্থান পেয়েছে। এরমধ্যে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরের অবস্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এরপরে পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ-সাউথ, বাকৃবি, বুয়েট, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।
তবে এবারই প্রথম দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পেছনে ফেলে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সামনে চলে এসেছে।
The Times Higher Education World University Ranking-2024 adopts methodology which includes 18 carefully calibrated performance indicators that measure an institution’s performance across five areas: teaching, research environment, research quality, industry, and International outlook.
যে পাঁচটি ইন্ডিকেটরস তথা সূচক দিয়ে শিক্ষার মানদণ্ড বিশ্লেষণ করা হয় সেগুলোর সব কয়টির সাথেই শিক্ষকগণ ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। সেই শিক্ষকদের নিয়ে যদি নানান বিরোধ ও গ্রুপিং সৃষ্টি করা হয় তাহলে সবকিছুই মুখ থুবড়ে পড়বে সন্দেহাতীতভাবে। তাছাড়া কেউ যদি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ভিশন নিয়ে কাজ না করে নিজের ব্যক্তিগত হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য নিয়ে মহান শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন সেক্ষেত্রে যা হবার তা-ই হবে এবং বর্তমানে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের সামগ্রিক বিষয়ে দক্ষতা, মেধা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপরেই মূলত অনেক কিছু নির্ভর করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক মেধাবী শিক্ষক আছেন যাদেরকে উপযুক্ত পরিবেশ ও সুযোগ দিলে তারা শিক্ষা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন।
সকল বিষয়ে মেধা সৃষ্টি করার পরিবেশ সংরক্ষণ করার প্রাথমিক দায়িত্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। যে কথা দিয়ে আমার লেখাটা শুরু করেছিলাম তা ছিল সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কম্পোনেন্ট হলেন শিক্ষক। আর সেই শিক্ষকদের সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনার দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠান প্রধানের। তাই সততা, নিষ্ঠা ও নীতি-নৈতিকতার সাথেসাথে সব ধরনের লোভ-লালসার উর্ধ্বে উঠে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে হবে। এটা না পারলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত হবে।
দেশে শিক্ষার্থীর মধ্যে যদি মেধা সৃষ্টি করা না যায়, সততা ও দেশপ্রেম তৈরি করা না যায় তাহলে আমরা যে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মানের কথা বলছি তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। শুধু মেধা থাকাই যথেষ্ট নয়। যে মেধার মধ্যে সততা এবং শুদ্ধাচার না থাকে সেই মেধা মূল্যহীন। পক্ষান্তরে এমন মেধা দেশ ও জাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। এছাড়া সামনে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) যুগ; যা সম্পূর্ণভাবে নতুন ধারণার উপর ভর করে সকল ক্ষেত্রে উন্নয়নের পথ প্রদর্শক হিসাবে কাজ করবে। আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবেই গড়ে তুলতে হবে। বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগীকরণ, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ এবং শিক্ষকদের নীতি-নৈতিকতার বিপর্যয় রোধ করতে না পারলে অমানিশার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। #

লেখকঃ প্রফেসর ড. সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেন
প্রাক্তন উপাচার্য,
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম নেতা।
১৮ জুলাই, ২০২৬ ০২:৩৩
১৭ জুলাই, ২০২৬ ২০:৩৭
১৭ জুলাই, ২০২৬ ১৮:০৮
১৭ জুলাই, ২০২৬ ১৪:১৭

১২ জুলাই, ২০২৬ ১৩:০৪
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা একটি পদ্ধতিগত স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণমানুষের এক অভূতপূর্ব ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন নতুন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আগামীকাল ১৩ জুলাই, ২০২৬, সোমবার শস্যভাণ্ডার খ্যাত ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জনপদে তাঁর এই প্রথম আনুষ্ঠানিক শুভ আগমন। এই ঐতিহাসিক আগমনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ জনপদের কোটি মানুষের মাঝে যে বিপুল আবেগ, গভীর উন্মুখতা এবং হৃদয়ের সুতীব্র আকুলতা দৃশ্যমান, তা কেবল একজন জনপ্রিয় নেতার প্রতি সাধারণ রাজনৈতিক আনুগত্য নয়- বরং এটি হলো দীর্ঘদিনের অবদমিত, বঞ্চিত এবং সুপরিকল্পিতভাবে প্রান্তিকীকরণে বাধ্য করা একটি ভৌগোলিক জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণ।
একজন অপরাধবিজ্ঞানী (Criminologist) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে যখন আমি বরিশালের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূচিত্র অবলোকন করি, তখন জনগণের এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশার আড়ালে এক গভীর নাগরিক পরিপক্বতা লক্ষ করি। এখানে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, কোনো তাড়াহুড়া কিংবা অতি-উচ্ছ্বাসের আতিশয্য নেই। দীর্ঘ স্বৈরাচারের নির্যাতন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন সয়ে সয়ে এই জনপদের মানুষ যে ধৈর্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে, আজ তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তাদের প্রাণপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ককে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদায় বরণ করে নেওয়ার সুশৃঙ্খল মানসিকতার মধ্য দিয়ে।
স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষত এবং বরিশালের পদ্ধতিগত প্রান্তিকীকরণ: একটি অপরাধবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ: বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার বাংলাদেশের যে কয়টি জনপদকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাঞ্জাবিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও আক্ষরিক অর্থেই ‘জাহান্নাম’ বানিয়ে ফেলেছিল, তার মধ্যে বরিশাল ছিল অন্যতম। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে আমরা বলতে পারি “State-Sponsored Structural Crime” বা রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষিত কাঠামোগত অপরাধ। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া, সেখানকার অবকাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এবং জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করা এক ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক অপরাধ।
বিগত সরকারের আমলে বরিশাল বিভাগকে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত দেড় দশকে সরকারের মেগা প্রজেক্টগুলোর বণ্টন এবং regional budget allocation বা আঞ্চলিক বাজেট বরাদ্দে বরিশাল বিভাগ সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেয়েছে। শুধু তা-ই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা এই উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি বড় অংশই পদ্ধতিগত দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের কারণে অপচয় ও পাচার হয়েছে। টিআইবি’র তথ্যমতে, জলবায়ু প্রকল্পের বড় অঙ্কের অর্থ রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে লোপাট হওয়ায় বরিশালের নদীভাঙন কবলিত মানুষগুলো আরও বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।
একইভাবে, বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর সাম্প্রতিক দারিদ্র্য ম্যাপ ও অর্থনৈতিক সূচকগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যোগাযোগের অভাব, শিল্পায়নের অনুপস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের চরম সংকটের কারণে বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি ছিল। ফ্যাসিবাদী চক্র এই অঞ্চলকে কেবল তাদের ভোট ব্যাংক কিংবা বলপ্রয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, কিন্তু বিনিময়ে বরিশালের মানুষকে দিয়েছে কেবলই বঞ্চনা আর অবক্ষয়।
শতভাগ ব্যালট বিপ্লব: জনগণের উপহার ও আস্থার চুক্তি: ফ্যাসিবাদের সেই দুঃসহ অন্ধকারের মোক্ষম জবাব বরিশালের সচেতন জনগণ দিয়েছে ২০২৬ সালের নির্বাচনে। বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি সংসদীয় আসনের সবকয়টিতেই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জনাব তারেক রহমানের মনোনীত প্রার্থীদের তথা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) বিপুল ভোটে জয়ী করে এক অবিস্মরণীয় ‘ব্যালট বিপ্লব’ ঘটিয়েছে। এই শতভাগ আসন উপহার দেওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক বিজয় নয়; রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি হলো জনগণের পক্ষ থেকে তাদের নেতার সাথে একটি “Social Contract” বা সামাজিক ও রাজনৈতিক আস্থার চুক্তি।
বরিশালের মানুষ তাদের ভোটকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রমাণ করেছে যে, জুলুম, নির্যাতন এবং গুম-খুনের অপরাজনীতি দিয়ে এই অঞ্চলের সাহসী জনতাকে দাবিয়ে রাখা যায় না। তারা তাদের প্রাণের নেতাকে সকল আসন উপহার দিয়ে মূলত এই নতুন বাংলাদেশের পুনর্গঠনে এবং দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় নিজেদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করেছে।
বৈশ্বিক উন্নয়ন অংশীদারদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বরিশালের রূপান্তর সম্ভাবনা: নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো সমতাভিত্তিক উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসমূহ বাংলাদেশের এই নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সুশাসন এবং জবাবদিহিমূলক নীতির প্রতি গভীর আস্থা ব্যক্ত করছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নীতি:
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি বিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণে যে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তার সুফল সরাসরি গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করবে। বরিশাল যেহেতু দীর্ঘকাল ধরে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার, তাই বিশ্বব্যাংকের সহায়তাপুষ্ট নতুন প্রকল্পগুলো এই অঞ্চলের সুশাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
এডিবি’র অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও যোগাযোগ খাত: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) সম্প্রতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিশেষ করে পরিবহন অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগের (Transport Connectivity) ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি অনুমোদন করেছে। এডিবি’র এই স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন পলিসি বরিশালের জন্য একটি আশীর্বাদ। ‘বাংলার ভেনিস’ খ্যাত বরিশালের নদীভিত্তিক অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নৌপথের আধুনিকায়ন, পায়রা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে এডিবি’র এই নতুন অর্থায়ন অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।
টিআইবি’র দুর্নীতিমুক্ত টেকসই মডেল: Transparency International Bangladesh (TIB)-এর প্রস্তাবিত দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক মডেলকে ধারণ করে নতুন প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তাতে বরিশালের স্থানীয় প্রশাসন, টেন্ডারবাজি ও নদীশাসন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। ফলে প্রতিটি সরকারি টাকার শতভাগ সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
আকাশচুম্বী প্রত্যাশা বনাম জনগণের রাজনৈতিক পরিপক্বতা: একটি দীর্ঘ অত্যাচারিত জনপদের মানুষের প্রত্যাশা নতুন নেতার কাছে আকাশচুম্বী হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বরিশালের জনগণের রাজনৈতিক চেতনা অত্যন্ত গভীর। তারা বোঝেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার দীর্ঘ ১৫ বছরে রাষ্ট্রের যে গভীর ক্ষত ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গেছে, তা রাতারাতি বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় দূর করা সম্ভব নয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি টেকসই স্বনির্ভর রাষ্ট্র নির্মাণ করতে সময় এবং ধৈর্যের প্রয়োজন।
তাই তো বরিশালের মানুষের মাঝে কোনো ক্ষোভ, তাড়া কিংবা অযৌক্তিক দাবি আদায়ের কোনো উগ্র বাড়াবাড়ি নেই। তাদের সমস্ত মনোযোগ এখন তাদের প্রিয় নেতাকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, নিখাদ ভালোবাসা এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানানোর আয়োজনে। এই সুশৃঙ্খল আচরণ বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ কেবল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই করেনি, তারা উন্নত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চাতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় বরিশাল: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বরিশাল সফর কেবল একটি রুটিন রাষ্ট্রীয় সফর নয়। এটি মূলত ফ্যাসিবাদের অন্ধকার থেকে মুক্ত হওয়া এক নতুন সুপ্রভাতের দিকে বরিশালের যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা। এই সফরের মধ্য দিয়ে বরিশালের অবহেলিত গ্যাস সংযোগ, বন্ধ হয়ে থাকা শিল্পকারখানা সচল করা, আইটি পার্ক স্থাপন এবং কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পায়নের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
এক সময়ের অবহেলিত, শোষিত ও জাহান্নামে পরিণত করা বরিশাল আজ ডানা ঝাপটে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠছে। প্রিয় নেতার হাত ধরে এই জনপদ তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের এক অনন্য রোল মডেলে পরিণত হবে -এটাই আজ সমগ্র বরিশালবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস। গণতন্ত্রের নবযাত্রার কাণ্ডারি, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি- লক্ষ কোটি মানুষের ভালোবাসার এই বরিশালে আপনাকে জানাই প্রাণঢালা সুস্বাগতম!
লেখক:
অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা একটি পদ্ধতিগত স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণমানুষের এক অভূতপূর্ব ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন নতুন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আগামীকাল ১৩ জুলাই, ২০২৬, সোমবার শস্যভাণ্ডার খ্যাত ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জনপদে তাঁর এই প্রথম আনুষ্ঠানিক শুভ আগমন। এই ঐতিহাসিক আগমনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ জনপদের কোটি মানুষের মাঝে যে বিপুল আবেগ, গভীর উন্মুখতা এবং হৃদয়ের সুতীব্র আকুলতা দৃশ্যমান, তা কেবল একজন জনপ্রিয় নেতার প্রতি সাধারণ রাজনৈতিক আনুগত্য নয়- বরং এটি হলো দীর্ঘদিনের অবদমিত, বঞ্চিত এবং সুপরিকল্পিতভাবে প্রান্তিকীকরণে বাধ্য করা একটি ভৌগোলিক জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক মনস্তাত্ত্বিক বিস্ফোরণ।
একজন অপরাধবিজ্ঞানী (Criminologist) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক হিসেবে যখন আমি বরিশালের এই রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূচিত্র অবলোকন করি, তখন জনগণের এই আকাশচুম্বী প্রত্যাশার আড়ালে এক গভীর নাগরিক পরিপক্বতা লক্ষ করি। এখানে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, কোনো তাড়াহুড়া কিংবা অতি-উচ্ছ্বাসের আতিশয্য নেই। দীর্ঘ স্বৈরাচারের নির্যাতন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়ন সয়ে সয়ে এই জনপদের মানুষ যে ধৈর্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে, আজ তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে তাদের প্রাণপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ককে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক মর্যাদায় বরণ করে নেওয়ার সুশৃঙ্খল মানসিকতার মধ্য দিয়ে।
স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষত এবং বরিশালের পদ্ধতিগত প্রান্তিকীকরণ: একটি অপরাধবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ: বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার বাংলাদেশের যে কয়টি জনপদকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাঞ্জাবিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত ও আক্ষরিক অর্থেই ‘জাহান্নাম’ বানিয়ে ফেলেছিল, তার মধ্যে বরিশাল ছিল অন্যতম। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় একে আমরা বলতে পারি “State-Sponsored Structural Crime” বা রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষিত কাঠামোগত অপরাধ। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া, সেখানকার অবকাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া এবং জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ করা এক ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক অপরাধ।
বিগত সরকারের আমলে বরিশাল বিভাগকে চরম অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত দেড় দশকে সরকারের মেগা প্রজেক্টগুলোর বণ্টন এবং regional budget allocation বা আঞ্চলিক বাজেট বরাদ্দে বরিশাল বিভাগ সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেয়েছে। শুধু তা-ই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা এই উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের একটি বড় অংশই পদ্ধতিগত দুর্নীতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের কারণে অপচয় ও পাচার হয়েছে। টিআইবি’র তথ্যমতে, জলবায়ু প্রকল্পের বড় অঙ্কের অর্থ রাজনৈতিক দুর্নীতির কারণে লোপাট হওয়ায় বরিশালের নদীভাঙন কবলিত মানুষগুলো আরও বেশি প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।
একইভাবে, বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর সাম্প্রতিক দারিদ্র্য ম্যাপ ও অর্থনৈতিক সূচকগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যোগাযোগের অভাব, শিল্পায়নের অনুপস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের চরম সংকটের কারণে বরিশাল বিভাগে দারিদ্র্যের হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি ছিল। ফ্যাসিবাদী চক্র এই অঞ্চলকে কেবল তাদের ভোট ব্যাংক কিংবা বলপ্রয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, কিন্তু বিনিময়ে বরিশালের মানুষকে দিয়েছে কেবলই বঞ্চনা আর অবক্ষয়।
শতভাগ ব্যালট বিপ্লব: জনগণের উপহার ও আস্থার চুক্তি: ফ্যাসিবাদের সেই দুঃসহ অন্ধকারের মোক্ষম জবাব বরিশালের সচেতন জনগণ দিয়েছে ২০২৬ সালের নির্বাচনে। বরিশাল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি সংসদীয় আসনের সবকয়টিতেই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জনাব তারেক রহমানের মনোনীত প্রার্থীদের তথা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) বিপুল ভোটে জয়ী করে এক অবিস্মরণীয় ‘ব্যালট বিপ্লব’ ঘটিয়েছে। এই শতভাগ আসন উপহার দেওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি রাজনৈতিক বিজয় নয়; রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি হলো জনগণের পক্ষ থেকে তাদের নেতার সাথে একটি “Social Contract” বা সামাজিক ও রাজনৈতিক আস্থার চুক্তি।
বরিশালের মানুষ তাদের ভোটকে একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে প্রমাণ করেছে যে, জুলুম, নির্যাতন এবং গুম-খুনের অপরাজনীতি দিয়ে এই অঞ্চলের সাহসী জনতাকে দাবিয়ে রাখা যায় না। তারা তাদের প্রাণের নেতাকে সকল আসন উপহার দিয়ে মূলত এই নতুন বাংলাদেশের পুনর্গঠনে এবং দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় নিজেদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করেছে।
বৈশ্বিক উন্নয়ন অংশীদারদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বরিশালের রূপান্তর সম্ভাবনা: নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো সমতাভিত্তিক উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসমূহ বাংলাদেশের এই নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সুশাসন এবং জবাবদিহিমূলক নীতির প্রতি গভীর আস্থা ব্যক্ত করছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নীতি:
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি বিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালীকরণে যে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তার সুফল সরাসরি গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করবে। বরিশাল যেহেতু দীর্ঘকাল ধরে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার, তাই বিশ্বব্যাংকের সহায়তাপুষ্ট নতুন প্রকল্পগুলো এই অঞ্চলের সুশাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।
এডিবি’র অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ ও যোগাযোগ খাত: এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) সম্প্রতি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিশেষ করে পরিবহন অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সংযোগের (Transport Connectivity) ওপর বিশেষ জোর দিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তা চুক্তি অনুমোদন করেছে। এডিবি’র এই স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন পলিসি বরিশালের জন্য একটি আশীর্বাদ। ‘বাংলার ভেনিস’ খ্যাত বরিশালের নদীভিত্তিক অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ নৌপথের আধুনিকায়ন, পায়রা বন্দরের পূর্ণাঙ্গ রূপান্তর এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশে এডিবি’র এই নতুন অর্থায়ন অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।
টিআইবি’র দুর্নীতিমুক্ত টেকসই মডেল: Transparency International Bangladesh (TIB)-এর প্রস্তাবিত দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক মডেলকে ধারণ করে নতুন প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, তাতে বরিশালের স্থানীয় প্রশাসন, টেন্ডারবাজি ও নদীশাসন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। ফলে প্রতিটি সরকারি টাকার শতভাগ সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
আকাশচুম্বী প্রত্যাশা বনাম জনগণের রাজনৈতিক পরিপক্বতা: একটি দীর্ঘ অত্যাচারিত জনপদের মানুষের প্রত্যাশা নতুন নেতার কাছে আকাশচুম্বী হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বরিশালের জনগণের রাজনৈতিক চেতনা অত্যন্ত গভীর। তারা বোঝেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার দীর্ঘ ১৫ বছরে রাষ্ট্রের যে গভীর ক্ষত ও প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গেছে, তা রাতারাতি বা জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় দূর করা সম্ভব নয়। ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি টেকসই স্বনির্ভর রাষ্ট্র নির্মাণ করতে সময় এবং ধৈর্যের প্রয়োজন।
তাই তো বরিশালের মানুষের মাঝে কোনো ক্ষোভ, তাড়া কিংবা অযৌক্তিক দাবি আদায়ের কোনো উগ্র বাড়াবাড়ি নেই। তাদের সমস্ত মনোযোগ এখন তাদের প্রিয় নেতাকে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, নিখাদ ভালোবাসা এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানানোর আয়োজনে। এই সুশৃঙ্খল আচরণ বিশ্ব দরবারে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ কেবল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই করেনি, তারা উন্নত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চাতেও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
একটি নতুন ভোরের অপেক্ষায় বরিশাল: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বরিশাল সফর কেবল একটি রুটিন রাষ্ট্রীয় সফর নয়। এটি মূলত ফ্যাসিবাদের অন্ধকার থেকে মুক্ত হওয়া এক নতুন সুপ্রভাতের দিকে বরিশালের যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা। এই সফরের মধ্য দিয়ে বরিশালের অবহেলিত গ্যাস সংযোগ, বন্ধ হয়ে থাকা শিল্পকারখানা সচল করা, আইটি পার্ক স্থাপন এবং কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পায়নের এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
এক সময়ের অবহেলিত, শোষিত ও জাহান্নামে পরিণত করা বরিশাল আজ ডানা ঝাপটে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠছে। প্রিয় নেতার হাত ধরে এই জনপদ তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের এক অনন্য রোল মডেলে পরিণত হবে -এটাই আজ সমগ্র বরিশালবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস। গণতন্ত্রের নবযাত্রার কাণ্ডারি, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এমপি- লক্ষ কোটি মানুষের ভালোবাসার এই বরিশালে আপনাকে জানাই প্রাণঢালা সুস্বাগতম!
লেখক:
অধ্যাপক ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অপরাধ বিশ্লেষক।

১৪ জুন, ২০২৬ ১৯:১৩
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে আর্নেস্তো চে গুয়েভারা একটি অত্যন্ত জটিল, বহুমাত্রিক এবং তুমুল বিতর্কিত নাম। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার সান্তা ফে শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না। কালক্রমে তিনি বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলমুক্তির এক অবিনাশী প্রতীকে পরিণত হন। তবে সমকালীন ইতিহাসচর্চা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্মেদ আলোয় চে গুয়েভারা কেবল একজন রোমান্টিক গেরিলা নেতা নন। তিনি একই সাথে একজন কট্টর মার্ক্সবাদী সামরিক তত্ত্ববিদ, কিউবা বিপ্লবের প্রধান স্থপতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাস্তবতায় এক তীব্র বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন, রাজনৈতিক দর্শন এবং সামরিক কৌশলকে বুঝতে হলে কেবল স্তুতিগাথা যথেষ্ট নয়। এর জন্য তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক চুক্তির মারপ্যাঁচ এবং ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের একটি নির্মোহ মূল্যায়ন অপরিহার্য।
সান্তা ফে শহরে জন্মের পর আর্নেস্তোর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল এক মননশীল ও উদার পারিবারিক আবহে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই তিনি তীব্র হাঁপানি রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যা তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পিছু ছাড়েনি। কিন্তু এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর অদম্য প্রাণশক্তিকে দমাতে পারেনি; বরং এটি তাঁকে আরও জেদি ও লড়াকু করে তোলে। তাঁর পরিবারে ছিল তিন হাজারেরও বেশি বইয়ের এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, যেখানে ডুব দিয়ে কিশোর আর্নেস্তো কার্ল মার্ক্স, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন থেকে শুরু করে পাবলো নেরুদা, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং জঁ-পল সার্ত্রের দর্শনের সাথে পরিচিত হন। একই সাথে দাবা খেলা ও খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র ঝোঁক। ১৯৪৭ সালে তিনি বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন। চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনকারী এই তরুণ মূলত মানুষের রোগমুক্তির স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু মানবসমাজের গভীরে প্রোথিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাধিটি তাঁকে আরও বেশি তাড়িত করেছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই ছাত্রটির বৈপ্লবিক চেতনার প্রধান রূপান্তর ঘটেছিল ১৯৫২ সালের প্রথমার্ধে নেওয়া লাতিন আমেরিকা পরিভ্রমণের মাধ্যমে। বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোকে সাথে নিয়ে এক জরাজীর্ণ মোটরসাইকেলে তিনি এই সফরে বের হন। এই সফর সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে ছিল না, এটি মূলত আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পথিমধ্যে চিলির লস অ্যাঞ্জেলেস নামক স্থানে মোটরসাইকেলটি চিরতরে অচল হয়ে যায় এবং বাকি পথ তাঁরা পায়ে হেঁটে, ট্রাকে বা ভেলায় পাড়ি দিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ ভ্রমণ কেবল কোনো ভৌগোলিক পর্যটন ছিল না, এটি ছিল লাতিন আমেরিকার খনি শ্রমিকদের অমানবিক শ্রম ও আদিবাসীদের চরম অবহেলিত জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। পেরুর আমাজন অববাহিকার সান পাবলো কুষ্ঠাশ্রমে কুষ্ঠরোগীদের সামাজিক ও শারীরিক বিচ্ছিন্নতা তরুণ আর্নেস্তোকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই ভ্রমণের পরপরই ১৯৫৩ সালে তিনি বলিভিয়ায় যান এবং সেখানে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা খনি শ্রমিকদের ক্ষমতা ও সংস্কারের প্রথম বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেন, যা তাঁর সমাজতান্ত্রিক ভাবনাকে আরও তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করে।
এই বৈপ্লবিক বোধ চে-র চিন্তাধারায় এক ধরনের আপসহীন মানসিকতা তৈরি করে। ১৯৫৩ সালের শেষভাগে গুয়াতেমালায় অবস্থানকালীন ওখানকার সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী নির্বাসিতরা তাঁর কথার মাঝে আর্জেন্টিনার আঞ্চলিক সম্বোধন ‘চে’ (যার অর্থ বন্ধু বা ভাই) ব্যবহারের অভ্যাসের কারণে তাঁকে ভালোবেসে প্রথম ‘চে’ নামে ডাকতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় পেরুর নির্বাসিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিবিদ হিল্ডা গাদিয়ার সাথে। হিল্ডা গাদিয়াই চে-কে প্রথম উচ্চতর মার্ক্সবাদী দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং মেক্সিকোতে নির্বাসিত থাকাকালীন ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর সাথে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেন। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এই অভিযানের মূল উস্কানিদাতা ছিল মার্কিন বহুজাতিক ফল বিপণন সংস্থা 'ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি', যাদের বিশাল ভূ-সম্পত্তি আরবেনজ সরকার ভূমি সংস্কার আইনের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। এই ঘটনা চে-র সেই সশস্ত্র দর্শনকে আরও দৃঢ় করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বা নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। শোষক শ্রেণী কখনো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। কাস্ত্রোর ‘২৬শে জুলাই আন্দোলন’-এ যোগ দিয়ে ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি 'গ্রানমা' নামক জাহাজে চড়ে কিউবায় অবতরণ করেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রার গেরিলা যুদ্ধে চে তাঁর বিখ্যাত ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটান। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি ছোট ও সুসংগঠিত গেরিলা অগ্রবর্তী দল গণ-আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ছাড়াই একটি দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতির সূচনা করতে পারে। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে চে-র নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘সান্তা ক্লারার যুদ্ধ’-এ বাতিস্তার সামরিক ট্রেনের ওপর আক্রমণ কিউবা বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় নির্ধারণ করে এবং ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি স্বৈরাচারী বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে কিউবার মাটিতে এই বিপ্লবী মডেল সফল হয়।
কিউবার বিপ্লবোত্তর পুনর্গঠন পর্বে চে গুয়েভারা যে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা আজো তীব্র সমালোচনার উৎস। বাতিস্তা সরকারের পতনের পর ১৯৫৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবী সরকার কর্তৃক কিউবার ১৯৪০ সালের সংবিধানে 'আইনি ধারা ১২' সংশোধন করে একটি বিশেষ ডিক্রি জারির মাধ্যমে চে গুয়েভারাকে 'জন্মসূত্রে কিউবান নাগরিক' হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা ছিল কিউবার ইতিহাসে এক বিরল আইনি ঘটনা। ১৯৫৯ সালের প্রথমভাগে হাভানার ‘লা কাবানিয়া’ দুর্গের সামরিক প্রধান হিসেবে বাতিস্তা সরকারের সহযোগী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল। বাতিস্তা সরকারের তৎকালীন ১৯৩৮ সালের 'প্রতিরক্ষা সামাজিক কোড' এবং বিপ্লবী সরকারের 'আইনি ডিক্রি নম্বর ২০৮' ও 'বিপ্লবী আইন নম্বর ১১'-এর আওতায় এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালিত হয়েছিল। এই সময় আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে চে-র একটি উক্তি আজো দালিলিক প্রমাণ হিসেবে বিতর্ক তৈরি করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, "বিচার বিভাগীয় প্রমাণের উপস্থাপনা বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালগুলোর জন্য অপ্রয়োজনীয়, এটি একটি বিপ্লবী যুদ্ধ।" পশ্চিমা ঐতিহাসিক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো আন্তর্জাতিক আইনি বিধিমালা বা আসামিপক্ষের যথাযথ আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অনুসৃত হয়নি। সেখানে বাতিস্তা সরকারের বেশ কিছু সহযোগীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যার সঠিক সংখ্যা নিয়ে আজো ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই একে রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও রাষ্ট্রীয় ভিন্নমত দমনের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। উল্লেখ্য, সমাজতন্ত্রের প্রতি অনুপযুক্ত নাগরিকদের কৃষি-শ্রমশিবিরে পাঠানোর বিতর্কিত প্রক্রিয়াটি কিউবায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৬৫ সালের শেষভাগে, যার নাম ছিল 'উৎপাদনে সহায়তার জন্য সামরিক ইউনিট'। তখন চে কিউবা ছেড়ে চলে গেছেন, ফলে তিনি সেই ক্যাম্পের সরাসরি পরিচালক ছিলেন না। তবে তাঁর তৈরি নতুন মানব তত্ত্বের কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক শুদ্ধিবাদ এই ক্যাম্প তৈরিতে গভীর আদেশিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
এর পাশাপাশি, সমাজতান্ত্রিক কিউবার শিল্পমন্ত্রী এবং জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তাঁর অর্থনৈতিক নীতিগুলো চরম প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। পুঁজিবাদের প্রতি তীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করতে তিনি জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কিউবান মুদ্রার নোটগুলোতে নিজের পুরো নামের বদলে শুধু অবহেলাভরে ‘চে’ লিখে স্বাক্ষর করতেন, যা ছিল বিশ্ব ব্যাংকিং ইতিহাসের এক অভিনব দালিলিক কূটাভাস। চে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ "কিউবায় সমাজতন্ত্র এবং মানুষ"-এ এক নতুন মানব ধারণার অবতারণা করেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ বা বস্তুগত লাভ ত্যাগ করে কেবল নৈতিক চেতনা ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করবে। মানুষের সহজাত মনস্তত্ত্ব ও বাজার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এই অতি-উগ্র অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং অবাস্তব দ্রুত শিল্পায়ন নীতির কারণে কিউবার উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে কিউবান অর্থনীতিতে বিখ্যাত 'শিল্প বনাম কৃষি উৎপাদন বিতর্ক' শুরু হয়, যেখানে সোভিয়েত ব্লকের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার বিরোধিতা করে চে কিউবাকে একতরফা ভারী শিল্পের দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করেন, যা চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। চিনি শিল্পের ওপর মারাত্মক ধস নামে। ফলে কিউবা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ সোভিয়েত-নির্ভর হয়ে পড়ে। এমনকি ১৯৬২ সালের বিখ্যাত 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' বা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন কিউবার মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগোচরে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, চে তা সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু পরে কিউবাকে অন্ধকারে রেখে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ফিরিয়ে নেন, তখন চে একে সোভিয়েত ইউনিয়নের চরম সাম্রাজ্যবাদী আপস ও বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করেন।
চে গুয়েভারার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের চীন-সোভিয়েত বিভাজন এবং সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের সাথে তাঁর সংঘাত। চে ক্রুশ্চেভ-এর পশ্চিমা পুঁজিবাদের সাথে "শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান" নীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি সংশোধনবাদী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল ১৯৬৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ঊনবিংশ অধিবেশনে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ। সেই ভাষণে তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি পরিষ্কার ঘোষণা দেন যে, লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষ এখন তাদের মুক্তির ইতিহাস নিজেদের রক্তে লিখতে শুরু করেছে। এই ওজস্বী ভাষণের ঠিক পরদিন কিউবান প্রবাসী সমাজতান্ত্রিক-বিরোধীরা জাতিসংঘের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে মর্টার হামলা চালায়, যা তাঁর উপস্থিতির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বড় প্রমাণ। এর পরপরই ১৯৬৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়াতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় অর্থনৈতিক সম্মেলনে তিনি তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ‘আলজিয়ার্স ভাষণ’ দেন। সেখানে চে খোলাখুলিভাবে সোভিয়েত ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুন্নত ও শোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মতোই অসমান ও শোষণমূলক বাণিজ্য করছে। এই ভাষণের ফলে কিউবা-সোভিয়েত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। ফিদেল কাস্ত্রো তখন অর্থনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে সোভিয়েত ব্লকের প্রবল চাপের মুখে চে গুয়েভারাকে কিউবার সমস্ত রাষ্ট্রীয় পদ, মন্ত্রিত্ব এবং নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়।
কিউবা ত্যাগের পর চে গুয়েভারা বিশ্ব-বিপ্লবের ধারণাকে ছড়িয়ে দিতে তাঁর বিখ্যাত ‘ত্রিমহাদেশীয় কৌশল’ প্রবর্তন করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডমিনো তত্ত্বের বিপরীতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ব্যস্ত ও দুর্বল রাখতে বিশ্বজুড়ে দুই, তিন বা ততোধিক ভিয়েতনামের জন্ম দেওয়ার সামরিক আহ্বান জানান। এই তত্ত্বের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে কঙ্গো কিনশাসায় তাঁর মার্ক্সবাদী গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর প্রধান কারণ ছিল স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বুঝতে না পারা, কঙ্গোলিজ নেতা লঁরা কাবিলার বাহিনীর চরম শৃঙ্খলহীনতা এবং চে-র নিজস্ব সামরিক সংস্কৃতির সাথে আফ্রিকান বাস্তবতার তীব্র অসঙ্গতি।
এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি বলিভিয়ায় তাঁর ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর পুনরাবৃত্তি করতে যান। সেখানে তাঁর সাথে একমাত্র নারী গেরিলা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হাইডি তামারা , যিনি 'টানিয়া' নামে পরিচিত। ছদ্মবেশে গোয়েন্দাগিরি ও লজিস্টিক সাপোর্টে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু বলিভিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল কিউবা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে রেনে বারিয়েনতোসের সামরিক সরকারের ভূমি সংস্কারের কারণে গ্রামীণ আদিবাসী কৃষকদের মধ্যে কোনো বড় অসন্তোষ ছিল না। তার ওপর ভাষাগত দূরত্ব ছিল এক বিশাল বাধা; স্থানীয় কৃষকেরা স্প্যানিশের বদলে কেচুয়া ও গুয়ারানি ভাষায় কথা বলত, যার ফলে চে-র বাহিনী তাদের সাথে সংযোগ গড়তে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, বলিভিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মারিও মোনহে চে-র সাথে দেখা করে দাবি করেছিলেন যে, বলিভিয়ার মাটির এই যুদ্ধের সুপ্রিম কমান্ডার হবেন তিনি নিজে। চে তা মেনে না নেওয়ায় দলের ভেতরের নেতৃত্বের অহং ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের কারণে সেই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টি চে-কে সমর্থন করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়।
ফলস্বরূপ, স্থানীয় জনবিচ্ছিন্নতা, চরম প্রতিকূল পরিবেশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ পরিচালিত বিশেষ দমন অভিযান 'অপারেশন সিনথিয়া'-র আওতায় সিআইএ-প্রশিক্ষিত বলিভিয়ান রেঞ্জার বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর 'কিব্রাদা দেল ইউরো' গিরিখাতে আহত অবস্থায় বন্দি হন চে। বন্দি হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক 'বলিভিয়ান ডায়েরি' সম্বলিত ব্যাগটি এক বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেন তাঁর শেষ লড়াইয়ের সত্যনিষ্ঠ দলিলটি সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে বিকৃত না হয়। পরদিন, ৯ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামের একটি জরাজীর্ণ স্কুলকক্ষে বলিভিয়ার সামরিক প্রধান রেনে বারিয়েনতোসের সরাসরি আদেশে এবং সিআইএ কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজের উপস্থিতিতে কোনো প্রকার আইনি বিচার ছাড়াই অত্যন্ত অনৈতিক ও নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ঘাতক সার্জেন্ট মারিও তেরান যখন মদ্যপ অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢোকে, চে তখন বুক চিতিয়ে তাঁর শেষ অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন: "আমি জানি তুমি আমাকে মারতে এসেছ। গুলি করো কাপুরুষ, তুমি কেবল একজন মানুষকে হত্যা করবে, তার আদর্শকে নয়।" মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর আইনি ও শারীরিক পরিচিতি নিশ্চিত করার অছিলায় বলিভিয়ার সামরিক জান্তা তাঁর দুই হাতের কবজি কেটে রাসায়নিক পাত্রে সংরক্ষণ করে হাভানায় পাঠিয়েছিল, যা বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসে এক পৈশাচিক দালিলিক প্রমাণ। পরবর্তীতে ডিক্লাসিফাইড হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নথিপত্র প্রমাণ করে যে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে এই অভিযানের প্রতিটি মুহূর্তের গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছিল। দীর্ঘ তিন দশক পর ১৯৯৭ সালে ভ্যালেগ্রান্দেতে তাঁর গোপন গণকবর আবিষ্কৃত হলে তাঁর দেহাবশেষ কিউবার সান্তা ক্লারায় এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বস্তুনিষ্ঠতার নিরিখে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, চে গুয়েভারা একই সাথে ইতিহাসের এক পরম পূজনীয় মুক্তিদূত এবং এক নির্মম শাসনতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব। ভিন্নমত দমন, সমকামীদের প্রতি নীতিগত কঠোরতা এবং আইনি প্রক্রিয়া বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য দক্ষিণপন্থী ও উদারপন্থী সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে তিনি একজন কঠোর ও নির্মম আদর্শবাদী। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল মুক্তিকামী শক্তির কাছে তিনি শৃঙ্খলমুক্তির এক আপসহীন আইকন। মৃত্যুর অর্ধশতক পরেও আলবার্তো কোর্দার তোলা তাঁর কালজয়ী আলোকচিত্র ‘গেরিলিরো হিরোইকো’-র যে বাণিজ্যিক রূপান্তর ঘটেছে, তা উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কূটাভাস। যে পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে চে গুয়েভারা আজীবন লড়াই করলেন, সেই বহুজাতিক পুঁজিবাদী কর্পোরেট বাজারই আজ তাঁর বৈপ্লবিক অবয়বকে টি-শার্ট, পোস্টার ও বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করে বিলিয়ন ডলারের মুনাফা কামাচ্ছে। এটি তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শকে এক প্রকার নিষ্ক্রিয় করে একটি নিরীহ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।
আর্নেস্তো চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার তাই কোনো সরলরৈখিক সমীকরণ নয়; এটি এক গভীর আত্মদ্বন্দ্বে জারিত আখ্যান। রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন ও নির্মম বাস্তবতায় তিনি হয়তো একজন ব্যর্থ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর অনেক সামরিক সিদ্ধান্তই হয়তো ডেকে এনেছিল বিপর্যয়। কিন্তু দিনশেষে চে গুয়েভারা কোনো সাধারণ ক্ষমতার লোভী রাজনীতিক ছিলেন না। নিজের তৈরি করা কঠোর আদর্শের জন্য সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুখ, মন্ত্রিত্বের গদি এবং নিশ্চিত বুর্জোয়া জীবনের সচ্ছলতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন—ইতিহাস তাঁকে সহজে ভুলে যায় না। পুঁজিবাদ তাঁর ছবি বিক্রি করে মুনাফা লুটতে পারে, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই আপসহীন শৃঙ্খল ভাঙার তাড়নাকে কিনতে পারে না। সমস্ত তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও শাসনতান্ত্রিক ত্রুটির ঊর্ধ্বে উঠে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর যে চিরকালীন মানবিক আদিম আকাঙ্ক্ষা—চে গুয়েভারা আজীবন তারই এক জীবন্ত, স্পন্দমান এবং অবিনাশী ইশতেহার।
আজ ১৪ জুন—এই কালজয়ী বিপ্লবীর শুভ জন্মদিন। ইতিহাসের খেরোখাতায় তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন এক অমলিন, দীপ্তিময় এবং তীব্র পঠনযোগ্য ধ্রুবতারা হয়ে। ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে ধূলিমগ্ন যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া এই চির-তরুণ রোমান্টিক রাজপুত্রের জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলিত মানুষের হৃদয়ে আজো বেজে ওঠে এক নীরব ও গভীর শ্রদ্ধাগাথা।
শুভ জন্মদিন, কমরেড চে গুয়েভারা!

বাহাউদ্দিন গোলাপ,
১৪ জুন,২০২৬
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে আর্নেস্তো চে গুয়েভারা একটি অত্যন্ত জটিল, বহুমাত্রিক এবং তুমুল বিতর্কিত নাম। ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার সান্তা ফে শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেন আর্নেস্তো গুয়েভারা দে লা সের্না। কালক্রমে তিনি বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলমুক্তির এক অবিনাশী প্রতীকে পরিণত হন। তবে সমকালীন ইতিহাসচর্চা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নির্মেদ আলোয় চে গুয়েভারা কেবল একজন রোমান্টিক গেরিলা নেতা নন। তিনি একই সাথে একজন কট্টর মার্ক্সবাদী সামরিক তত্ত্ববিদ, কিউবা বিপ্লবের প্রধান স্থপতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাস্তবতায় এক তীব্র বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন, রাজনৈতিক দর্শন এবং সামরিক কৌশলকে বুঝতে হলে কেবল স্তুতিগাথা যথেষ্ট নয়। এর জন্য তাঁর প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক চুক্তির মারপ্যাঁচ এবং ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগের ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের একটি নির্মোহ মূল্যায়ন অপরিহার্য।
সান্তা ফে শহরে জন্মের পর আর্নেস্তোর শৈশব ও কৈশোর কেটেছিল এক মননশীল ও উদার পারিবারিক আবহে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই তিনি তীব্র হাঁপানি রোগে আক্রান্ত ছিলেন, যা তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পিছু ছাড়েনি। কিন্তু এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর অদম্য প্রাণশক্তিকে দমাতে পারেনি; বরং এটি তাঁকে আরও জেদি ও লড়াকু করে তোলে। তাঁর পরিবারে ছিল তিন হাজারেরও বেশি বইয়ের এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, যেখানে ডুব দিয়ে কিশোর আর্নেস্তো কার্ল মার্ক্স, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন থেকে শুরু করে পাবলো নেরুদা, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা এবং জঁ-পল সার্ত্রের দর্শনের সাথে পরিচিত হন। একই সাথে দাবা খেলা ও খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র ঝোঁক। ১৯৪৭ সালে তিনি বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন। চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনকারী এই তরুণ মূলত মানুষের রোগমুক্তির স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু মানবসমাজের গভীরে প্রোথিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাধিটি তাঁকে আরও বেশি তাড়িত করেছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই ছাত্রটির বৈপ্লবিক চেতনার প্রধান রূপান্তর ঘটেছিল ১৯৫২ সালের প্রথমার্ধে নেওয়া লাতিন আমেরিকা পরিভ্রমণের মাধ্যমে। বন্ধু আলবার্তো গ্রানাদোকে সাথে নিয়ে এক জরাজীর্ণ মোটরসাইকেলে তিনি এই সফরে বের হন। এই সফর সমগ্র লাতিন আমেরিকা জুড়ে ছিল না, এটি মূলত আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, কলম্বিয়া এবং ভেনিজুয়েলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পথিমধ্যে চিলির লস অ্যাঞ্জেলেস নামক স্থানে মোটরসাইকেলটি চিরতরে অচল হয়ে যায় এবং বাকি পথ তাঁরা পায়ে হেঁটে, ট্রাকে বা ভেলায় পাড়ি দিয়েছিলেন। এই দীর্ঘ ভ্রমণ কেবল কোনো ভৌগোলিক পর্যটন ছিল না, এটি ছিল লাতিন আমেরিকার খনি শ্রমিকদের অমানবিক শ্রম ও আদিবাসীদের চরম অবহেলিত জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। পেরুর আমাজন অববাহিকার সান পাবলো কুষ্ঠাশ্রমে কুষ্ঠরোগীদের সামাজিক ও শারীরিক বিচ্ছিন্নতা তরুণ আর্নেস্তোকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই ভ্রমণের পরপরই ১৯৫৩ সালে তিনি বলিভিয়ায় যান এবং সেখানে জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা খনি শ্রমিকদের ক্ষমতা ও সংস্কারের প্রথম বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেন, যা তাঁর সমাজতান্ত্রিক ভাবনাকে আরও তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করে।
এই বৈপ্লবিক বোধ চে-র চিন্তাধারায় এক ধরনের আপসহীন মানসিকতা তৈরি করে। ১৯৫৩ সালের শেষভাগে গুয়াতেমালায় অবস্থানকালীন ওখানকার সমাজতান্ত্রিক ও বামপন্থী নির্বাসিতরা তাঁর কথার মাঝে আর্জেন্টিনার আঞ্চলিক সম্বোধন ‘চে’ (যার অর্থ বন্ধু বা ভাই) ব্যবহারের অভ্যাসের কারণে তাঁকে ভালোবেসে প্রথম ‘চে’ নামে ডাকতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে ইতিহাসে তাঁর স্থায়ী পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় পেরুর নির্বাসিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিবিদ হিল্ডা গাদিয়ার সাথে। হিল্ডা গাদিয়াই চে-কে প্রথম উচ্চতর মার্ক্সবাদী দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং মেক্সিকোতে নির্বাসিত থাকাকালীন ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রোর সাথে তাঁর ঐতিহাসিক সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেন। ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এই অভিযানের মূল উস্কানিদাতা ছিল মার্কিন বহুজাতিক ফল বিপণন সংস্থা 'ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানি', যাদের বিশাল ভূ-সম্পত্তি আরবেনজ সরকার ভূমি সংস্কার আইনের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। এই ঘটনা চে-র সেই সশস্ত্র দর্শনকে আরও দৃঢ় করে। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বা নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। শোষক শ্রেণী কখনো স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়ে না। কাস্ত্রোর ‘২৬শে জুলাই আন্দোলন’-এ যোগ দিয়ে ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি 'গ্রানমা' নামক জাহাজে চড়ে কিউবায় অবতরণ করেন। সিয়েরা মায়েস্ত্রার গেরিলা যুদ্ধে চে তাঁর বিখ্যাত ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটান। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি ছোট ও সুসংগঠিত গেরিলা অগ্রবর্তী দল গণ-আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ছাড়াই একটি দেশে বৈপ্লবিক পরিস্থিতির সূচনা করতে পারে। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরের শেষভাগে চে-র নেতৃত্বে পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘সান্তা ক্লারার যুদ্ধ’-এ বাতিস্তার সামরিক ট্রেনের ওপর আক্রমণ কিউবা বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয় নির্ধারণ করে এবং ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি স্বৈরাচারী বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে কিউবার মাটিতে এই বিপ্লবী মডেল সফল হয়।
কিউবার বিপ্লবোত্তর পুনর্গঠন পর্বে চে গুয়েভারা যে প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বিচারবিভাগীয় নীতি গ্রহণ করেছিলেন, তা আজো তীব্র সমালোচনার উৎস। বাতিস্তা সরকারের পতনের পর ১৯৫৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিপ্লবী সরকার কর্তৃক কিউবার ১৯৪০ সালের সংবিধানে 'আইনি ধারা ১২' সংশোধন করে একটি বিশেষ ডিক্রি জারির মাধ্যমে চে গুয়েভারাকে 'জন্মসূত্রে কিউবান নাগরিক' হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা ছিল কিউবার ইতিহাসে এক বিরল আইনি ঘটনা। ১৯৫৯ সালের প্রথমভাগে হাভানার ‘লা কাবানিয়া’ দুর্গের সামরিক প্রধান হিসেবে বাতিস্তা সরকারের সহযোগী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল। বাতিস্তা সরকারের তৎকালীন ১৯৩৮ সালের 'প্রতিরক্ষা সামাজিক কোড' এবং বিপ্লবী সরকারের 'আইনি ডিক্রি নম্বর ২০৮' ও 'বিপ্লবী আইন নম্বর ১১'-এর আওতায় এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলো পরিচালিত হয়েছিল। এই সময় আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে চে-র একটি উক্তি আজো দালিলিক প্রমাণ হিসেবে বিতর্ক তৈরি করে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, "বিচার বিভাগীয় প্রমাণের উপস্থাপনা বিপ্লবী ট্রাইব্যুনালগুলোর জন্য অপ্রয়োজনীয়, এটি একটি বিপ্লবী যুদ্ধ।" পশ্চিমা ঐতিহাসিক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো আন্তর্জাতিক আইনি বিধিমালা বা আসামিপক্ষের যথাযথ আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ অনুসৃত হয়নি। সেখানে বাতিস্তা সরকারের বেশ কিছু সহযোগীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যার সঠিক সংখ্যা নিয়ে আজো ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের অনেকেই একে রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও রাষ্ট্রীয় ভিন্নমত দমনের একটি নিকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। উল্লেখ্য, সমাজতন্ত্রের প্রতি অনুপযুক্ত নাগরিকদের কৃষি-শ্রমশিবিরে পাঠানোর বিতর্কিত প্রক্রিয়াটি কিউবায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় ১৯৬৫ সালের শেষভাগে, যার নাম ছিল 'উৎপাদনে সহায়তার জন্য সামরিক ইউনিট'। তখন চে কিউবা ছেড়ে চলে গেছেন, ফলে তিনি সেই ক্যাম্পের সরাসরি পরিচালক ছিলেন না। তবে তাঁর তৈরি নতুন মানব তত্ত্বের কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক শুদ্ধিবাদ এই ক্যাম্প তৈরিতে গভীর আদেশিক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
এর পাশাপাশি, সমাজতান্ত্রিক কিউবার শিল্পমন্ত্রী এবং জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তাঁর অর্থনৈতিক নীতিগুলো চরম প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দেয়। পুঁজিবাদের প্রতি তীব্র অবজ্ঞা প্রকাশ করতে তিনি জাতীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কিউবান মুদ্রার নোটগুলোতে নিজের পুরো নামের বদলে শুধু অবহেলাভরে ‘চে’ লিখে স্বাক্ষর করতেন, যা ছিল বিশ্ব ব্যাংকিং ইতিহাসের এক অভিনব দালিলিক কূটাভাস। চে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ "কিউবায় সমাজতন্ত্র এবং মানুষ"-এ এক নতুন মানব ধারণার অবতারণা করেন। তিনি চেয়েছিলেন মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ বা বস্তুগত লাভ ত্যাগ করে কেবল নৈতিক চেতনা ও স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করবে। মানুষের সহজাত মনস্তত্ত্ব ও বাজার বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এই অতি-উগ্র অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং অবাস্তব দ্রুত শিল্পায়ন নীতির কারণে কিউবার উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে কিউবান অর্থনীতিতে বিখ্যাত 'শিল্প বনাম কৃষি উৎপাদন বিতর্ক' শুরু হয়, যেখানে সোভিয়েত ব্লকের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার বিরোধিতা করে চে কিউবাকে একতরফা ভারী শিল্পের দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করেন, যা চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। চিনি শিল্পের ওপর মারাত্মক ধস নামে। ফলে কিউবা শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সম্পূর্ণ সোভিয়েত-নির্ভর হয়ে পড়ে। এমনকি ১৯৬২ সালের বিখ্যাত 'কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস' বা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন কিউবার মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অগোচরে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে, চে তা সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু পরে কিউবাকে অন্ধকারে রেখে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির সাথে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ফিরিয়ে নেন, তখন চে একে সোভিয়েত ইউনিয়নের চরম সাম্রাজ্যবাদী আপস ও বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করেন।
চে গুয়েভারার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের চীন-সোভিয়েত বিভাজন এবং সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের সাথে তাঁর সংঘাত। চে ক্রুশ্চেভ-এর পশ্চিমা পুঁজিবাদের সাথে "শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান" নীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে একটি সংশোধনবাদী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা ছিল ১৯৬৪ সালের ১১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ঊনবিংশ অধিবেশনে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণ। সেই ভাষণে তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি পরিষ্কার ঘোষণা দেন যে, লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষ এখন তাদের মুক্তির ইতিহাস নিজেদের রক্তে লিখতে শুরু করেছে। এই ওজস্বী ভাষণের ঠিক পরদিন কিউবান প্রবাসী সমাজতান্ত্রিক-বিরোধীরা জাতিসংঘের সদর দপ্তর লক্ষ্য করে মর্টার হামলা চালায়, যা তাঁর উপস্থিতির ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের বড় প্রমাণ। এর পরপরই ১৯৬৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়াতে অনুষ্ঠিত আফ্রো-এশীয় অর্থনৈতিক সম্মেলনে তিনি তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ‘আলজিয়ার্স ভাষণ’ দেন। সেখানে চে খোলাখুলিভাবে সোভিয়েত ও পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ তোলেন যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন অনুন্নত ও শোষিত সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের মতোই অসমান ও শোষণমূলক বাণিজ্য করছে। এই ভাষণের ফলে কিউবা-সোভিয়েত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়। ফিদেল কাস্ত্রো তখন অর্থনৈতিক ও সামরিক অস্তিত্বের জন্য সম্পূর্ণভাবে মস্কোর ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ফলে সোভিয়েত ব্লকের প্রবল চাপের মুখে চে গুয়েভারাকে কিউবার সমস্ত রাষ্ট্রীয় পদ, মন্ত্রিত্ব এবং নাগরিকত্ব ত্যাগ করে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়।
কিউবা ত্যাগের পর চে গুয়েভারা বিশ্ব-বিপ্লবের ধারণাকে ছড়িয়ে দিতে তাঁর বিখ্যাত ‘ত্রিমহাদেশীয় কৌশল’ প্রবর্তন করেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডমিনো তত্ত্বের বিপরীতে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ব্যস্ত ও দুর্বল রাখতে বিশ্বজুড়ে দুই, তিন বা ততোধিক ভিয়েতনামের জন্ম দেওয়ার সামরিক আহ্বান জানান। এই তত্ত্বের অংশ হিসেবে ১৯৬৫ সালে কঙ্গো কিনশাসায় তাঁর মার্ক্সবাদী গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এর প্রধান কারণ ছিল স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বুঝতে না পারা, কঙ্গোলিজ নেতা লঁরা কাবিলার বাহিনীর চরম শৃঙ্খলহীনতা এবং চে-র নিজস্ব সামরিক সংস্কৃতির সাথে আফ্রিকান বাস্তবতার তীব্র অসঙ্গতি।
এরপর ১৯৬৬ সালে তিনি বলিভিয়ায় তাঁর ‘ফোকো তত্ত্ব’-এর পুনরাবৃত্তি করতে যান। সেখানে তাঁর সাথে একমাত্র নারী গেরিলা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন হাইডি তামারা , যিনি 'টানিয়া' নামে পরিচিত। ছদ্মবেশে গোয়েন্দাগিরি ও লজিস্টিক সাপোর্টে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু বলিভিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল কিউবা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে রেনে বারিয়েনতোসের সামরিক সরকারের ভূমি সংস্কারের কারণে গ্রামীণ আদিবাসী কৃষকদের মধ্যে কোনো বড় অসন্তোষ ছিল না। তার ওপর ভাষাগত দূরত্ব ছিল এক বিশাল বাধা; স্থানীয় কৃষকেরা স্প্যানিশের বদলে কেচুয়া ও গুয়ারানি ভাষায় কথা বলত, যার ফলে চে-র বাহিনী তাদের সাথে সংযোগ গড়তে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, বলিভিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মারিও মোনহে চে-র সাথে দেখা করে দাবি করেছিলেন যে, বলিভিয়ার মাটির এই যুদ্ধের সুপ্রিম কমান্ডার হবেন তিনি নিজে। চে তা মেনে না নেওয়ায় দলের ভেতরের নেতৃত্বের অহং ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের কারণে সেই সময়ের কমিউনিস্ট পার্টি চে-কে সমর্থন করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়।
ফলস্বরূপ, স্থানীয় জনবিচ্ছিন্নতা, চরম প্রতিকূল পরিবেশ এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ পরিচালিত বিশেষ দমন অভিযান 'অপারেশন সিনথিয়া'-র আওতায় সিআইএ-প্রশিক্ষিত বলিভিয়ান রেঞ্জার বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে ১৯৬৭ সালের ৮ অক্টোবর 'কিব্রাদা দেল ইউরো' গিরিখাতে আহত অবস্থায় বন্দি হন চে। বন্দি হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে তিনি তাঁর ঐতিহাসিক 'বলিভিয়ান ডায়েরি' সম্বলিত ব্যাগটি এক বিশ্বস্ত সহযোদ্ধার মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, যেন তাঁর শেষ লড়াইয়ের সত্যনিষ্ঠ দলিলটি সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে বিকৃত না হয়। পরদিন, ৯ অক্টোবর লা হিগুয়েরা গ্রামের একটি জরাজীর্ণ স্কুলকক্ষে বলিভিয়ার সামরিক প্রধান রেনে বারিয়েনতোসের সরাসরি আদেশে এবং সিআইএ কর্মকর্তা ফেলিক্স রদ্রিগেজের উপস্থিতিতে কোনো প্রকার আইনি বিচার ছাড়াই অত্যন্ত অনৈতিক ও নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী, ঘাতক সার্জেন্ট মারিও তেরান যখন মদ্যপ অবস্থায় কাঁপতে কাঁপতে ঘরে ঢোকে, চে তখন বুক চিতিয়ে তাঁর শেষ অমোঘ বাণী উচ্চারণ করেছিলেন: "আমি জানি তুমি আমাকে মারতে এসেছ। গুলি করো কাপুরুষ, তুমি কেবল একজন মানুষকে হত্যা করবে, তার আদর্শকে নয়।" মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাঁর আইনি ও শারীরিক পরিচিতি নিশ্চিত করার অছিলায় বলিভিয়ার সামরিক জান্তা তাঁর দুই হাতের কবজি কেটে রাসায়নিক পাত্রে সংরক্ষণ করে হাভানায় পাঠিয়েছিল, যা বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসে এক পৈশাচিক দালিলিক প্রমাণ। পরবর্তীতে ডিক্লাসিফাইড হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নথিপত্র প্রমাণ করে যে, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে এই অভিযানের প্রতিটি মুহূর্তের গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছিল। দীর্ঘ তিন দশক পর ১৯৯৭ সালে ভ্যালেগ্রান্দেতে তাঁর গোপন গণকবর আবিষ্কৃত হলে তাঁর দেহাবশেষ কিউবার সান্তা ক্লারায় এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বস্তুনিষ্ঠতার নিরিখে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, চে গুয়েভারা একই সাথে ইতিহাসের এক পরম পূজনীয় মুক্তিদূত এবং এক নির্মম শাসনতান্ত্রিক ব্যক্তিত্ব। ভিন্নমত দমন, সমকামীদের প্রতি নীতিগত কঠোরতা এবং আইনি প্রক্রিয়া বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য দক্ষিণপন্থী ও উদারপন্থী সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে তিনি একজন কঠোর ও নির্মম আদর্শবাদী। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল মুক্তিকামী শক্তির কাছে তিনি শৃঙ্খলমুক্তির এক আপসহীন আইকন। মৃত্যুর অর্ধশতক পরেও আলবার্তো কোর্দার তোলা তাঁর কালজয়ী আলোকচিত্র ‘গেরিলিরো হিরোইকো’-র যে বাণিজ্যিক রূপান্তর ঘটেছে, তা উত্তর-আধুনিক পুঁজিবাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কূটাভাস। যে পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে চে গুয়েভারা আজীবন লড়াই করলেন, সেই বহুজাতিক পুঁজিবাদী কর্পোরেট বাজারই আজ তাঁর বৈপ্লবিক অবয়বকে টি-শার্ট, পোস্টার ও বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করে বিলিয়ন ডলারের মুনাফা কামাচ্ছে। এটি তাঁর বৈপ্লবিক আদর্শকে এক প্রকার নিষ্ক্রিয় করে একটি নিরীহ ফ্যাশন ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।
আর্নেস্তো চে গুয়েভারার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার তাই কোনো সরলরৈখিক সমীকরণ নয়; এটি এক গভীর আত্মদ্বন্দ্বে জারিত আখ্যান। রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন ও নির্মম বাস্তবতায় তিনি হয়তো একজন ব্যর্থ প্রশাসক ছিলেন, তাঁর অনেক সামরিক সিদ্ধান্তই হয়তো ডেকে এনেছিল বিপর্যয়। কিন্তু দিনশেষে চে গুয়েভারা কোনো সাধারণ ক্ষমতার লোভী রাজনীতিক ছিলেন না। নিজের তৈরি করা কঠোর আদর্শের জন্য সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুখ, মন্ত্রিত্বের গদি এবং নিশ্চিত বুর্জোয়া জীবনের সচ্ছলতা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াতে পারেন—ইতিহাস তাঁকে সহজে ভুলে যায় না। পুঁজিবাদ তাঁর ছবি বিক্রি করে মুনাফা লুটতে পারে, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই আপসহীন শৃঙ্খল ভাঙার তাড়নাকে কিনতে পারে না। সমস্ত তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা ও শাসনতান্ত্রিক ত্রুটির ঊর্ধ্বে উঠে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর যে চিরকালীন মানবিক আদিম আকাঙ্ক্ষা—চে গুয়েভারা আজীবন তারই এক জীবন্ত, স্পন্দমান এবং অবিনাশী ইশতেহার।
আজ ১৪ জুন—এই কালজয়ী বিপ্লবীর শুভ জন্মদিন। ইতিহাসের খেরোখাতায় তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন এক অমলিন, দীপ্তিময় এবং তীব্র পঠনযোগ্য ধ্রুবতারা হয়ে। ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে ধূলিমগ্ন যুদ্ধক্ষেত্রে হারিয়ে যাওয়া এই চির-তরুণ রোমান্টিক রাজপুত্রের জন্মদিনে বিশ্বজুড়ে শৃঙ্খলিত মানুষের হৃদয়ে আজো বেজে ওঠে এক নীরব ও গভীর শ্রদ্ধাগাথা।
শুভ জন্মদিন, কমরেড চে গুয়েভারা!

বাহাউদ্দিন গোলাপ,
১৪ জুন,২০২৬

০৩ জুন, ২০২৬ ১২:১০
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে বাগেরহাটে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। ইসলাম প্রচার করতে এসে তিনি সেখানে সুপেয় পানির অভাবে মসজিদের পাশে খনন করেছিলেন প্রায় ২০০ একর আয়তনের বিশালাকৃতির একটি দিঘি। নিজের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি নদীর দুইটি কুমির এনে মিঠা পানির দিঘিতে বন্দী করেছিলেন। ভালোবেসে তাদের নামকরণ করেছিলেন কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নামে। তাঁর জীবদ্দশায় কুমির দুটি তাঁর হাতের ইশারায় চলতো। তিনি নাম ধরে ডাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে পাহাড়ের মতো তারা ভেসে উঠতো এবং মানুষের কাছে আসতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কালাপাহাড় পুরুষ এবং ধলাপাহাড় নারী কুমির হওয়ায় তারা দিঘিতে বেশকিছু বাচ্চা জন্ম দিয়েছিল। খানজাহান আলীর (রহ.) মৃত্যুর পরেও সেই কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধররা কয়েকশো বছর ধরে এই দিঘিতে বেঁচেছিল।
পরবর্তীকালে অযত্ন-অবহেলা, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা আর খাদ্যের অভাবে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বাচ্চা কুমিরগুলো একে একে মারা যেতে শুরু করে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর দিঘি। এতে মাজার ব্যবসায় ধ্বস নামে। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে নতুন ৩টি কুমির কিনে এনে খানজাহান আলীর দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। ঐতিহ্যের নামে মূলতঃ মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ। কিন্তু পরিচর্যার অভাব ও খাদ্য সংকটে ২টি কুমির মারা যায়। দিঘিতে অবশিষ্ট একটা কুমির টিকে থাকে। এই কুমিরের সাথে হযরত খানজাহান আলী (রহ.), তাঁর বংশধর কিংবা তাঁর আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাজার ব্যবসায়ী একদল ভন্ডের সাথে এই কুমিরের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আগত ভক্ত মাজার পূজারীরা আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আশায় কুমিরের জন্য টাকা দেয়, খাবার দেয়। খাবার হিসেবে মুরগি, ছাগল এবং মাংস কিনে দেয়। তবে সেগুলো কুমিরের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। কুমিরের মুখের সামনে থেকে ঘুরিয়ে এনে সেগুলো আবার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। মাজারের কাছে গড়ে উঠেছে আগরবাতি, মোমবাতি, তাগা, ফিতা, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁকসহ রকমারি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলে সেখানে চলছে নানান প্রতারণা আর পর্যটকদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। মাজার থেকে আয় হওয়া টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়। এই মাজার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত মাজারের খাদেম, স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কিছু মাদকসেবী, সরকার দলীয় কতিপয় নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি।
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল আর বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আমার উদাত্ত আহবান এবং বিনীত অনুরোধ থাকবে- দিঘির এই কুমিরকে অনতিবিলম্বে মিরপুরের চিড়িয়াখানা, চট্টগ্রামের কুমির প্রজনন কেন্দ্র কিংবা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে অবমুক্ত করা হোক। একটি মাংসাশী হিংস্র প্রাণিকে কোনো অবস্থাতেই একটি লোকালয়ের দর্শনীয় স্থানে রাখা যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে যেমন মানুষ শিরক করার মতো পাপাচারে লিপ্ত হবে, অন্যদিকে ফাতেমার মতো অনাথ পথশিশুরা কুমিরের খাদ্যবস্তুতে পরিনত হবে। আমার অনুসন্ধান করা এই ভেতরের গল্পটা দেশের ৯৯% মানুষ জানে না। অনেকেই ভক্তি সহকারে এই কুমিরের কাছে মানত করে। হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) প্রতিনিধি মনে করে। সরল বিশ্বাসী ধর্মভীরু এসব মানুষকে জেনেশুনে ধোঁকা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
তাছাড়া হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) আমলে ছেড়ে দেওয়া কুমির কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধরেরা কখনো কাউকে আক্রমণ করার ইতিহাস নেই। তবে ভারত থেকে আনা এই কুমিরটি বারবার হিংস্র আচরণ করছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এই কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিঘির প্রধান ঘাটে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ কুমিরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমণ করেছিল হিংস্র স্বভাবের মাদ্রাজি এই কুমির। ২০০৯ সালে মাজারে মানত করতে আসা এক মায়ের হাত থেকে তার শিশু সন্তানকে প্রথম এই কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরে দিঘির মাঝখানে শিশুটির মৃতদেহ ভেসে ওঠে। গতকাল এর সর্বশেষ আক্রমণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে মাজারে আশ্রিত ৭ বছরের অনাথ পথশিশু ফাতেমা আক্তার। কুমিরের আক্রমণে একের পর এক এসব হতাহতের ঘটনা ঘটলেও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, তাদের কাছে মাজার আর কুমির ব্যবসাই ছিল মুখ্য। পরিশেষে বলতে চাই- ভন্ডদের মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেখানে ভিনদেশ থেকে কিনে আনা কুমির পালনের কোনো প্রয়োজন নেই। অনাথ ফাতেমার জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে অন্তত মাজারের কুমির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হোক। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও সুশাসনকর্মী।
২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।
আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে বাগেরহাটে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সুফি সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ.)। ইসলাম প্রচার করতে এসে তিনি সেখানে সুপেয় পানির অভাবে মসজিদের পাশে খনন করেছিলেন প্রায় ২০০ একর আয়তনের বিশালাকৃতির একটি দিঘি। নিজের অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে মানুষকে ধর্মের পথে পরিচালিত করার জন্য তিনি নদীর দুইটি কুমির এনে মিঠা পানির দিঘিতে বন্দী করেছিলেন। ভালোবেসে তাদের নামকরণ করেছিলেন কালাপাহাড় আর ধলাপাহাড় নামে। তাঁর জীবদ্দশায় কুমির দুটি তাঁর হাতের ইশারায় চলতো। তিনি নাম ধরে ডাক দিলে সঙ্গে সঙ্গে দিঘির পানিতে পাহাড়ের মতো তারা ভেসে উঠতো এবং মানুষের কাছে আসতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কালাপাহাড় পুরুষ এবং ধলাপাহাড় নারী কুমির হওয়ায় তারা দিঘিতে বেশকিছু বাচ্চা জন্ম দিয়েছিল। খানজাহান আলীর (রহ.) মৃত্যুর পরেও সেই কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধররা কয়েকশো বছর ধরে এই দিঘিতে বেঁচেছিল।
পরবর্তীকালে অযত্ন-অবহেলা, পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা আর খাদ্যের অভাবে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বাচ্চা কুমিরগুলো একে একে মারা যেতে শুরু করে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে কুমিরশূন্য হয়ে পড়ে ঐতিহাসিক খানজাহান আলীর দিঘি। এতে মাজার ব্যবসায় ধ্বস নামে। পরে ২০০৫ সালে ভারত থেকে নতুন ৩টি কুমির কিনে এনে খানজাহান আলীর দিঘিতে অবমুক্ত করা হয়। ঐতিহ্যের নামে মূলতঃ মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্যেই নেওয়া হয় এই উদ্যোগ। কিন্তু পরিচর্যার অভাব ও খাদ্য সংকটে ২টি কুমির মারা যায়। দিঘিতে অবশিষ্ট একটা কুমির টিকে থাকে। এই কুমিরের সাথে হযরত খানজাহান আলী (রহ.), তাঁর বংশধর কিংবা তাঁর আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে মাজার ব্যবসায়ী একদল ভন্ডের সাথে এই কুমিরের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
আগত ভক্ত মাজার পূজারীরা আল্লাহর রহমত কামনা এবং তাদের মনোবাসনা পূর্ণ করার আশায় কুমিরের জন্য টাকা দেয়, খাবার দেয়। খাবার হিসেবে মুরগি, ছাগল এবং মাংস কিনে দেয়। তবে সেগুলো কুমিরের ভাগ্যে খুব একটা জোটে না। কুমিরের মুখের সামনে থেকে ঘুরিয়ে এনে সেগুলো আবার আরেক ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয়। মাজারের কাছে গড়ে উঠেছে আগরবাতি, মোমবাতি, তাগা, ফিতা, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁকসহ রকমারি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নানা কৌশলে সেখানে চলছে নানান প্রতারণা আর পর্যটকদের পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। মাজার থেকে আয় হওয়া টাকা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভাগবাটোয়ারা হয়। এই মাজার সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত মাজারের খাদেম, স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কিছু মাদকসেবী, সরকার দলীয় কতিপয় নেতা, স্থানীয় পুলিশ এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তি।
সরকারের ঊর্ধ্বতন মহল আর বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আমার উদাত্ত আহবান এবং বিনীত অনুরোধ থাকবে- দিঘির এই কুমিরকে অনতিবিলম্বে মিরপুরের চিড়িয়াখানা, চট্টগ্রামের কুমির প্রজনন কেন্দ্র কিংবা সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে অবমুক্ত করা হোক। একটি মাংসাশী হিংস্র প্রাণিকে কোনো অবস্থাতেই একটি লোকালয়ের দর্শনীয় স্থানে রাখা যৌক্তিক নয়। এতে একদিকে যেমন মানুষ শিরক করার মতো পাপাচারে লিপ্ত হবে, অন্যদিকে ফাতেমার মতো অনাথ পথশিশুরা কুমিরের খাদ্যবস্তুতে পরিনত হবে। আমার অনুসন্ধান করা এই ভেতরের গল্পটা দেশের ৯৯% মানুষ জানে না। অনেকেই ভক্তি সহকারে এই কুমিরের কাছে মানত করে। হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) প্রতিনিধি মনে করে। সরল বিশ্বাসী ধর্মভীরু এসব মানুষকে জেনেশুনে ধোঁকা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
তাছাড়া হযরত খানজাহান আলীর (রহ.) আমলে ছেড়ে দেওয়া কুমির কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় এবং তাদের বংশধরেরা কখনো কাউকে আক্রমণ করার ইতিহাস নেই। তবে ভারত থেকে আনা এই কুমিরটি বারবার হিংস্র আচরণ করছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এই কুমিরের আক্রমণে একটি কুকুর মারা যাওয়ার দৃশ্য দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দিঘির প্রধান ঘাটে সেখাম আলী নামের এক বৃদ্ধ কুমিরের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ২০২০ সালের দিকে এক কিশোরকে আক্রমণ করেছিল হিংস্র স্বভাবের মাদ্রাজি এই কুমির। ২০০৯ সালে মাজারে মানত করতে আসা এক মায়ের হাত থেকে তার শিশু সন্তানকে প্রথম এই কুমিরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরে দিঘির মাঝখানে শিশুটির মৃতদেহ ভেসে ওঠে। গতকাল এর সর্বশেষ আক্রমণের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে মাজারে আশ্রিত ৭ বছরের অনাথ পথশিশু ফাতেমা আক্তার। কুমিরের আক্রমণে একের পর এক এসব হতাহতের ঘটনা ঘটলেও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কারণ, তাদের কাছে মাজার আর কুমির ব্যবসাই ছিল মুখ্য। পরিশেষে বলতে চাই- ভন্ডদের মাজার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে সেখানে ভিনদেশ থেকে কিনে আনা কুমির পালনের কোনো প্রয়োজন নেই। অনাথ ফাতেমার জীবন বিসর্জনের বিনিময়ে অন্তত মাজারের কুমির ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হোক। #
❑ লেখাঃ আরিফ আহমেদ মুন্না
সাংবাদিক, কলামিস্ট, কবি ও সুশাসনকর্মী।
২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।